আমরা প্রায়ই স্বর্গ-নরক কিংবা বেহেস্ত-দোযখ নিয়ে কথা বলি। বিশ্বাস করি মৃত্যুর পর এমন একটা স্থান তৈরি হবে যেখানে স্বর্গ এবং নরক বলে দুটি স্থান থাকবে। পৃথিবীতে যারা ভালো কাজ করবে তারা স্বর্গে যাবে আর যারা খারাপ কাজ করবে তারা নরকে যাবে। পৃথিবীতে ভালো-খারাপ কাজ করার মানদ- কী! ধর্ম, অনেকগুলো ধর্ম আছে, প্রত্যেকের আছে নিজ নিজ মানদ-। সেই মানদ- অনুযায়ী একটি ধর্মের কল্পিত স্বর্গ-নরকে স্থান হবে সেই ধর্মের অনুসারীদের। তাহলে অন্যদের?
যদি ধরে নিই ইসলামই সেরা ধর্ম তাহলে বাকিগুলোর অবস্থা কী? সেরা না হওয়া মানে কিন্তু অধর্ম হওয়া না। তাহলে অন্যদের সঙ্গে ইসলামের বিরোধ কোথায়? কেন ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা খ্রিষ্ঠান, হিন্দু, বৌদ্ধদের সহজভাবে মেনে নিতে পারে না? একই কথা খ্রিষ্ঠান ও হিন্দুদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। বরং ধর্মের মর্ধে বৌদ্ধরাই প্রকৃত শান্তিবাদী। আমি ধর্ম বিশ্বাসী নই। আমাকে ধর্মে বিশ্বাসী হিসেবে কেউ আশা করতেই পারেন। কিন্তু তিনি যদি আমাকে ধার্মিক হিসেবে দেখতে চান তাহলে তাকে আমার একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। আর ভালো কথা আমি না দেখে বিশ্বাসের পক্ষে নই। আমার প্রশ্নটি খুব সহজ-সরল, বাচ্চাদের মতো, এমনকি অনেকের কাছে প্রশ্নটি অনেক পুরোনোও মনে হতে পারে! একজন সৃষ্টিকর্তায় যদি সবকিছুর সৃষ্টি করেন তবে তার সৃষ্টি কোত্থেকে? সবকিছুর সৃষ্টির পিছনে কী একজন স্রষ্টার প্রয়োজন? যদি তা-ই হয় তবে, সমীকরণ বলে আমরা যাকে ¯্রষ্টা বলার চেষ্টা করি তিনিও কারো না কারো সৃষ্টি। তার মানে তিনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নন। তার চেয়েও আরো বড় ক্ষমতার অধিকারী কেউ আছেন। আর তাঁর সৃষ্টিকে যদি তিনি ভুল কাজের শাস্তি ও ভালো কাজের পুরষ্কার দিবেন তাহলে এই একই ব্যবস্থা নিশ্চয় তার জন্য রয়েছে! তারমানে কি এটাই প্রমাণিত হয় না, সৃষ্টির রহস্য ধর্ম নামক গোলক ধাঁধাঁ দিয়েও সমাধান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না? বিজ্ঞানও সৃষ্টির এই জায়গায় এসে এখনো নিশ্চিতকরে কিছু বলতে পারছে না। তবে আমি বিজ্ঞান নিয়ে আশাবাদী, কারণ তারাও অন্তত প্রমাণ ব্যাতিত কোন কিছু আমাদের বিশ্বাস করতে বলছে না। আর তারা এখনো সন্তুষ্ট না। এটাই আসল কথা। ধার্মিকরা সন্তুষ্ট। ওরা আর কিছু চায় না। ধার্মিকেরা এতটাই অন্ধবিশ্বাসী যে তারা এখনো মনে করে বিজ্ঞান আজ যা করছে, ভবিষ্যতে যা করবে সবই তাদের পবিত্র(!) গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে। এবং তারা একইসঙ্গে এতটাই কুঁড়ে (যা হতে তাদেরকে তাদের ধর্মই বার বার নিষেধ করেছে, সতর্ক করেছে) যে ধর্মগ্রন্থ ঘেঁটে সেই মূল্যবাণ আবিষ্কারগুলো বের করতে পারে না। তাকিয়ে থাকে বিজ্ঞানিদের পথ চেয়ে আর ঢোল নিয়ে। যেই একটা কিছু নতুন আসে ঢোল পিঠিয়ে ধর্মগ্রন্থের দাবী তুলে তারা!!
