ফেব্রুয়ারী আসতে না আসতেই দেখা গেলো অনেকেই ঢাল তোলোয়ার নিয়া প্রস্তুত হয়ে গ্যাসে। "মামা এইবার ভ্যালেন্টাইন'স ডে তে অফার কইরাই ফেলমু।" দোস্তের উচ্ছাসিত মুখ দেইখাই মনে হইল এইবার ও সে ব্যার্থ হবে, কিন্তু কিসু দিন সে একটা উত্তেজনা ভাল লাগা নিয়ে থাকবে এতেই সে খুশি। ১৪ই ফেব্রুয়ারী আসা মাত্র চারিদিকে শুরু হইল ভালবাসা আর লাল রঙের ছড়াছড়ি। ফেসবুক, টুইটার ইয়ুটিয়ুব এ অনেক আয়োজন। এর সাথে ভ্যালেন্টাইন'স দিবসের বিরুদ্ধেও ব্যপক প্রচার দেখতে পাইলাম। ভ্যলেন্টাইন'স ডে পুরাপুরি নাকি নিষিদ্ধ। ইসলাম ধর্ম মতে এই দিবস পালন করা যাইবনা। কারণ এই টা বিধর্মিদের উৎসব মুসলমানদের জন্য না। একটু অবাক হইলাম। যদি সত্যই নিষিদ্ধ হয় তাইলে ত আর এই দিন নিয়া ফালাফালি করা যাইবনা মাগার আগে ত বুঝতে হইব ক্যান নিষিদ্ধ কি কি করা নিষিদ্ধ। ভ্যালেন্টাইন'স ডে কিভাবে আসচে সেই গল্প বহুবার বহু ভাবে বলা হইসে। তাও একটু সংক্ষেপে বলি...
ভ্যালেন্টাইন নামে তিনজন খৃষ্ট সন্ত ছিলেন একজন কে ২৬৯ ক্ষৃষ্টাব্দে রোমের সম্রাট "ক্লাউদিয়াসের" হুকুমে মারা হয়, আরেকজন কে ১৯৭ খৃষ্টাব্দে রমান সম্রাট "আউরেলিয়ন" এর হুকুমে মারা হয় আর আরেকজন বড়ই অভাগা যেকিনা আফ্রিকাতে মারা গেছে জানা গেলেও জানাযায়নাই কবে কিভাবে। এখন প্রশ্ন এদের সাথে এই দিবসের আর ভালোবাসার সম্পর্ক কোথায়?
খৃষ্ট ধর্ম আসার আগে ১৪ই ফেব্রুয়ারী রোমানদের একটা ধর্মিয় উৎসব ছিল "লুপারকেলিয়া" নামে। সেই উৎসবে রোমের প্রতিষ্ঠাতা "রেমাস ও রমুলাস" কে যে গুহায় খুজে পাওয়া গেসিল তার সামনে ছাগল আর কুকুর বলি দেয়া হত। খৃষ্ট ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হবার পর মনে করা হল পেগানদের এই সকল কু আচার বন্ধ করতে হবে তাই পোপ এই ১৪ই ফেব্রুয়ারী কে ঘষোনা করলেন সেইন্ট ভ্যলেন্টাইন এর স্মরণে পবিত্র একটা দিন যেমনটা আমাদের ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠার পর করা হয়েছিল নবি মুহাম্মদ(সঃ) মদিনাই দেখতে পেলেন মুসলমানেরা কাফেরদের উৎসব পালন করতেসে তখন তিনি সেই উৎসব বাতিল করে দেন। যেহেতু একই আল্লাহ প্রদত্ত ধর্ম তাই কিছু কিছু নিতী মিল হইতেই পারে। এই ভ্যালেন্টাইন যে কোন ভ্যালেন্টাইন যার স্মরণে এই পবিত্র দিন এই প্রশ্নের উত্তর পোপ দিয়া জাইনাই। প্যাঁচ ত লাগাই দিয়া গেসে।
ঐতিহাসিকদের মতে আউরেলিয়নের হাতে নিহত ভ্যালেন্তাইন ১৪ই ফেব্রুয়ারী মারা গেসেন এবং তাকে ঐ গুহাতে সমাধিস্ত করা হয় যেখানে "লুপারকেলিয়া" হইত আর ক্যাথলিকরা বলত আফ্রিকায় জিনি মারা গেছেন সে ১৪ই ফেব্রুয়ারী সমাধিস্ত হইসেন। এই দন্দের যখন কনো সমাধান পাওয়া যাইতেসিলনা তখন জলন্ত উণুনে ঘি ঢাইলা দিল "জেফ্রি চউষার"। রাজা রিচার্ড(২) আর এনের বিবাহ বার্ষিকিতে এক বিস্তর মহাকাব্য লিখে বসলো "Parlement of Foules"। সেই কবিতাই প্রথম ভ্যলেন্টাইন যে কিনা রাজা ক্লাউদিয়াসের হাতে মারা গেসেন তাকে দেখান হয়েছে বিবাহের দূত হিসাবে যখন রাজা ক্লাউদিয়াস তার রাজ্জ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ করে দিয়েসিল। আরো কিছু ঘটনার পর রাজা সর্ব শেষে তাকে বজ্র মেরে হত্যা করেন। রাজার আবার অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা ছিল। কবিতা ত! কিন্তু কবিতার ঘটনার সত্যতার হদিস কথাও পাওয়া যায়নাই। বলা হয় এই টা পুরাটাই কল্প কাহিনী।
"For this was on Saint Valentine's Day,
when every bird cometh there to choose his mate."
