somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভেজা চশমা

১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ রাত ১:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ডাক্তার দরজা লাগিয়ে চলে যাবার পর আমার রুমে আর তেমন কোন শব্দ নেই। শুধু বাঁদিকে মাথার উপর মিটমিট করে একটুকরো সবুজ আলো অস্ফুট স্বরে অবিরাম কি যেন বলার চেষ্টা করছে... আমি চশমা ছাড়া তা শুনতে পাচ্ছি না। শব্দ বলতে এটুকুই। মৃদু আলোর কিছু ব্যাপার অবশ্য রুমে আছে। ডানদিকের মেঝেটাকে রহস্যময় করে রেখেছে সিপিইউ থেকে বের হয়ে আসা নীল রঙের নরম আলোটা। ওদিকে তাকিয়ে আমি কাঁথার ভেতরে নিজেকে আরেকটু গুটিয়ে নিলাম। টাইলসে নীল আলোর রিফ্লেকশন সিলিঙ্গে ছায়া ফেলেছে ফ্যানের তিনটি ডানার। আর সেই ছায়ার কিনার ঘেঁষে খুব সাবধানে দাঁড়িয়ে আছে প্রকান্ড আলমারিটা।
আমি খুঁটিয়ে খুটিয়ে সবাইকে দেখতে থাকলাম- টেবিলের কাঁচে অস্ফুট আলোর ছায়া, মেঝে রাঙ্গানো নীলচে আলো আর দেয়ালে টাঙ্গানো প্রিয়োতির ২টি পেইন্টিং। সবাই কতটা আলাদা আমার থেকে – কতটা অচেনা। আমার চেনা এই জগতের প্রতিটি সত্ত্বা থেকে কতটা বিচ্ছিন্ন এই আমি- আমার এই ছোট্টো শরীরটার মাঝে। আবেগটাকে আরেকটু উস্কে দিতে বামপাশের দেয়ালে সেঁটে থাকা ত্রিমুখী আলোটা জ্বালালাম। নীল দেয়ালের খাঁজ কাটা নকশায় লাল আলোর প্রতিচ্ছবি তীরের মত বিঁধতে থাকলো আমার চোখের রেটিনায়। নকশাগুলো পাল্টে যেতে থাকলো কোন এক প্রাগৈতিহাসিক সাপের মত। আমি অবাক হয়ে দেয়ালে তাদের গতিপথ দেখতে থাকলাম...
চোখ ব্যাথা করছে। উপলের মত আজ আমারও আর এই সাইকেডেলিক প্যারা নিতে ভাল লাগছে না। আমি আলোটা নেভালাম। আবার প্রশান্তি নেমে এলো আমার দুই চোখে।
আমি জীবিত- অনেকদিন ধরে জীবিত। আমি বেঁচে আছি আজস্র মৃত স্বত্বার মাঝে- হাজার বছর আগের কোন এক বিস্মৃত আগন্তুকের মত।
অর্থ কি এই জীবনের? কি করলে শান্তি পাবে আমার এই সদাচঞ্চল জীবন্ত স্বত্বাটা? জ্ঞান হবার পর থেকে এই প্রশ্নটাই আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়েছে অনেকদিন ধরে।
আমি কখনো খুব বেশী বই পড়িনি, পারিনি খুব ভাল কোন ছাত্র হতে, উড়াতে পারিনি দেশের হয়ে বিশ্ব আসরে আমার দেশের পতাকা। আমি কখনো জানিনি উগান্ডার রাষ্ট্রপতির নাম, পাইনি স্রষ্টা প্রদত্ত বিশেষ কোন ক্ষমতা...
আমি শুধু দুটো চোখ পেয়েছি- জীবন্ত এক জোড়া চোখ। যা দিয়ে আমি এই সদা মৃত প্রকৃতিকে দেখেছি ২৪টি বছর ধরে, দেখেছি নিজের অব্যয় অপুর্ণতা আর ধোঁয়াটে অস্তিত্বকে।
আমি বৃষ্টি দেখেছি, দেখেছি ভেজা চশমার মাঝে এ পৃথিবীর অপূর্ব অলীক সৌন্দর্য। আমি জ্যোৎস্না ভরা রাতে হেঁটে গিয়েছি শান্ত সাগরের পাড় ঘেঁষে, আমি পায়ে লাগিয়েছি অতলান্তিকের হিম শীতল পানি... আমি শীতের রাতে পাগল হয়ে শুয়ে থেকেছি অসংখ্য তারার নিচে, আমি বুনেছি অজস্র স্বপ্নের জাল।
আমি ভালবেসেছি- আমি শিহরিত হয়েছি প্রেয়সীর সিক্ত লাজুক চুম্বনে, আমি কেঁপে উঠেছি প্রচন্ড আবেগে, ভেঙ্গে পড়েছি ক্রন্দনে...
আমি আরো কিছুক্ষন ভাবলাম। বুঝলাম ক্ষুদ্র এ জীবনে এগুলোর থেকে বেশী কিছু আসলে পাওয়ার নেই। তাই চাওয়ারও কোন মানে নেই। অর্থহীন এ সমগ্র সৃষ্টির মেলায় এই প্রাপ্তিগুলোই তো বরং অনেক অনেক বেশী...
আমি প্রশান্তিতে চোখ বুদলাম। আমার সারাটি মন ভরে গেল অস্তিত্বের আনন্দে, ভরে গেল একদম কানায় কানায়...
আমি পরিপুর্ণ হলাম আজ, তৃপ্ত হলাম দুই যুগ দীর্ঘ এক লোভাতুর জীবনের শেষে।
এমন সময় আমি দেবদূতের আগমন টের পেলাম। সে আসছে... আমি তা অনুভব করতে পারছি আমার সারা শরীর দিয়ে ... সে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে আমার এই ক্ষুদ্র স্বত্বার দিকে। উজ্জ্বল এক আলোর দরজা পার হয়ে সে ছায়া হয়ে এলো আমার বিছানার পাশে। তার দীর্ঘ রেশমী চুল উড়তে থাকলো শীতল এক স্নিগ্ধ বাতাসের ঝাপটায়। সে আমার বুকে হাত রাখলো। আমি প্রস্তুত হলাম। সে ঝুঁকে এসে চুমু খেলো আমার খসখসে ঠোঁটে। তার চুলের গন্ধে আমি মাতাল হলাম যেন। সে আমার বুকে হাত বুলিয়ে দিতে থাকলো... হাত বুলিয়ে দিতে থাকলো কোন এক আবেগবান মাঝির হাতের বৈঠার মত। তার সেই হাতরূপী বৈঠার মৃদু ধাক্কায় আমি এগিয়ে যেতে থাকলাম অদ্ভুত এক ঘুমের রাজ্যে... আমি তলিয়ে যেতে থাকলাম প্রশান্তিমাখানো চির অধরা এক ক্লান্তিহীন বিস্মৃতিতে...
হ্যাঁ, আমার জীবন সার্থক ছিল...
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ সকাল ৮:৩৮
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ওরা জিডিপি আর সেমিকন্ডাক্টরে ব্যস্ত , আমরা ব্যস্ত গোরুর জিয়াফত নিয়ে ....।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩৫


