অনেকেই বলাবলি করছেন, যেহেতু দল তৈকে বহিষ্কার হয়েছেন তাতে স্বাভাবিকভাবেই সংসদ সদস্যপদ হারাবেন নারী কেলেঙ্কারির সহতি জড়িত সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম।
কিন্তু বিষয়টি আসলেই কী? সেটা জানার জন্য আমাদেরকে বাংলাদেশের সংবিধান, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কাযপ্রণালী-বিধি এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ একসাথে পড়তে হবে।
প্রথমেই পড়া যাক বাংলাদেশের সংবিধানে সংসদ সদসস্যের আসন শূন্য হওয়ার বিষয়ে কী বলেছেঃ
সদস্যদের আসন শূন্য হওয়া, অনুচ্ছেদ ৬৭(১):
৬৭। (১) কোন সংসদ-সদস্যের আসন শূন্য হইবে, যদি
(ক) তাঁহার নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ হইতে নব্বই দিনের মধ্যে তিনি তৃতীয় তফসিলে নির্ধারিত শপথগ্রহণ বা ঘোষণা করিতে ও শপথপত্রে বা ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরদান করিতে অসমর্থ হন:তবে শর্ত থাকে যে, অনুরূপ মেয়াদ অতিবাহিত হইবার পূর্বে স্পীকার যথার্থ কারণে তাহা বর্ধিত করিতে পারিবেন;
(খ) সংসদের অনুমতি না লইয়া তিনি একাদিক্রমে নব্বই বৈঠক-দিবস অনুপস্থিত থাকেন;
(গ) সংসদ ভাঙ্গিয়া যায়;
(ঘ) তিনি এই সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের (২) দফার অধীন অযোগ্য হইয়া যান; অথবা
(ঙ) এই সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বর্ণিত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়।
গাজী নজরুল ইসলাম সাহেবের বিষয়ে (ঘ) এবং (ঙ) আসতে পারে কিনা তা দেখা যাকঃ
সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের (২) এ বলা হয়েছেঃ
সংসদে নির্বাচিত হইবার যোগ্যতা ও অযোগ্যতা: ৬৬(২)
(২) কোন ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ-সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি
(ক) কোন উপযুক্ত আদালত তাঁহাকে অপ্রকৃতিস্থ বলিয়া ঘোষণা করেন;
(খ) তিনি দেউলিয়া ঘোষিত হইবার পর দায় হইতে অব্যাহতি লাভ না করিয়া থাকেন;
(গ) তিনি কোন বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোন বিদেশী রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন;
(ঘ) তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোন ফৌজদারী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইয়া অন্যূন দুই বৎসরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তাঁহার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বৎসরকাল অতিবাহিত না হইয়া থাকে;
(ঙ) তিনি ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ যোগসাজশকারী (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশের অধীন কোন অপরাধের জন্য দণ্ডিত হইয়া থাকেন;
(চ) আইনের দ্বারা পদাধিকারীকে অযোগ্য ঘোষণা করিতেছে না, এমন পদ ব্যতীত তিনি প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোন লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকেন; অথবা]
(ছ) তিনি কোন আইনের দ্বারা বা অধীন অনুরূপ নির্বাচনের জন্য অযোগ্য হন।
[(২ক) এই অনুচ্ছেদের (২) দফার (গ) উপ-দফা তে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোন ব্যক্তি জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হইয়া কোন বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করিলে এবং পরবর্তীতে উক্ত ব্যক্তি-
(ক) দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে, বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করিলে; কিংবা