পাখিদের ত আর খায়াদায়া কাজনাই যে হিসাব কইরা একেবারে ১৪ তারিখ পার্টনার খুজতে বাইর হইব। তাইলে আর সারা বছর আর মুরগী খাওয়া লাগতনা। মুরগীও ত একটা পাখি।
তারপর শুরু হইল ভালোবাসা দিবসের ইতিহাস আতক্ষন চলসে ভ্যালেন্টাইন'স ডে এর কল্পকাহিনী। জেফ্রি চউষের ভক্তরা এই দিনটাকে মনের মানুষকে ভালোবাসার কথা জানান শুরু করলো। তারা বিভিন্ন রঙ্গিন কাগজে ছোট ছোট কবিতা লিখে প্রেম প্রস্তাব দিত আর কবিতার নিচে লিখত "ইয়উর ভালেন্তাইনে"।
ভালোবাসা সার্বজনীন। সব কালের সব জাতির সব ধরনের মানুষ ভালোবেসেছে। বাংলা গান আসে "সবার জীবনে ত প্রেম আসে। তাই ত সবাই ভালোবাসে।" ভালোবাসার জনপ্রিয়তার কারনে ১৪ই ফেব্রুয়ারীর "ইয়উর ভালেন্তাইনে" কথাটা খুব দ্রুত চারিদিকে ছড়িয়ে গেলো। খৃষ্টিয় যে রিতী ছিলো ১৪ই ফেব্রুয়ারী নিয়ে তা ভালোবাসার চাপে চ্যাপ্টা হয়ে গেলো। পোপ জন পোল(২) দেখলেন এই দিনটিতে আর ধর্মিয় কোন উৎসব পালন হচ্ছেনা। আমজনতা যে বিষয়টি কে অনুসরন করতেসে তা হল ""Parlement of Foules"। "Parlement of Foules" এ বর্ণিত ঘটনার ধর্মিয় বা ঐতিহাসিক কোন ব্যখ্যা নাই। অন্য দিকে কোন ভ্যালেন্টাইন এর স্মরণে যে এই দিন তারও কোন হদিস পাওয়া যাইতেসেনা। তাই তিনি বাদ দিয়ে দিলেন এই দিন ক্যাথলিক দিনপঞ্জিকা থেকে। ১৯৬৯ খৃষ্টাব্দে বন্ধ করে দেয়া হয় ১৪ই ফেব্রুয়ারীর সরকারি ছুটি এবং সব ধর্মিয় আচার।
কিন্তু ভালোবাসার কাঙ্গাল মানুষ জাতি ভালোবাসার একটা দিন প্যেয় ছেরে দেয়নি সুযোগ। একটা রিতী চালু হয়ে গেসে। ১৪ই ফেব্রুয়ারী ভালোবাসার প্রস্তাব করার দিন। আর হয়ত ঐদিন প্রস্তাব করলে রিস্ক একটু কম থাকে। এই টুকু আশা করা যাই অন্তত চড় মারবেনা বা স্যান্ডেলটা হাতে নিবেনা। কোন এক ১৪ই ফেব্রুয়ারী তে দেখসিলাম সী সেল এর সামনে রিক্সায় এক মেয়ে বসে বসে আপন মনে হাসতেসে। তার হাতে অনেক গুলা গোলাপ ফুল। হয়তো কেবল মাত্র তাকে কেউ ফুল গুলো দিয়ে গেসে। সে তখনো তার ভালোলাগার অনুভুতি গুলো অনুভব করতেসিলো। হঠাৎ রিক্সাওয়ালা জোরে বলল "আফা কই যাইবেন কন্না ক্যান?" মেয়েটির হাস্যজ্জল উত্তর "জানিনা!!! সামনে যেতে থাক।" ভালো লাগাই সে ভুলে গেছে তার গন্তব্য কই? সারা জীবনে একজন মানুষের কতবারেই বা ভালো লাগে?
