somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

তাহমিদ রহমান
একজন অলস মানুষ; ভালোবাসি স্বপ্ন দেখতে, চিন্তা করতে, আর কবিতা লিখতে।পেশায় চিকিৎসক, তবে স্বপ্ন দেখি সাহিত্যের সাথে নিবিড় সখ্য গড়বার।ছাত্রজীবনে জড়িত ছিলাম স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে, ভবিষ্যতে কাজ করতে চাই কন্যাশিশু নিরাপত্তা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে।

"এ ট্রাজেডি অর ট্রাজেক্টরি অফ লাভ" (পর্ব-৪/শেষ পর্ব)

০১ লা আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



৪. কুয়াশার ভেতরে ও বাইরে

পরের দুটো সপ্তাহ কেটে গেল এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক লুকোচুরির মধ্য দিয়ে। শামিত নিজেকে আপ্রাণ বোঝানোর চেষ্টা করল যে সে ক্যাভেনডিশ ব্যাংকের একজন সামান্য চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী মাত্র, যার পায়ের নিচের মাটিটা প্রতি মুহূর্তে কাঁপছে। কিন্তু মনের অবাধ্য কোণটা তো আর ব্যাংকের অডিট রিপোর্টের মতো কড়া নিয়মে চলে না। একটা তীব্র অবদমিত ঘোরের মাথায়, অফিসে চোরের মতো চারপাশ দেখে নিয়ে সে ব্যাংকের অফিশিয়াল ডেটাবেজ থেকে ক্লারার জন্মতারিখ আর ইমেইল আইডিটা টুকে নিয়েছিল।

সেই তথ্যের সূত্র ধরে শেষমেশ সে ক্লারাকে খুঁজেও পেল ইনস্টাগ্রামের অসীম জগতে।

ল্যাপটপের উজ্জ্বল স্ক্রিনে ক্লারার একটা ছবি জ্বলজ্বল করছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে নরফোকের কোনো এক সমুদ্র সৈকত, খোলা বাতাস তার সমান করে ছাঁটা চুলগুলোকে উড়িয়ে দিচ্ছে, আর তার সেই চেনা সবুজাভ চোখ দুটো ফ্রেমের ওপার থেকে যেন সরাসরি শামিতের দিকেই মায়াবী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ছবির ঠিক নিচে ভেসে আছে নীল রঙের ছোট বোতামটা—‘Follow’।

শামিতের ডান হাতের আঙুলটা মাউসের ওপর স্থির হয়ে রইল। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত একটা ছুঁইছুঁই। সোহামের নীরব ঘরটায় কেবল বাইরের বৃষ্টি আর ট্রেনের দূরবর্তী হুইসেলের শব্দ শোনা যাচ্ছে। শামিত মনে মনে ভাবল, সে যদি এখন এই নীল বোতামটা টিপে দেয়, তবে কি সে নিজেকে এক অনন্ত গোলকধাঁধায় হারিয়ে ফেলবে? নাকি এটাই তার এই একঘেয়ে, ঋণগ্রস্ত ও দুঃস্বপ্নে ভরা জীবন থেকে মুক্তির একটা গোপন সুড়ঙ্গ? দীর্ঘ সময় দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগার পর শেষমেশ এক অজানা আবেগের বশে সে বোতামটি টিপেই দিল। তারপর ল্যাপটপের স্ক্রিনটা সজোরে বন্ধ করে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

পরদিন বৃহস্পতিবার। লাঞ্চের সময় ক্যাভেনডিশ ব্যাংকের কাস্টমার লাউঞ্জে হালকা গুঞ্জন। বাইরে ইলির আকাশটা আজ অদ্ভুত রকম সুন্দর, যেন কোনো এক ওস্তাদ শিল্পী নীল ক্যানভাসে সাদা মেঘের তুলির টান দিয়েছেন। কুয়াশার চাদর সরে রোদের মিষ্টি একটা প্রলেপ পড়েছে পুরো ইলি শহরের ওপর। শামিত নিজের ডেস্কে বসে কম্পিউটারের স্ক্রিনে এক তরুণ দম্পতির লোন অ্যাপ্লিকেশন দেখছিল, কিন্তু তার চোখ বারবার অবচেতনেই চলে যাচ্ছিল ব্যাংকের ভারী কাচের অটোমেটিক প্রবেশদ্বারের দিকে।

