পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর অতিরিক্ত সালফারযুক্ত কয়লার অধিকাংশই অবৈধ প্রক্রিয়ায় দেশে আসছে। আর এ কয়লা ইটভাটাসহ দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহারের ফলে পরিবেশের ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে। অথচ এ অবৈধ প্রক্রিয়া রোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগই নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
পরিবেশ অধিদফতর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ব্রিক ম্যানুফ্যাকচারার্স ওনার্স এ্যাসোসিয়েশন ও পরিবেশবিদদের সঙ্গে আলাপ করে হতাশাজনক এ সব কথা জানা গেছে।
সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, সরকারের সংশ্লিষ্ট কোনো দফতর জানেই না দেশে কয়লার চাহিদা কত এবং প্রতি বছর কী পরিমাণ কয়লা এখানে ব্যবহৃত হয়? অথচ দিন দিন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বেড়েই চলেছে আমদানিনির্ভর কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের সংখ্যা। এদিকে তাৎক্ষণিক অতিরিক্ত লাভ ও কম দামের কথা ভাবনায় নিয়ে অতিরিক্ত মাত্রার সালফারের অস্তিত্বের কথা জেনেও ভারত থেকে কয়লা আমদানি বন্ধ করা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এ্যান্ড টেকনোলজি (বুয়েট)-এর কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. ইজাজ হোসেন দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘দেশে ব্যবহৃত কয়লার শতকরা ৯০ ভাগই প্রশাসনের হাত গলে এখানে আসে। এক শ্রেণীর আমদানিকারক কাস্টমসের উদাসীনতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন কূটকৌশলে এ সব কয়লা এ দেশে এনে বাজারজাত করে থাকে। দেশের ইটভাটা, চায়ের দোকান, রি-রোলিং স্টিল মিল, রাস্তা তৈরি ও সংস্কারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ কয়লা খোলামেলাই ব্যবহার হয়। বেআইনী এই কাজ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সকলে জানেন। তবে প্রতিকারের জন্য কাউকে কিছুই করতে দেখা যায় না।’
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এ পর্যন্ত কয়লার অব্যবস্থাপনা রোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পরিচালিত হয়নি কোনো জরিপ। সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থাই বলতে পারবে না দেশে কী পরিমাণে কয়লা দরকার এবং তা কোন দেশ থেকে কীভাবে আনা উচিত।’
এনডিপি, বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ও নিজের করা বিভিন্ন সময়ের কাজের বরাতে এই শিক্ষক বলেন, ‘দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে প্রতি বছর ৮ লাখ থেকে ৯ লাখ টন কয়লা উত্তোলন করা হয়ে থাকে। উত্তোলিত এই কয়লা প্রতি বছরই সরকারের বিপিডিবির মালিকানাধীন বড়পুকুরিয়া ২৫০-৩০০ মেগাওয়াট (তৃতীয় ইউনিট) বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের চাহিদা মেটানোর পর কোনো কোনো বছর সামান্য পরিমাণ কয়লা স্থানীয় ইটভাটাগুলোকে দেওয়া হয়। দেশের অভ্যন্তরের আর কোনো খনি থেকে এখনো কয়লা উত্তোলন করা হয় না। অথচ রামপাল তাপবিদ্যুৎসহ কয়লাভিত্তিক বিভিন্ন প্রকল্পের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ১৩৬০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে বছরে আরও অতিরিক্ত ৪৫ লাখ টন কয়লা লাগবে, যা বর্তমানে সারাদেশের মোট ব্যবহৃত কয়লার সমান। ভারত থেকেই এ কয়লা আমদানি করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশের ইটভাটা, চায়ের দোকান, রি-রোলিং স্টিল মিল, রাস্তা তৈরি ও সংস্কারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কয়লার পুরোটাই বিদেশী কয়লার ওপর নির্ভরশীল। বেসরকারি উদ্যোক্তারাই এই চাহিদার পুরোটাই যোগান দিয়ে থাকে। বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি করা অতিরিক্ত সালফারযুক্ত এ কয়লার প্রায় পুরোটাই ভারত থেকে আমদানি করা হয়। সরকারের বেঁধে দেওয়া নিয়ম মেনে কাগজপত্রে যে পরিমাণ কয়লা আমদানির কথা বলা হয়, বাস্তবে ব্যবহার হয় তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি।’
পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার প্রসঙ্গ টেনে ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘দেশে প্রায় ৬ হাজার ইটভাটা রয়েছে। প্রতি ইটভাটায় বছরে ৪০ থেকে ৪৫ লাখ ইট উৎপাদন হয়। প্রতি লাখ ইট উৎপাদনের জন্য ২০ টন কয়লা লাগে। এ হিসাবে এই ইটভাটাগুলোর জন্য বছরে প্রায় ৪৮ লাখ টন কয়লা ব্যবহার হয়। এ ছাড়া প্রতি বছর দেশের চায়ের দোকান, রি-রোলিং স্টিল মিল, রাস্তা তৈরি ও সংস্কারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও অন্তত ২ লাখ মেট্রিক টন কয়লা ব্যবহার করা হয়। এ সব মিলিয়ে বর্তমানে দেশে প্রতি বছর ৫০ লাখ মেট্রিক টন কয়লার দরকার পড়ে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ সব ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কয়লা ও কাগজপত্রে আমদানি করা কয়লার মধ্যে ব্যাপক গরমিল লক্ষ্য করা যায়। এ হিসাব থেকেই বলা যায়, দেশে ব্যবহৃত কয়লার অধিকাংশই আসে অবৈধভাবে। প্রায় সকল আমদানিকারকই বিভিন্ন কূটকৌশলে তাদের ঘোষণার বাইরে ৪-৫ গুণ এবং ক্ষেত্রবিশেষে আরও বেশি পরিমাণ কয়লা বিনা শুল্কে এনে থাকে। অবৈধভাবে আসায় এ সব কয়লায় সালফারসহ ক্ষতিকর উপাদান অনেক বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়। ভারত থেকে আনা কয়লায় শতকরা ৬ থেকে ৭ ভাগ সালফার পাওয়া যায়। অথচ পরিবেশ আইনে শতকরা ১ ভাগের চেয়ে বেশি সালফার থাকা কয়লা আমদানি বেআইনী। ভারতীয় কয়লায় সালফার বেশি থাকে। তাই ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা বা অন্য কোনো দেশ থেকে কয়লা আমদানি করলে ভাল হয়।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক রইছউল আলম মণ্ডল দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘বাজারের কয়লা অবৈধভাবে আসে কিনা তা দেখার দায় এই অধিদফতরের নয়। তবে এতে অনেক সময় শতকরা ১০ ভাগ পর্যন্ত সালফার পাওয়া যায়। ভারত থেকে কয়লা আনলে সালফার বেশি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ ভারতীয় কয়লায় সালফার বেশি থাকে। ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা বা অন্য কোনো দেশ থেকে আমদানি করা হলে কম সালফারের কয়লা পাওয়া যাবে। তবে তাতে যে বাড়তি খরচ হবে, তার সক্ষমতা কি আপনাদের আছে?’
পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক (এয়ার কোয়ালিটি) মাহমুদ হাসান খান দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘দেশে ৬ হাজার ইটভাটা রয়েছে। এই ভাটাগুলোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বছরে কী পরিমাণ কয়লা ব্যবহার করে থাকে তা আমাদের জানা নেই। এ সংক্রান্তে কোনো জরিপ কখনো হয়নি।’
দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির জেনারেল ম্যানেজার (মাইন অপারেশন) হাবিব উদ্দিন বলেন, ‘এই খনি থেকে বছরে ১ মিলিয়ন মেট্রিক টন কয়লা উত্তোলনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। প্রায় প্রতি বছরই এই টার্গেটের প্রায় পুরোটাই অর্জিত হয়ে থাকে। পিডিবির থার্মাল পাওয়ার প্লান্টে এই কয়লা ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া কোনো কোনো বছরে কিছু কয়লা এখানকার ইটভাটাগুলোকে দেওয়া হয়ে থাকে। বড়পুকুরিয়া ছাড়া দেশের অন্য কোনো ক্ষেত্র থেকে কয়লা উত্তোলন হয় না।