প্রায়শঃ আমরা ইউরোপ আমেরিকা কানাডাকে বলে থাকি কতো সভ্য সেসব রাষ্ট্রগুলো। সেসব সভ্যতার ব্যাখ্যাদানে বলা হয়, ঐসব সমাজে অপরাধ প্রবণতা কম, নারীর অবাধ স্বাধীনতা, নারীকে অবাধে বেশ্যাবৃত্তি করতে দেওয়া হয়, বেশ্যানারীদের কাছ থেকে নাকি বেশ্যাবৃত্তির জন্য সরকার ট্যাক্স গ্রহণ করে, এরকম নাকি সভ্য সমাজের পরিচিতি। যে সমাজে নারী দৈহিক ব্যবসার ট্যাক্সে বাজেট তৈরী হয় সে সমাজ কতোটা সভ্য সমাজ তাতো আলাপেই বোঝা যায়।
প্রায়শঃ শুনি নেদাল্যাণ্ডে কারাগারের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। অপরাধ যদি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, তাহলে অপরাধ থাকে না। আবার অপরাধীকে যদি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, তাহলে কারাগার থাকে না। এর অর্থ এই যে অপরাধীকে ছেড়ে দিয়ে পুলিশিং যদি বৃদ্ধি করা যায় তাহলে সমাজে অপরাধীর সংখ্যা কম দেখানো যায়। কারাগারে লালন পালন করে পর্যবেক্ষনে রেখে ডাণ্ডার উপর রাখা যায় তাহলে রাষ্ট্রের খরচ কমে, কারাগার অপ্রয়োজন হয়ে যায়। এটা একটা কৌশল মাত্র। তবে সেটা তখনই সম্ভব হয় যদি দেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব কম হয়। কোন দেশে কারগার নেই বা কারাগারের সংখ্যা কমানো হচ্ছে তার মানে এই নয় সে দেশে অপরাধ নেই। যেহেতু নেদারল্যাণ্ডে কারাগার কমছে সেহেতু নেদারল্যাণ্ডের কথাই ধরি, সেখানে সাইকেলের ব্যবহার খুব বেশী এবং এই সাইকেল চুরির সংখ্যাও অধিক। শুধু রাজধানীতেই নাকি প্রতি বছর সাইকেল চুরি হয় প্রায় এক লক্ষ। ১০০ ইউরোর চোরাই সাইকেল বিক্রি হলে কতো তে বিক্রি হবে? ধরে নিলাম ১০ ইউরো। ১০ ইউরো চুরি করার লোক যেখানে আছে, কি করে বলি সেখানে অপরাধীসহ অপরাধ প্রবণতা নেই। আর সেই সমাজ একেবারেই সভ্য সমাজ হয়ে গেছে!
কেউ না মানলেও ইতিহাস সাক্ষী দেয় গোটা ইউরোপের জাতিরা ছিলো লুটেরা, সন্ত্রাসী, শোষক, নির্যাতক, নিপীড়ণকারী। সারা জগতের সম্পদ লন্ঠন করে অর্থনৈতিক সাবলম্বী হয়ে শেষে বিশাল বিশাল ভূখণ্ড নিয়ে গুটি কয়েক লোকের বসতি করে এখন দেখাতে চায় তারা সভ্য জাতি। এসব রাজনীতি আমাদের দেশের মোড়ল চেয়াম্যানরাও করে। ভোট কেনার জন্য কিছু টাকা বিনিয়োগ করে পাঁচ বছরে লুটেপুটে খেয়ে, ছেলেকে বিলাত থেকে লিখা পড়া করায়ে নিজের পরিবার নিয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকে। সব লুটেরার একই চরিত্র। সেটা দেশী হোক আর বিদেশী হোক।
সভ্য চোর বাটপারদের গল্প করতে গিয়ে মনে পড়ে গেলো আমার অতীতের এক ঘটনার কথা। ৭৭-এ আমাদের ৩টা গরু চুরি হয়েছিলো। অনেক খোঁজাখুঁজি করার পর এক চেয়ারম্যানের দালালের মাধ্যমে জানতে পারলাম, গরু এখনও আছে, বর্ডারের ওপারে যায় নি। অর্থাৎ গরু চুরির পর কিছুদিন গরু চোরের তত্ত্বাবধানে দেশের মধ্যে থাকে। গরুওয়ালা খোঁজ খবর করে পেতে চাইলে চেয়ারম্যানের মাধ্যমে মধ্যস্থতায় গরু ফেরত দেওয়া হয়। যদি কোন চুরি যাওয়া গরুর মালিক খোঁজ খবর না করে তখন গরু বর্ডারের ওপারে, মানে ভারতে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দিতো ডাকাতের দলেরা।
আমাদের বাড়ী পৌরসভার মধ্যে। কিন্তু গরুর খোঁজ পেলাম ১৫/১৬ মাইল দূরে অন্য একটি ইউনিয়নে। ঐ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের ছেলে আমার ক্লাশমেট। খোঁজ পাওয়ার পর আমার বন্ধুটাকে নিয়ে তাদের গ্রামে গেলাম তার বাবার সাথে দেখা করতে। সেখানে গিয়ে বিস্তারিত জানলাম, ডাকাতের দল গরু ফেরত দিতে রাজি আছে তবে বাজার দর হিসাবে গরুর মূল্যের অর্ধেক দাম তাদেরকে দিতে হবে। চুরি যাওয়া গরু ফেরত পাওয়ার এটাই নাকি নিয়ম। যাহোক অনেক দেন দরবারে নির্ধারন হলো, যেহেতু আমি চেয়ারম্যানের ছেলের বন্ধু তাই কিছু কম রেখে তিন ভাগের এক ভাগ মূল্য দিয়ে গরু নিয়ে যেতে পারবো। পরে জানতে পারলাম, চেয়ারম্যান ডাকাত দিয়ে গরু মহিষ চুরি করায়ে যে টাকা উদ্ধার হয় তার অর্ধেক ডাকাত দলকে দেওয়া হতো, বাকি অর্ধেকের কিছু টাকা থানাকে দিয়ে বাকিটুকু চেয়ারম্যান ভোগ করতো। এই হলো ভদ্র সমাজের ভদ্র লোকের চোরাই ভদ্রনীতি। যেমন চেয়ারম্যান হতভাগা গরু মালিকের চুরি যাওয়া গরু উদ্ধার করে দিয়ে সমাজে হতভাগাদের বাহবা কুড়ালেন। অন্ধকারে চেয়ারম্যান নাটক করে হতভাগাদেরকে কি ঘোল খাওয়ালেন তা কেউ বুঝলো না। আদিকাল থেকেই এভাবেই গড়া হয়েছে গোটা বিশ্বের সমাজ ব্যবস্থাকে। সমাজের খোস-পাচড়া সমাজপতিরা ঢেকে রাখে বাহারী বোরকা দিয়ে। বাহারী বোরকার জৌলুসে সমাজকেও সভ্য বলেই মনে হয়।
তাই নিজের সমাজকে অন্যের সাথে নোংরাভাবে তুলনা না করে, নিজের সমাজ কিভাবে সুন্দর করে গড়া যায় তা নিয়ে সকলকে ভাবা উচিত। নিজ জাতিকে হীন মানসিকতায় না দেখে, একটু নাকটা উঁচু করে নিজ জাতির দিকে তাকালে জাতি অনেক এগিয়ে যাবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জুলাই, ২০১৭ দুপুর ২:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




