somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

তাহমিদ রহমান
একজন অলস মানুষ; ভালোবাসি স্বপ্ন দেখতে, চিন্তা করতে, আর কবিতা লিখতে।পেশায় চিকিৎসক, তবে স্বপ্ন দেখি সাহিত্যের সাথে নিবিড় সখ্য গড়বার।ছাত্রজীবনে জড়িত ছিলাম স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে, ভবিষ্যতে কাজ করতে চাই কন্যাশিশু নিরাপত্তা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে।

"এ ট্রাজেডি অর ট্রাজেক্টরি অফ লাভ"

১৯ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :





১. জলজ্যান্ত ক্যালকুলেটর ও হাওয়াই মিঠাই

আইরিশ কবি ও নাট্যকার ওস্কার ওয়াইল্ড লিখেছিলেন—পৃথিবীতে মাত্র দুটি ট্র্যাজেডি আছে। একটি হলো মানুষ যা চায় তা না পাওয়া, আর অন্যটি হলো তা পেয়ে যাওয়া। শেষেরটি অনেক বেশি খারাপ; শেষেরটিই হলো প্রকৃত ট্র্যাজেডি।

অবশ্য সৈয়দ মুজতবা আলী বোধহয় বেঁচে থাকলে যোগ করতেন—তার চেয়েও বড় ট্র্যাজেডি হলো, পকেটে পাউন্ড না থাকা সত্ত্বেও বিলাতি সাহেবদের দেশে ভদ্রলোক সেজে ঘুরে বেড়ানো।

শামিতের অবস্থাটা ঠিক এই দুইয়ের মাঝামাঝি।

জুলাই মাসের মাঝামাঝি হলেও কেমব্রিজশায়ারের ইলি শহরটাকে দেখে তা বোঝার উপায় নেই। সকাল থেকেই আকাশটা একটা নোংরা চাদরের মতো ধূসর হয়ে আছে। চারপাশের নিচু জলাভূমি বা ‘ফেনল্যান্ডস’ থেকে উঠে আসা কুয়াশায় চাদরমুড়ি দিয়ে আছে পুরো শহর। দূর থেকে ইলির বিখ্যাত ক্যাথেড্রালটিকে দেখলে মনে হয়, যেন কোনো এক অতিপ্রাকৃতিক দৈত্য কুয়াশার সমুদ্র থেকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ঝিমোচ্ছে।

বাস থেকে নেমে জ্যাকেটের কলারটা আরেকটু টেনে দিল শামিত। ঘড়িতে তখন সকাল পৌনে আটটা। ইলি শহরটা ছোট হলে কী হবে, এখানের বাতাসটার মধ্যে একটা ধারালো ছুরি লুকিয়ে থাকে, যা আচমকা এসে বাঙালি চামড়ায় বিঁধে যায়। শামিতকে দেখতে অবশ্য এই বিলিতি পরিবেশে বেশ মানায়। তিরিশ বছর বয়স, একহারা ছিপছিপে গড়ন, খাঁড়া নাক, আর মাথাভর্তি ঘন কালো চুল। তার ওপর সে থাকেও খুব টিপটপ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলটা নিখুঁতভাবে না আঁচড়ালে তার দিন শুরু হয় না। কিন্তু এই চমৎকার আবরণের নিচে যে মানুষটা বাস করে, সে আসলে একটা জলজ্যান্ত ক্যালকুলেটর, যেখানে শুধুই বিয়োগের হিসাব চলে।

যখন শামিত মাস্টার্স করতে ইউকে এসেছিল, তখন তার বুকভরা ছিল স্বপ্ন আর পিঠে ছিল লোটাস ব্যাংক থেকে নেওয়া পনেরো লাখ টাকার একটা ঋণের বোঝা। যেহেতু মানুষ মুখ ঘুরিয়ে পিঠখানা দেখতে পারে না, তাই স্বপ্নের মাত্রাটাই একটু বেশি ছিল। তিন বছর পর সেই পনেরো লাখ এখন সুদে-আসলে প্রায় ত্রিশ ছুঁইছুঁই। প্রতি মাসের শুরুতে যখন বেতনটা অ্যাকাউন্টে ঢোকে, তার পরমুহূর্তেই একটা বড় অংশ দেশে পাঠিয়ে দিতে হয় লোটাস ব্যাংকের চরণে অর্ঘ্যদানে।

