somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সাদা ভাতের গন্ধ

১৮ ই অক্টোবর, ২০০৬ সকাল ৮:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ধরা যাক তার নাম কাতব আলী। আগে কিছুই ছিলো না। নিজের কিংবা বাপের। নামটা বাপের রাখা। তবে এ নামের কারণটা আজও স্পষ্ট নয় তার কাছে। মাঝে মধ্যে খোলা উঠানে বসে বসে ভাবে কাতব।
বাড়ির চারপাশটা বেশ সাদামাটা। ভেতরে কয়েকটা ধানের গোলা। পাশেই গরুর গোয়াল। 8টা সব মিলিয়ে। একটা গাভী। কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে পাকার ধানের গন্ধে বাড়ির চারপাশটা ভরে ওঠে। তার মাঘে দাঁড়িয়ে কাতব শুন্যের দিকে তাকিয়ে গালি দিয়ে ওঠে অস্ফুটে, ছোটলোকের বাচ্চা। দেখে যা এখন আমার কত ধান। শেয়াল কুকুরে খায় আমার ভাত। আর তোকে মরতে হলো ভাতের অভাবে।
গালাগালটা কাতবের মৃত বাপের উদ্যেশ্যে। ভাতের অভাবে মাঠের মাঝখানে হা করে মরেছিল। আকাশের দিকে তাকিয়ে। খিদেটা যেন আকাশের মতই বিশাল ছিল। কাতব তখন 7 বছরের। প্রথমটা কিছুই বুঝে উঠতে পারে নি। কান্নার বদলে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল বাপের হা হওয়া মরা মুখটার দিকে। ওপাড়ার মহাজনের বৌটা বলেছিল, হারামজাদার কান্ড দেখছ? বাপাটা তো মরেছে। চোখে একফোটাও পানি নেই।
তারপর মহাজনের কষে দেয়া চড়টা দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এসেছিল তার। তারপর চোখ দিয়ে বিন্দু বিন্দু জল গড়িয়েছিল চোখ থেকে। কাতবের কান্না দেখে নিমেষেই পাল্টে গিয়েছিল আশপাশের সবার দৃষ্টি। কান্নাটা যেন মহৎ ব্যাপার, এমন দৃষ্টিই ছিল সবার। কিন্তু তখন দৃষ্টি পরিস্কার হয়ে আসলেও, বা গালটা বেশ জ্বলছিল কাতবের।
তারপর কেটে গেছে একে একে 25টি বছর। বদলে গেছে অনেক কিছু। বাঁশের ব্যবসা পাল্টে দিয়েছে কাতবের জীবন। আস্তে আস্তে জমি জিরাত হল, গরু হলো হালের। ফসলের বাড়ন্ত অবস্থায় ঝাড়ের বাঁশ কেটে গোটা দুই বড় বড় গোলাও তৈরি করতে হল। এখন বাঁশের ব্যবসাটা ছেড়ে দিয়েছে কাতব। তার বদলে চাষ করা মাটির বুনো গন্ধটাই বেশি টানে তাকে। মাঝে মাঝে চাষ দেয়া লাঙ্গলের ফলাতে দু'ভাগ মাটিতে উবু হয়ে বুকভরে মাটির গন্ধ নেয় সে। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। বাপের মরা মুখটা খোঁজে। মাঝে মাঝে মনে হয় পুরো আকাশটাই যেন বাপের মরা মুখ। মুখের হা টা আর দেখতে পায় না সে। কিন্তু তবুও গত 25 বছরে একদানা ভাতও মুখে দিতে পারেনি কাতব। ভাত দেখলেই বমি আসে। পেটের নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসতে চায়।
'ও বাবা। একমুঠো ভাত দিবা?
হঠাৎ ভাবনায় ছেদ পড়ে কাতবের। পেছনে জীর্ন কাপড়ের এক বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে। শীর্ণ দেহ।
-আজ 5দিন ভাত খাই নি। পরাণডা বাইর হই যাতি চায়। এটউ ভাত দিবা বাবা?
চেহারাটা যেন চেনা চেনা লাগে। হঠাৎই চিনতে পারে। মহাজনের বউ! কাতবের মনে পড়ে, ভাতের জন্য বাপ গিয়েছিল মহাজনের বাড়িতে। বউটা বাপের ুধিত চোখের সামনে কুকরকে ভাত ঢেলে দিয়ে বলেছিল, নে ভাত খা।
ঋণের দায়ে জমিগুলো আগেই গিয়েছিল মহাজনের পেটে। তারপর ভিটে মাটি টুকুও কড়ে নিল। পরের দিনগুলো কুকুরের মতই কেটেছিল বাপের। অপমান , অভিমানে আর লজ্জায়। তারপর সব শেষ। সে সময় কাতব ছিল বকুল মাসির বাড়িতে। সেখানে দু' বেলা খাবার জুটত। আর এই খাবার টুকুর লোভেই বাপের কাছে যেতে চাইতনা সে। তবুও দেখতে পেলেই বাপ বুকে জড়িয়ে ধরত কাতবকে। বলত- তুই অনেক বড় হবি বাপ। তোর অনেক জমি-জিরাত হবে। তুই অনেক ভাতির মালিক হবি। তখন সবাইকে ভাত খেতে দিস। কাউকে যেন ফিরি দিস্ না খোকা।
আজ এতদিন পর মহাজনের বউটাকে দেখে রাগে শরীরটা চিড়বিড়িয়ে ওঠে কাতবের। ইচ্ছে করা ভাতের ওপর দিয়ে তাকে টেনে নিয়ে বলতে- নে মাগি। ভাত খা।
কিন্তু হঠাৎ করেই বাপের মরা হা করা মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে কাতবের। সেই মুখ যেন বলে ওঠে, ভাত দে কাতব। রাগ করিস নে বাপ।
বাড়ির ভেতর থেকে এক সানকি ভাত এনে মহাজনের বউটাকে দেয় কাতব। নেও চাচী, ভাত নেও।
আজ কেন যেন ভাতের গন্ধটাকে বড় ভালো লাগে কাতবের।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে অক্টোবর, ২০০৮ বিকাল ৩:৫৯
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