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্রিক ম্যানুফ্যাকচারার্স ওনার্স এ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মিজানুর রহমান বাবুল দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ৬ হাজার ইটভাটা রয়েছে। ভাটাগুলোর সবটাতেই এখন কয়লা ব্যবহার করা হয়। ভাটাগুলোতে বছরে ৪০ থেকে ৪৫ লাখ ইট প্রস্তুত হয়ে থাকে। প্রতি লাখ ইট প্রস্তুতের জন্য ১৮ থেকে ২০ মেট্রিক টন কয়লা লাগে। এই কয়লার পুরোটাই আমদানি করা হয়। এ যাবৎকাল এ সব কয়লা প্রধানত ভারত থেকেই আমদানি করা হয়েছে। ভারত থেকে আমদানি করা কয়লা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এতে শতকরা ১০ থেকে ১২ ভাগ পর্যন্ত সালফার পাওয়া যায়। ভারতীয় এ সব কয়লা সিলেটের তামাবিলসহ সীমান্তের বিভিন্ন শুল্ক স্টেশন দিয়ে আসে। আমদানিকারকরা ভারত থেকে এবং তামাবিল দিয়েই কয়লা আমদানির ব্যাপারে বেশি উৎসাহী। আমদানিকারকরা তাদের ঘোষণার চেয়ে অনেকগুণ বেশি কয়লা এনে থাকে এই সীমান্ত দিয়েই।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইন্দোনেশিয়া বা দক্ষিণ আফ্রিকার কয়লায় সালফারের মাত্রা কম থাকে। কিছুটা দাম বেশি পড়লেও এই কয়লা পরিবেশের জন্য সহনশীল। এতে শতকরা ১ থেকে ২ ভাগ সালফার থাকে। এ কয়লার দামও খুব বেশি পড়ে না। প্রতি টন ভারতীয় কয়লা ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। ইন্দোনেশিয়া বা দক্ষিণ আফ্রিকার কয়লা ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় পাওয়া যায়, যা আমাদের পক্ষে এ্যাফোর্ট করা কষ্টের নয়। দেশের মানুষের স্বাস্থ্যরক্ষার উপযোগী পরিবেশের কথা ভাবনায় নিয়ে আমাদের ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা বা অন্য কোনো দেশের কয়লা ব্যবহার করা জরুরী।’
কাস্টমস কমিশনারেটের সেকেন্ড সেক্রেটারি ও ডেপুটি কমিশনার সাধন কুমার কুণ্ডু জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সার্ভারের বরাত দিয়ে দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘ম্যানুয়ালি পরিচালিত শুল্ক স্টেশনগুলো বাদে দেশে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের জুন পর্যন্ত ১৮ লাখ ৬ হাজার ২১০ মেট্রিক টন কয়লা আমদানি করা হয়েছে। দেশের ম্যানুয়ালি পরিচালিত শুল্ক স্টেশনের হিসাব ধরলে কয়লা আমদানির পরিমাণ আরও কিছু বাড়তে পারে। সারাদেশে বছরে কী পরিমাণ কয়লা আমদানি করা হয়েছে তা সমন্বয় করে দেখা হয়নি। এ ধরনের সমন্বিত কোনো তথ্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংশ্লিষ্ট বিভাগে নেই।’
সিলেট কাস্টমস ডিভিশনের সহকারী কমিশনার বায়োজিদ হোসেন এ বিষয়ে বলেন, ‘সিলেটের তামাবিল দিয়ে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ভারত থেকে ৪১ হাজার ৬২৯ টন কয়লা আমদানি করা হয়েছে। ভারতের পরিবেশবাদী গ্রুপের মামলার কারণে এ বছরের বেশিরভাগ সময় সেখানে কয়লা উত্তোলন বন্ধ ছিল। তাই এ বছর কয়লা আমদানি কম হয়। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এই শুল্ক স্টেশন দিয়ে ২ লাখ ১২ হাজার ৫০১ টন কয়লা আমদানি হয়েছিল। দেশের ইটভাটাগুলোর চাহিদার কথা বিবেচনা করেই এ কয়লা আমদানি হয়ে থাকে। ২০১৫ সালে আমদানি কম হওয়ার ইটভাটাগুলো কাঠ বা আগের আনা কয়লা দিয়ে ইট প্রস্তুত করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগে আমদানিকারকরা ঘোষণার চেয়ে অধিক পরিমাণ কয়লা আনতে সক্ষম হতো। কিন্তু ভারতীয় কাস্টমস ওয়্যার ব্রিজ বসানোর কারণে এখানকার ৩০০ আমদানিকারক এখন আর সে সুযোগ পাচ্ছেন না। ওয়্যার ব্রিজের উপর দিয়ে আসতে বাধ্য হওয়ার কারণে এখন ঘোষণা অনুযায়ীই কয়লা আনতে হচ্ছে। এখন আর ১ টনের ঘোষণা দিয়ে ৫-৬ টন কয়লা আনা যাচ্ছে না।’
সংগ্রহ- দ্য রিপোর্ট২৪
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে আগস্ট, ২০১৫ সকাল ৯:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


