somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রত্যক্ষদর্শির চোখে সেই ভয়াল ২৫শে মার্চ রাতের কথা...

২৬ শে মার্চ, ২০০৯ সকাল ৮:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঢাকা শহর থেকে এখানকার দুরত্ব শুধু নদীর এই পার আর ঐপার। তখনও জিঞ্জিরা নকল প্রসাধনীর জন্য এতটা বিখ্যাত বা কুখ্যাত হয়ে উঠেনি। শহরের এত কাছে থেকেও এ যেন বাংলাদেশের অন্য আট দশটা গ্রামের মতই। সবুজ শ্যামল ছায়ায় ঘেরা, যন্ত্রদানবের কর্কশ চিৎকারহীন শান্ত স্নিগ্ধ সৌম্য একটা পরিবেশ।

সামনে বছর আমার ম্যাট্রিক পরীক্ষা। রাত জেগে পড়ি। এর পর ফজরের নামাজ সেরে কিছু একটা মুখে দিয়ে খানিকক্ষণ ঘুম। রাতে কুপির আলোয় ভারিদিকে একটা ভৌতিক পরিবেশ থাকে। শান্তিতে পড়ার জন্য আমার ঘরটা আলাদা করা। দুরত্ব খুব সামান্যই, কিন্তু ঘুটঘুটে আধারে সেই দুরত্বই অনেক মনে হয়। অবশ্য রাতের জোনাকি কিংবা নিশাচর পাখি আমার এই আধার রাতের সঙ্গি হয়। তবে বাইরের জগতের সাথে একমাত্র যোগাযোগ সবেধন নীলমণি জানালাটা খুলি না। পাছে কৌতুহলে তেনারা উকি দেন।

সেই রাতটি ভেবেছিলাম এমন নিঃশব্দ নিস্তব্ধটায় কাটবে। কিন্তু মাঝ রাতে বহুদুর থেকে এক গাদা চিৎকার ভেসে আসায় বিদ্যাদেবির আরাধনায় খানিকটা ব্যাঘাতই ঘটলো। খানিকটা বিরক্ত হলাম। কিছুদিন আগে বাব গত হয়েছেন। যৌথ পরিবারের ছায়ায় থাকায় সাময়িক স্বস্তি আছে বটে, কিন্তু এতিম এই ছেলেটির পড়াশোনা শেষ করে সংসারের হাল ধরা খুব জরুরি যে। তাছাড়া দ্রুত বড় হতে থাকা বোনটির গতি না করতে পারলে সমাজে ছি ছি পড়ে যাবে।

জীবনের এই প্রথম বুঝি এমন একটা সাহসের কাজ করলাম। হাতে কুপি নিয়ে দরজা খুলে বাইরে এলাম, বেশ নিঃশব্দেই। পাছে ঘরের কেউ জেগে যায়। তাছাড়া রাত বিরেতে ঘুরে বেড়ানো তেনাদের মনযোগ আকর্ষনের কোন ইচ্ছাই আমার নেই। অজস্র চিৎকার ধবনির শব্দটা একটু বেশি মনে হলো। উৎস নদীর ওপার, ঢাকা শহর থেকেই আসছে। আন্দাজ করলাম সেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালইয় আর তার আশা পাশ থেকেই আসছে। আকাশে দেখলাম লাল নীল হলুদ কত রঙ্গিন আলোর খেলা। সেই সাথে বাজি ফুটবার মত শব্দ। নিশ্চই পাকিস্থানের সামরিক জান্তা বঙ্গবন্ধুর সব প্রস্তাব মেনে নিয়েছেন। আর তাই উল্লাসে ফেটে পড়েছে জনতা। সে আনন্দেই তাই আকাশে হাউই উড়িয়ে বাজি ফুটিয়ে রাতের নিঃস্তব্ধতাকে চিরে দেয়া হচ্ছে।

মনটা আনন্দে ভরে গেলো। যাক বাবা, বাচা গেলো। চারিদিকে চাপা উত্তেজনা, ভয়, প্রতিদিনের মিছিল মিটিং, গুরুজনদের ফিসফিসানি, বন্ধুবান্ধবের বদলে যাওয়ার অবসান হলো অবশেষে। তাই আবারো ঘরে ঢুকে বিদ্যাদেবিতে মন লাগালাম। কিন্তু কেন জানি না মনটা বেশ খুত খুত করতে লাগলো।

