শহীদ ভাগীরথীর ছেলে গনেশ চন্দ্র সাহার বিপরীতমুখী সাক্ষ্যের কারণে যুদ্ধাপরাধের বিচার আবারও বিলম্বিত এবং ভ্রান্ত পথে চলায় নিজেকে বাঙালি হিসেবে বেশ লজ্জিত মনে হচ্ছে। খবর শোনার পর পত্রিকাগুলোর প্রথম সংস্করণ আর ব্লগের দিকে তাকিয়ে রইলাম। না, ভুল খবর নয়। আগে গনেশ চন্দ্রের সাক্ষিনামা পড়ি –
সাক্ষী গণেশ চন্দ্র সাহার গতকাল মঙ্গলবারের জবানবন্দি :
আমার নাম গণেশ চন্দ্র সাহা। আমার বয়স আনুমানিক ৫১ বছর। আমার মা ভাগীরথী সাহা ১৯৭১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। আমাদের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধা থাকতো। আমার মা মিলেটারি ক্যাম্পে কাজ করতো। আমার মা ক্যাম্পের খবরা-খবর মুক্তিযোদ্ধাদের পৌঁছিয়ে দিতেন। মতিউর রহমান সরদার, কালু মোল্লা, জলিল মোল্লা, হানিফ খান এরা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। মতিউর রহমান সরদার বর্তমানে পিরোজপুর উপজেলা চেয়ারম্যান। মা রাতের বেলায় বাসায় আসত এবং সকাল বেলা ক্যাম্পে যেত। মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে আমার মা কি কথা বলতেন তা আমাদের শুনতে দিতেন না। কিছুদিন পরে আমাদের গ্রাম বাগমারায় মিলিটারি আসে তখন মুক্তিবাহিনী ও মিলিটারির মধ্যে গোলাগুলী হয়। ১০ জন মিলিটারি মারা যায়। অস্ত্র ফেলে মিলিটারিরা পিরোজপুরে পালিয়ে যায়। আমার মা ঐ দিন পিরোজপুর ক্যাম্পে ছিলেন। ঐ দিন আমার মা বাড়িতে ফিরে আসে নাই। তারপর দিন আমরা দু'ভাই মায়ের খোঁজে যাই। আমার অপর ভাইয়ের নাম কার্তিক চন্দ্র সাহা। তিনি বর্তমানে মৃত। ১২টার দিকে আমরা শুনি এক মহিলাকে ধরে নিয়ে গেছে তিনি আমার মা, আরো শুনি মিলিটারি তার কোমরে এবং পায়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে গাড়িতে করে টেনে নদীর ধারে নিয়ে গেছে। ওখানে গিয়ে দেখি মায়ের শরীর তক্ষ-বিক্ষত, গাড়িতে ৫ জন লোক বসা। মাকে মেরে নদীর চড়ে ফেলে রেখেছে। ঐ ৫ জনের ভিতর ৪ জনের হাতে অস্ত্র, একজন ড্রাইভার সবাই খাকি পোশাক পরা। এই ৫ জনকে আমি চিনি না। এরা কি কথা বলতো তা বুঝতে পারি নাই। কিছুক্ষণ পরে তারা গাড়ি চালিয়ে চলে যায়। এদের সাথে কোনো রাজাকারকে দেখি নাই। একজনকেও চিনতে পারি নাই। বছর দেড়েক আগে আমি জানতে পেরেছি এই মামলার আমি সাক্ষী। বৈশাখ মাসের শেষে আমি জানতে পেরেছি। আমার মায়ের মৃত্যুর ব্যাপারে সাংবাদিক এবং কোর্টের লোক আমার কাছে গিয়েছিল। তাহারা আমার কাছ থেকে এই মৃত্যুর কথা শুনে এসেছে। আমার মায়ের মৃত্যুর ব্যাপারে আজকেই আমি প্রথম সাক্ষ্য দিচ্ছি।
এই মামলায় সাক্ষ্য দেয়ার ব্যাপারে বৈশাখ মাসের শেষে রফিক ভাই আমার সাথে দেখা করেছে। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন, আপনার মাকে কারা মেরেছে? আমি বলেছি, মিলিটারিরা মেরেছে। তখন তিনি বলেছেন, না আরো অন্য মানুষেরাও মেরেছে। তখন আমি বলেছি, না শুধু পাক সৈন্যরাই মেরেছে। তখন তিনি বলেন, তুমি দিবিব করে বল। আমি বলেছি যে, না। আমার মায়ের মৃত্যুর কাহিনী নাটক ‘নোবেলে' আছে, সবাই দেখেছে, প্রতি বছর হচ্ছে। নাটক ‘নোবেল' পিরোজপুরে হয়। এছাড়া অন্য কোনো কেউ আমাকে অন্য কোনো কথা বলে নাই, রফিক ভাই আমাকে আবারো বলেন, আমার বাবা তোমার মাকে মেরেছে? আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি আপনার বাবা কে? উনি বলেন, সাঈদী সাহেব, তখন আমি বলি, না উনি আমার মাকে মারেননি।
এরপর বেলা ১১টা ২৩ মিনিটে সাক্ষী গণেশ চন্দ্র সাহার জেরা শুরু হয়। জেরা করেন প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী।
প্রশ্ন : রফিক ভাইকে কতদিন ধরে রফিক ভাই ডাকেন?
