somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শব্দ গুচ্ছের দোলা কিংবা ভেসে যাওয়া স্রোতের ঢেউ

১৩ ই মার্চ, ২০১৭ সন্ধ্যা ৬:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



সময়ের কাজ সময়ে না করলে নাকি ফল পাওয়া যায় না। কথাটায় আমিও বিশ্বাস্ করি কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই তা পালন করা হয়ে উঠে না। তেমনি ফেব্রুয়ারি মাসটা ছিলো ব্লগ জুড়ে একের পর এক বই পরিচিতি কিংবা বই রিভিউয়ের পোস্টে ভরা। প্রচন্ড ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও লেখা হয়ে উঠেনি। অলসতা ছিলো যার প্রথম ও প্রধান কারন।
ব্লগে মোটামুটি অ্যাক্টিভ নিক আছে অথচ শায়মা/অপ্সরা আপুকে চেনে না এমন মনে হয় কেউ নেই। এবছর তার কবিতার বই বেরুচ্ছে সেটা মোটামুটি ব্লগ পল্লীর সবার জানা। কবিতার প্রতি আমার আগ্রহটা মূলত জন্মায় ব্লগে পদচারনার সময় থেকেই। কিন্তু ছোটবেলায় জোর করে পড়ানো হতো বলে কবিতার রস আস্বাদন করে পড়ার অভিজ্ঞতা ছিলো না। কিন্তু টুকটাক কবিতা লেখা দিয়েই ভারি হওয়া শুরু হয় আগ্রহের পাল্লার ওজন। শায়মাপুর লেখা কিংবা মন্তব্যের মধ্যেই অপরিচিত মানুষকে আপন করে নেয়ার, কাছে টানার অদ্ভুত একটা গুণ আছে। সেটার আকর্ষন এড়াতে না পেরেই কিনে ফেললাম গাঁটের টাকা খরচ করে ‘ইচ্ছেগুলো উড়িয়ে দিলাম প্রজাপতির পাখায়’। বইটার কবিতা গুলো ৪ ভাগে ভাগ করা- নস্টালজিয়া, প্রেম, অভিমান আর ‘খোকাভাই ও আমি’।

নস্টালজিয়া

অতীত, খুব মধুরময় যন্ত্রনাদায়ক সময়। কিছু হাসি, কিছু কান্না, কিছু অভিমানে ভরা, সাদা-কালো আর রঙ্গিন স্বপ্ন আর আশা-হতাশার ইতিহাসে মোড়ানো। লেখিকা যেন কখনো ছোট্ট একটা মেয়ে; কবিতাকে তার জিজ্ঞাসা-

‘আচ্ছা এবার বলতোরে তুই...... এখনো কি কষ্টে ভুগিস?
কাঁদিস কি তুই চুপি চুপি?
ঠিক তেমনি, একলাপনায় যেমনি পেতিস
দুঃখ গুলো, নিঝুম দুপুর মেঘেরা তোর
ব্যথার সাথী, ডাহুকপাখি গাছের ডালে।’


নস্টালজিয়ার শুরুটা তো এভাবেই শুরু হওয়ার কথা ছিলো।
ছোট্ট মেয়েটা যেন হুট করে ঊনিশে পা দিয়ে ফেললো বইয়ের পাতা উল্টাতেই। পাওয়া না পাওয়ার ভেলায় ভেসে যাওয়া কিংবা বিশেষ কারো স্মৃতি চিহ্ন দেখে চমকে উঠার স্মৃতি- যেন স্বপ্নের মাঝে এক দুঃস্বপ্নকে মনে করা বইয়ের পাতায় পাতায়। শব্দের গাড়িতে চড়ার পরে টের পাইনি কিভাবে কিভাবে যেন দুলতে দুলতে এক পাতা থেকে এক পাতা অতিক্রম করে করে নস্টালজিয়া নামক স্টেশনে পৌঁছে গেছি। নামার সময় হয়ে এসেছে যে! টের পাই প্রিয়জনের হাহাকারের ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে-

‘কেমন আছো আকাশনীলা?
আজ অনেকগুলো দিনের পরে
হঠাত খুব জানতে ইচ্ছে করে।
কেমন আছো তুমি?’


