‘ব্লগার’ ইস্যুতে হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন করেছে সরকার। গত শুক্রবার রাজধানীর গোড়ানে ব্লগার নিলয় নীল হত্যার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশ প্রধান একেএম শহিদুল হক অপরাধীদের গ্রেফতারের আশ্বাসের পাশাপাশি ব্লগে ধর্ম অবমাননা করলে তাকেও শাস্তির আওতায় আনার কথা বলেছেন। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে ব্লগে লেখাকেও সরকার অপরাধ হিসেবে দেখছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার রাজনৈতিক কারণে তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘এটা সুস্পষ্ট যে তারা (সরকার) রাজনৈতিক বিবেচনায় আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। যারা ব্লগারদের হত্যা করছে কিংবা ব্লগারদের হুমকি দিচ্ছে— তাদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নিতে পারছে না বা নিচ্ছে না, এটা আশঙ্কার কথা; যা নিয়ে অনেক রকম প্রশ্ন উঠছে।’
হঠাৎ কেন রাজনৈতিক বিবেচনায় সরকার আগের অবস্থান থেকে সরে আসছে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা ডানপন্থীদের সঙ্গে আপোসকামিতা। আপোসকামিতার জন্যই সরকার নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে।’
ব্লগার ইস্যুতেই তো হেফাজতে ইসলামের সৃষ্টি হয়েছিল, তখনও তো সরকার ব্লগারদের পক্ষেই ছিল—এমন প্রশ্নের জবাবে সুজন সম্পাদক বলেন, হেফাজতে ইসলাম সৃষ্টি করেছে কে? হেফাজতে ইসলামকে ঢাকায় এনেছে কে?
তাহলে কী সরকারই হেফাজতে ইসলাম সৃষ্টি করেছে বলতে চাচ্ছেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘আপিনই এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে দেখেন, কারা সৃষ্টি করেছে তাদের।’
বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘সরকার বলেছে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত অপরাধ, এটাকে আমলে নিচ্ছে। এটাকে আমি সমর্থন করি। একই সঙ্গে বলব— হত্যাকাণ্ডও কোনো সমস্যার সমাধান না, আইন কোনো অবস্থাতেই নিজের হাতে তুলে নেওয়াকেও সমর্থন করি না।’
তিনি বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট বা ওই সব ব্লগাররাই আক্রান্ত হচ্ছে যারা ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত দেয়। সাধারণ ব্লগাররা আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে না, বা হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে না। সে জন্যই হয়ত সরকার বাস্তবতার আলোকে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে। এ জন্য তাদের আমি সমর্থন জানাই, স্বাগত জানাই।’
এতদিন পর কেন সরকার তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে আসছে— এমন প্রশ্নের জবাবে মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ ইবরাহিম বলেন, ‘সরকার হয়ত বুঝতে পারছে তাদের জনপ্রিয়তা আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে। আর ভোটের রাজনীতি তো এতে অবশ্যই আছে।’
সিপিবির পলিট ব্যুরোর সদস্য হায়দার আকবর খান রনো দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘যেসব ব্লগারদের হত্যা করা হয়েছে, অপরাধীদের খুঁজে বের করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু সরকার তা না করে যে এটিচ্যুড দেখাচ্ছে তা ভালভাবে দেখছি না।’
কেন সরকারের এই পরিবর্তন? এ ব্যাপারে রনো বলেন, ‘তারা চালাকি করছে। সরকার আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে, আর খালেদা জিয়া তো আগেই তাদের (ব্লগার) নাস্তিক বলে ঘোষণা দিয়েছে। পুরোটাই রাজনৈতিক।’
তবে এটিকে পরিবর্তন হিসেবে দেখতে নারাজ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য সিনিয়র রাজনীতিক সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি বলেন, ‘সরকার আগের অবস্থানেই আছে। যে কেউ আইন ভাঙলে, প্রচলিত আইনে তার বিচার হবে। এটা তো নতুন কিছু নয়।’
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ত্বরান্বিত করার দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের সৃষ্টি হয়। ২০১৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ব্লগার রাজিব হায়দার গণজাগরণ মঞ্চ থেকে বাসায় ফেরার পথে রাজধানীর মিরপুরে খুন হন। এ ঘটনার পর ব্লগার রাজিবসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননা করে বিভিন্ন ধরনের লেখালেখির অভিযোগ উঠে। ধর্ম অবমাননাকারীদের শাস্তি দাবিতে সৃষ্টি হয় কওমী মাদরাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। এ দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ এপ্রিল ও ৬ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে বড় ধরনের সমাবেশও করে সংগঠনটি। ৬ মে রাতে শাপলা চত্বরে হেফাজত কর্মীদের অবস্থান নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। হতাহতের সঠিক তথ্য আজও পাওয়া যায়নি।
এর পেছনে উগ্রবাদী বা জঙ্গিগোষ্ঠীর জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এ অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে অতীতে গ্রেফতারও করা হয়।
এদিকে গত শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর গোড়ানে ব্লগার নিলয় নীল হত্যাকাণ্ডের পরপরই উগ্রবাদীদের গ্রেফতারের পাশাপাশি যারা ব্লগে ধর্ম অবমাননা করছে তাদের বিরুদ্ধেও প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের আইজি একেএম শহিদুল হক।
সর্বশেষ বুধবার রাজধানীর রমনায় তথ্য ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘প্রত্যেক ধর্মের মানুষের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা থাকবে। কেউ কারো ধর্মে আঘাত দিয়ে কোনো কাজ করবে না এবং বলবে না। সেভাবেই আমরা বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চাই।’
সূত্র- www.thereport24.com এর বিশেষ সংবাদ পেজ থেকে।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই আগস্ট, ২০১৫ সকাল ৯:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