মসজিদের ইমাম সাহেব নামাজ পড়াতে যান আমার এই ঘরটির পাশ দিয়েই। যাবার সময় সামান্য কাশি দিয়ে যান, উদ্দেশ্য আমাকে নামাজের কথাটা মনে করিয়ে দেয়া। আজও তার কাশি শুনে বই পত্র গুছিয়ে রাখলাম। আকাশ তখন সবে মাত্র ফর্সা হতে শুরু করেছে। আতজবাজির সেই খেলা আর চিৎকার চেচামেচি সব রাত্রির আধারেই ইতি হয়েছে। আমার ঘরে একটা কলসিতে পানি আর বদনা থাকে। ভালো করে হাত মুখ ধুয়ে অজু করে রওয়ানা দিলাম মসজিদের দিকে। কুয়াশাভেজা মেঠো পথ ধরে খানিকটা আগালেই পুকুর। তার ঠিক পাশে রাস্তা থেকে কিছুটা উচু জমির উপর অনেকদিন আগে বানানো মসজিদ। পুকুর ঘাটের আলো আধারে দুজন মানুষের মত মুর্তিকে বসে থাকতে দেখে পা দুটো নিজ অজান্তেই থেমে গেলো। আতংকিত আমি কতক্ষন ও রকম ছিলাম জানি না, তবে নামাজ পড়তে আসা আরো কয়েকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে সম্বিত ফিরে পেলাম। সবাই ওই মুর্তি দুটির দিকেই তাকিয়ে। নিজেদের ভেতর গুঞ্জন শুরু হলো। এর মধ্যে দেখলাম সাহসি একজন এগিয়ে গেলো ওদের দিকে। পেছনে পেছনে আমরা কয়েকজন।আরেকটু কাছাকাছি যেতেই দেখি খাকি হাফ প্যান্ট আর সাদা গেঞ্জি পড়া চুল ছোট দুজন উদ্ভ্রান্ত মানুষ। দুজনেরই ভেজা শরির। একজনের শরিরে লাল কিছু একটা। সেই সাহসি মানুষটাই প্রথমে কথা বললো।

" কে আপনারা? এখানে কি চান?"

সেই মানুষ দুটোর একজন উত্তর দিলো, " আপনারা কিছু জানেন না? শোনেননি কিছু?"

অজানা আশংকায় আমার বুকটা ছ্যাত করে উঠলো, কি শুনবো কি জানবো? সেখানে উপস্থিত মুসল্লিরা একে অন্যের দিকে তাকালো। কেউ কিছু শোনেনি। আমাদের নিরবতায় সেই মানুষটি নিজের মনেই বল উঠলো "ঢাকা শহরের সবাই শেষ। সব শেষ করে দিয়েছে।"

তার কথা গুলি যেন অনেক বেদনায় ডুকরে কাঁদার মত মনে হলো। ততক্ষনে আরো কিছু মানুষ আশে পাশে জড়ো হল। সবাই জানতে চাইলো কি ঘটেছে? সেই মানূষ দুটো বললেন তারা সদরঘাটের ফায়ার সার্ভিসের দমকল কর্মি। গতরাতে পিলখানা রাজাবাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মডদা কথা পুরো ঢাকা শহরেই পাকিস্থানি আর্মি যাকে যেভাবে পেয়েছে গুলি করে হত্যা করেছে। ফায়ার স্টেশনটিতেও ওরা হামলা করে ঘুমন্ত কর্মিদের নির্বিচারে হত্যা করেছে। ওরা দুজন কোন মতে নদী সাতরে জীবন বাচিয়ে এ পারে এসেছে। তবে একজন সঙ্গির পায়ে গুলি লেগেছে।

" মিলিটারি এ পারেও আসতে পারে। জীবন বাচাতে চাইলে যত জলদি সম্ভব পালান", একথা বলে আহত সঙ্গিকে নিয়ে অজানা গন্তব্যে পাড়ি দিলেন ওই দুজন।