প্রেম

শান্ত-স্নিগ্ধ নদীটা যেন হুট করে উলটো স্রোতে বইতে লাগলো। থমকে গেলাম পাতা উল্টাতে উল্টাতেই। লেখিকা যে শব্দের নদীর স্রোতটাকে উলটে দিলেন মুহূর্তেই। তবে ছন্দের তোড়ে ভেসে যেতে একটুও আপত্তির কারন খুঁজে পেলাম না। প্রেমিকের চোখ দিয়েই যেন এবার কবিতাগুলো শুরু হচ্ছে-শেষ হচ্ছে। যেন একথা অন্য কারো, লেখিকার অস্তিত্বের সাথে বেমানান।

‘তীর্যক চাহনিতে ডুবেছি
কাঁচভাঙ্গা হাসিতে যে ভুলেছি
কলকন্ঠের প্রগল্ভতায়
কোটি বার বার আমি মরেছি’


প্রেমাকর্ষণের সবচাইতে বড় প্রভাবক- অপরের প্রতি যৌনাকাঙ্ক্ষা। সেটাকে অস্বীকার করা মানে ভন্ডামি, সন্ন্যাসীবেশ ভেক ধরা। লেখিকা সে ভুল করেননি। পরের স্তবকেই সে মোহ-আকাঙ্ক্ষাকে পশ্রয় দিয়েছেন সূক্ষ্ম আঁচল পেতে-

‘চিবুকের চুম্বনে চুম্বন
গলদেশে এঁকে দেবো চিহ্ন
বুকের ঐ খাঁজকাটা খাঁজটায়
এ হৃদয় হোক আজ ছিন্ন’


কিংবা-

‘ওষ্ঠ বাড়াও নিষ্ঠুর প্রিয়া
ছিন্নভিন্ন রক্তাক্ত রাগে
ফোটাই আজ রক্ত গোলাপ......
আবেশিত হোক খঞ্জর তনু
শিথিল কবরী আলুথালু কেশ...’


কেবলি মনকে কবিতার বাণে এলোমেলো করে উদাস আবহাওয়া এনে দেয়ার চক্রান্ত ছিলো না মনে হয় লেখিকার। খিক করে হেসে ফেলেছিলাম যখন পড়লাম-

‘কিন্তু এবার পড়ছো ধরা স্বর্ণঘুঘু
তুমিও যেমন পুরান পাপী, আমিও বুনো ওল
ঘুচবে তোমার ছলাকালা, সব অভিনয়
কসম খোদার খাওয়াবো তোরে পাক্কা তেঁতুল ঘোল’


আমার হাসি অনুমান করেই নাকি কে জানে, শেষটা হল হাসি বন্ধের প্রেমমাখানো হুমকি দিয়ে-

‘বিষ শরবৎ গুলিয়ে নেবো
নিজের হাতে গিলিয়ে দেবো
আত্নারামটা দুলিয়ে দেবো
ভূতেরগলি পাঠিয়ে দেবো’


লেখিকার চরিত্র পরিবর্তনের এক্সপেরিমেন্টটা আশা করিনি। আচমকা সারপ্রাইজ পেয়ে যেন বাকিটুকু পড়ার আকর্ষন বেড়ে গেলো।

অভিমান

অভিমানের অংশে কলমকে সম্ভবত স্বাধীনতা উপভোগের সুযোগ দিয়েছিলেন শায়মাপু। অভিমানকে পুঁজি করে হলেও নিজের মুক্ত চিন্তার, হঠাত কুড়িয়ে পাওয়া ভাবনার ফসল কবিতায় রূপান্তরের ঢালাও সুযোগের পূর্ণ ব্যবহার করেছেন। কখনো ছিলো নস্টালজিয়ার ছোঁয়ায় অভিমানের ইঙ্গিত কিংবা কখনো নিরেট অভিমান- প্রেমিক কিংবা প্রেমিকার প্রতি। চাওয়া-পাওয়া কিংবা মনের সংগোপনে কুঠূরি বদ্ধ করে রাখা ইচ্ছের প্রকাশ পেয়েছে সফেদ পাতায়। বাদ যায়নি কারো ত্যাগ স্বীকারের কথা। হোক না সেটা ভাষার যুদ্ধের কিংবা ভালোবাসার যুদ্ধের ত্যাগ। কখনো প্রেমিক কখনো দেশ শিকার হয়েছে তার কেন্দ্রবিন্দুতে।