শামিত নিজেও ব্যাংকে চাকরি করে। ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী ক্যাভেনডিশ ব্যাংকের ইলি ব্রাঞ্চে সে একজন ডেস্ক অফিসার। ব্যাংকের ভেতরের ঝকঝকে কর্পোরেট পরিবেশ, স্যুট-টাই পরা কেতাদুরস্ত জীবন দেখে বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই ভেতরের শূন্যতা। ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ করে বাকি যা টাকা থাকে, তা দিয়ে নিজের থাকা-খাওয়া তো আছেই, সাথে পাঠাতে হয় ঢাকাতেও। বাবা রিটায়ার করেছেন। ঢাকার ভাড়া বাসা, সংসারের খরচ, আর ছোট বোনের প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির মোটা অঙ্কের সেমিস্টার ফি—সবই এখন শামিতের কাঁধে।

অথচ ঢাকায় শামিতের ফুপু, খালা আর বড় মামাদের ধারণা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা যখন দল বেঁধে শামিতের মার সাথে গল্প করতে আসেন, তখন চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলেন, “আহা রে সুফিয়া, তোমার ছেলের তো কপাল খুলে গেল! ইংল্যান্ডের বড় ব্যাংকে চাকরি! এবার একটা ভালো দেখে ফ্ল্যাট কিনতে বলো ঢাকায়। বুড়ো বয়সে তোমরা একটু শান্তিতে থাকবে। আর হ্যাঁ, এবার তাড়াতাড়ি বিয়েটা দিয়ে দাও। ঐসব দেশে একা একা থাকলে কম বয়সের ছেলে, কখন কী না কী ভুল করে বসবে, কার সাথে জড়িয়ে পড়বে! তখন কিন্তু পস্তাবে।"

এই ‘কী না কী ভুল’ করার কথা শুনে সুফিয়া খাতুন মনে মনে বেশ ভড়কে যান। ছেলের অমঙ্গলের আশঙ্কায় ওনার বুক কাঁপতে থাকে। সেই কম্পনের প্রতিক্রিয়া প্রায়শই সুনামি হয়ে ফোনের অন্য প্রান্তে বহুদূরে শামিতের উপরেও আছড়ে পড়ে।

বাবা-মার গর্ব করে বলতে থাকা শামিতের সাফল্যের গল্প পৌঁছে যায় দুঃসম্পর্কের আত্মীয়দের কাছেও। তারপর সৃষ্টি হয় নতুন বিড়ম্বনার। মাঝরাতে যখন শামিত হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে মাত্র ঘুমাতে যাবে, তখনই হুট করে হোয়াটসঅ্যাপের কলটি বেজে ওঠে। ফোনের ওপার থেকে কোনো দূর সম্পর্কের মামা বা চাচা ইনিয়ে-বিনিয়ে দেশের নানান দুঃখের কথা পাড়েন। তারপর হুট করেই তেইশ বছর আগের কোনো এক অতিলৌকিক অতীত যোগসূত্রের দোহাই দিয়ে বসেন—"মনে আছে শামিত, তুমি যখন ছোট ছিলে, আমি তোমাকে বাজার থেকে হাওয়াই মিঠাই কিনে দিয়েছিলাম? তা বলছিলাম কী, তোমার ছোট ভাইয়ের ব্যবসার জন্য যদি হাজার দুয়েক পাউন্ড..."। শামিত সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে বালিশে মাথা খোঁড়ে।

এখানেই শেষ হয় না। কাজিনরা প্রায়ই হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দেয়। কোনো এক মঙ্গলবারে খালাতো ভাই লিখে পাঠায়—“ভাইয়া, একটা আইফোন ১৬ প্রো ম্যাক্স পাঠিয়ে দিও না প্লীজ?” আবার হয়তো কোনো এক বিষণ্ণ রবিবার সন্ধ্যায় মামাতো বোনের টেক্সট আসে—“ভাইয়া, ইউনিভার্সিটির অ্যাসাইনমেন্টের জন্য একটা ম্যাকবুক খুব দরকার ছিল। ওখানে তো দাম কম, একটু দেখো না!”

শামিত হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারে না। সে নিজে থাকে ইলির শহরের বাইরে, সোহাম নামের এক গ্রামে, এক বুড়ো ইংলিশ দম্পতির বাড়ির এনেক্স (মূল বাড়ির সাথে লাগোয়া বাড়তি ঘর) ভাড়া নিয়ে। প্রতিদিন ভোরে তাকে বাস ধরে শহরে আসতে হয়, কারণ শহরের ভেতরে বাসা ভাড়ার যা আগুন দাম, তা তার সাধ্যের বাইরে।

