সেই ছোটবেলা থেকেই রুশ সাহিত্যের পোকা আমি। প্রথম বইটি ছিল, "চুক আর গেক"-আর্কাদি গাইদারের এক অনন্য শিশু সাহিত্য ! এরপর থেকে কত বই যে পড়েছি--সবগুলো আমার বড়বোনের দেয়া। আপা তখন মেডিকেলে পড়ত, স্কলারশীপের টাকা বাঁচিয়ে আমাকে আর বই পাগল আব্বা-আম্মাকে বই কিনে দিত। রুশ ছোট গল্পসংকলন আমার বেশি প্রিয় ছিল, অবশ্য এতে প্রগতী প্রকাশনের ননী ভৌমিকের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য ছিল--ওনার প্রান্জল অনূবাদে দূর্বোধ্য রুশ ভাষা প্রানের বাংলায় পরিপূর্ন রূপ পেয়ে আমার হৃদয়ে নির্মল জলধারার মতো বইতো! আর চিত্রকর দ দুবিন্সকীর স্কেচ! ওনার আঁকা থেকেই আমার প্রথমে ছবি আঁকা, পরে আর্কিটেক্ট হওয়ার অনুপ্রেরনা শুরু হয়--

চুক আর গেক এর পরে পুশকীনের রুশ দেশের রূপকথা আমাকে অন্য জগতে নিয়ে যেত---ছোট ইভান বড় বদ্ধিমান, ডাইনি বুড়ি বাবা ইয়াগা আরও কত অজানা চরিত্রের ভীড়ে!
রুশ ছোট গল্পের বেশ বড় একটা সিলেকশন ছিল আমার, এর মধ্যে ভাসিলি সুকশীন, আর দস্তয়ভস্কীর এর লেখা খুব প্রিয় ছিল। সুকশীনএর লেখার বিষয়বস্তু খুব সাধারন গ্রাম্য মানুষদের নিয়ে--গল্পগুলো আমাকে খুব কাছে টানত, সেই যে রুশ গ্রাম্য বুড়িটি তার নাতি কে যারপরনাই বিরক্ত করছে পাতার পর পাতা বিশাল টেলিগ্রাম লিখতে তার ছেলের কাছে; অথবা হেমন্তের শুরুতে খেতে কাজ করতে করতে কোন ক্লান্ত কৃষক ছোট টিলায় হেলান দিয়ে নুনে জারানো চর্বি আর শশা খেতে খেতে জগতের রহস্য বুঝতে গিয়ে হাই দিয়ে ওঠে, পাশ দিয়ে সরসর করে ঘিনঘিনে নিরীহ সাপ চলে যায় আর তা দেখে ইভান নামের ছুলি ভরা মুখের সেই কৃষকটি বিষন্ন গলায় গেয়ে ওঠে "পপ্লার গা-- ছ , ওরে পপ্লার গা-- ছ !"
মিখাইল শলোখভের "না পাঠানো চিঠি" পরে কতোবার যে কেঁদেছি--একদল খনি কাজে নিযুক্ত মানুষ সাইবেরিয়ার ভয়ংকর তুষারঝড়ের সাথে যুদ্ধ করতে করতে দিশেহারা হয়ে আর খাদ্যের অভাবে একেএকে সবাই মারা পরে , শুধুমাত্র গল্পের লেখক পুরো ঘটনাটি চিঠি আকারে লিখে রাখে প্রিয়জনের নামে, সেও প্রকৃতির কাছে একদিন আত্ম সমর্পন করে। একসময় সেই চিঠি উদ্ধার হয় পরিত্যক্ত ব্যাগের ভেতর ভেতর থেকে!---
বেশ বড় হবার পরেও পড়েছি শিশুতোষ লেখা "পিতা ও পুত্র", ভেরা পানোভা এর। পড়তে গিয়ে গল্পের প্রধান চরিত্র সেরিওজার বাবার উপরে কত অভিমান যে হয়েছিল আমার! সেই যে সেরিওজাকে ফেলে ওর বাবা নতুন মা আর সেরিওজার সৎভাইকে নিয়ে মস্কোতে চলে যাচ্ছে--দরজায় দাড়িয়ে সেরিওজার সে কি আকুল কান্না !.
একটা মজার ঘটনা দিয়ে শেষ করছি!--সুকশীনের একটা ছোট গল্প, সেই বরাবরের মত রুশ গ্রাম্য চরিত্র, ধরাযাক তার নাম পাভেল (নামটা ভুলে গেছি আসলে) সে প্রথমবারের মতো প্লেনে উঠেছে।কিছুতেই সীট বেল্ট বাধবেনা পাভেল, ফলে যা হবার হলো, প্লেন টেক অফ করতেই হুড়মুড় সে সীট থেকে ছিটকে পড়ল! মুখ থেকে বাঁধানো দাঁত দুটো ছিটকে পড়ল দূরে--একজন ভদ্রলোক সেগুলো খুঁজে পেয়ে পাভেল দিতেই, ভীষন খেপে গিয়ে যা বলল, তা মনে হলে এখনও হেসে কুটিকুটি হই আমি!,
পাভেল বলেছিলো "হাত দিয়ে ওতা না ধল্লেই কি তলথিলো না! এখন আমি এতাকে গলম দলে ফোতাই কোথায়, কোথায় ফোতাই বলুন?"

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



