প্রথম আলো’র নতুন ক্যাম্পেইনে উঠে এসেছে উটপাখি। সবার আগে এই উটপাখি নিয়ে কিছু কথা। উটপাখি পাখি হলেও উড়তে পারে না। বর্তমান পৃথিবীতে জীবিত পাখি প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে উটপাখি সবচেয়ে বৃহৎ এবং পাখি প্রজাতির মধ্যে সবচেয়ে বড় ডিম পাড়ে (এর আগে শুধুমাত্র মাদাগাসকারের অ্যালিফ্যান্ট বার্ড এবং নিউজিল্যান্ড এর জায়ান্ট মোয়ার এর ডিমই সবচেয়ে বড় ছিল।) উটপাখি মূলত আফ্রিকার শুষ্ক অঞ্চলে পাওয়া গেলেও পৃথিবীর অনেকদেশেই উটপাখির খামার আছে। পালক, মাংষ, ডিম ও চামড়ার জন্যই মূলত উটপাখি পালা হয়। চামড়া দিয়ে বিভিন্নরকম পণ্য তৈরি হয়। একটা ডিম দিয়ে একটা চার-পাঁচজনের পরিবারের একবেলার আহার হয়ে যায়। একেকটা উটপাখির গড় ওজন সাধারণত ৬৩ কেজি থেকে ১৩০ন কেজি পর্যন্ত হয়। পুরুষদের ওজন আরো বেশি, ১৫৫ কেজির মতো। তবে পাখি হিসেবে উটপাখি একটু ভীতু প্রকৃতির। ভয় পেলে এরা সাধারণ একটা বিচিত্রধরণের আচরণ করে। মাথাটি ঘাষ, বালি কিংবা ঝোপের ভিতর লুকিয়ে ফেলে। মাঝে মাঝে দৌড়ে পালিয়ে যায়। বেশ ভালো গতিতে দৌড়াতে পারে উটপাখি। ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার বেগে দৌড়াতে পারে এরা। খুব তীক্ষè এদের দৃষ্টিশক্তি ও ঘ্রাণশক্তি। বেশ অনেকদূর থেকেই এরা শত্রুর অবস্থান বুঝতে পারে। পায়ে প্রচ- শক্তি এদের। মাঝে মাঝে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে শক্তিশালি পা দিয়ে আক্রমণও করে। তবে উটপাখি পৃথিবীজুড়ে বিখ্যাত তার ভয়ে বালির নিচে মাথা লুকিয়ে ফেলার এই বিচিত্র আচরণটির জন্য। অনেক কার্টুন, অ্যানিমেশন মুভি, ফানি ম্যাটারে উটপাখির এই বিচিত্র আচরণটি নিয়ে প্রচুর মজা করা হয়, হাসাহাসি হয়।
এবার আসি প্রথম আলোর নতুন বিজ্ঞাপন নিয়ে। গতকাল বিজ্ঞাপনটি প্রথমবার দেখে একটু ধাক্কা লাগলো। মাথায় অনেকগুলো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। মানুষের জীবনের সাথে উটপাখিকে মেলানোটি ঠিক হয়েছে? তার উপর উটপাখির সাথে আমাদের দেশের মানুষ তেমনভাবে পরিচিত না! ছোটবেলা থেকে সাধারণ জ্ঞান হিসেবে যেটা জেনে এসেছে সেটা হলো উটপাখি পাখি হলেও উড়তে পারেনা! যেই প্রাণীটির সাথে আমাদে কোনদিন দেখা হয়নি, যে প্রাণীটি সম্পর্কে আমরা আসলে তেমন কিছু জানিনা, সেই প্রাণীর সাথে তুলনা করলে মানুষ কি তুলনা করা হলো সেটা কি বুঝতে পারবে? এইসব ইত্যাদি ইত্যাদি। পরে বিষয়টা নিয়ে আরো চিন্তা করলাম। নিশ্চয় এই প্রশ্নগুলোরও উত্তর আছে। শুরুতে আমি যে ধাক্কাটা খেয়েছি আমার মনে হয় অনেক দর্শকই এটার মুখোমুখি হবে। আর যারা উটপাখির এই বিচিত্র আচরণটি সম্পর্কে জানেই না তাদের কাছে অ্যাবসার্ড লাগতে পারে। তবে হয়তো কি জানি এই ধাক্কাটাও এই ক্যাম্পেইনের একটা বড় সাফল্য হয়ে যাবে। ধাক্কাটার কারণেই মানুষের মাথায় ঢুকে যাবে জিনিসটা।
