somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমি যখন একটি ফুটফুটে ছেলের বাবা

১০ ই জুন, ২০১৬ সন্ধ্যা ৬:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আজ আমি নীলয়ের স্কুলের গেইটে দাড়িয়ে আছি, ছেলেটার আজ প্রথম স্কুল জীবন শুরু হল। ঘুম থেকে উঠেই দেখি নীলয় নিজে নিজে তৈরী হয়ে লিভিং রুমে বসে আছে, হাসি হাসি একটা ভাব। যেন আজ বিশ্ব জয় করবে।
সেই দিনের সেই ছোট্ট নীলয় আজ কত বড় হয়েছে মাশাল্লাহ, যেন পৃথিবী জয় করার জন্যই এই ছেলেটার জন্ম।

আজো মনে আছে, তনি তখন অন্তঃসত্ত্বা। বাড়িতে নতুন অতিথি বরন করার সাজ সাজ রব শুরু হয়ে গেল। আমি অফিস থেকে ফেরার পথে নতুন নতুন খেলনা নিয়ে আসি, খুব সুন্দর হাসি মাখা বাচ্চাদের ছবি নিয়ে আসি। আমার রুমের চারিপাশে শুধু বাচ্চাদের ছবি, ড্রইং রুম থেকে শুরু করে সারা বাড়ি বাচ্চাদের খেলনা। সারা বাড়িতে এক উৎসব উৎসব ভাব চলে এসেছে। বড় আপুর মেয়ে "পুষ্পা" ডাক্তার, সেই শরীরিক পরীক্ষা করে বল্ল নরমাল ডেলিভারির কথা তাতে সবাই সম্মতি দিল। ৩১শে মার্চ আমদের প্রথম সন্তান পৃথিবীতে আসছে।

মার্চের ২০ তারিখে হঠাৎ করেই তনিটা অসুন্থ্য হয়ে পরল, ড্রাইভারকে প্রায় ১৫ দিন থেকে সব কাজের ইস্তফা দিয়ে আর্মির ফোর্সের মত তৈরী করে রেখেছিল বাবা। ডাকদিতেই ড্রাইভার এসে হাজির। বাবা ফোনে করে ভাগ্নিকে হসপিটালে আসতে বল্ল, মনে হয় সেই আমাদের চেয়ে বেশি অস্থির হয়ে উঠল। ১০ মিনিটের রস্তায় অন্ত্যত ১৫ বার ফোন করে জানতে চাইল কোথায় আছি।
হসপিটালের গেইট থেকেই পুষ্পা নিজে ট্রলিটা নিয়ে ওটির দিকে যাচ্ছে, রিসিপশনের সব আনুষ্ঠানিকতা সে এসেই সেরে রেখেছে।
তনিকে ওটিকে রেখে পুষ্পা বল্ল "মামা তুমি একটু দাড়াও মামীর পাশে, আমি প্রফেসরকে নিয়ে আসছি"
পুষ্পা বাহিরে যাওয়ার পর অনুভব করলাম তনিটা কিছু বলতে চাচ্ছে, খুব কাছে আসতেই বলে উঠল "শরীফ আমি মনে হয় তোমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছি, যদি কোন অন্যায় করে থাকি আমাকে ক্ষমা করো"
তনিটার চোখের জল গড়িয়ে গড়িয়ে পরছে, পৃথিবীর কষ্টের একটা দৃশ্যের অন্যতম কঠিন দৃশ্য এটি। শান্তনা দেবার মত কোন ভাষায় খুজে পাচ্ছিলামনা, বোবার মত দাড়িয়ে থাকলাম। পুষ্পা প্রফেসর ম্যাডামকে নিয়ে ওটিতে আসল, কি যেন দেখল একটা মেশিনে তারপর প্রফেসর বল্ল বাচ্চার পজিশন চেই্ন্জ হয়ে গেছে যত দ্রুত সিজার করাতে হবে। তখন যেন রাজ্যের সবটুকু রাগ ভাগনির উপর ঝাড়তে ইচ্ছে করল, ধমক দিয়ে বল্লাম তুই কি লেখাপড়া করে ডাক্তার হয়েছিস নাকি বাজার থেকে সার্টিফিকেট কিনেনিয়ে এসেছিস।
সেই দিনের আমার কটু কথায় পুষ্পা একটু রাগ করেনি, বরং শান্ত মাথায় বল্ল "মামা তুমি বাহিরে অপেক্ষা কর, আমরা দেখছি কি করা যায়'