এখন প্রশ্ন ইসলাম আইনে কিভাবে কিভাবে এই দিন ও কর্মকান্ড নিষিদ্ধ হইতে পারে এবং সেই প্রেক্ষিতে আমাদের করণিয় কি থাকতে পারে?
১) উচ্ছৃঙ্খলতাঃ ভ্যালেণতাইন'স ডে তে কিছু পলাপাইন উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উল্টাপাল্টা কাজ করে। ইসলাম কখনয় উচ্ছৃঙ্খলতা সমর্থন করেনা। সেটা ভ্যালেন্টাইন'স ডে হউক আর থার্টিফাস্ট নাইট হউক আর ঈদ হউক। প্রতিবাদ হইলে হবে উচ্ছৃঙ্খলতার বিরুদ্ধে।
২) নামঃ এই দিবসের নাম খৃষ্টান এক সেইন্টের নামে এই নিয়া আপত্তি উঠা সাভাবিক। কিন্তু সেই সেন্টের জন্ম-মৃত্যু ইসলাম ধর্ম নাজিল হবার আগে এবং সেই সময় সে যে ধর্ম প্রচার করেসে তা ঐ সময়ের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত ধর্ম তাই তিনি অতটা ঘৃণিত নাও হইতে পারে। তারপরও যদি আপত্তি থাকে আমরা দিনটার নাম পুরপুরি বদলায়া ভালোবাসা দিবস বা অন্য কিছু রাখতে পারি।
৩) তারিখঃ ১৪ই ফেব্রুয়ারী ছিল পেগানদের ধর্মিয় উৎসবের দিন ছিল আবার খৃষ্টানদেরও ছিল যে উৎসবের উৎপত্তি পেগানদের "লুপারকেলিয়া" উৎসব বন্ধ করার জন্য। দিন যদি হিসাব করা শুরু হয় তাহলে অন্য কোন ধর্মের কোন উৎসবহীন দিন কয়টা পাওয়াযাবে তা নিয়া আমার ব্যপক ভয় আসে। বলা হয় হিন্দু ধর্মে বার মাসে তের পার্বন আর ইনকান, মায়া এযতেক আরো কত জাতি তাদের কত উৎসব! তবুও যদি আপত্তি থাকে তাহলে আমরা দিনপঞ্জিকা দেখে ভাল একটা দিন বের করতে পারি।
আমার উপরের নোট গুলোর উদ্দেশ্য একটাই যে দিনটা কিছু মানুষের মনে ভালোলাগা, আবেগ, আনন্দ এই সকল ভালো অনুভুতি নিয়া আসে সেই দিনটা একেবারে মুছে না ফেলা হউক। তার উপরও একটা কথা থাইকা যাই। সবচেয়ে বড় আপত্তি।
৪) রিতীঃ আখন ভালোবাসা দিবসে যা করা হয় সেইটা আদিম ধর্মেরও নিতী না বা খৃষ্টান দেরও নিতী নহে। ভালোবাসার উচ্ছাসে খৃষ্টিয় আচার ঢাকা পরে গেসে। তাই পোপ এই দিনটিকে তাদের পবিত্র দিনের তালিকা থেকে মুছে দিয়েছেন। এখন যে নিতী অনুসরন করা হয় তা হইল ভালোবাসা। কবির কবিতার ভালোবাসা। আমি সব হাদিস পরিনাই বা সম্পুর্ণ কুরানের মানে জানিনা। হতে পারে ইসলাম এ ভালোবাসা না জায়েজ প্রেম করা জেনাহ। যদি তাই হয় তবে শুধু কেন ভালবাসা দিবসে প্রতিবাদ হবে। বছরের বাকি ৩৬৫টা দিনেও ত মানুষ ভালোবাসতেসে প্রেম করতেসে। যদি ভালোবাসা না জায়েজ আর প্রেম করা জেনাহ হয় তবে ১৪ই ফেব্রুয়ারীর বিরুদ্ধে না লেগে আমাদের উচিৎ ভালোবাসার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষনা করা, কোন মুসলমান কখনোই ভালোবাসতে পারবেনা।
আমি আলেমদার মানুষ না। তাই কোন সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষমতা আমার নাই। আমি শুধু এইটুকু বলতে পারি যে কাজটা কোন খারাপ উদ্দেশ্যে করা হয়না সেটা কে নিষিদ্ধ ঘোষনা করার আগে জেনে শুনে বুঝে ঘোষনা করা ভালো।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১২ বিকাল ৩:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