তবে নতুন এই ক্যাম্পেইনের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশটা হচ্ছে মূল ভাবনাটা। আমাদের যে জাতীয় সমস্যাটা নিয়ে কথা বলা হয়েছে সেটা। এটা আমাদের নিত্যদিনের অংশ। আমাদের চোখের সামনেই এমন অনেককিছু ঘটছে প্রতিনিয়তই। কিন্তু ব্যাপারটায় আমাদের গা সয়ে গেছে। একটা সময় ছিল যখন মানুষ পত্রিকায় একটা নিউজ হওয়াকে অনেক ভয় পেতো। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে পুলিশ, আমলা, মন্ত্রী, নেতা সবাই। কিন্তু বর্তমানে পত্রিকার খবরকে কেউ আর তেমন পাত্তা দেয় না। ব্যাপারটা হয়ে গেছে নিউজ করলে করুক, কী আর হবে! কিছু কি হয়েছে কখনো! এটা এখন এদেশে জনসংখ্যার পর দ্বিতীয় জাতীয় সমস্যা। একটা সময়ে একটা মানুষ খুন হলে মানুষের মাঝে শোক ছড়িয়ে পড়তো। এখন পাশেরজন খুন হলেও আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই ভুলে যাই। জাতিগতভাবে এই পরিবর্তনটুকু শুধু খারাপই নয় রীতিমত আতংকের। জনসংখ্যা যদি এদেশের প্রধান সমস্যা হয় তাহলে এই মুখ-বুজে সব সহ্য করার সমস্যাটি বর্তমানে আমাদের দেশের জন্য দ্বিতীয় জাতীয় সমস্যা। এটা দিন দিন আরো প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে প্রতিবাদী হওয়ার এই ডাকটি শুধু সময়োপযোগিই নয় এককথায় অসাধারণ। প্রথম আলোর মূল স্লোগান- যেখানে সমাজ তথা রাষ্ট্র এবং ব্যাক্তি পর্যায় থেকে শুরু সকল অনিয়মের বিরুদ্ধে বদলে যাওয়ার জায়গাটি ঠিক রেখে প্রতিবছর সমাজ ও রাষ্ট্রের একেকটি সমস্যাকে চিহ্নিত করে সারাবছরজুড়ে তা নিয়ে গণসচেতনা বৃদ্ধির কাজ করে। এর ফলাফল হয়তো এইমুহূর্তে কাউন্ট করা সম্ভব হবে না। কিন্তু এর ফলাফলটা দীর্ঘমেয়াদী। মানুষ বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা আগের চেয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্তত তার একটা লক্ষণ ফুটে উঠছে। এজন্য অবশ্য বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়া, ব্লগের অবদান রয়েছে। খারাপকে খারাপ বলার সাহস তৈরি হচ্ছে। এটা শুধু প্রথম আলোর প্রচারণার কারণে হচ্ছে তা নয়। এটা আসলে সময়ের দাবী। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে যেমন আর পিছনে যাওয়া যায় না। তেমনি মানুষ এখন পরিবর্তন দরকার এটা বুঝতে শুরু করেছে। এখানে প্রথম আলো শুধু প্রভাবকের ভূমিকাটা পালন করছে নিষ্ঠা আর দায়িত্বের সাথে।
