somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বব ডিলানের গান: উন্মোচন

২৫ শে এপ্রিল, ২০১০ রাত ১:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আপনাকে প্রথম শুনি ষোলো বছর বয়সে। গিটার আর হারমোনিকা নিয়ে নাকি সুরে একলা একটা লোক গেয়ে যাচ্ছে "হাউ মেনি রোডস মাস্ট আ ম্যান ওয়াক ডাউন, বিফোর ইউ কল হিম আ ম্যান..দা অ্যানসার মাই ফ্রেন্ড ইজ ব্লোইং ইন দা উইন্ড" মাথার ভিতরে যেন বিস্ফোরণ ঘটল...এমন সুরের চলনে এমন কথার মিশেল তো এর আগে শুনিনি কখনো! রবীন্দ্রসংগীত আর আধুনিক বাংলাগানের সুগার কোটেড নির্মাণে অভ্যস্ত কান আছড়ে পড়ল বাস্তবের কঠিন জমিতে। পাগলের মতো শুনে গেলাম "দা টাইম দে আর আ-চেঞ্জিং",“মিঃ টামবুরিন ম্যান", "লাভ মাইনাস জিরো/নো লিমিট", “লে ডাউন ইওর ওয়্যারি টিউন" এবং আরো, এবং আরো, এবং আরো..সেই আমার আপনাকে শোনার শুরু।

ততদিনে শুনে ফেলেছি সুমন চট্টোপাধ্যায়ের “কতোটা পথ পেরোলে তবে পথিক বলা যায়” বা “আমি যাকে ভালবাসি” -র মতো সব অনুসারী গান। চেটেপুটে খেয়ে চলেছি আপনার সম্পর্কিত সবকিছু, হাতে চলে এসেছে আপনার লিরিক বই- আপনাকে নিয়ে আমার ঊন্মাদনা তখন চরমপন্থী।

তখন ক্যাসেট আর টেপ রেকর্ডারের যুগ। আপনার প্রথম যে ক্যাসেট-টি কিনেছিলাম, আমার ভালোবাসার অত্যাচারে কিছুদিনের মধ্যেই তা দেহ রাখলো। তখন হাতে এলো হাইওয়ে সিক্সটি-ওয়ান রিভিজিটেড... এবং অবধারিতভাবে, "লাইক আ রোলিং স্টোন"। বুঝলাম কিভাবে আপনি অত্যন্ত সচেতন ভাবে ফোক থেকে সরে যাচ্ছেন রক অ্যান্ড রোলের দিকে, কিভাবে ফোকের মেদুরতাকে গ্রাস করে নিচ্ছে রক অ্যান্ড রোলের উন্মাদনা।

জানলাম, নিউপোর্ট ফোক ফেস্টিভালে কিভাবে আপনি অ্যাকুস্টিক গিটার-হারমোনিকা ছেড়ে চড়া আলোয়, চড়া সুরে হয়েছিলেন ‘ইলেকট্রিক’। জানলাম, ফোক আন্দোলন কে কিভাবে নিজের ওঠার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছেন চিরকাল। তখন ব্যথিত হয়েছিলাম, ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম- ভেবেছিলাম এই আমার আপনাকে শোনার শেষ। সত্যি সত্যি শোনা বন্ধ করে দিয়েছিলাম নাকি আজ আর মনে নেই, বরং কি্ছুদিনের মধ্যেই আপনি আবার আমাকে চমৎকৃত করে দিলেন ন্যাশভিল স্কাইলাইন আর জন ওয়েসলি হার্ডিং দিয়ে। দেখলাম আপনি আপনার শিল্পীসত্বাকে নিয়ে গেছেন এক নতুন উত্তরণে, যার নাম কান্ট্রি-রক। গানের লিরিক হয়েছে আরও বিমূর্ত (হাইওয়ে সিক্সটি-ওয়ান রিভিজিটেড- এর “ডিজ়োলেশন রো” দিয়ে যার শুরু), গানের সুর নেমে এসেছে মাটির আরো কাছাকাছি। অনুভব করলাম, কত অকারণ ছিল আমার অভিমান। অনুভব করলাম, আপনার মত শিল্পীরা শুধুমাত্র একটি ধারায় আটকে থাকার জন্য জন্মান না। সমস্ত রকম গানের শী্র্ষবিন্দু ছোঁয়াই তাদের সঙ্গীত-পরিক্রমার মহানির্বাণ।

