ক্যাম্পাসে চায়ের কাপে ঝড় তুলছিলাম কয়েকজন মিলে। কাছাকাছি একজন বৃদ্ধা বসেছিলেন ছেলের অপেক্ষায়। আমাদের কথার মধ্যে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সাঈদী সাবেরেও আটকায়া রাখসে?’
সরকার জানে, দেলু রাজাকার দেশের কয়েক কোটি মানুষের কাছে ‘সাঈদী সাব’। না, এরা সবাই জামাতকর্মী নন। সাঈদী’র ওয়াজ-এর ভক্ত। এবং ‘দেলু রাজাকার’ সম্পর্কে অজ্ঞ। কাজেই, আদালতের উপর সরকারের বিন্দুমাত্র প্রভাব থাকলে,(মাননীয় আইন পাতি-মন্ত্রী জানিয়েছেন, মাঠ আগে থেকে দখলে রাখতে পারলে অন্যরকম রায় হতে পারতো, সুতরাং...) ফাঁসীর রায় দেবার আগে অনেক ভাবনা-চিন্তা করতেই হবে।
তবে আরেকটা দিক আছে। শাহবাগের কয়েক হাজার মানুষ দেশের কয়েক কোটি মানুষের সমান ক্ষমতার অধিকারী। কারণ তাদের ‘ভয়েস’ আছে। মিডিয়ার নজর তাদের ওপর। শাহবাগে হর্ষধ্বনি উঠলে তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়বে মুহূর্তেই। আর সাধারণের ওপর মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার প্রভাবের কথা কে না জানে। অসন্তোষ চাপা পড়ে যাবে।
সাঈদীর বিচারকাজ শেষ। যদি ফাঁসীর রায় হয়, তা হবার কথা শাহবাগে গণজমায়েত থাকতে থাকতেই, যেন বিশাল আনন্দমিছিলটাকে সরকার নিজের সাফল্য হিসেবে বগলদাবা করতে পারে। এটা সরকারের জন্য হবে এক বিশাল রাজনৈতিক সাফল্য, সন্দেহ নেই। শেয়ার বাজার লুট, পদ্মা কেলেংকারী, ইনডেমনিটি দিয়ে কুইক রেন্টাল (নাকি কুইক প্রফিট) বিদ্যুত, বিশ্বজিৎ হত্যার সেনসেশন চাপা পড়ে যাবে এক নিমিষে। সেই সাথে, বিএনপি’র বিরুদ্ধে নির্বাচনী দৌড়েও আওয়ামী লীগ ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে।
আর যদি ফাঁসির আদেশ না হয়, সেই ঘোষণা বোধহয় শীঘ্রই আসবে না। রায় ঝুলে যাবে দীর্ঘদিনের জন্য। আন্দোলনকারীরা ধৈর্য হারিয়ে সংখ্যায় কমতে থাকবে, কিন্তু সেটা, বলার অপেক্ষা রাখেনা, হবে বর্তমান সরকারের জন্য অশনীশঙ্কেত। রাজাকারদের (আমি যুদ্ধাপরাধী বা যুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধী বলতে নারাজ, কেননা এই ক্যাটাগরির সবার বিচার হচ্ছে না, যেমন যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানী সেনা এবং আটক হওয়া রাজাকার হত্যাকারী বাংলাদেশী ‘কর্তৃপক্ষ’) বিচারকে সমস্তকিছুর ওপর প্রাধান্য দেয়া জনগোষ্ঠীর (যারা সংখ্যায় একদম কম নন) সমর্থন হারাবে তারা।
গতকাল একজন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে কথা বললাম কিছু বিষয় বোঝার জন্য। তিনি বললেন, কোন অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা ফাঁসি হলেই ফাঁসি দেয়া যায় না, অভিযুক্তের ইনভলভমেন্টের লেভেল অনুযায়ী সাজা কম বেশি হতে পারে। আবার সাজার র্যাশনেল ব্যাখ্যা করার ব্যাপারটাও বিচারকভেদে ভিন্ন হতে পারে। সর্বোপরি, বিচারক একজন মানুষ। তিনি অনেকভাবে প্রভাবিতও হতে পারেন।
দেখা যাক শাহবাগ আন্দোলনের প্রভাব পরবর্তী রায়ে পড়ে কিনা। আমাদের সবার মত আওয়ামীলীগ সরকারও টেনশনে আছে বলেই আমার ধারণা। অপেক্ষাকৃত লঘুপাপে মাওলানা আজাদের গুরুদণ্ড, অন্যদিকে গুরুপাপে কাদের মোল্লার লঘুদণ্ডের কারণেই সরকার এখন আছে বহুমুখী চাপ ও সন্দেহের মুখে। রাজাকারের ‘বিচারের’ দাবী সকল রাজাকারের ‘ফাঁসির’ দাবীতে পরিণত হওয়াটা এখন যেমন তাত্ত্বিকভাবে আদালতের প্রয়োজনীয়তা ও স্বাধীনতাকে চ্যালেঞ্জ করেছে, তেমনি সরকারকে ফেলেছে শাঁখের করাতে। একদিকে জন-অসন্তোষের ভয়, আরেকদিকে জামায়াত-শিবিরকে চিরশত্রু বানিয়ে ফেলার আশঙ্কা।
অধীর আগ্রহে বসে আছি- দেখা যাক কোন পথ বেছে নেয় আওয়ামী লীগ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