সবাই স্বম্ভিত। সবাই যেন মুক বধির। অজানা আশংকায় সবাইকেই যেন ঘিরে রেখেছে। কি হবে এখন? কি করবো আমি? কোথায় যাবো? বড় বোনটির শশুর বাড়ি যে পুরানো ঢাকায়। ডুকরে কাদতে ইচ্ছা হলো, দৌড়ে ছুটে গেলাম বাড়িতে। মাগো ও মা বলে চিৎকার করে বাড়িশুদ্ধ লোককে সেই সাত সকালে ঊঠিয়ে দিলাম। সবার দৃস্টি আমার দিকে। ডুকরে কেদে কোনমতে গতকালের সেই ভয়াল রাতের কথা সবাইকেই জানালাম। চাচা চাচি, ছোট চাচা, মা, ছোট ছোট ভাইবোন সবার চেহারায় তখন একটিই প্রতিচ্ছবি। সেটা মৃত্যুভয়ের, আতংকের, অজানা গন্তব্যের।

(জিঞ্জিরাবাসি একজন সাধারণ মানুষের মুখে শোনা এই ঘটনা আপনাদের সাথে ভাগ করে নিলাম। উৎসর্গ করলাম, সেদিনের ঘটনায় নিহত নাম না জানা অসংখ্য শহিদের প্রতি)।
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পূর্বপুরুষের অপরাধের দায় বর্তমান জেনারেশনকে দেওয়া অন্যায়

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা জুন, ২০২৬ রাত ১০:৪৩

"দোস্ত, ওরা আমাকে এক পাকিস্তানীর সাথে বন্ধুত্ব করতে বলছে যে কিনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উলাটা-পাল্টা কথা বলেছে। আমি সেই বক্তব্যের প্রতিবাদ করে রুম থেকে বের হয়ে এসেছি।" রাতেরবেলা দেখা হলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ ও আত্মহত্যা (তথ্য এআই দ্বারা যাচাইকৃত)

লিখেছেন সাহাদাত উদরাজী, ০৩ রা জুন, ২০২৬ রাত ১২:১৯

গত ১ বছরে বাংলাদেশে আত্মহত্যার সংখ্যা প্রায় ১৫,০০০ জনের মতো। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৪০–৪১ জন মানুষ আত্মহত্যা করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় সামান্য বেশি।

বাংলাদেশে আত্মহত্যার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান (২০২৫–২০২৬):
**মোট আত্মহত্যা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভবিষ্যত স্বপ্ন।

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৩ রা জুন, ২০২৬ রাত ১২:৪৭

পাঁচ বছর আগে এই গানটা লিখেছিলাম। আজ গানে 'পরিবর্তন' করলাম।
ঝগড়া করতে চাওয়া সব মানুষদের উৎসর্গ করছি। ;)



ভবিষ্যত সম্পূর্ণ একটা স্বপ্ন
যেখানে তুমি আমি বাধাহীন
আজকের দিনটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবনে কিছু করা বলতে আসলে "প্রচুরস" টাকা কামানো বলে!

লিখেছেন ঋণাত্মক শূণ্য, ০৩ রা জুন, ২০২৬ ভোর ৫:৫৯

স্কুলে যখন ছিলাম, তখন "প্রচুরস" শব্দটা আমরাই তৈরী করি। প্রচুর দিয়েও যখন যথেষ্ট বোঝানো যায় না, তখন "প্রচুরস" ব্যবহার করা হয়, প্রচুরের প্লুরাল আর কি।



আমার আব্বার বইয়ের দোকান ছিলো।... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ পতনের অপেক্ষায়...

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ০৩ রা জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৪০


(ছবিটার পুওর কোয়ালিটির জন্য দুঃখিত। নিজের তোলা এর চেয়ে ভালো কোন ছবি পেলে পরে এটা রিপ্লেস করে দিব)

আমরা এখন...
পাকাফল হয়ে হয়ে ঝুলে আছি,
ভূমিপানে নতমুখে,
পতনের অপেক্ষায়....... ...বাকিটুকু পড়ুন

×