বাংলাদেশের সমাজ কাঠামো হবে পুরুষতান্ত্রিক, রাষ্ট্রভাষা হবে আরবি!
এমনই এক ‘ইসলামী খিলাফতভিত্তিক’ রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে এখনো সক্রিয় নিষিদ্ধ উগ্রপন্থি সংগঠন হিযবুত তাহরীর।

গত ২৬ অক্টোবর চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকা থেকে গ্রেপ্তার দুই হিজবুতকর্মীর কাছে ৪০ পৃষ্ঠার একটি পুস্তিকা উদ্ধার করেছে পুলিশ, যার ওপর লেখা রয়েছে ‘খিলাফত রাষ্ট্রের খসড়া সংবিধান’।
সেই ‘খসড়া সংবিধানে’ বাঙালির রাষ্ট্রভাষা বদলে দেওয়ার পাশাপাশি দেশের সব নাগরিকের সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক এবং নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে।
১৮৬টি ধারা নিয়ে তৈরি ওই পুস্তিকার একটি অনুলিপি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের হাতে এসেছে। এতে দেখা যায়, ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর নিষিদ্ধ হওয়ার নয় মাসের মাথায় ২০১০ সালের ১৬ অগাস্ট তারা এই ‘খসড়া সংবিধান’ প্রকাশ করে।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন সময় সংগঠনটির অনেক নেতাকর্মী বিভিন্ন স্থানে দলীয় প্রচারপত্রসহ গ্রেপ্তার হলেও তাদের এই ‘খিলাফত’ রাষ্ট্রের সংবিধান এই প্রথম পাওয়া গেল।
শুক্রবার বন্দরনগরীর আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের সামনে থেকে বেশ কিছু প্রচারপত্রসহ সাত হিজবুতকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসব প্রচারপত্রে কথিত সেই ‘খিলাফত রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠায় সেনাবাহিনীকেও উস্কানি দিয়ে বক্তব্য এসেছে।
একটি প্রচারপত্রে বলা হয়েছে, “যালিম হাসিনা আপনাদেরকে তার দুঃশাসনের কাছে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে গোলা-বারুদ নিয়ে দমন-নিপীড়নে নেমেছে; তার কবল থেকে মুক্তির একমাত্র পথ- সামরিক বাহিনীর নিষ্ঠাবান অফিসারদের নিকট তাকে অপসারণ করে খিলাফত প্রতিষ্ঠায় হিযবুত তাহরীর- এর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি তুলুন।”
হিযবুতের পরিকল্পিত সেই রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো, বিচার বিভাগ এবং নাগরিকদের কর্মকাণ্ড কেমন হবে- সে বিষয়েও বলা হয়েছে ‘খসড়া সংবিধানে’।
এর ৮ ধারায় বলা হয়েছে, “ইসলামের ভাষা হচ্ছে আরবি। একমাত্র আরবি ভাষাই রাষ্ট্রের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা হবে।”
১৬ ধারায় রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থাকে ‘এককেন্দ্রিক’ করার কথা বলা হয়েছে। আর শাসক কিংবা রাষ্ট্রের যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের অবশ্যই মুসলিম হতে বলে এর ১৯ ধারায় বলা হয়েছে।
১৮ ধারায় রাষ্ট্রের শাসকদের জন্য চারটি পদ নির্ধারিত করা হয়েছে। এগুলো হলো- খলিফা, মুওয়াউয়িন তাফউয়িদ (প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী), ওয়ালী (গভর্নর) ও আ’মীল (মেয়র)। বাকি সব পদ হবে কর্মচারীর।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) মনজুর মোরশেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “হিযবুতের খিলাফত রাষ্ট্রের খসড়া সংবিধানটি তাদের কর্মীরা বিশ্বাস করে এবং এর আলোকেই তাদের নেতারা কর্মীদের মগজ ধোলাই করে থাকে।”
হিযবুতের ওই কথিত সংবিধানের ৫৬ ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের সব মুসলমান নাগরিকের বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে হবে। ১৫ বা তদুর্ধ্ব সব পুরুষের ‘জিহাদের’ প্রস্তুতিমূলক সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হবে। তবে সামরিক বাহিনীতে সক্রিয় অংশগ্রহণ ‘ফরজ’।
এর ৫৮ ধারায় বলা হয়েছে, খিলাফত রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী হবে একটি একক বাহিনী, পুলিশ হবে তার শাখা বিশেষ। সশস্ত্র বাহিনীকে ইসলামী সেনাবাহিনী হিসেবে দক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় যুদ্ধ উপকরণ ও সরঞ্জাম দিয়ে সজ্জিত করার কথা বলা হয়েছে ৬৫ ধারায়।
‘হিযবুতি সংবিধানে’ বিচার ব্যবস্থায় কোনো রায়ের বিরুদ্ধে আপিল কিংবা রায় খারিজের কোনো বিধান রাখা হয়নি, অর্থাৎ প্রতিটি রায়ই চূড়ান্ত।
এ বিষয়ে ৭৪ ধারায় বলা হয়েছে, ঘোষিত রায় তাৎক্ষাণিকভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
খিলাফত রাষ্ট্রের সংবিধানে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
১০৮ নম্বর ধারায় নারীকে প্রধানত ‘মা’ ও ‘গৃহবধূ’ গণ্ডিতে রাখা হয়েছে। আর এর পরের ধারায় পুরুষ ও নারীকে ‘মৌলিকভাবে’ পৃথক রাখার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘শরীয়া অনুমোদিত’ প্রয়োজন ছাড়া নারী-পুরুষের মেলামেশা করার অনুমতি নেই।
তবে গ্রেপ্তার সাত হিযবুতকর্মীর কাছ থেকে চট্টগ্রামে সংগঠনটির নেতৃত্ব সম্পর্কে কোনো তথ্য আদায় করতে পারেনি পুলিশ।
কোতোয়ালি থানার ওসি একেএম মহিউদ্দিন সেলিম বলেন, “চট্টগ্রামে কে বা কারা নেতৃত্ব দিচ্ছে- সে ধরনের কোনো তথ্য বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার কারো কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে না।”
আন্দরকিল্লায় গ্রেপ্তার সাত হিযবুতকর্মীর মধ্যে একজন নগরীর হকার্স মার্কেটের ব্যবসায়ী। এছাড়া একজন নৌ প্রকৌশলীও রয়েছেন। বাকি পাঁচজন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী।
ওসি মহিউদ্দিনের দাবি, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতার কারণে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড চালাতে না পেরে হিযবুত এখন বিভিন্ন পেশার লোকজনকেও সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



