somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

তাহমিদ রহমান
একজন অলস মানুষ; ভালোবাসি স্বপ্ন দেখতে, চিন্তা করতে, আর কবিতা লিখতে।পেশায় চিকিৎসক, তবে স্বপ্ন দেখি সাহিত্যের সাথে নিবিড় সখ্য গড়বার।ছাত্রজীবনে জড়িত ছিলাম স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে, ভবিষ্যতে কাজ করতে চাই কন্যাশিশু নিরাপত্তা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে।

"এ ট্রাজেডি অর ট্রাজেক্টরি অফ লাভ" (পর্ব-২)

২৩ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




২. বিনা মেঘে সবুজ দৃষ্টিপাত

​শামিতের দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল একঘেয়েভাবে, মরচে পড়া অব্যবহৃত কলকব্জার মতো—সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বাসে চেপে ব্যাংকে আসা, রোবটের মতো ডেস্কটপের স্ক্রিনে ডেবিট-ক্রেডিটের হিসাব মেলানো, আর সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে এসে বিষণ্ণ জানালার পাশে এক কাপ চা নিয়ে বসা। কিন্তু ভাগ্যবিধাতা বোধহয় নেপথ্যে বসে মুচকি হাসছিলেন। তিনি শামিতের এই ধূসর জীবনে কিছুটা সবুজ রং ঢেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

​মেয়েটির নাম ক্লারা। বয়স তেইশ। কেমব্রিজশায়ারের এক সবুজ গ্রামেই তার জন্ম আর বেড়ে ওঠা। হাইস্কুল শেষ করেই মেয়েটি আর পড়াশোনার চক্করে যায়নি, সোজা চাকরিতে ঢুকেছে। এখন সে ইউরোপের একটি নামী ট্রাভেল এজেন্সির ইলি ব্রাঞ্চে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। ক্লারাকে প্রথমবার দেখলে আর দশটা সাধারণ ইংরেজ মেয়ের মতোই মনে হয়। ফ্যাকাশে সাদা গায়ের রং, কপাল ঢেকে রাখা বাদামী রঙের চুল—যা সামনে সমান করে ছাঁটা আর পেছনে বেশ লম্বা। প্রথম দেখায় তাকে অনন্যসুন্দরী কিংবা কোনো রূপকথার রাজকন্যা মনে হওয়ার বিশেষ কোনো কারণ নেই।

​কিন্তু ক্লারার আছে প্রকৃতিপ্রদত্ত এক অনিন্দ্যসুন্দর উপহার—তার সবুজ দুটো চোখ। সেগুলো সাধারণ কোনো মানবচক্ষু নয়, যেন কোনো জাদুকরের তৈরি করা দুটি সবুজাভ মণি। 'সমুদ্রের গভীরতা' শব্দটা উপন্যাসে খুব বেশি ব্যবহার হয়, কিন্তু ক্লারার চোখের দিকে তাকালে সত্যি মনে হয়, ওই অতল জলের নিচে কোথাও হারিয়ে গেলে আর কোনোদিন চেনার জগতে ফিরে আসা যাবে না। আর সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টা ঘটে, যখন সে হাসে। সেই হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা নেই, এক্কেবারে নির্মল, খাঁটি একটা আনন্দের ছটা। যখন সে হাসে, তখন সেই চোখ দুটো এক অপার্থিব দ্যুতি ছড়ায়। যেকোনো পুরুষ মানুষের বুকের ভেতর একটা অদৃশ্য ঘণ্টা বাজিয়ে দেওয়ার জন্য ওই এক চিলতে হাসিই যথেষ্ট।

​সেদিন দুপুরে ক্লারা ব্যাংকে এল বেশ বিপর্যস্ত হয়ে। তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টটা কে বা কারা হ্যাক করেছে। সকাল থেকে তার কার্ড কাজ করছে না, অনলাইন ব্যাংকিংও লক হয়ে আছে। ব্যাংকের ম্যানেজার মিস্টার হ্যারিসন যখন ক্লারাকে নিয়ে শামিতের ডেস্কে এলেন এবং বললেন, “শামিত, একটু দেখো তো মিস ক্লারার কী সমস্যা,” তখন শামিত একটা ফাইলের ওপর ঝুঁকে ছিল।

