somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ব্যক্তিগত কাসুন্দিঃ হোস্টেল-১ম পর্ব

২২ শে ডিসেম্বর, ২০১৪ রাত ৯:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার জীবনের সবচে আনন্দের কিছু মুহূর্ত আমি হোস্টেল জীবনে কাটিয়েছি। হোস্টেলের খাবার-দাবার আর গোসল করার পানি ছাড়া আর কোন কিছুর প্রতি আমার তেমন অভিযোগ ছিল না। হোস্টেল জীবন ভালো ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে কখনো আনন্দের হয় না। এটা আনন্দের হয় ফাঁকিবাজদের কাছে। ফাঁকিবাজরা যখন আড্ডা দেয়, ভালোরা তখন কানে তুলো দিয়ে পড়াশোনা করে। আমাদের ব্যাচের হোস্টেলে বসবাসরত মেয়েদের মধ্যে সবচে ফাঁকিবাজ যে আমি ছিলাম এই ব্যাপারে প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে কারো কোন সন্দেহ থাকার কথা না। আমি দেখতে শান্ত-শিষ্ট টাইপের হলেও একটা অদৃশ্য লেজবিশিষ্ট ছিলাম। অতিরিক্ত দুষ্টুমির কারনে আমার এই লেজের খবর হোস্টেল সুপার ফাহমিদা আপার কানেও চলে যায় দু-একবার। দুষ্টুমির প্রধান অংশ ছিল ভীতু মেয়েদের চিনে রেখে সুযোগ বুঝে তাদের ভয় দেখানো। বেশিরভাগ মেয়েই ভীতুর ডিম ছিল। আর আমিও ভয় দেখানোর জন্য এবং ভয়ের গল্প বলার জন্য খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করি। জনপ্রিয়তার একটা নমুনা শোনেন। উচ্চমাধ্যমিক ফাইনালের ফিজিক্স পরীক্ষা চলছে। আইনস্টাইন ব্যাটার আলোর আপেক্ষিক তত্ত্বের সূত্রের প্রতিপাদন করার চেষ্টা করছি। মাঝামাঝি এসে গুলিয়ে ফেলেছি। মেজাজ মহা খাপ্পা। এদিকে সময় চলে যাচ্ছে। এর মধ্যে পেছন থেকে একটা মেয়ে খোঁচা দিল। খারাপ ছাত্র-ছাত্রীদের বদ অভ্যাস হল, যত ক্রিটিক্যাল মুহূর্তই হোক না কেন, পেছন থেকে কেউ খোঁচা দিলে তারা না তাকিয়ে পারেনা। খোঁচাখুঁচির সাথে তাদের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের টানে আমিও তাকালাম।
-কী ব্যাপার?
কোন জবাব নাই, খালি হাসে।
-হাসো ক্যান?
পরীক্ষা শেষ হইলে ভূতের গল্প শুনাইতে হবে। চ্যালেঞ্জ-তুমি আমারে ভয় দেখাইতে পারবা না।
কথা শুনে মুগুর দিয়ে মেয়েটার মাথায় একটা বাড়ি মারতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু হোস্টেলের কারো সাথে, কোনদিন, কোন কিছু নিয়েই, আমার কোন ভেজাল হয়নি। তাই কিছু না বলে চেপে গেলাম।