গতকাল মামার ফোন এল দুবাই থেকে, রাতের বেলা। বললেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই করে জিয়াফত খাওয়ার খবর এখান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, ব্যাপার কী? আমি বললাম, মামা, ওরা গরুর মাংস... ...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

তাবলিগে গিয়ে যা শিখলাম না

লিখেছেন মুনতাসির, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:৫৯

আমি যখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি, তখন আমার কয়েকজন বন্ধু তাবলিগ করত। তাবলিগের প্রতি আমার কখনোই আগ্রহ ছিল না। তবে ওরা নিজেরা রান্না করত, আর আমি রান্না করতে পছন্দ করি। তাই একদিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”- শুনতে চমৎকার, জনপ্রিয়ও বটে। কিন্তু কথাটি কি ধর্মীয় বিশ্বাসের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ?
আমার কাছে তা নয়। এধরণের বাণী... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি আরবে নারীসহ দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ: প্রতিমন্ত্রী, নাকি পাপেট?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০


গত বুধবার সৌদি আরবের শরিয়া আদালত একজন নারীসহ দুই বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের শিরশ্ছেদ কার্যকর করেছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যে বিবৃতিটি দিয়েছেন, সেটা পড়ে বোঝা গেল যে, পররাষ্ট্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

×