​ম্যানেজারের কথায় শামিত যখন মাথা তুলল, তখন ঠিক কী ঘটেছিল তা সে নিজেও ব্যাখ্যা করতে পারবে না। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের নায়ক হলে হয়তো সে মনে মনে বলত—‘হঠাৎ করে ঘরের ভেতরের আলোটা বদলে গেল।’ আর মুজতবা আলীর ভাষায় বলতে গেলে—‘বিনা মেঘে বজ্রপাত তো অনেক দেখেছি, কিন্তু বিনা মেঘে এমন চোখের আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়া এই প্রথম।’

​ক্লারা সামনে বসামাত্র শামিত কয়েক সেকেন্ডের জন্য সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গেল। তার হাতের কলমটা প্রায় খসে পড়ার উপক্রম হল। সে ক্লারার মুখের দিকে, বিশেষ করে তার ওই সবুজ চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে রইল হাঁ করে। প্রবাস জীবনের কঠিন লড়াই, পাউন্ডের হিসাব, ডেমোক্লিসের তরবারির মতো মাথার উপরে ঝুলে থাকা পিএসডব্লিউ ভিসার দ্রুত ফুরিয়ে আসা মেয়াদের খড়গ—সব যেন এক ফুঁৎকারে কর্পূরের মতো কোথায় উড়ে গেল!

​“হ্যালো?” ক্লারা একটু অবাক হয়ে ডাকল।

​শামিত ঝটকা দিয়ে বাস্তবে ফিরে এল। নিজের এই অভদ্রতায় সে কান পর্যন্ত লাল হয়ে উঠল। তাড়াতাড়ি কম্পিউটারের কিবোর্ডে আঙুল চালিয়ে সে নিজেকে ব্যস্ত দেখানোর চেষ্টা করল। তারপর ভেতরের সমস্ত জড়তা কাটিয়ে, নিজের স্বভাবজাত নম্রতার সাথে, অত্যন্ত যত্ন সহকারে ক্লারার অ্যাকাউন্টটা রিওপেন করার প্রসেস শুরু করল। সাধারণত সে কাস্টমারদের সাথে যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই কথা বলে, কিন্তু আজ সে নিজেই অবাক হয়ে দেখল, তার গলার স্বর কতটা মখমলের মতো মোলায়েম শোনাচ্ছে!

​কাজ শেষ হতে মিনিট চল্লিশেক লাগল। ক্লারা সিট থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তার সেই স্বর্গীয় হাসিটা দিল। “থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ, মিস্টার শামিত। তুমি খুব দ্রুত আর সুন্দরভাবে কাজটা করে দিলে।”

​শামিত কী বলবে বুঝতে না পেরে কেবল একটা বোকার মতো হাসি দিল।

​ক্লারা যখন ব্যাংক থেকে বের হয়ে যাচ্ছে, শামিত কাচের দেয়ালের ওপার থেকে তার চলে যাওয়া দেখছিল। সে উপন্যাসে পড়েছিল, মেয়েরা নাকি খুব সহজেই বুঝতে পারে যখন কোনো পুরুষ তার সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়। ক্লারা কি বুঝতে পেরেছিল? হয়তো পেরেছিল। কিন্তু তার আচরণে কোনো অস্বস্তি, বিরক্তি বা আহ্লাদী ভাব ছিল না। সে এক্কেবারে স্বাভাবিক, স্মার্ট একটা মেয়ের মতো ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেছে।

​শামিত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল, ‘ধুর, এটা স্রেফ একটা ক্রাশ। সাময়িক একটা ঘোর। দুই দিন পর অফিসের কাজের চাপে আর মনেও থাকবে না।’