যে বিষয়ে মজিবর ও হাসিনা এক বিন্দুও ভুল করেনি!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:২৫


বাংলাদেশের ইতিহাসে মজিবরের শেষ শাসন কাল ও হাসিনার শেষ শাসন কাল দুটি ভিন্ন সময়ে হলেও গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত মিল বহন করে। নির্বাচনী বৈধতার নিরিখে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের সংগে ২০১৪, ২০১৮... ...বাকিটুকু পড়ুন

যতবার শেষ, ততবার শুরু

লিখেছেন রাজসোহান, ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১১



তেরো বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের মা মারা যান। জীবনস্মৃতিতে তিনি সেই রাতের কথা লিখেছেন। "যে রাত্রীতে তাঁহার মৃত্যু হয় আমরা তখন ঘুমাইতে ছিলাম। তখন কত রাত্রি জানি না, একজন পুরাতন... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই যোদ্ধা!

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৭


এই লোকটির নাম আল আমিন। সে বিশেষ একটি দলের হয়ে জুলাই মঞ্চে জ্বালাময়ী বক্তব্য দেয় মাঝেমধ্যে। এর সম্পর্কে গুরুতর একটি অভিযোগ উঠেছে, সে নাকি ৫ আগস্ট দিবাগত রাতে ময়মনসিংহের দাপুনিয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

তুমি যা জানো, আমি তা জানি না

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫২



তোসার সাথে কথা চালাচালি হয় না মেলাদিন;
বসন্তদিনে অস্ত গেলেই বেশ জমিয়ে,
আড্ডা হতো চিলেকোঠার বারান্দায়।
তোমার মতো স্মৃতিশক্তি প্রখর না হলেও
ভালোই হতো স্মৃতিচারণ।
কতো যে স্মৃতিসমষ্টি- দগদগে-... ...বাকিটুকু পড়ুন

সরকারী প্রতিষ্ঠান বিটিভির মহাপরিচালক পদে নিয়োগ পেয়েছে বেসরকারী ব্যক্তি কাজি জেসিন!

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ০৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৫২




আশির দশককে বলা হয় বিটিভির নাটকের স্বর্ণযুগ । সেই সময়ে বিটিভিতে মহাপরিচালক হিসাবে বিভিন্ন সময়ে ছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান,এম এ সাঈদ , জামিল চৌধুরি প্রমুখ।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×