ঠিক ১টা ২০ মিনিটে কাচের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল ক্লারা। আজ তার পরনে একটা হালকা হলদে রঙের ট্রেঞ্চ কোট, গলায় জড়ানো সুতির স্কার্ফ। কপালে এসে পড়েছে সেই পরিচিত বাদামী চুল। তবে আজ সে সরাসরি শামিতের ডেস্কে এল না। সে বেশ আত্মবিশ্বাসী পায়ে হেঁটে এসে দাঁড়াল ম্যানেজার মিস্টার হ্যারিসনের কাচঘেরা কেবিনের সামনে।

ডেস্কে বসে দৃশ্যটি দেখা মাত্রই শামিতের বুকের ভেতরটা যেন একটা অজানা আশঙ্কায় মুচড়ে উঠল। সারা শরীরে নেমে এল বরফ-ঠান্ডা এক আতঙ্কের স্রোত। ক্লারা কি তবে সব জানতে পেরেছে? ইনস্টাগ্রামের সেই নিঃশব্দ ফলো রিকোয়েস্টটা কি তবে একটা ভুল বার্তা পৌঁছে দিল তার কাছে? সে কি বুঝতে পেরেছে যে শামিত ব্যাংকের ডেটাবেজ ঘেঁটে তার ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করেছে? ক্লারা কি এসেছে ব্যাংকের কাস্টমার প্রাইভেসি ও সিকিউরিটি পলিসি ভঙ্গের গুরুতর অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানাতে?

যদি তাই হয়, তাহলে মিস্টার হ্যারিসন হয়তো আজই তাকে চাকরিচ্যুত করবেন। এই চাকরি গেলে ভবিষ্যৎ স্পন্সরশিপের স্বপ্ন শেষ—বারো মাস পর যখন ভিসা ফুরিয়ে যাবে, তখন শূন্য হাতে দেশে ফিরে যেতে হবে ঋণের বিশাল বোঝা কাঁধে নিয়ে। শামিতের কপাল ঘেমে উঠল।

মিনিট পাঁচেক পর মিস্টার হ্যারিসন তাঁর কেবিন থেকে বের হয়ে এলেন। তার মুখে এক ধরনের গম্ভীর পেশাদারি অভিব্যক্তি। তিনি সোজা শামিতের ডেস্কে এসে দাঁড়ালেন, পেছনে ক্লারা শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে, মুখে সেই চিরচেনা রহস্যময় ও কিছুটা কৌতুকপূর্ণ মৃদু হাসি।

“শামিত,” মিস্টার হ্যারিসন নিচু গলায় বললেন, “মিস হিগিন্স তার এজেন্সির একটা কর্পোরেট অ্যাকাউন্টের বিষয়ে কথা বলতে এসেছেন। আমি তাকে বলছিলাম যে তুমি এই ধরনের প্রসেসিং আর ইন্টারন্যাশনাল ট্রানজেকশনগুলো ভালো বোঝো। তুমি কি একটু ওঁর সাথে কনফারেন্স রুমে বসবে?”

শামিত সিট থেকে উঠে দাঁড়াল। তার পায়ের নিচে তখন যেন মাটি নেই, হাতের তালুটা সামান্য ঘামছে। সে একবার ক্লারার চোখের দিকে তাকাল। সেই সবুজাভ মণি দুটো আজ আরও গভীর, আরও অচেনা লাগছিল। সেখানে কি কোনো চতুর ফাঁদ লুকিয়ে আছে, নাকি আছে ভালোবাসার বিশুদ্ধ আমন্ত্রণ?

কনফারেন্স রুমের ভারী কাঠের দরজাটা যখন নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে গেল, তখন বাইরে ইলির বাতাসে আবার কুয়াশার হালকা চাদর জমতে শুরু করেছে। ডেস্কে পড়ে থাকা শামিতের ব্যক্তিগত ফোনটার স্ক্রিনে তখন একটা দেশের নাম্বারের মিসড কল জ্বলজ্বল করছে—হয়তো ঢাকা থেকে কোনো নতুন সাহায্যের আবদার, কোনো কাজিনের নতুন অ্যাপল গ্যাজেটের চাহিদা, কিংবা লোটাস ব্যাংকের ঋণের তাগাদা। কিন্তু সেগুলোর উত্তর দেওয়ার সময় এখন নয়।