অপারেশন থিয়েটারের বাহিরে দাড়িয়ে থাকা কতযে অস্থির সেই দিন আমি বুঝতে পারলাম, বাবা মা ভাই বোন সব মিলিয়ে আমরা প্রায় ২০/২৫ অপেক্ষা করছি। বার বার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছি, মনে হচ্ছে হাজার বছরের সময়টা থেমে গেছে কিছুতেই ঘড়ি চলছে না।

ঠিক ২৬ মিনিট পর পুষ্পা বাহিরে আসল, হাতে একটা কাগজ দিয়ে বল্ল "তারাতারি ঔষধ গুলি নিয়ে আস"। আমি প্রেসক্রিপশনটা হাতে নিয়ে আলোর গতিতে ফার্মেসীতে এসে হাজির, হসপিটালের নিজস্ব দোকান। পুষ্পা আছে তাই খুব বেশি একটা বিল করেনা। তাছাড়া ম্যানেজারের সাথে আমারও একটা ভাল সম্পর্ক আছে, হাপাতে হাপাতে কাগজটা দিয়ে বল্লাম যত তারাতারি পারেন ঔষধ গুলি দিন।
কাগজটা হাতে নিয়ে এরা কেমন রহস্যময় একটা চাহনি দিয়ে বল্ল "৩২ হাজার টাকা দিন, আমাদের দোকানে নেই পাশের দোকান থেকে আনতে হবে"।

মনে হল দোকানে আগুন লাগিয়ে পুড়ে ফেলি, হসপিটালের ভেতরে দোকান অথচ জরুরি ঔষধ রাখেনা। রাগে ফুলে ফেপে টাকাটা দিয়ে বল্লাম একটু তারা করেন।

ঠিক ৭ মিনিট পর, কর্মচারিটা ফিরে আসল। সাথে প্রায় ৩০/৪০ টা মিষ্টির কাটুন, আমিতো ক্ষেপে গিয়ে ধপাস করে একটা লাগিয়ে দিলাম। বেটা ইতরামি করার আর সময় পেলিনা, আমার বউ মরার অবস্থায় আছে আর এরা মিষ্টি নিয়ে ফিরে এসেছে। ম্যানেজার সাহেব লাফিয়ে এসে আমার হাতটা ধরে ফেলে আর বলে মামা করছেন কি, সবাই একটু মজা করছে আপনি কি উল্টা পাল্টা শুরু করে দিলেন। এই নেন প্রেসক্রিপশন দেখেন কি লেখা আছে -
দুই তিন চারবার পড়লাম, নাহ! ভুল কিছুই দেখছিনা এটাতো পুষ্পার হাতেরই লেখা, আজো কাগটা যত্ন করে রেখে দিয়েছি। তাতে লেখা ছিল - "কনগ্রেচুলেশন মামা, এই মাত্র আপনি একটা ফুটফুটে ছেলের বাবা হলেন। এক্ষনি দোকান থেকে ৮০ কেজি মিষ্টি ৪০টা প্যাকেটে করে নিয়ে আসেন, সবাই আপনার জন্য ১২ নাম্বার ক্যাবিনে অপেক্ষা করব"