এবার মূল প্রসঙ্গ। আমার কাছে স্বর্গ ও নরক সম্পর্কে অন্যরকম একটা ধারণা আছে, সম্পূর্ণ আমার নিজস্ব ধারণা। যে কেউ সেটার প্রতিবাদ, পাল্টা ধারণা দিতে পারেন, আমার কোন সমস্যা নেই। পৃথিবীতে প্রাণের শুরুতে পৃথিবী ছিল অনেক সুন্দর। সুন্দর অন্য এক অসাধারণ অর্থে। তখন পৃথিবী নিজেই নিজের গর্ভে নানারকম সুন্দর ফুল-ফলসমৃদ্ধ ছিল। ভরপুর ছিল পৃথিবী। বিভিন্ন ধর্মের স্বর্গের বর্ণনা থেকে এইরকম একটি ছবির ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যখন কিনা চাহিবা মাত্র স্বর্গ থেকে ফল-মূল এসে মুখে পুড়ে যাবে। হুরপরির ব্যাপারটাও আদিমে ওইরকমই ছিল, জৈবিক আচরণগুলো তখন কোন নিয়ম শৃংঙ্খলায় আবদ্ধ ছিল না, ফলে যার যখন যাকে পছন্দ হতো তার সঙ্গে দৈহিক মিলন সম্ভব ছিল। বিভিন্ন ধর্মের বর্ণনায় এই ব্যাপারটাও একইরকম। কিন্তু ছোট্ট একটি পার্থক্য আছে, ধর্মেও ব্যাপারটা কিছুটা পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিকোন থেকে লেখা, আদতে অতীতে ব্যাপারটা ছিল সাম্য। এছাড়া বিভিন্ন ধর্মে নির্দিষ্ট করে দেওয়া সংখ্যাটা তখন ছিল না। কিন্তু তখন ছিল নারী-পুরুষের ছিল অবাধ মেলামেশা। গাছে গাছে ভর্তি ছিল ফুল-মূলে। ফলে মানুষ ক্ষিধা লাগার ব্যাপারটাও টের পেত না। এটা গোষ্ঠিগত বসবাসের পরের কথা। আদতে তখন থেকেই মানুষের বিভিন্ন গুহার দেয়ালে আঁকা-আঁকি করে রাখার বিষয়টাও শুরু হয়। এছাড়া তখন প্রাণীর ভয় ছিল। ধর্মগুলো স্বর্গ থেকে ওই জন্তু-জানোয়ার, সাপ-খোপের বিষয়টা বাদ দিয়ে নিয়ে গেছে নরকে। ঐ সময়কার নান্দনিক বিষয়গুলোকে আনা হয়েছে স্বর্গে। এছাড়া স্বর্গে নতুন আর কোন কিছু নেই। এবার আমরা সামনের দিকে এগোই। আমরা এখন মারণাস্ত্র বানাচ্ছি? কার জন্য? অতিকায় ভয়ঙ্কর ডায়নোসরের ভয়ে? না, আমরা অস্ত্র বানাচ্ছি মানবতার বিরুদ্ধে। শুরু হয়েছিল আদিমকালের বল্লম দিয়ে। প্রথমে ঐসব পাথুরে অস্ত্র ব্যবহৃত হতো ভয়ঙ্কর প্রাণী শিকারের জন্য। পরে কোন একদিন মানুষ শিখলো গোষ্ঠি রক্ষায় অন্য গোষ্ঠির বিরুদ্ধে। সেই রক্তক্ষয়ী সংঘাত এখনো শেষ হয়নি। বেড়েছে। আজকের সভ্য জগতের অনেকে আদিম মানুষের ঐ শিকারকে বর্বর বলে গালি দেয়। কিন্তু আমরা যত সভ্য হচ্ছি তত বেশি অস্ত্র তৈরি করছি মানুষ হত্যার জন্য। (আমাকে এছাড়া অস্ত্রের একটি বিকল্প ব্যবহার