যা হোক, যা বলছিলাম। এই ভয় দেখানো নিয়ে অনেক মজার ঘটনা আছে। বিভিন্ন রুম ঘুরে-টুরে আমি তখন ৩০৬ নম্বর রুমে আঁখির সাথে থাকতে শুরু করেছি। মেয়েটা দজ্জাল। সারাক্ষণ শাসনের ওপর রাখে- এই, রাতজেগে আড্ডা দেয়া যাবে না; এখন খেতে যেতে হবে; পড়ার সময় হয়েছে, পড়তে বোস; এতটার পর বাতি জ্বালিয়ে রাখা যাবে না; হ্যান-ত্যান। মাঝে মাঝে বই খুলে লেসনও বের করে দেয়-এটা শিখে আমাকে পড়া দিবি। শাসনের যন্ত্রনায় অতিষ্ঠ হয়ে মাঝে মাঝে তাকে ‘তুই মায়া হাজারী’ বলে গাল দেই, মনে মনে। আমার রাতে ডায়েরী লেখার অভ্যাস ছিল। তাও করতে পারি না। রাতে ঘুম না আসলে গল্প করতে হয়, তাও পারি না। সেদিন তক্কে তক্কে ছিলাম। আঁখি ঘুমিয়ে পড়তেই চেয়ারটা শূন্যে ভাসিয়ে দরজার কাছে নিয়ে এলাম। আল্লাহর কাছ থেকে হাইটে বিশেষ ডিসকাউন্ট লাভ করার কারনে দরজার ছিটকিনি নাগাল পেতাম না, তাই ঐ রকম করতে হল। নিঃশব্দে দরজার ছিটকিনি খোলার প্র্যাকটিস আমার আগে থেকেই ছিল। অনেক বছর আগে আমাদের যখন টিভি ছিল না, তখন এইভাবে চুপি চুপি ঘরের পেছনের দরজা খুলে বড় জেঠুমনিদের ঘরে আলিফ লায়লা দেখতে যেতাম। সেইভাবে বের হয়ে পা টিপে টিপে চার তলায় চলে এলাম। কিন্তু চার তলায় এসে দেখি শুধু ৪০৯ নম্বর রমেই বাতি জ্বলছে। ঐ রুমের মেয়েদের সাথে অত ঘনিষ্ঠতা ছিল না। কিন্তু এতো কষ্ট করে এলাম, তাই ভাবলাম কথা বলেই যাই। আমি দুষ্টুমি করে দুই হাত দিয়ে ধাম ধাম করে কয়েক ঘা লাগিয়ে দিলাম দরজায়। একটা মেয়ে বলল,
-কে?
আমি নিরুত্তর।
-কে?
মেয়েটার স্বর ভয়ার্ত।
আমি তখন মজা করা শুরু করলাম। কোন কথা না বলে খুব করুন সুরে কাঁদতে শুরু করলাম-প্রথমে আস্তে আস্তে, তারপর একটু জোরে, তারপর আরেকটু জোরে। কান্নার অভিনয়টা মনে হয় ভালই হচ্ছিল। কারন- দরজার একটা ফুটো দিয়ে তাকিয়ে দেখি মেয়েগুলো ভয়ে জড়সড় হয়ে আছে। মাঝে মাঝে ভয়ার্ত স্বরে প্রশ্ন করে- কে? কে?
আমি তখন কান্না বন্ধ করে চুপ করে যাই। তারপর আবার শুরু করি। হঠাত দেখি একটা মেয়ে একটা বটি হাতে দরজার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি হাসি চেপে রেখে ছিটকে দেয়ালের আড়ালে চলে এলাম। তারপর টুক করে পাশের ওয়াশরুমে লুকিয়ে পড়লাম। মেয়েটা সশব্দে দরজা বন্ধ করে দিল। ভেতর থেকে ধুপ-ধাপ আওয়াজ পেলাম। ভালোই ভয় পেয়েছে বলে মনে হল।