উত্তর : রফিক ভাই একদিনই আমাদের বাড়িতে গিয়েছেন এবং তাকে আমি একদিনই দেখেছি।
প্রশ্ন : সেটা কবে?
উত্তর : বৈশাখ মাসের শেষ দিকে পিরোজপুরে তিনি ওয়াজ অথবা মাহফিল করতে যান। তখনকার ঘটনা এটি।
প্রশ্ন : বৈশাখ মাস এখন থেকে কতদিন আগে হবে?
উত্তর : সাত মাস আগে ছিল।
প্রশ্ন : ওয়াজ শুনতে গেছেন?
উত্তর : না।
প্রশ্ন : আপনাকে পেলেন কিভাবে?
উত্তর : উনি আমাদের বাড়ি যাওয়ার পরে আমি মাঠে ছিলাম, মোবাইলে আমাকে ডেকে নিয়ে এসেছেন।
প্রশ্ন : ওনার সাথে আর কেউ ছিলেন?
উত্তর : আরেকজন গিয়েছিল।
প্রশ্ন : তাকে চেনেন?
উত্তর : চিনি, তার নাম নান্না, রফিক ভাইয়ের মামা না কি হয়।
প্রশ্ন : আর কেউ গিয়েছিল?
উত্তর : ঐদিন ছাড়া আমার কাছে কেউ আর কোনো দিন যায় নাই।
প্রশ্ন : কেন সে একথা আপনাকে জিজ্ঞাসা করছেন তা জানতে চেয়েছিলেন?
উত্তর : হ্যাঁ। তিনি বলেন, তোমার মাকে কে মেরেছে তাতো জানি না, তাই জানতে এসেছি, আমার জানার দরকার আছে।
প্রশ্ন : এতদিন পরে কেন জানতে আসছেন এ কথা তাকে জিজ্ঞাসা করেছেন?
উত্তর : না।
প্রশ্ন : তিনি অন্য কোনো বাড়িতে গিয়েছিলেন?
উত্তর : না।
প্রশ্ন : আপনার মায়ের নামে পিরোজপুরে ভাগীরথী চত্বর আছে।
উত্তর : হ্যাঁ।
প্রশ্ন : কোর্টের লোক কদ্দিন আগে গেল আপনার কাছে?
উত্তর : গত ফাল্গুনে কোর্টের লোক আমার নিকট গিয়েছিল। গিয়ে বলেছে, আমরা কোর্টের লোক, কোর্ট থেকে তদন্তের জন্য এসেছি।
প্রশ্ন : যে গিয়েছিল সে তার পরিচয় দিয়েছিল বা নাম বলেছে?
উত্তর : নাম-ধাম বলেন নাই, তারা বলেছিল, তারা ঢাকা থেকে এসেছেন, আমিও তাদেরকে নাম জিজ্ঞাসা করি নাই। এক সপ্তাহ পরে উনারা আবার গিয়েছিলেন।
প্রশ্ন : আপনার মাকে কারা মেরেছে বা কি কি ঘটনা ঘটেছিল তা আপনি কোর্টের লোকদের কাছে বলেছেন?
উত্তর : হ্যাঁ।
প্রশ্ন : রাজাকারের কথা শুনেছেন?
উত্তর : রাজাকার কারা দেখিনি। তবে শুনেছি।
প্রশ্ন : কার মধ্যে যুদ্ধ হয়েছে এটা জানেন ?
উত্তর : মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তানি মিলিটারিদের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছে এটাই আমি বুঝেছি।
প্রশ্ন : রাজাকারেরা কি করতো?
