অপরূপ সৌন্দর্যে ভরা কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত। এই সৈকতে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়, যা বিশ্বে বিরল। এ জন্য সব ঋতুতেই দেশী-বিদেশী পর্যটকের পদভারে মুখরিত থাকে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত।
কিন্তু জোয়ারের পানি বৃদ্ধি ও প্রচণ্ড ঢেউয়ের তাণ্ডবে বালুক্ষয়ে সমুদ্র সৈকতটি লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে সৈকত লাগোয়া সংরক্ষিত বনাঞ্চলের শত শত গাছ। এতে শ্রীহীন হয়ে পড়ছে সৈকতটি। এভাবে চলতে থাকলে শিগগিরই অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়তে পারে সাগরকন্যা কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত।
অব্যাহত ভাঙনের কারণে ৮ কিলোমিটারের প্রশস্ত সৈকতটি এখন এত সঙ্কোচিত হয়ে পড়েছে যে, জোয়ারের সময় পর্যটকরা বেলাভূমিতে নামতে পারছেন না। ভাঙনের হাত থেকে রক্ষার জন্য সরকার উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপও নিচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ সমুদ্রগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী লিংকন বায়েন দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘এভাবে সৈকত-সংলগ্ন গাছপালা সমুদ্রগর্ভে বিলীন হতে থাকলে পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। বালুক্ষয় রোধ করার জন্য সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’
দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে রয়েছে ব্যাপক সম্ভাবনা। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকার গ্রহণ করেছে নানা পরিকল্পনা। এরই মধ্যে ২০১৬ সালকে সরকারের তরফ থেকে পর্যটনবর্ষ ঘোষণা করা হয়েছে।
দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটা অন্যতম একটি পর্যটন কেন্দ্র। এর মধ্যেই বিশ্বব্যাপী সুখ্যাতি অর্জন করেছে সাগরকন্যা কুয়াকাটা। কিন্তু দফায় দফায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সাগরের রুদ্র-রোষের কারণে হারিয়ে গেছে কুয়াকাটার মূল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এরই মধ্যে সাগর বক্ষে হারিয়ে গেছে সৈকতের সৌন্দর্য হিসেবে খ্যাত ফয়েজ মিয়ার ‘ফার্মস এ্যান্ড ফার্মস’-এর সারি সারি নারিকেল, ঝাউ, তাল, সেগুন, কুল, লেবু, আম ও পেয়ারা বাগান।
এ ব্যাপারে ফয়েজ মিয়ার বাগানের বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘বহু বছর যাবৎ সমুদ্র পাড়ে বাস করছেন তিনি। কিন্তু প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে বসতঘর উপরের দিকে আনতে আনতে এখন ক্লান্ত তিনি।’
ঢাকা থেকে কুয়াকাটায় বেড়াতে এসেছেন আকতার হোসেন ও তার স্ত্রী শিমা আক্তার। আক্তার হোসেন তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, ‘আমরা ১৫ দিন আগে কুয়াকাটায় এসে একটি আবাসিক হোটেল উঠেছি। আমরা ৫ বছর পূর্বে কুয়াকাটায় বেড়াতে এসেছিলাম। তখনকার কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের অবস্থা আর এখনকার অবস্থা অনেকটা পাল্টে গেছে। আগের সেই সৌন্দর্য যেন ক্রমেই ম্লান হতে চলেছে। আসলে এভাবে বালুক্ষয় হতে থাকলে হয়ত অদূর ভবিষ্যতে এটি বিলীন হয়ে যেতে পারে। বর্তমানেই তো কুয়াকাটা বেশ শ্রীহীন হয়ে পড়েছে।’
এ ছাড়া সৈকতের কোলঘেঁষা ‘কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যান’ এখন পুরোপুরি হুমকির মুখে। এরই মধ্যে উদ্যানটির এক অংশ সাগর বুকে বিলীন হয়ে গেছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন বহু হোটেল-মোটেল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ ব্যাপারে উপকূলীয় মানব উন্নয়ন সংস্থা’র (সিকোডা) নির্বাহী পরিচালক মিজানুর রহমান দ্য রিপোর্টকে জানান, উপকূল রক্ষার জন্য সরকারকে দ্রুত সময়ের মধ্যে বালুক্ষয় রোধের উদ্যোগ নিতে হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত ভাঙ্গনের কবলে পড়েনি। বালুক্ষয়ের কারণেই কুয়াকাটার মানচিত্র ছোট হচ্ছে।
বালুক্ষয় রোধের জন্য খাজুরা পয়েন্টে একটি গ্রোয়েন বাঁধ নির্মাণ করতে পারলে ঢেউয়ের তাণ্ডব থেকে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত রক্ষা সম্ভব বলে মত দিয়েছেন অনেকেই।
এ ব্যাপারে রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির লতাচাপলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শফিকুল আলম দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘পশ্চিম কুয়াকাটা অথবা খাজুরা লেবুর চর এলাকায় একটি গ্রোয়েন বাঁধ নির্মাণ করলে জোয়ার-ভাটার মূল স্রোত বাঁধাপ্রাপ্ত হবে। ফলে স্রোতের গতি কমে গেলেই বালুক্ষয় বন্ধ করা সম্ভব হবে।’
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এম এ মোতালেব শরীফ দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘কুয়াকাটায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিনিয়োগকারীরা কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। সৈকত বিলীন হয়ে গেলে বিনিয়োগকারীদের অবস্থা কী হবে? তাই সরকারকে দ্রুত এ ব্যাপারে পদপেক্ষ নেওয়া উচিত।’
এ ব্যাপারে কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল খায়ের দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের ভাঙন রোধে প্রাথমিকভাবে এক কিলোমিটার জিওটিউব’র একটি ডিজাইন কাজ চলছে। শিগগিরই এ কাজ শুরু হবে।’
সূত্র- দ্য রিপোর্ট২৪
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই আগস্ট, ২০১৫ সকাল ১০:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