দরজা বন্ধ করে দিতেই আমি আবার ফিরে এলাম। আবার একই রকম কান্না। ফুটো দিয়ে তাকিয়ে দেখি, সবাই একজন আরেকজনের কোলে উঠে বসে আছে। দেখার মতো দৃশ্য। আবার জিজ্ঞাসা- কে? কেরে কান্দে?
আমি বললাম, ‘দরজাটা খুলুন না-আঁ-আঁ-আঁ...আমার খুব বিপদ।’
-কে তুই?
-আমি আপনাদেরই একজন।
একটা মেয়ে শুনলাম বলছে,
-এই, ভুলেও দরজা খুলবি না। আমি শুনেছি অনেক বছর আগে পুরোনো হোস্টেলের একটা মেয়ে আত্মহত্যা করেছিল।
আমি বললাম-
-এই তাড়াতাড়ি দরজা খোল। না হয় সমস্যা করব। দরজার ফুটো দিয়ে ঢুকে যাব।
ফুটো দিয়ে তাকিয়ে দেখি, সবাই কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছে। আমি তখন আর হাসি রাখতে পারলাম না। পিঁৎ করে হেসে ফেললাম। বললাম,
-দরজাটা খোল। আমি পায়েল। ঘুম আসছে না, একটু গল্প করেই চলে যাব।
কিন্তু ওরা মনে হয় আমার কথা বিশ্বাস করতে পারল না। এতো রাতে এমন একজন কেন আসবে, যার সঙ্গে ওদের তেমন আলাপ-পরিচয়ই নেই-এরকম কিছু ভাবছিল হয়তো। শেষে কলেজের ফাংশনে আবৃত্তি করেছি এরকম একটা কবিতা শোনানোর পর ওরা আমার কথা বিশ্বাস করল। ভূত আর যাই হোক, কবিতা শোনাবে না। তাছাড়া আমার ঐ গলা সবারই জানা। পূণ্য নামের মেয়েটা দরজা খুলে দিল। আমাকে পিঠা খেতে দিল। গল্প করতে করতে প্রায় ভোর রাত হয়ে গেল আমাদের। আমি তাই ওদের সাথে ওখানেই শুয়ে পড়লাম।

কখন সকাল হয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি। বেশ চেঁচামেচির শব্দে ঘুম ভাঙল। আঁখির কাঁদো কাঁদো কথা শুনতে পাচ্ছি- আমাকে খুঁজে না পেয়ে ভয় পেয়ে গেছে মেয়েটা। রাতে হঠাত উঠে দেখল, রুমের দরজা খোলা। সে তো দরজা বন্ধ করেই শুয়েছিল। তাহলে খোলা কেন। দরজার কাছে চেয়ার দেখে নিশ্চিত হল, কেউ বাইরে গেছে। তারপর দেখল, আমি নেই। ভাবল ওয়াশরুমে গেছি। কিন্তু ওয়াশরুমের সব দরজাই খোলা। কেউ নেই। তাহলে মেয়েটা এতো রাতে গেল কোথায়? আর এখনো হোস্টেলের একমাত্র গেইট খোলা হয় নি। অথচ সে কোন রুমেই নেই। ভোজবাজি নাকি?- এগুলোই সে চেঁচামেচি করতে থাকা পাবলিকদের বলছিল। আমি ঐ রুমের মেয়েদের ইশারায় বুঝিয়ে দিলাম, আঁখি খুঁজতে আসলে যেন বলা হয় আমি এখানেও নেই। ওরা খুব সুন্দর করে মিথ্যে বলল- ‘অনেক রাতে কে যেন আমাদের ডেকেছিল। আমরা সাড়া দেই নি। মেয়েটা কাঁদছিল, আর বলছিল তার নাকি খুব বিপদ।’
-তারপর?
-তারপর দরজা খুলে কাউকে দেখতে পাই নি।