শামিত চেয়ারটা টেনে বসল। কাচের টেবিলের ওপারে ক্লারা তার চামড়ার নোটপ্যাডটা খুলে রাখল। তারপর আলতো করে চোখের সামনের চুলে একটা আঙুল চালিয়ে সোজা হয়ে বসল। তার সেই সবুজাভ চোখ দুটো সরাসরি শামিতের দিকে নিবন্ধ করে, সামান্য ঝুঁকে নিচু অথচ স্পষ্ট গলায় সে বলল—
“সো, শামিত... আমরা কি শুধু কাজের কথাই বলব, নাকি আরও কিছু?”

কনফারেন্স রুমের ভেতরের সেন্ট্রাল হিটিংয়ের মৃদু গুঞ্জনের মাঝে শামিত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সে বুঝতে পারল না, ক্লারার এই একটিমাত্র প্রশ্ন কি তার ব্যাংকিং ক্যারিয়ারের শেষ ঘণ্টার ট্র্যাজিক ধ্বনি, নাকি এক নতুন, অনিশ্চিত অথচ রোমাঞ্চকর কুয়াশাবৃত পথের সূচনা।
তবে এই প্রশ্নের উত্তর বোধহয় প্রবাসের এই রহস্যময় আবহাওয়ার মতোই অনুদঘাটিত থেকে যাওয়া ভালো।

(সমাপ্ত)

সর্বশেষ এডিট : ০১ লা আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৫৪
৪টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মতাদর্শের চেয়ে রাষ্ট্রের স্বার্থ বড়....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০১ লা আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:২৮

মতাদর্শের চেয়ে রাষ্ট্রের স্বার্থ বড়....

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আবেগ দিয়ে নয়, বাস্তবতা দিয়ে চিন্তা করা প্রয়োজন। আমাদের রেমিট্যান্স অর্থনীতির একটি বড় ভিত্তি সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো।... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিজিবিজি নদীর ধারে খাদ্যমেলা

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০১ লা আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৪

হিজিবিজি নদীর ধারে খাদ্যমেলা
.................................................................



শামুক ভাইটি দিল ছুট,
পায়ে তাহার নাইকো বুট।
হোঁচট খেয়ে থাবড়া,
মাছের নাকে কামড় বা!

মাছটি বলে, "কী আপদ!
ছাড়ো আমার এই পথ।
"ফ্যাঁকফ্যাঁকে সব বুদবুদ,
ছুটলো তারা কুদকুঁদ।

ব্যাঙ ও মাছি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

চেনা অচেনা জীবন

লিখেছেন সামিয়া, ০১ লা আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১২



ঝড়ের কাছে হেরে যাওয়া গাছ,
শুকনো পাতার মতোই ঝরে পড়ে।
আমি শিকড়ে বেঁধেছি বাসা,
তাই তো দাঁড়িয়েছি ঝড়ের পরে।

একলা রাতের নীরব জানালায়,
কত অশ্রু ভোরের আগে শুকায়।
শান্তি নামে শব্দহীন এক পাখি,
যখন মানুষ নিজেকেই খুঁজে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ সমস্যা ও সমাধান

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০১ লা আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:১৬


ছবি-১

চলার পথে অনেকেই হয়তো মোবাইল ফোনে ব্লগ পড়তে বা দেখতে গিয়ে বিপত্তির সম্মুখীন হচ্ছেন। সাধারণত মোবাইল ফোনে যারা ব্লগ পড়েন তাদের ব্লগের লেখা পড়তে ও ব্লগের লেখা সহ ছবি... ...বাকিটুকু পড়ুন

"এ ট্রাজেডি অর ট্রাজেক্টরি অফ লাভ" (পর্ব-৪/শেষ পর্ব)

লিখেছেন তাহমিদ রহমান, ০১ লা আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৫৪



৪. কুয়াশার ভেতরে ও বাইরে

পরের দুটো সপ্তাহ কেটে গেল এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক লুকোচুরির মধ্য দিয়ে। শামিত নিজেকে আপ্রাণ বোঝানোর চেষ্টা করল যে সে ক্যাভেনডিশ ব্যাংকের একজন সামান্য চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী মাত্র,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×