আমার পায়ের নখ উল্টে যেনতেন একটা অবস্থা হয়েছিলো খুব অল্প বয়সে, সেবার ক্ষতবিক্ষত সেই পায়ের আঙ্গুল দিয়ে একটা শব্দ ঢুকে পড়েছিল আমার শরীরে! শব্দ টি এত ক্ষুদ্র যে দেখা যায় না, আবার শরীরের ভিতরে কোন আলো নেই বলে সে শব্দ আলোর গতির সাথে পাল্লা না দিয়ে শরীরের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়ায়। মানুষ শ্রেণীর প্রাণী হওয়ায় আমার দুটো কান বিরামহীন ভাবে শরীরে শব্দের সফল অনুপ্রবেশের যাবতীয় দায়িত্ব সম্পন্ন করেন। কিন্তুএই সদা জাগ্রত কর্ণ মহাশয়দের অবজ্ঞা করে একটি ক্ষুদ্র শব্দ কি উদ্দেশ্যে আমার শরীরে প্রবেশ করল তা জানতে আমি উৎসাহী হই! শব্দ টি একটু চালাক আর অভিমানী, আমার সাথে কোন কথাই বলল না পাছে সে ফুরিয়ে যায়। ইতিমধ্যে আমার শরীরের রক্ত কণিকা গুলোর সাথে শব্দটির ভালো সমঝোতা হয়েছে, তারা শব্দ টিকে রীতিমত ট্রানজিট দিয়ে দিয়েছে। এখন সে যখন খুশি যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়, তবে কোথাও বেড়াতে যায় না। এর মাঝে আমি অনেকটা বড় হয়েছি, শব্দটা আগের মতই আছে। যে যার মত সহ অবস্থান নীতিতে দিন পার করছি।
এরমাঝে, একদিন আমার নিঃশ্বাসের সাথে রক্তে প্রবেশ করা বাতাস সে শব্দটিকে দেখে ফেলে আর বাহিরে এসে অন্য শব্দদের বলে দেয়। অন্য শব্দরা তো শুনে রেগে আগুন! শব্দরাজ বললেন, এই সে শব্দ যাকে আমরা বহুবার খুঁজেও পাই নি, এবার তাকে পাওয়া গেছে, তাকে অবশ্যই ফিরে আসতে হবে। শব্দরাজ লক্ষ লক্ষ শব্দের বিশাল বাহিনী পাঠিয়ে দিলেন খুদ্র শব্দটিকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য। শব্দ সৈন্যগণ আমার এক কান দিয়ে ডুকে অন্য কান দিয়ে বেরিয়ে গেল কিন্তু শব্দটিকে কোথাও পেল না!
শব্দ সেনাপতি সৈন্যদের বিফল হবার খবর শব্দরাজের কানে তুললেন। শব্দরাজ মন্ত্রী সভার সদস্যদের নিয়ে জরুরী সভায় বসলেন। একজন মন্ত্রী জানালেন, আমরা এই ক্ষুদ্র শব্দ নিয়ে মোটেও ভাবতাম না যদি শব্দটি রাজার আজ্ঞাবহ হতো। অপরজন বললেন, এই শব্দের দৃশঠতার দাঁত ভাঙ্গা জবাব দিতে হবে, অন্যথায় শব্দরাজের অনুগত শব্দদের মধ্যে বিদ্রোহ দেখা দিলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। শব্দরাজ খানিকটা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন আর সভার মুলতবি ঘোষণা করলেন।
এর মাঝে খবর পোঁছে গেল শব্দ দ্যূতদের কানে, এ কান সে কান করে পৃথিবীর সব শব্দেরা জেনে গেল আমার শরীরের কোন এক প্রান্তে লুকিয়ে আছে ক্ষুদ্র এক শব্দ! যাকে ফিরিয়ে নিতে হবে শব্দের আপন ভুবনে, যেহেতু যুদ্ধ করে তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয় তাই কৌশল অবলম্ভন করতে হবে। কিন্তু কি হবে সেই কৌশল! কিছু শব্দ প্রস্তাব করল শান্তি চুক্তি করা যেতে পারে, কেউ কেউ বলল না রাজনৈতিক ভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে, আরেক পক্ষ মত দিলেন অর্থনৈতিক অবরোধ গড়ে তোলার পক্ষে। শব্দের বিশ্বনেতারা বুঝতে পারলেন এভাবে হবে না, তাই তারা শব্দ সম্মেলনের আয়োজন করলেন।
কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে শুরু হল বিশ্ব শব্দ সম্মেলন, লক্ষ্য একজন সাধারণ মানুষের দেহে লুকিয়ে থাকা একটি ক্ষুদ্র শব্দ কে ফিরিয়ে নেওয়া। সম্মেলনে আসতে পেরে শব্দরা বেশ খুশি। অনেক দিন পর দেখা হওয়া শব্দরা কোলাকুলি করল, হাসি ঠাট্টা করল, শুভেচ্ছা বিনিময় করল। শব্দমহারাজ সকলকে আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানালেন। প্রাচীন শব্দরা বলল আমরা যেভাবে বলি সেভাবে কর, আধুনিক শব্দরা বলল তোমরা এখন আর ব্যবহার হচ্ছ না তাই তোমাদের কথা চলবে না। পুঁজিবাদী শব্দরা দাবী করলো সবাই আমাদের অধীনস্থ, সমাজত্রান্তিক শব্দরা বলল শ্রেণী সংগ্রাম চলছে চলবে, মৌলবাদী শব্দরা চোখ গরম করে জানালো আমরা ঈশ্বর প্রেরিত, সুতারং আমাদের কথাই ঠিক। বুদ্ধিজীবী শব্দরা সাদা কালো দলে ভাগ হয়ে নিশ্ছুপ থেকে বিজয়ী দলে ভিড়বার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।
শব্দ সম্মেলনের বেহাল দশা দেখে শব্দমহারাজ অত্যন্ত বিচলিত বোধ করলেন। তিনি ক্ষুদ্র শব্দ কে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ যেন বাধাগ্রস্ত না হয় তার একটি উপায় বের করলেন। মহারাজ শব্দদের পৃথক হয়ে নিজ নিজ দলের সুচিন্তিত মতামত জানাতে বললেন। মুহূর্তের মধ্যে শব্দরা ছুটাছুটি করে নিজেদের দলে ভিড়তে লাগলো। পাখিদের শব্দ গুলো উড়ে গিয়ে একটু দূরে বসলো, পশুদের শব্দগুলো ছুটাছুটি করতে করতে মাঠের এক কোনায় বসলো। এভাবে গাছেদের শব্দ, মাছেদের শব্দ, নদ নদীর শব্দ, বাতাসের শব্দ যে যার দলে একত্রিত হয়ে আলোচনা শুরু করলো। কিন্তু মানুষের শব্দ গুলো এক হতে পারলো না, এ জন্য তারা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করতে শুরু করলো।
এ দিকে শব্দ সম্মেলনের কারণে দেখা দিল আর এক বিপত্তি! মানুষ, পশুপাখি সহ যারা শব্দের ব্যবহার করতো তারা পড়ল মহা বিপদে, তাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা সৃষ্টি হল। কেউ কারো সাথে ভাব বিনিময় করতে পারলো না, লড়াই সংগ্রাম করতে পারলো না, পরচর্চা করতে পারলো না ফলে পৃথিবীর বুকে অপরিচিত সংকটের আশঙ্কায় সময় পার হতে লাগলো। তবে অন্য একটা উপকার হল, পৃথিবী থেকে যাবতীয় প্রতিহিংসা কিছুদিনের জন্য হারিয়ে গেল।
শব্দ সম্মেলনের সময় প্রায় শেষের দিকে, অথচ মানুষের শব্দ গুলো কোন মতৈক্যে পোঁছাতে পারলো না। মানুষের পরিবেশে থেকে শব্দ গুলো নিজেদের পরিচয় হারিয়ে ফেলায় তারা মানুষের মতই আচরণ করতে লাগলো। অন্য সব শব্দরা মানুষের শব্দদের বোঝাতে এল কিন্তু তারাও অল্প সময়ের মধ্যে বিবাদে জড়িয়ে গেল। শেষমেশ গোলযোগ বেড়ে যাওয়ায় শব্দ সম্মেলন পণ্ড হল, শব্দরাজ মহারাজ সকল শব্দ কে নিজ নিজ কর্ম ক্ষেত্রে ফিরে যাবার নির্দেশ দিলেন।
শব্দরা ফিরে আসায় পৃথিবীর বুকে আবার কর্ম চাঞ্চল্য সৃষ্টি হল। সবাই মিষ্টি বিতরণ করলো, প্রার্থনা গৃহে স্রষ্টার প্রশংসা হল, পাখিরা গান গাইল, বিজ্ঞানীরা গবেষণায় মন দিলেন, প্রত্রিকায় কলাম ছাপা হল, মিছিল হল, মিটিং হল, যুদ্ধ হল, সন্ধি হল, যা হবার নয় তাও হল! কিন্তু সবাই ভুলে গেল আমার শরীরে লুকিয়ে থাকা একটি ক্ষুদ্র শব্দের অস্তিত্ব !!
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই নভেম্বর, ২০১২ দুপুর ২:৪৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





