আমরা যারা ঢাকাবাসী তাদের কতজন ঢাকার ইতিহাস জানি? একবিংশ শতাব্দীর তিলোত্তমা নগরী ঢাকা আর প্রাচীন ঢাকার অবস্থা কি এক? এ প্রশ্নের উত্তর ইতিহাস কৌতুহলী মাত্রই খোঁজ করেন। কিংবা ঢাকার নাম “ঢাকা” কিভাবে হলো তা নিয়েও জিগীষার অন্ত নেই। বিশেষত যখন রাজধানি ঢাকার চারশ’ বছর উদযাপন নিয়ে এক মহাবিতর্ক বিজ্ঞজনদের চায়ের কাপে ঝড় তুলছে এমনি সময় ঢাকার প্রাচীনত্ব নিয়ে কৌতুহল থাকা স্বাভাবিক!
বর্তমানে ঢাকা বলতে বোঝায় বাংলাদেশের রাজধানী। একদিকে যার সু-বিশাল, অপরিকল্পিত অট্টালিকার আকাশ ছোঁয়ার ঈপ্সা অন্যদিকে ভূ-কম্পের আতঙ্কে নগরবাসী কম্পমান। যাইহোক, আধুনিক ঢাকার পত্তন, বিশেষত জেলা হিসেবে ঢাকার সৃষ্টি মূলত বৃটিশদের হাত ধরে। তবে ঢাকা রাজধানী হিসেবে মর্যাদা লাভ করে ১৬১০সালে মোগল সুবাদার ইসলাম খান চিশতীর হাত ধরে। এ সময় থেকেই ঢাকা নগরীর বিকাশের সূচনা হয়। মোগল ঢাকার অবস্থান সম্পর্কে একটি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত রয়েছে “আইন-ই-আকবরী” গ্রন্থে। “আইন-ই-আকবরী”-র মতে বৃহত্তর ঢাকার অবস্থান নির্দেশ করা হয়েছে সরকার বাজুহা এবং সরকার সোনারগাঁও এর মধ্যবর্তী কোন স্থানে। আবার ঢাকায় প্রাপ্ত সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহের সময়কার একটি শিলালিপি থেকে স্পষ্টতই ধারনা করা যায় ঢাকা তখন ইকলিম মুবারকাবাদের অন্তর্গত। উল্লেখ্য যে, সরকার এবং ইকলিম হলো মোগল প্রশাসনের দুটি স্তর। ডঃ আহমদ হাসান দানীর বক্তব্যের সূত্র ধরে আমরা বলতে পারি এইচ.ই. স্ট্যাপ্যাল্টন এর মতে পূর্ববাংলার একটি বড় পরগনা ছিল ইকলিম মোবারকাবাদ এবং ইকলিম মুয়জ্জামবাদ ছিল আরেকটি ইকলিম যা সোনারগাঁও এর সাথে সংশ্লিষ্ট বলে মনে করা হয়। মোগল যুগের সরকার বাজুহা এবং ইকলিম মোবারকাবাদের অবস্থান অভিন্ন বলে চিহ্নিত করা হয়। ডঃ স্ট্যাপলনের বক্তব্য অনুসারে ঢাকা, ফরিদপুর, ধলেশ্বরীর দক্ষিনাংশ ইকলিম মোবারকাবাদের অন্তর্ভূক্ত ছিল। এখানে উল্লেখ্য যে, আলোচ্য ঢাকার সীমানা ধরা হয়েছে পশ্চিমে বুড়িগঙ্গা এবং পূর্বে শীতলখ্যার মধ্যবর্তী ভূখন্ডকে। সুতরাং অনুমান করা যায়, ইকলিম মোবারকাবাদের সীমান্ত অঞ্চল হিসেবে ঢাকার একাংশে মুসলিম সমাজ বিকাশের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল।
এবার চলুন নজর দেয়া যাক কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক সূত্রের দিকে। এ প্রসংগে তিনটি শিলালিপির বিষয় সংক্ষেপে উপস্থাপন করার প্রয়াস পাব। প্রথমটির প্রাপ্তিস্থান ঢাকার নারিন্দায় একটি মসজিদের গায়ে। এ থেকে জানা যায় ৮৬১ হিজরি মোতাবেক ১৪৫৬-৫৭ খিস্টাব্দে মারাহমাতের কন্যা দ্বীন দরিদ্র বখত বিনত এ মসজিদটি নির্মান করেন। লিপিটি ফার্সিতে উৎকীর্ন। সাধারনভাবে এ মসজিদটি বিনত বিবির মসজিদ নামে অভিহিত করা হয়। এ লিপিটি নিঃসন্দেহে সুলতানী যুগে ঢকায় মুসলিম বসতির অস্তিত্ব দ্ব্যার্থহীনভাবে ঘোষনা করছে। একটি সংস্কারবদ্ধ ধ্যান ধারনার বাইরে মুসলিম নারীদের উন্নত সামাজিক অবস্থার দিকেও ইঙ্গিত করে। বলা প্রয়োজন যে, এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত ঢাকার প্রাচীনতম মসজিদ এটিই। কিন্তু দুঃখের বিষয় বর্তমানে এটি প্রায় ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত যে শিলালিপিটির কথা উল্লেখ করব তার প্রাপ্তিস্থান বর্তমান কেন্দ্রীয় কারাগারের পশ্চিমে গিরিদিকিল্লা মহল্লার নসওয়ালাগলির মসজিদের সম্মুখস্ত তোরন। মসজিদ বা তোরনের তোন অস্তিত্ব বর্তমানে নেই। তবে লিপিটি বর্তমানে জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। এ লিপির ভাষ্যানুযায়ী ১৪৫৯ খ্যিস্টাব্দে সরকারি প্রষ্ঠপোষকতায় মসজিদটি নির্মিত হয়। এখানে সুলতানের নামের সাথে নির্মাতা হিসাবে খাজা জাহান (সম্ভবত মুবারকাবাদের শাসনকর্তা) এর নাম উল্লেখ পাওয়া যায়। শিলালিপিটি আরবি নসখ রীতিতে উৎকীর্ন। (চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