ওদের কথায় কনফিউশন তৈরি হল সবার মধ্যে-আমি আসলে মানুষ, নাকি জ্বীন। আমি সবকিছু শুনছিলাম আর মজা নিচ্ছিলাম।
-জ্বীন হতেই পারে। আমার দাদার মাদ্রাসায় অনেক জ্বীন নাকি পড়াশোনা করত।
-যত সব ফালতু কথা। কারো সাথে পালিয়ে গেছে কিনা খোঁজ নিয়ে দেখা উচিত। সব হোস্টেলেই মেয়ে পালানোর ঘটনা ঘটে।
-এক থাপ্পড় খাবি। ও এরকম মেয়ে না। তাছাড়া নিচের গেইট তো এখনো খোলাই হয় নি। এখনো তালা ঝুলছে। বুঝলাম, কোন রকমে বের হয়েছে, তাহলে এতো জন গার্ড, কারো চোখে পড়ল না?
-তাহলে কি হাওয়া গেছে? আমার তো ভাবতেই গা শিউরে উঠছে।
-আমি শেষ রাতে অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখলাম। দেখলাম কি, পায়েল লোহার গেইটের ফাঁক দিয়ে কীভাবে যেন বের হয়ে গেল। তারপর হাঁটতে হাঁটতে কুয়াশার মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।
-হুম। ঐ যে শেক্সপীয়ার বলছিল না, দেয়ার আর ম্যানি থিংক্স ইন হ্যেভেন এন্ড আর্থ। কত আজব ঘটনা যে দুনিয়ায় ঘটে।
এরকম আজব আজব সব মন্তব্য আসছিল একেক জনের মুখ থেকে, তবু কেউ রুম সার্চ করার কথা বলছিল না। পরে একজন প্রস্তাব করল, বিষয়টা হোস্টেল সুপারকে জানানো হোক। তারপর না হয় পুলিশে ইনফর্ম করা হবে। এরপর আর শুয়ে থাকা যায় না। আমি চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে এসে বললাম,
-কী হইছে? এতো গোলমাল কিসের?
আঁখি বলল-
-আমার চোখের দিকে তাকা।
-তাকাইছি।
-তুই এখানে ক্যান?
আমি চারদিকে তাকিয়ে চোখ কচলে খুব ইনোসেন্ট কন্ঠে বললাম,
-আমি এখানে ক্যান?
তারপর ডান গালে কষে একটা চড় পড়ল। আসলেই দজ্জাল মায়া হাজারী।

২য় পর্ব দেখতে হলে-
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ডিসেম্বর, ২০১৪ বিকাল ৪:১৯
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কক্সবাজার ভ্রমণ ২০২০ : যাত্রা শুরু

লিখেছেন পগলা জগাই, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২০ দুপুর ১২:৫১




দীর্ঘ্য ৬ বছর পরে পরিবার নিয়ে বেরাতে যাওয়ার সুযোগ হলো আবার। এর মধ্যে ওদের নিয়ে বেরাতে গেলেও তা ছিলো ডে ট্রিপ, যেখানেই গেছি রাতের মধ্যে বাড়িতে ফিরতেই হয়েছে। স্ত্রী-কন্যকে নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নারী পাচার

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২০ দুপুর ১:৫৯



এশিয়ার এক নম্বর নারী ও শিশু পাচার রুট বাংলাদেশ।
প্রতিদিন দেশ থেকে প্রচুর নারী ও শিশু বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত দিয়ে অথবা বিমান যোগে পাচার হয়ে যাচ্ছে। পাচারকৃত নারী ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

চিলেকোঠার প্রেম- ১২

লিখেছেন কবিতা পড়ার প্রহর, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২০ বিকাল ৪:২৩

প্রায় দেড় বছর! না না এক ফাল্গুন থেকে আরেক ফাল্গুন পেরিয়ে চৈত্রের শেষ। নাহ ঠিক দেড় বছর না, এক বছরের একটু বেশি সময় পর পা দিলাম আমার চিরচেনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষের প্রতি দয়ামায়া না থাকলে দেশে কি কি ঘটতে পারে?

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:১০



ভারত খাদ্য রপ্তানী করে, বাংলাদেশের মতো ভারতে সকাল-বিকেল খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ে না, আয়ের তুলনায় খাবারের দাম কম; খাবারে কেমিক্যাল, ফরমালিন মিশায় না; অনেক বছর এত বেশী খাদ্য উৎপাদন... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিরু আলুমের সিনেমা বাহিরে চলিচ্ছে , ভিতরে খালি ক্যারে

লিখেছেন শাহ আজিজ, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:৩৮


প্রাডো গাড়ি নিয়ে ঘুরছেন হিরো আলম। ছুটছেন এক প্রেক্ষাগৃহ থেকে আরেক প্রেক্ষাগৃহে। তাঁকে ঘিরে প্রেক্ষাগৃহের বাইরে আবার উৎসুক জনতার ভিড় লক্ষ করা গেলেও প্রেক্ষাগৃহের ভেতরে আসন ফাঁকা। নেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×