somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আদি বাংলার ইতিহাস (প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ২৩

০৩ রা জুলাই, ২০১৩ সন্ধ্যা ৭:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আদি বাংলার ইতিহাস
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ২৩

গৌড় দখল করার পর বাদশাহ হুমায়ুন অমাত্য জাহিদ বেগকে বাংলার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। সমৃদ্ধিশালী সুবার এরকম একটি উচ্চ পদে নিযুক্তির জন্য সম্রাটের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে জাহিদ বেগ বাদশাহকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “জাঁহাপনা কি আমাকে মারার জন্য বাংলা অপেক্ষা উত্তম জায়গা আর খুঁজে পাননি।” ৩৭

এমনকি সম্রাট আকবরের শাসনকালের প্রথমদিকে মোঘল সৈন্যরা বাংলার চাকুরি করতে পছন্দ করত না, যদিও তাদেরকে দ্বিগুণ বেতন দেয়া হয়েছিল। অনুমান করা হয়, অস্বাস্থ্যকর জলবায়ুর কারণে গৌড় ও পাণ্ডুয়ার জাঁকজমকপূর্ণ শহরগুলো পর্যন্ত মোঘল রাজপ্রতিনিধি এবং রাজকর্মচারীগণ কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়েছিল। ১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দে খান খানান মুনিম খানের সুবাদারির সময়ে গৌড়ে ব্যাপকভাবে প্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। সমস্ত অঞ্চল মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়। এই মহামারীতে বহুসংখ্যক মোঘল সেনাপতি, সৈনিক ও রাজকর্মচারীর মৃত্যু হয় এবং সুবাদার গৌড় থেকে তান্ডায় সুবাবাংলার রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। ৩৮

অবশ্য এটা ছিল একটি মহামারীতে আক্রান্ত হবার সময়। সব সময়ে সমস্ত বাংলার জলবায়ু অস্বাস্থ্যকর ছিল, এটা বোধ হয় ঠিক নয়। বাংলা সম্পর্কে আর্যদের উক্তি এবং পরবর্তীকালে মোঘলদের ধারণা সঠিক বলে মনে হয় না। বিশেষ করে গৌড়ের জলবায়ু এতটা অস্বাস্থ্যকর হলে সেখানে শতবর্ষের অধিককাল বঙ্গের রাজধানী থাকার কথা নয়। গৌড় শুধু রাষ্ট্রের রাজধানীই ছিল না, প্রাচীন যুগের শেষ কাল থেকে মধ্যযুগের প্রারম্ভিক কাল পর্যন্ত গৌড় একটি সমৃদ্ধিশালী শহর ছিল এবং এর পরিচিতি ছিল সমস্ত উত্তর ও মধ্যভারতে। উৎখননের ফলে অনেক ঐতিহাসিক তথ্য বেরিয়ে এসেছে। আজকাল জানা যায় যে, অনেক প্রাচীনকাল থেকেই বাংলা অনেক উন্নত জাতিগোষ্ঠীর আবাসস্থল ছিল। তারাই গড়ে তুলেছিল তাম্রলিপ্ত, চন্দ্রকেতুগড়, পুণ্ড্রবর্ধন, গঙ্গাবন্দর এবং এমন আরও অনেক শহর ও বন্দর। এই শহর ও বন্দরের সঙ্গে পৃথিবীর বহু দেশ ও জাতির ব্যবসায়িক আদান-প্রদান ছিল। বাংলার অনেক অঞ্চলই শিল্পসমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে প্রাচীনকালে বহির্বিশ্বে পরিচিত ছিল। পাল এবং সেন আমলে বাংলার রাজধানী গৌড়ে যে কৃষ্টি-সংস্কৃতি, শিল্প-সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা হতো তা তৎকালীন মধ্য ভারতের জন্যও উপেক্ষা করার মতো ছিল না। সভ্যতার এই স্তরে উন্নয়ন নিশ্চয় একটি অঞ্চলের দূষিত আবহাওয়ার লক্ষণ হতে পারে না। বিদ্যাকরের সুভাষিত রত্নকোষ শ্রীধরদাসের সদ্যুক্তিকর্ণামৃত, কবি ধোয়ীর পবনদূত, কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দম এবং বিভিন্ন পুরাণ গ্রন্থ এ যুগেই রচিত হয়েছিল। এ মুক্ত চিন্তা-চেতনা ও গভীর মননশীলতার পরিচায়ক যা দূষিত আবহাওয়ার ফসল হতে পারে না।

সম্রাট হুমায়ুন কিছুদিন গৌড়ে বাস করেছিলেন। তিনি কয়েক মাস এই সুন্দর শহরে অবস্থান করেন এবং স্নিগ্ধ জলবায়ু ও সুন্দর পরিবেশে এত বেশি মুগ্ধ হন যে, তিনি এই শহরের নামকরণ করেন জান্নাতবাগ বা স্বর্গ। সুলতান বলবনের পুত্র নাসিরউদ্দিন বুগরাখান বাংলার বিশুদ্ধ জলবায়ু ও সবুজ বৃক্ষরাজির সমারোহ এত ভালবাসতেন যে, তিনি দিল্লির সম্রাট হওয়ার চেয়ে বাংলার শাসনকর্তা থাকা অধিক পছন্দ করেছেন। আবুল ফজলের বর্ণনায় প্রকাশ পায় যে, বাংলার জলবায়ু যতটা অস্বাস্থ্যকর বলে বর্ণিত হয়েছে, বাস্তবিকপক্ষে ততটা খারাপ ছিল না। বৃষ্টিপাতের পরে মহামারী সৃষ্টিকারী জলবায়ুর কথা বলতে গিয়ে এই মোঘল ঐতিহাসিক আরও জানিয়েছেন যে, “বর্তমান শাহানশাহের আমলে এই অশুভ আবহাওয়ার অবসান হয়েছে।” এতে বোঝা যায় যে, জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছিল। আর এই পরিবর্তন নিশ্চয় হঠাৎ করে হয়নি। দেশের জলবায়ু উন্নত করার জন্য সম্রাট আকবরের কাছে নিশ্চয় কোনো ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা ছিল না। নদ-নদী, বৃষ্টিপাত ও জলাভূমিসমূহ তখনও একই রকম ছিল। তা হলে কিভাবে এই অসাধারণ শুভ পরিবর্তন ঘটে ?
৩৭ আবুল ফজলঃ আইন-ই-আকবরী।
৩৮ আবুল ফজল: আকবর নামা- তৃতীয় খণ্ড।

আদি বাংলার ইতিহাস (প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ২২
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×