উইকএন্ডে যখন ব্যাংকের অন্য কলিগরা পাব-এ গিয়ে বিয়ারের মগে চুমুক দেয় কিংবা গার্লফ্রেন্ড নিয়ে লেক ডিস্ট্রিক্টে ঘুরতে যায়, তখন শামিতকে ট্রেনের টিকিট কেটে যেতে হয় কেমব্রিজ শহরে। সেখানে এক রিফুয়েলিং স্টেশনে একটানা বারো ঘণ্টার লং শিফট করতে হয় ক্যাশিয়ার হিসেবে। অতিরিক্ত কয়েকটা পাউন্ডের জন্য। সে জানে, এই প্রবাস জীবনে নিজের জমানো কিছু টাকা ছাড়া বিপদের দিনে তার মাথায় ছাতা ধরার আর কেউ নেই।

মাঝে মাঝে তীব্র যন্ত্রণায় যখন সে দেশের বাড়িতে ফোন করে বাবাকে একটু বলতে যায়, “বাবা, এখানে টিকে থাকা খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে...”, বাবা ওপাশ থেকে নিরাসক্ত গলায় বলেন, “আরে ধুর, পাগল ছেলে! চিন্তা করিস না, সব ঠিক হয়ে যাবে। ওপরওয়ালা আছেন না?”
আর মা ফোন ধরে বলেন, “তুই একটা বিয়ে কর শামিত। একলা আছিস বলেই এত চিন্তা মাথায় ঢোকে। বউ ঘরে এলে দেখবি আল্লাহ সব সহজ করে দিয়েছেন।”

শামিত ফোন রেখে জানালার বাইরে চেয়ে থাকে। এই ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’ ধরণের বাণীগুলো তাকে শান্তি দেয় না, বরং এক গভীর, অন্তহীন হতাশায় ডুবিয়ে দেয়। সে বুঝতে পারে না, এই দুনিয়ায় মানুষের মন এত জটিল কেন? কেন অন্য একটা মানুষের ভেতরের রক্তক্ষরণটা কেউ দেখতে পায় না?

(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:৫৮
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জুলাই অভ্যুত্থান ফিরে দেখা: কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৯ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:২২


জুলাই ২০২৪ এর আন্দোলন ও তার পরবর্তী রাজনীতিকে ঘিরে বাংলাদেশে দুটি পরস্পরবিরোধী বয়ান দাঁড়িয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ, বিশেষত শেখ হাসিনার অনুগত সমর্থকেরা মনে করে জুলাই ছাত্রজনতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

দু’বছর আগে লেখা; জুলাই নিয়ে প্রতিটি কথা সত্য হয়েছে

লিখেছেন অর্ক, ১৯ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:১৩



পুরো ব্যাপারটা আমার চোখে দেখা। আমার সামনে দিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত মাছ ব্যবসায়ী যুবকের লাশ গেছে রিক্সাভ্যানে করে। পিছনে স্বজনদের কান্না। ঢাকার সবচেয়ে গোলযোগপূর্ণ জায়গার একটিতে স্বশরীরে উপস্থিত থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

¡Vamos Argentina!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৯ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১১:০৭

⚽ হ্যালো আর্জেন্টিনা-বিদ্বেষী গাইস!
কেমন আছেন?
আপনাদের আজাইরা তত্ত্ব- সব কি প্রস্তুত?

আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে যত ভবিষ্যদ্বাণী, যত বাজি, যাদু-টোনা, কালো যাদু, আন্ধা জ্যোতিষ বিশ্লেষণ, প্রতিটি ম্যাচের আগে স্বঘোষিত ফুটবল বিশেষজ্ঞদের ঐশী বাণী- "আজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসরায়েলী আগ্রাসনের বিপক্ষে দাঁড়ানো গাজা ফ্লোটিলায় অংশগ্রহণ করা আর্জেন্টাইনদের ধন্যবাদ নিরন্তর

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২০ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:২২





যারা বলেন আর্জেন্টিনার জনগণ ফিলিস্তিনের বিপক্ষে এবং ইসরায়েলী আগ্রাসনের পক্ষে, তাদের জনে এই পোস্ট। আপনাদের জানাতে চাই, অত্যাচারী শেখ হাসিনা যেমন পুরো বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করতেন না,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফুটবল বিশ্ব কাপে : তারুন্যের জয় হোক !

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২০ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ২:০৫


ফুটবল বিশ্ব কাপে : তারুন্যের জয় হোক !



গর্জনে ভরা গ্যালারি ওই, হঠাৎ যেন শান্ত হয়,
তারুন্যর চোখে চোখ পড়িলে, থমকে দাঁড়ায় বিশ্বময়।
সোনার ট্রফির পিছে ছুটুক, জগৎ জুড়িয়া যত লোক,
আমার জীবনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×