যাইহোক আবার প্রথম আলোর নতুন বছরের বিজ্ঞাপনে ফিরে আসি। এর আগে প্রথম আলো বলেছে আপনি শুরু করুন, অন্যরা ঠিকই বদলাবে। মাইক্রো থেকে শুরু করার আহ্বান। কোন দেশের প্রতিটি মানুষ যদি সৎ ও ভালো হয় এবং দেশপ্রেমিক হয় সে দেশের আর ভাবনা কি? এরপর প্রথম আলো বলল, দেশকে মায়ের মতো ভালোবাসার কথা। মায়ের প্রতি সব মানুষেরই একটা আলাদা জায়গা থাকে। সেই ভালোবাসার জায়গাটা আমাদের দেশের জন্য তৈরি হলেই দেশের পরিবর্তন বাধ্যতামূলক। এবার প্রথম আলো বলছে উটপাখির মতো জীবন নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মানুষের মতো বাঁচতে। মানুষের মতো বাঁচা মানে-মানুষের মতোই বাঁচা, মাথা উঁচু করে বাঁচা, অন্যায়ের সাথে আপোষ না করে বাঁচা। এইবার প্রথম আলো একটু প্রতিবাদি জায়গায় গিয়েছে। এটা আসলে প্রথম আলো যায়নি। এই প্রতিবাদী ব্যাপারটা আমাদের প্রতিটি মানুষের ভিতরে ভিতরেই আছে। মুখ বুঁজে অনেক সহ্য করেছে এদেশের মানুষ। তাদের সহ্যের সীমা ভেঙ্গে যাচ্ছে। প্রথম আলো শুধু দেশের মানুষকে চিনিয়ে দিচ্ছে জায়গাটা। এইবারের ক্যাম্পেইনের মূল বিষয়টা শুধু সময়োপযোগী নয়, অনেক বেশি ইনসাইটফুল। আমরা প্রতিটি মানুষই আমাদের এই উটপাখির মতো অদ্ভুত আচরণটির সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু নিজেই যেন নিজেকে চিনতে ভুলে যাই তখন। কিন্তু আমাদের এই আচরণটি দুর্বলচিত্তের একটি নিম্নশ্রেণীর প্রাণীর আচরণের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। বিপদে আমরা উটপাখির মতো না দেখার ভান করি। আমাদের মাঝে একটা প্রশ্ন অনেক বড় হয়ে দাঁড়ায়? আমরা কি এখনো মানুষ হিসেবে বেঁচে আছি না উটপাখি হয়ে যাচ্ছি। ফ্রান্জ কাফকার সেই বিখ্যাত মেটামরফোসিস গল্পের মতোই আমরা যেন কবে কখন দেশের প্রতিটি মানুষই উটপাখি হয়ে গেছি। চোখের সামনে কত অন্যায়-অবিচার ঘটে চলেছে কিন্তু আমরা আমাদের মাথাটা বালির ভিতর লুকিয়ে ভাবছি কোন কিছুই হচ্ছে না। অথচ এটা মানুষ হিসেবে কাম্য নয়। এই অদ্ভুত আচরণটি উটপাখিকে সাজে, মানুষকে নয়। সেইদিক দিয়ে প্রথম আলোর বর্তমান ক্যাম্পেইনের মূল ভাবনাটি এককথায় অসাধারণ। আমাদের আসলে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এবার প্রতিবাদের পালা।
গতকাল চীন-মৈত্রি সম্মেলন কেন্দ্রে নতুন ক্যাম্পেইনের উদ্ভোধনী অনুষ্ঠানে পুরো ঘটনাটির একটা ছোট্ট মঞ্চনাট্যাংশের মাধ্যমে তুলে ধরা হয় দর্শকের সামনে। আমার সৌভাগ্য যে আমি এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পেরে এই নাট্যাংকশটুকু উপভোগ করেছি। কারণ ঐ অংশটুকু লাইট এবং সাউন্ড এর মাধ্যমে এতটাই জলজ্যান্ত হয়ে উঠেছিল যে সত্যিই অসাধারণ। ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হলের সামনে একটি ইভটিজিং এবং একটি ছিনতাই ও হত্যার ঘটনাটি যে মূর্ত হয়ে উঠেছে অভিনয় শিল্পীদের অভিনয় দক্ষতায় তা লোম দাড়িয়ে যাওয়ার মতো! এরপর বড় স্ক্রিনে দেখানো হলো এই ক্যাম্পেইনের জন্য তৈরি টিভিসিটা।