দেখালে খুশি হবো।) বিভিন্ন চ্যানেলে সেইসব অস্ত্র কতটা লক্ষ্যভেদী, কতটা ভয়াবহ তার নির্লজ্জ প্রচরণা হয়। ভবিষ্যতে এগুলো আরো হবে। ধর্ম ও ক্ষমতাধর কিছু হিংস্র মানুষের আধিপত্য বিস্তারের লোভ একসময় এই মানুষ হত্যা ব্যাপারটাকে নিয়ে আসে স্বাভাবিক পর্যায়ে। এছাড়া আসুন পরিবেশগত দিকে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে, কারণ অনিয়ন্ত্রিত জীবাস্ম জ্বালানি। আসুন এভাবে এগিয়ে আমরা আরো অনেক অনেক সামনের দিনে তাকায়। কি দেখবো? পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়তে বাড়তে একসময় কিরকম হতে পারে? ধর্মগ্রন্থের বর্ণনার সেই নরকের উত্তাপের কাছাকাছি? ধর্মগ্রন্থগুলো রচনাকালে তাপমাপার কোন যন্ত্র ছিল না। ফলে অতিরিক্ত তাপমাত্রা বুঝানোর জন্য তারা বলেছেন সুর্য মাথার উপর চলে আসবে। গরমে সিদ্ধ হয়ে মারা যাবে মানুষ। বিজ্ঞানীদের হিসেব মতে সুর্যের ভিতরকার শক্তিও একদিন শেষ হয়ে যাবে। আমরা সুর্যের শেষদিনের আগের দিনগুলো পর্যন্ত ভাবি। সামান্য খাদ্যের জন্য, ভোগের জন্য মানুষ মানুষকে হত্যা করবে। (যার কিছু লক্ষণ এখনই আমরা পৃথিবীর অনেক জায়গায় শুরু হতে দেখেছি।) সুতরাং পুরো ব্যাপারটা হচ্ছে, নরকের দিনগুলো সামনে অপেক্ষা করছে।
আসলে স্বর্গ নরকের জন্য আমাদের আবার জন্মাতে হবে না। পৃথিবীর শুরুতে পৃথিবীতে একটি স্বর্গ ছিল আর পৃথিবীতে মানব সভ্যতার শেষদিকে পৃথিবী যেটাতে পরিণত হবে (মানুষ যেটাতে নিয়ে যাবে) সেটাই হচ্ছে নরক। এর বাইরে স্বর্গ-নরকের আলাদা কোন পূর্ন:জন্ম হবে না, মানুষেরও না। শুধু শুধু পরোকালের চিন্তায় পৃথিবীতে ভালো কিছু করে না যাওয়ার চেষ্টা করাটা হবে মস্তবড় বোকামী। আর অবশ্যই আমরা চাইলে আবার হয়তো পৃথিবীকে ফিরিয়ে নেয়া যেত সেই স্বর্গীয় শুরুতে। কিন্তু সেটা সম্ভব না। পৃথিবীর কিছুলোক সেটা কখনো হতে দেবে না। ধর্মগুলো ওদেরকে আখ্যা দিয়েছে শয়তান হিসেবে। কারণ সেই শয়তানগুলোও জেনে গেছে আজকের পৃথিবী থেকে যতটা সম্ভব স্বর্গীয় সুখ ভোগ করে নেয়া যায় সেটাই বুদ্ধিমানের কাজ। ফলে তারা করছে নিজে নিজে। যেটা হয়তো সম্ভব ছিল পুরো মানবজাতি একত্রে মিলেমিশে। যেহেতু সেটা সম্ভব নয়, সেহেতু আমরা নিশ্চিতভাবে এগিয়ে যাচ্ছি নরকের দিকে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