উত্তর : আমি শুনেছি রাজাকারেরা মানুষদের ধরে নিয়ে পাক সেনাদের হত্যায় সহযোগিতা করতো।
প্রশ্ন : কোর্টের লোক যারা তদন্ত করতে গিয়েছিল তাদের মধ্যে প্রধান ছিলেন হেলাল সাহেব?
উত্তর : এটা হতে পারে।
প্রশ্ন : ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হেলাল সাহেবই কি কোর্টের উক্ত ব্যক্তি কিনা?
উত্তর : হ্যাঁ।
প্রশ্ন : আপনি যে মামলায় সাক্ষী দিতে এসেছেন সে মামলাটি কার বিরুদ্ধে করা হয়েছে জানেন?
উত্তর : সাঈদী সাহেবের ছেলে রফিক আমাকে বলেছেন, আপনি আমার বাবার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন কিনা। আমি বলেছি না। তাহলে এটা কোর্টে গিয়ে বলতে পারবো কিনা জানতে চাইলে আমি বলেছি পারবো। একথা বলতেই আমি কোর্টে এসেছে।
প্রশ্ন : আপনার মা হত্যার ব্যাপারে পারের হাটের সাঈদী সাহেবের প্রত্যক্ষ হাত ছিল?
উত্তর : এটা মিথ্যা
প্রশ্ন : এ কথাগুলো না বলার জন্য রফিক সাহেব তার মামা ও সাঈদী সাহেবের লোকজন টাকা দিয়ে ভুল বুঝিয়ে সাক্ষ দেয়ার জন্য এ ট্রাইব্যুনালে আপনাকে নিয়ে এসেছেন?
উত্তর : এটা সত্য নয়।
প্রশ্ন : আপনি ঢাকায় এসছেন কীভাবে?
উত্তর : নান্না ভাই আমাকে পিরোজপুর থেকে নিয়ে এসেছেন, এখানে তার সঙ্গে আমি একটি হোটেলে ছিলাম। সকালে উনি আমাকে কোর্টে নিয়ে আসেন।
প্রশ্ন : অর্থের বিনিময়ে আপনি পক্ষ ত্যাগ করেছেন?
উত্তর : এটা সত্য নয়।
প্রশ্ন : আপনার মায়ের হত্যায় সাঈদী সাহেবের হাত ছিল এটা জেনেও সত্য গোপন করে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন?
উত্তর : এটা সত্য নয়।
খবরের লিংক
এই খবর পড়ার পড়ে আমার মনে সাধারণ প্রশ্ন জাগল যা রাষ্ট্র পক্ষের বিজ্ঞ কুশলীদের কাছ থেকে আশা করেছিলাম।
১।নান্না কে, সাক্ষীর সাথে তার পরিচয়ের সুত্র?
২। ঢাকায় তিনি আসলেন সাক্ষীর ভাষায়- ভাই আমাকে পিরোজপুর থেকে নিয়ে এসেছেন, এখানে তার সঙ্গে আমি একটি হোটেলে ছিলাম। সকালে উনি আমাকে কোর্টে নিয়ে আসেন???
৩। সাক্ষী তার বয়স দাবি করেছে ৫১ বছর, ১৯৭১ এ বয়স ছিল (২০১২-১৯৭১ = ৯/১০, এরকম লোককে কিভাবে সাক্ষ্য কিভাবে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিলেন?)
৪। সাক্ষী গনেশ চন্দ্র সাহা রাষ্ট্র পক্ষে সাক্ষ্য প্রদানে সম্মত হয়ে (ফাল্গুনে তার সাথে তদন্তকারী কর্মকর্তা যোগাযোগ করেন।) কিভাবে বৈশাখ মাসে রফিক (সাইদির ছেলে) সাথে দেখা করার পর যদি বিপরীত সাক্ষ্য দেন তবে রাষ্ট্র তো আদালতের মূল্যবান সময় নষ্ট করার জন্য সাক্ষী এবং তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করা যেতে পারে। (বিচারে আসল দোষী সাব্বাস্ত হবে)
প্রত্যেক সাক্ষীর জবানবন্দী পড়ার পড়ে আবারও বারবার খুঁটিয়ে পড়ি, এক গাদা প্রশ্ন মনে , সাথে জমে আবারো যুদ্ধাপরাধির গাড়িতে স্বাধীন দেশের পতাকা ওড়ার ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন ‼!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