​কিন্তু মানুষের মন তো আর ব্যাংকের লেজার বুক নয় যে ডেবিট-ক্রেডিট মিলিয়ে দিলেই হিসাব চুকে যাবে। সেদিন রাতে বাসায় ফিরে শামিত আবিষ্কার করল, সারা দিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর চরম ক্লান্ত হওয়া সত্ত্বেও সে ঘুমাতে পারছে না। ঘড়িতে তখন রাত বারোটা। বাইরে সোহামের নিঝুম রাতে তখন টুপটাপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। শামিত বিছানায় শুয়ে ছটফট করছে আর তার চোখের সামনে ভাসছে ক্লারার সেই সবুজ চোখের মণি।

​যেহেতু সে ব্যাংকের সিস্টেমে ক্লারার অ্যাকাউন্ট নিয়ে কাজ করেছে, তাই তার পুরো নামটা সে জানত—ক্লারা হিগিন্স। মাঝরাতে সে চোরের মতো ফেসবুকে ক্লারাকে খুঁজে বেড়াল। কিন্তু কোনো লাভ হলো না; সোশ্যাল মিডিয়ার বিশাল সমুদ্রে একই নামের অনেকগুলো প্রোফাইল ভেসে উঠলেও, শামিতের কাঙ্ক্ষিত সেই মায়াবী মুখটি কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। রাতের নীরবতা বাড়ার সাথে সাথে শামিতের বুকের ভেতরের অবদমিত একাকীত্বটাও যেন দ্বিগুণ ভারী হয়ে চেপে বসল।

(চলবে)


সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৪৭
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

১৭ জুনে বিয়ে, অথচ ২২ জুনের সিভিতে ‘অবিবাহিত’? এমপি সাহেবের এই গণিত কে মেলাবে?

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৮



ধরা খাইলেই “দ্বিতীয় বিবি”! কিন্তু ১৭ জুনের বিয়ার পর ২২ জুনের সিভিতে মাইয়া 'আনম্যারিড' থাকে কেমনে?
সাতক্ষীরার এমপি সাবের এই ভণ্ডামির জট ছাড়াইতে পারবেন তো, নাকি এআই (AI) এর ওপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

=আজ খুশি ভাগ করতে এসেছি=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:০৫



আসসালামু আলাইকুম। শুভ সন্ধ্যা। কেমন আছেন সবাই?

আলহা গত বৃহস্পতিবার আমি প্রমোশন পেয়েছি। অতিরিক্ত পরিচালক (৪র্থ গ্রেড)। খুশির সংবাদ জানাতে দেরি করে ফেলেছি সরি।

আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন, যেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি 2G এর আমলে ফিরে যেতে চাই।

লিখেছেন ইমরোজ৭৫, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:২০


আমি 2G এর আমলে ফিরে যেতে চাই। ইন্টারনেট এর স্পিড খুবই কম। ফেসবুকে কেউ ভাইরাল হতে আসবে না। অল্প লেখায় নিজের মনোভাব ফেসবুকে পোস্ট করবে। কেউ আর পাকনা পাকনা কথা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিজয়ী

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩২

বিজয়ী
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

বিজয়ী কখনো কখনো হেরে যায়
হঠাৎ কেউ টপকে যায় তাকে
সেরা সবসময় সেরা থাকে না
পরাজিত হয়ে সে কাঁদে, ভেঙে পড়ে।
জয়লাভ প্রায় প্রত্যেকে আনন্দিত করে
আর হার প্রায় প্রত্যেকে দুখি করে।
আমরা কেউ... ...বাকিটুকু পড়ুন

জামায়াতের দ্বিচারিতায় পরিপূর্ণ রাজনীতি

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ২২ শে জুলাই, ২০২৬ ভোর ৫:২৮


১৯৪১ সালে ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে ইসলামী চিন্তাবিদ সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী ‘জামায়াতে ইসলামী’ গঠন করেন। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর এটি ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×