somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

তাহমিদ রহমান
একজন অলস মানুষ; ভালোবাসি স্বপ্ন দেখতে, চিন্তা করতে, আর কবিতা লিখতে।পেশায় চিকিৎসক, তবে স্বপ্ন দেখি সাহিত্যের সাথে নিবিড় সখ্য গড়বার।ছাত্রজীবনে জড়িত ছিলাম স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে, ভবিষ্যতে কাজ করতে চাই কন্যাশিশু নিরাপত্তা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে।

উত্তর সাগরের তীর থেকে / প্রকৃতির ক্যানভাসে নির্জনতার মেলোডি এবং এক টুকরো জীবনবোধ

১৭ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




বিকেলে যখন বাসা থেকে বের হয়েছিলাম, আকাশজুড়ে তখন রৌদ্রের একক রাজ্যত্ব । কিন্তু ঘণ্টাখানেকের পথ পেরিয়ে যখন নরফোকের ছোট্ট উপকূলীয় শহর শেরিংহাম-এ এসে পৌঁছলাম, আকাশ ততক্ষণে মেঘের চাদরে নিজেকে ঢেকে নিয়েছে। রোদ নেই, কিন্তু মেঘের আড়াল থেকে ঠিকরে বের হওয়া সূর্যের ওই মৃদু আলোটাই যেন সমুদ্রের রূপকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। রুদ্র ভাবটা কেটে গিয়ে চারপাশটায় এক অদ্ভুত মায়াবী স্নিগ্ধতা নেমে এসেছে। সমুদ্রের একটানা গর্জন, তীরে এসে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের শব্দ, আর বাতাসের দুরন্তপনা—সবকিছু মিলিয়ে প্রকৃতি যেন রূপের এক নতুন ব্যঞ্জনা তৈরি করেছে।

ঘড়ির কাঁটায় তখন ইতোমধ্যে সন্ধ্যা নেমে এসেছে।

জুলাইয়ের এই চমৎকার সামার-এ ইংল্যন্ডের অন্যান্য জায়গায় যখন রাত নয়টা-সাড়ে নয়টা পর্যন্ত চনমনে আলো থাকে, নরফোকের উপকূলীয় প্রকৃতিতে তখন মাঝেমধ্যেই এমন আলোছায়ার লুকোচুরি দেখা যায়। গ্রীষ্মের এই সময়ে এখানকার প্রকৃতি একদিকে যেমন বিস্তীর্ণ সবুজ আর বুনো ফুলের রঙে রঙিন থাকে, অন্যদিকে সমুদ্রের ঠান্ডা বাতাস আর আচমকা মেঘলা আকাশ চারপাশের আবহাওয়ায় এক অপার্থিব প্রশান্তি এনে দেয়।

​দেরি করে আসার কারণে সৈকতে মানুষজন একেবারেই কম। আর এই নির্জনতাটাই আমার সবচেয়ে প্রিয়। প্রকৃতি যেন আমাকে একান্তে এই নির্জনতা উপভোগ করারই এক দারুণ সুযোগ করে দিয়েছে।এমন সময়ে অবাক হতে হলো দূর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে। ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়ার মধ্যেও দুটো মেয়ে নির্ভয়ে উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়ে আনন্দ উপভোগ করছে। ওদের দেখে মনের ভেতর আবারও একটা পুরনো সত্য নতুন করে দোলা দিয়ে গেল—এ দেশের মানুষ জীবনকে সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ উপভোগ করতে জানে। কোনো কৃত্রিমতা নেই, নেই কোনো দ্বিধা। হয়তো এই কারণেই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে, বার্ধক্যে দাঁড়িয়ে ওরা এত অবলীলে বলতে পারে— "এই জীবনে আর কিছু পাওয়ার নেই, সব পাওয়া হয়ে গেছে।" জীবনকে এভাবে নিংড়ে উপভোগ করার মন্ত্রটা সত্যিই শেখার মতো।

​শেরিংহামের এই সৈকতে দাঁড়িয়ে ইতিহাস আর বর্তমানের এক অদ্ভুত সম্মিলন টের পাওয়া যায়। এই শেরিংহাম একসময় ছোট্ট একটা জেলেপল্লী ছিল। ১৯০১ সালের দিকে এটি পূর্ণাঙ্গ শহর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, উত্তাল উত্তর সমুদ্রের তীরে গড়ে ওঠা এই শহরের কোনো নিজস্ব বন্দর বা হারবার নেই! তাই এখানকার লাইফবোটগুলো সমুদ্রে নামাতে হয় সরাসরি ট্র্যাক্টরের সাহায্যে, আর মাছ ধরার নৌকাগুলোকে টেনে হিঁচড়ে সৈকতে তুলতে হয়।