এইবার টিভিসি নিয়ে কিছু কথা। টিভিসিটা দর্শক মনে রাখবে অনেকদিন। আইডিয়ার দিক দিয়ে আইডিয়াটা ফ্রেশ। এর পিছনের কারণ হচ্ছে ক্যাম্পেইনের মূল ভাবনা অসম্ভব বাস্তব এবং ইনসাইটফুল। যে কারণে সমাজের যে যেকোন স্তরের মানুষই নিজেকে এর সঙ্গে মেলাতে পারবে প্রথম দেখাতেই। প্রথমে একটু ধাক্কা লাগবে উটপাখির বিষয়টিতে। কিন্তু সেটা আরো অন্যান্য মিডিয়ার মাধ্যমে আসা করি অল্পদিনেই দূর হয়ে যাবে। অর্থাৎ বিপদ দেখলে উটপাখি যে বালির মধ্যে মাথা লুকিয়ে ফেলে এই জিনিসটি মানুষকে একটু শেখানোর দরকার হবে। কিন্তু এই উটপাখির জিনিসটির জন্যেই আবার ক্যাম্পেইনটা মানুষের মাথায় ঢুকে যাবে। কিন্তু টিভিসির মেসেজটা যতটা সিরিয়াস, টিভিসিতে সেটা অতটা সিরিয়াসলি ফুটে উঠেনি। বরং কখনো কখনো মনে হয়েছে কিছুটা কমিকেল হয়ে গেছে। জিঙ্গেলটার মধ্যেও সেই সিরিয়াসনেস নেই। টিভিসিতে একটা গল্প শুরু হয়ে হঠাৎ যেন খেই হারিয়ে ফেলে। টিভিসির ল্যান্ডিংটা খুবই খাপছাড়া। অনেককথা বলতে গিয়ে যেন হঠাৎ কি বলতে চাচ্ছে সেটাই ভুলে গেছে। এরপর ভয়েসওভার দিয়ে জোর করে মিলিয়ে দেওয়া। কারণ টিভিসিটা মিউট করে দিয়ে দেখলে বক্তব্যটা ক্লিয়ার হয় না। এরপর প্রথম আলোতে যে বিজ্ঞাপনটা ছাপা হয়েছে তাতে দুইজন সন্ত্রাসী মিলে একজন কোট-টাই পরিহিত লোককে আক্রমণ করে। ছিনতাই! কিন্তু এখানে দ্বিতীয় যে সন্ত্রাসীটির হাতে একটা চাপাতি রয়েছে তার চাপাতির লক্ষ্যটা কিন্তু তার সঙ্গির দিকেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা চাপাতি হাতে লোকটাই যেন আরেকটা গল্পের সুপারইমপোজ। জোর করে এই গল্পে ঢোকানো হয়েছে। আরডিসিগুলো বরং একটু এগিয়ে। প্রথম আলোর এর আগের তিনবারের ক্যাম্পেইনের সাথে তুলনা করলে এইবারের ক্যাম্পেইনের মূল ভাবনাটা খুবই ভালো ছিল কিন্তু এক্সিকিউশানের মান আগেরবারগুলোর চেয়ে অনেকবেশি খারাপ হয়েছে। দেখে মনে হয় বেশ তাড়াহুড়ো করে করা।
সবকিছু মিলিয়ে ক্যাম্পেইনের সাকসেস যেহেতু শুধুমাত্র টিভিসি কিংবা প্রেস এর উপর নির্ভর করবে না, এর সাথে যথার্থ অ্যাকটিভেশ, প্রোগ্রাম, কনসার্ট ইত্যাদির সাপোর্ট থাকবে সেক্ষেত্রে ক্যাম্পেইন সফল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ধন্যবাদ প্রথম আলো’কে জাতির চোখ খুলে দেওয়ার মতো, জাতিকে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর মতো, অন্যায়ে প্রতিবাদ করতে বলার মতো এই সাহসি উদ্যোগ নেয়ার জন্য। আবারও প্রমানিত হোক প্রথম আলোর সবচেয়ে পুরোনো স্লোগান- ‘চোখ খুললেই প্রথম আলো, চোখ খুলে দেয় প্রথম আলো।’ কেটে যাক আমাদের সকলের দেখেও না দেখার এই অন্ধত্ব- এই প্রত্যাশা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