এই দুই লাইনের চিঠিটা পড়ে মনে হল আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ, দোকানের সেই ছেলেটাকে বুকে জড়িয়ে অনুনয় বিনয় করে ক্ষমা চাইলাম তারহাতে একটা মিষ্টির প্যাকেট দিয়ে ছোটে চল্লাম ১২ নাম্বার ক্যাবিনের দিকে, সাথে ৫ জন আসছে বাকি ৩৯টা প্যাকেট নিয়ে।

দরজায় দাড়াতেই পুষ্পা কেমন মায়ের মত শাসন করে উঠল, এত দেড়ি হলে অপারেশন থিয়েটারে রোগিকে রাখা যায়? আজ আমি কিছুই বলবনা, সবাই শাসন করবে আমি শুধু অবুঝ হয়ে থাকব। আমার দুটি চোখ শুধু খুজে ফিরছে পুষ্পার লেখা "ফুটফুটে" ছেলেটাকে, এক নজর না দেখলে মনে হয় আর শান্তি পাচ্ছিনা।

কিযেন ভাবছিলাম এমন সময় পুষ্পা ধমকের স্বরে বল্ল, মামীর পাশে গিয়ে একটু বস, বেচারি অনেক ভয় পেয়েছে। অপারেশনে এত ভয় পেতে এই প্রথম কাওকে দেখলাম"

পুষ্পার কথা শেষ না হতেই, দেখলাম সবাই রুম থেকে চলে যাচ্ছে। আমি তনির পাশে গিয়ে বসলাম, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ছেলেটার দুটি হাত আমার মুষ্টির মধ্যে নিয়ে অপলক নয়নে তাকিয়ে আছি। চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পরছে, থামাতে চাচ্ছিনা। পরতে দিতে হবে, এযে আনন্দের অশ্রু। ছেলেটা হাসছে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ হাসি। এই হাসিটা দেখার জন্যই মনে হয় মানুষ হিসাবে জন্ম নিয়ে ছিলাম..........
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুন, ২০১৬ সন্ধ্যা ৬:১৪
১২টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশের জন্মগ্রহণ কি আজন্ম পাপ?

লিখেছেন এম ডি মুসা, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৬



রাষ্ট্রের নিরাপত্তা আছে, জনগণের নিরাপত্তা কোথায়?

বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে কি নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকারটুকুও আমাদের নেই? সরকার ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তায় গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর থাকে। কিন্তু সাধারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনেকটা পথ হেঁটে এসেছি

লিখেছেন চারাগাছ, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:০৫




১৯৯৭ সাল।

আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি।

স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে মামুন ভাইয়ের একটা অডিও ক্যাসেটের দোকান ছিল। পাশেই মির্জা ভাইয়ের কনফেকশনারি। টিফিনের সময় ওখানে প্যাটিস খেতাম।

সেই সময় অডিও ক্যাসেটের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশটাতো এখন রাজাকারদের....

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:২৮




একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে বাদী ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী (৮৭)। মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়ার প্রস্তুতি চলার সময় জামাতের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাদ্রাসা শিক্ষা একটা কর্মবিমুখ শিক্ষা

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:১৫

এদেশের মাদ্রাসা শিক্ষারে আপনি একটা স্ক্যাম হিসেবে ধরতে পারেন। মাদ্রাসার বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে যে মাদ্রাসাগুলো আছে সেগুলো বাদ দিয়ে অন্য সব মাদ্রাসাই এই স্ক্যামের ভেতরে। এটা একটা ভিক্ষার সাইকেল, দারিদ্র্য'র দুষ্টু... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিম করা কি হারাম?

লিখেছেন চারাগাছ, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৬




জিম করা কি হারাম?

হ্যাঁ, জিম করা হারাম!

যদি জিমে গিয়ে নিজের পেশিবহুল বাহুডোরে কোনো ললনাকে জড়িয়ে ধরেন!

কিন্তু তারপরেও কথা থাকে।

এখানে জড়িয়ে ধরাটা হারাম। জিম করাটা নয়!

অর্থাৎ, জিমে গিয়ে শরীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×