এভাবেই বাড়তে থাকে আমার ভালবাসার বয়স, ইতিমধ্যে এক-এক করে শোনা হয়ে গেছে আপনার প্রায় সবকটি অ্যালবাম। দেখেছি কি অবলীলায় আপনি কান্ট্রি-রক থেকেও সরে গেলেন আরো ভিন্নতর ধারার দিকে, ইংরাজিতে যাকে বলে "মুভিং অ্যাওয়ে টু দি নিউয়ার প্যাসচার"। দেখেছি ৮০-র দশকের প্রথমে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের পর আপনার গান কিভাবে গসপেল মিউজ়িকের কিছু এলিমেন্ট আহরণ করে হয়ে উঠলো গসপেল-রক। বেরোলো স্লো ট্রেন কামিং, এবং আলোড়ন ফেলে দিলো। এই অ্যালবামের আপনি আবার কুসুমকোমল, ঈশ্বরবিশ্বাসী। জগতের যা কিছু ভালো, তার উপর পরম আস্থাশীল। আপনাকে যেন কোনোভাবেই মেলানো যায় না ৬০-এর দশকের সেই প্রতিবাদী, বজ্রকঠিন গায়কীর সাথে!

এরপর এলো ৯০-এর দশক, যে দশকের পরতে-পরতে জড়িয়ে আছে আমাদের বড় হয়ে ওঠা। এই দশকে আপনি যেন অনেকটাই নিষ্প্রভ, অতীতের ছায়া। আর সবাই যখন আপনার সাংগীতিক জীবনের এপিটাফ রচনা করে ফেলেছে, মিস্টার ডিলান, কোনোদিন কি জানবেন ষোলো-আঠারো বছরের একটা ছেলে কিভাবে শবরীর প্রতীক্ষায় ছিলো আপনার ফিরে আসার?

আপনি স্বমহিমায় ফিরে এলেন, ১৯৯৭-এর টাইম আউট অফ মাইন্ড দিয়ে। ১২ বারে বাঁধা ব্লুজ যে এত রোমাঞ্চক হতে পারে আপনাকে শুনেই ত তা প্রথম জানলাম। এই অ্যালবামে আপনি আবার নিজেকে ভাঙলেন। “লাভ সিক”, “ডার্ট রোড ব্লুজ”, “নট ডার্ক ইয়েট” শুনে থমকে গেলো সব্বাই। ব্লুজ-রকের জগতেও আপনার সদর্প উপস্থিতি ঘোষিত হল। আর তারপর? তারপর তো ইতিহাস! “লাভ অ্যান্ড থেফট”, মডার্ন টাইমস, টুগেদার থ্রু লাইফ দিয়ে সম্পুর্ণ হল আপনার ব্লুজ রকের বৃত্ত। ২০০৫ সালে “লাভ অ্যান্ড থেফট” আর ২০০৬ সালে মডার্ন টাইমস নিয়ে, প্রায় ৬৫ বছরের আপনি ফের ফিরে এলেন বিলবোর্ড মিউজিক চার্ট এর শীর্ষে। যা এই বয়সে প্রায় অভাবনীয়!


আপনার চূড়ান্ত আত্মকেন্দ্রিকতা, অতিমানবিক মিথ ও মিথ্যে কথা, সমস্ত ফোক জগতের সাথে আপনার বিখ্যাত বিশ্বাসঘাতকতা, কিচ্ছু মনে রাখিনি আমি, মিস্টার ডিলান। মনে রাখতেও চাই নি, কারণ কি জানেন?কারণ, আপনার গানের পরাবাস্তবতা আমার যাবতীয় যুক্তি-তক্ক-গপ্পো ভাসিয়ে নিয়ে গেছে চিরকাল। সাধে কি আর অ্যালান গিনসবার্গের মত কবি আপনাকে অভিহিত করেন, “আমাদের প্রজন্মের গীতিকার” বলে? নোবেল পুরষ্কারের জন্য অনেকবার উঠেছে আপনার নাম, হয়তঃ যে কোনোদিন পেয়েও যাবেন, কিন্তু আপনার মাপের কবি র কাছে সেটা কিই বা এমন আর?


এখন সময় আবার নতুন গান শোনার, আবার নতুন করে আপনাকে চেনার। আপনি যে নতুন রূপে বারে বার ফিরে আসতে বড় ভালোবাসেন!
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই অক্টোবর, ২০১১ বিকাল ৪:২২
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×