(খ) অন্য ক্ষেত্রে, পুনরায় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করিলে-
এই অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তিনি বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন না।]
[(৩) এই অনুচেছদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে কোন ব্যক্তি কেবল রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পীকার, ডেপুটি স্পীকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপ-মন্ত্রী হইবার কারণে প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোন লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত বলিয়া গণ্য হইবেন না।]
**এখানে নৈতিক স্খলনজনিত বিষয়টি গাজী নজরুল ইসলামের সহিত আসে কিন্তু এতে অভিযোগ আসতে হবে এবং তা নৈতিক স্খলনজনিত কোন ফৌজদারী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইয়া অন্যূন দুই বৎসরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে। সুতরাং এটা উনার ক্ষেত্রে প্রয়োজ্য হবে না।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়ঃ
রাজনৈতিক দল হইতে পদত্যাগ বা দলের বিপক্ষে ভোটদানের কারণে আসন শূন্য হওয়া
৭০। কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি-
(ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা
(খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন,
তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোন নির্বাচনে সংসদ-সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।]
**৭০ অনুচ্ছেদের মূল কথা হলো সংসদ সদস্যকে দল হইতে পদত্যাগ করতে হবে কিংবা সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করতে হবে। এর কোনটার মধ্যে গাজী নজরুল ইসলাম পড়েন না । কারণ, দল তাকে বহিষ্কার করেছে, তিনি পদত্যাগ করেন নি।
এবার দেখা যাক জাতীয় সংসদের কাযপ্রণালী-বিধি কী বলে। জাতীয় সংসদের কাযপ্রণালী-বিধির ১৭৭ বিধিতে সংসদ সদস্যের পদত্যাগের কথা বলা হয়েছে। তা দেখে নেওয়া যাকঃ
সংসদের আসন হইতে পদত্যাগ এবং উহার শূন্যতা
১৭৭। সংসদের আসন হইতে পদত্যাগ।
(১) সংসদের আসন হইতে পদত্যাগ করিতে ইচ্ছুক কোন সদস্য এই মর্মে স্পীকারকে সম্বোধন করিয়া স্বহস্তে লিখিতভাবে আপন করিবেন যে, তিনি তাঁহার আসন হইতে পদত্যাগ করিতে ইচ্ছুক, এবং তিনি পদত্যাগের জন্য কোন কারণ দর্শাইবেন না।
তবে শর্ত থাকে যে, কোন সদস্য যদি কোন কারণ জ্ঞাপন করেন, অথবা অপ্রাসঙ্গিক কোন বিষয়ের অবতারণা করেন, তাহা হইলে স্পীকার স্বীয় বিবেচনামতে অনুরূপ শব্দ বা বাক্যাংশকে বাদ দিতে পারিবেন এবং উহ্য সংসদে পাঠ করিতা প্রদান হইবে না।
১৭৮। নির্বাচন কমিশনে প্রেরণ এবং আসন শূন্য হওয়া-
(১) নির্বাচনের পর কোন সদস্য সম্বন্ধে যদি এমন বিরোধ দেখা যায় যে, ৬৬ অনুচ্ছেদের (২) দফায় বর্ধিত অযোগ্যতাগুলির কোন একটির কারণে তিনি অযোগ্য বিবেচিত হইবেন কিনা, অথবা সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁহার আসন শূন্য হইবে কিনা, তাহা হইসে স্পীকার উক্ত বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে প্রেরণ করিবেন।
(২) যদি নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত এই হয় যে, উক্ত সদস্য অযোগ্য হইয়াছেন, অথবা তাঁহার আসন শূন্য করা উচিত, তাহা হইলে তিনি আর সদস্য থাকিবেন না।
