অরণ্য,
কেমন আছ? সরি এই প্রশ্নটা বোধহয় তোমাকে আর করা সাজেনা। তবুও খুব জানতে ইচ্ছে করে জানো... তুমি কোথায় আছো, কেমন আছো! আচ্ছা তোমার পাশে কি এখন চল্লিশ জন হুর পরী সবসময় ঘুরঘুর করে? গ্যালন গ্যালন সুরা কি তোমার চারিপাশে থৈথৈ করে?... খুব জানতে ইচ্ছে করে!
তোমাকে কখনো দেখিনি আমি... কিভাবে দেখব বল! আমরা দুজন দুই পৃথিবীর মানুষ। কিন্তু যখন তোমার ঘটনাটা শুনলাম তখন তোমাই আমি দেখলাম... খুব স্পষ্ট তুমি... তোমার নরম হাত, একমাথা কোঁকড়া চুল, চশমা ঢাকা চোখ আর তার অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। আমি যখন তোমায় দেখলাম তখন বুঝি তোমার খুব মন খারাপ ছিল না? কেমন উদাসীন নিষ্পাপ তুমি! মনে হচ্ছিল... দৌড়ে যেয়ে তোমার হাতটা ধরি! এত কষ্ট কিসের তোমার বলতো... তোমায় তো সবাই খুব ভালবাসতো! এত অভিমান কার ওপর শুনি?... তোমার কোন অভাব তো কখনো অপূর্ণ থাকেনি!
আচ্ছা ছোটবেলার থেকেই তোমার পানিকে খুব ভয় না? সাঁতার তো একদমই পারতেনা। বাবা মা কতো বলেছে সাঁতার শিখতে... তোমার সেই একি অজুহাত... সময় কোথাই! কিন্তু আমি ঠিকই বুঝি... পানিকে তোমার খুব ভয় ছিল! গাড়ো নীল সুন্দরের মধ্যেও কেমন একটা নিঃশব্দ ভয়াবহটা... তুমি সব টের পেতে ঠীকনা? Lake George এ তো তুমি আগেও গিয়েছ… তোমার বুঝি খুব প্রিয় ছিল জাইগাটা? যখন প্রথম গিয়েছিলে তখনই কি চিন্তাটা মাথাই এসেছিল? খুব সাহস তো তোমার … তোমায় দেখে কিন্তু একদম বুঝিনি!
আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে অরণ্য… তোমার সব কথা, সব ব্যাথা, সব দুঃখ, হাসি, কান্না ... তোমার সবকিছু! আমার তোমাকে জানতে ইচ্ছে করে। জানতে ইচ্ছে করে ঠিক শেষ মুহূর্তে তোমার কি মনে হয়েছিল... শেষবারটি কার মুখ তোমার চোখে ভেসেছিল! অশ্রুবিন্দু ছিল তোমার চোখে? নাকি মৃদু হাসি? তুমি পৃথিবীকে উপহাস করেছিলে... নাকি অবজ্ঞা? ... আমার জানতে ইচ্ছা করে!
যে মেয়েটি তোমায় ভালবাসত অরণ্য... ওর কথা কি একবারও ভাবনি? আমার কি মনে হয় জানো? আমার মনে হয় তুমি অনেক অনেক ভেবেছ... মা’র কথা ভেবেছ, বাবা’র কথা ভেবেছ... ওই মেয়েটির কথা ভেবেছ, বন্ধুদের কথা ভেবেছ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তোমার ইচ্ছাশক্তিই জয়ী হল! কি প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি তোমার... কি কঠিন তোমার মনবল! আর সাহস? সে কথা নাইবা বললাম... সাহস না থাকলে তুমি পানিকেই বেছে নিবে কেন বল!কত সহজ আর বোকা বোকা উপায় আছে... কিন্তু তোমার সবচেয়ে শক্ত উপায়টিকেই বরন করতে হবে... তোমায় আমি হিংসে করি... খুব খুব হিংসে হয় আমার অরণ্য!
সবাই তোমার কথা বলছে ইদানিং... বাসাই তোমার কথা, ফোনে তোমার কথা, Facebook এ তোমার কথা, খবরের কাগজে তোমার কথা এমনকি TV তেও তোমার কথা।কিছুদিনের মধ্যেই আবার নতুন প্রসঙ্গ আসবে… তখন তোমায় ভুলে যাবে সবাই। সবাই কি সত্যিই তোমায় ভুলে যাবে অরণ্য? তা কি কখনো সম্ভব? যে মা তোমার সর্বচ্চ সুখের কথা ভেবে আর কোন সন্তান নেননি, যে বাবা দিনরাত পরিশ্রম করেছেন তোমার সব আবদার মেটাতে আর যে মেয়েটির তুমি প্রথম প্রেম ছিলে? তারা তো তোমায় কখনো ভুলতে পারবেনা… শুধু তারাই কেন!... যে শিক্ষক তোমায় প্রথম অক্ষর শেখাল, যে বন্ধু তোমার জন্য সারা রাত্রি নির্ঘুম কাটাল আর যে আমি আজ তোমাকে লিখছি… ভুলবোনা কখনো!
অরণ্য তোমায় ভুলবোনা কখনো!
পরিশিষ্ট ঃ গত ছয় তারিখে অরণ্যের লাশ বাংলাদেশ পৌঁছেছে। আমেরিকান পুলিশ বাহিনী তাদের সর্বচ্চ সহযোগিতা দেখিয়েছে এ ক্ষেত্রে। লাশ এর সাথে suicide note টি ও পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওখানে লেখা ছিল “Please send my body as soon as possible to my parents in Bangladesh. Contact no:……….”

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