আরও একটি রোমাঞ্চকর তথ্য হলো, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের ইতিহাসে প্রথম বোমাটি কিন্তু এই শেরিংহামের বুকেই এসে পড়েছিল! একটি জার্মান জেপেলিন থেকে ফেলা সেই বোমাটি অবশ্য বিস্ফোরিত হয়নি, সরাসরি একটি বাড়ির ছাদ ফুঁড়ে ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। আজ অবশ্য সেই যুদ্ধ বা বোমার কোনো ক্ষতচিহ্ন এখানে নেই, আছে শুধু প্রকৃতির এক শান্ত রূপ।

​আসলে সমুদ্রের পাশে আসলে কীভাবে যেন মনটা ভালো হয়ে যায়। মনের ভেতরের সব অস্থিরতা কেটে গিয়ে এক অদ্ভুত স্থিরতা এসে ভর করে। আমাদের এই আধুনিক, যান্ত্রিক জীবন—যা প্রতিনিয়ত আমাদের জোর করে এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতার দিকে ছুটিয়ে নিয়ে যেতে চায়—তার সমস্ত চাপ এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে যায়। সমুদ্রের এই আদিম রূপ মনকে এক পরম স্বর্গীয় অনুভূতি দেয়। বাস্তবতা এবং নাগরিক কোলাহল থেকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও নিজেকে একদম আলাদা করে রাখা যায়। জীবনের খুব নিকটের এবং গভীর সত্যগুলো উপলব্ধি করবার যে এক অজানা জগত আমাদের অবচেতনে লুকিয়ে থাকে, সমুদ্রের তীরে দাঁড়ালে অন্তত সেই জগতের দরজায় এসে একটু ছুঁয়ে যাওয়া যায়।
​শেরিংহামের এই শান্ত সন্ধ্যা আর সমুদ্রের এই রূপ অনেকদিন মনে জমা থাকবে।

​ ১৬ই জুলাই ২০২৬
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:৪৭
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্যা সিক্রেট অফ ব্লগ ল্যাং মারামারি

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৫

ব্লগে টিকে থাকতে হলে আপনাকে মানসিক ভাবে শক্ত হতে হবে। আপনাকে অন্য কোন ব্লগার ল্যাংচি মেরে ফেলে দিবে, এরজন্যে আপনার প্রস্তুত থাকা উচিৎ। এই 'আমেরিকা বনাম ইরান' ল্যাং মারা খাওয়ায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

গভীর ক্রন্দন

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ১৬ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১১:৫৮


মেম্বার বাড়ি আর সরকার বাড়ির শত্রুতা দীর্ঘদিনের। জমিজমা লইয়া আজ এমন একখানি ঘটনা ঘটিয়া যাইবে, কেহ বোধহয় কল্পনাও করিতে পারেন নাই।

সকাল আটটায় কাঠের ব্যাপারী খসরু আসিয়া হাজির। দলিল লেখক আবু... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাজারের আগুন নিভবে পে-স্কেলে, প্রবৃদ্ধি ছুঁয়ে যাবে দশ শতাংশ ...

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৭ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৩৮


কেরামত মওলা সাহেবকে চেনেন না এমন মানুষ সচিবালয়ে কমই আছেন। তিনি মন্ত্রিপরিষদের একজন সিনিয়র সচিব। আজ নতুন পে স্কেল নিয়ে গঠিত সচিবদের কমিটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর এবং গুরুত্বপূর্ণ মানুষটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলামাবাদে জুলাই শহীদদের স্মরণে অনুষ্ঠান

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১৭ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৭:৪৩



পাকিস্তানের ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশনে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মরণে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বক্তারা দাবি করেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি বা দলের একক অর্জন নয়; এটি ছিল ছাত্র-জনতার সম্মিলিত আন্দোলনের ফল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপা আর ফিরে আসবে না......

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৭ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:৪১

যুগে যুগে গণ-আন্দোলন ও তীব্র জনরোষের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হওয়া বিভিন্ন দেশের স্বৈরশাসকদের তালিকাঃ

(১) মোহাম্মদ রেজা পাহলভিঃ (ইরান - ১৯৭৯)১৯৭৯ সালে ইরানি বিপ্লবের সময় লাখ লাখ মানুষের প্রবল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×