(৩) যদি কোন সদস্য তাঁহার আসন হইতে পদত্যাগ করেন, কিংবা সংসদের অনুমতি না লইয়া একাধিক্রমে নব্বই দিন বৈঠকে অনুপস্থিত থাকেন, কিংবা সংবিধানের ৬৭ অনুচ্ছেদের (১) (ক) দফায় উল্লেখিত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শপথগ্রহণ করিতে ও শপথ-পত্রে স্বাক্ষর প্রদান করিতে ব্যর্থ হন, কিংবা অন্য কোনওভাবে সদস্য না থাকেন, তাহা হইলে সংসদ অধিবেশনে থাকিলে স্পীকার উহা সংসদের গোচরে আনিবেনঃ
তবে শর্ত থাকে যে, সংসদ অধিবেশনে না থাকিলে পরবর্তী অধিবেশন আরম্ভ হইবার সঙ্গে সঙ্গেই স্পীকার সংসদকে জানাইবেন যে, অধিবেশন মধ্যবর্তী সময়ে উক্ত সদস্য পদত্যাগ করিয়াছেন বা সদস্যপদ হারাইয়াছেন।
(৪) যদি কোন সদস্যের আসন শূন্য হয়, তাহা হইলে সচিব এই মর্মে গেজেটে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করাইবেন এবং সংশ্লিষ্ট সদস্যকে বিজ্ঞপ্তির একটি প্রতিলিপি পাঠাইবেন এবং নির্বাচন কমিশনকেও বিষয়টি জানাইবেন, যাহাতে তাঁহার শূন্য পদটি পূরণের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারেন।
**এখানে পদত্যাগ ব্যাতিত বাকি বিষয়গুলো মূলত সংবিধানের ৬৬ (২) এবং ৭০ অনুচ্ছেদের শর্তই। অতএব এটিও প্রয়োগ হওয়ার সুযোগ নেই।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) সংসদ সদস্য পদ বাতিল বা অযোগ্যতার মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে মিথ্যা তথ্য প্রদান, ঋণ বা বিল খেলাপি হওয়া এবং নির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধ বা দণ্ড। এছাড়া সংবিধান ও নির্বাচনী আইন অনুযায়ী প্রার্থীর অযোগ্যতা প্রমাণিত হলে বা নির্দিষ্ট শর্ত ভঙ্গ করলে এই পদ বাতিল হতে পারে। মিথ্যা তথ্য: মনোনয়নপত্রে অসত্য বা ভুল তথ্য দিলে।
ঋণ ও ইউটিলিটি খেলাপি: ব্যাংক ঋণ বা সরকারি পরিষেবার বিল পরিশোধ না করলে।
দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়া: নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দুই বছরের বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে।
লাভজনক পদ: সরকারের অধীনে লাভজনক কোনো পদে বহাল থাকলে। এসব গোপণ করলে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে। যা গাজী নজরুল ইসলাম এর সহিত সম্পৃক্ত নয়।
এই আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি,
আসন শূন্য হওয়ার কারণসমূহঃ
শপথ গ্রহণে ব্যর্থতা: নির্বাচনের পর প্রথম বৈঠক থেকে ৯০ দিনের মধ্যে শপথ নিতে ব্যর্থ হলে (যদি স্পিকার সময় না বাড়ান)।
অনুপস্থিতি: সংসদের অনুমতি না নিয়ে টানা ৯০ কার্যদিবস অনুপস্থিত থাকলে।
পদত্যাগ: স্পিকারের কাছে স্বাক্ষরযুক্ত পত্র দিয়ে পদত্যাগ করলে।
যোগ্যতা হারানো: সংসদ সদস্য থাকার যোগ্যতা হারিয়ে ফেললে বা অযোগ্য ঘোষিত হলে।
অন্য পদে যোগদান: সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য পদে থাকার অযোগ্য এমন কোনো পদে নির্বাচিত বা মনোনীত হলে।
দলীয় বহিষ্কারের ফলে সংসদ সদস্য পদ হারানোর কোনো সাংবিধানিক বা স্বয়ংক্রিয় বিধান নেই। পদত্যাগ শর্ত: সংসদ সদস্য নিজেই যদি দল থেকে পদত্যাগ করেন, তবে তার আসন শূন্য হবে। অন্যান্য অযোগ্যতা: ফৌজদারি মামলা বা আদালতের রায়ে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অযোগ্য হলে এবং সংবিধানের ৬৭(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আসন শূন্য হওয়ার প্রশ্ন উঠলে নির্বাচন কমিশনের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
**বিঃ দ্রঃ এটি শুধুমাত্র আইনী আলোচনা। ভদ্রলোকের কেলেঙ্কারীর স্বপক্ষে কোন বক্তব্য নয়।
*মোহাম্মদ তরিক উল্যাহ
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
০১৭৩৩৫৯৪২৭০

সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