খোকাভাই ও আমি

স্কুল পালানো, বেণী দুলানো নিরুপমা আর একটু এলোমেলো, বড় বড় চুল দাড়ি আর গভীর চোখের মায়াময় দৃষ্টির খোকাভাই। বইটা কিনে সবার আগে শুরু করেছিলাম এই অংশটাই। কারন কবিতার মধ্যে গল্পের ছোঁয়া আছে এখানেই- জানতাম। শেষ করে মনে হয়েছিলো কিশোরী নিরুপমার স্মৃতিতে বিচরণ করে এলাম মাত্র। যেখানে তার আর খোকাভাইয়ের ভালোবাসার বুনুনি ছিলো কিন্তু পূর্ণতায় ছোঁয়ার অভাবে অশুদ্ধ রয়ে গেছে এই ভালোবাসা সমাজের চোখে। যেখানে নিরুপমার ছেলেমানুষী স্বপ্নরা পায়নি বাস্তবে পরিণত হওয়ার তিল মাত্র সুযোগ, বয়ে বেড়াতে হয়েছে খোকাভাইকে আপন করে নিতে না পারার তীব্র ব্যথা। খোকাভাই আর নিরুপমা- কবিতার সনাতন আদর্শকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়েও যে গল্প লেখা যায়- তার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

বইমেলা থেকে কবিতার বই কেনা হয়নি এটা ছাড়া। পড়ার ইচ্ছে হয় বলে অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ নামিয়ে রেখেছি কবিতার। সেটাতেই চলে যায়। কিন্তু সিদ্ধান্ত ভুল ছিলো না কেনার। পুরোটা ছিল চমৎকার একটা অভিজ্ঞতা। কখনো পড়ার মাঝে মনে হচ্ছিল অক্ষর গুলো কেমন যেন ঝিক! ঝিক!- ঝিক! ঝিক! শব্দ করে চলছে এগিয়ে। এক স্তবক থেকে আরে স্তবকে লাইন পার হয়ে যাচ্ছে শব্দের দোলায় দুলতে দুলতে। কিশোরীর চপলতার সাথে যার মিল খুঁজে পাই কিছুটা। আবার স্নিগ্ধ তরুণীর কোমলতা মনে করিয়ে দিচ্ছিলো ঢেউহীনা নদীর, যার বুকে প্রেম এসে মাঝে মাঝেই তুলে দিচ্ছিল উথাল-পাথাল ঢেউ।

অন্য কবিতার বই হাতে এসেছে আমার এই বছরেই কিন্তু সেটা পড়ার ইচ্ছে করছে না। থাকুক না এই অভিজ্ঞতা আরেকটু টাটকা, আরও কিছু দিন মনের মাঝে।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই মার্চ, ২০১৭ রাত ৮:৩৫
১৮টি মন্তব্য ১৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিএনপি একটি বেঈমান আর গাদ্দারদের দল।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:৫০

‘বিএনপি ৭৫এর যোদ্ধাদের রক্ষা করেনি, ২৪ এর যোদ্ধাদেরও রক্ষা করবে না।’ ...বাকিটুকু পড়ুন

এলপিজি কার্ডে সংকট কমবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:১৬


অনেক হতাশার মধ্যেও মাঝেমধ্যে সরকারের কোনো ভালো উদ্যোগের খবর দেখলে ভালো লাগে। অন্তত মনে হয়, সাধারণ মানুষের কষ্টের জায়গাগুলো নিয়ে সরকার কিছুটা হলেও ভাবতে শুরু করেছে। তেমনই একটি খবর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আত্মহনন ও পক্ষপাতিত্ব

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:২৮


রবীন্দ্রনাথ কি বাংলাদেশের নাগরিক ??!! শুধুমাত্র জাতীয় সংগীতের রচয়িতা এবং বাংলাদেশে কিছু সুশীলদের (ভালো নাপিত) তাকে নিয়ে নানা রকমের কলহ-বিবাদ-বিভক্তি তৈরী ব্যতিত; বাংলাদেশে তার আর অবদান কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

তারা ভারতের এই সফট টুলস রবীন্দ্রনাথকে রক্ষা করবে।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৩


কয়েকদিন আগে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জাতীর পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলা হলো, সেখানে তো গ্রেপ্তার দেখলাম না! সেখানে কি পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবণতির শঙ্কা ছিলো না? পাকিস্তানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

এআই মন্তব্যের পর ব্লগারগণের পোষ্ঠ ভালো বুঝে আসে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২০



চাঁদগাজী/সোনাগাজী বলতেন অনেক ব্লগার গরুর রচনা এবং অনেক ব্লগার গার্বেজ লেখেন। তাঁর এমন মন্তব্যের কারণে তাঁর বিরোধী ব্লগার সংখ্যা বেড়ে যায়। ফলে তিনি বার বার ব্যানের শিকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×