somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

লাইটার

২৩ শে আগস্ট, ২০১২ রাত ১০:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রায় ১৩ ঘণ্টার দীর্ঘ পথ পরিভ্রমণ শেষে সিউলের ইনচন এয়ারপোর্টে যখন নামলাম তখন রাত গড়িয়ে ভোর। ধূমপানের মতো বদ অভ্যাস থাকায় ১৩ ঘণ্টা আমার কাছে ৩৩ ঘণ্টার মতো দীর্ঘ মনে হ্ি‌চ্ছল। উড়োজাহাজে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বিধায় পকেটে একটা মোটাসোটা সিগারেটের প্যাকেট থাকলেও তাকে 'স্লিম' করার সুযোগ পাচ্ছিলাম না। মাঝখানে অবশ্য ব্যাংকক এয়ারপোর্টে পাঁচ ঘণ্টার লম্বা বিরতি ছিল। সেই বিরতিতে অনেক খোঁজাখুঁজি করে স্মোকিং রুম বের করে, একটা মাত্র সিগারেট টানতে পেরেছিলাম। অবশ্য প্রথম বিদেশ যাত্রা হওয়ায় স্মোকিং রুম খুঁজতে ব্যাংকক এয়ারপোর্টের ভেতরেই হাঁটতে হয়েছিল কয়েক কিলোমিটার পথ। তারপর আবার প্রায় ১০ ঘণ্টার বিরতিতে সিগারেটের নেশাটা চরমে গিয়ে ঠেকল। আমার মস্তিষ্ক বারবার জানান দিচ্ছিল, সময় পার হয়ে যাচ্ছে; দ্রুত সিগারেট ধরাও কিন্তু অসহায়ের মতো সিগারেট খাওয়ার সুযোগ খুঁজে খুঁজে মস্তিষ্ককে প্রবোধ দেয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারলাম না।

ইনচন এয়ারপোর্টের বাইরে পা দিয়ে প্রেমে অন্ধ, দুর্বিনীত কিশোরের মতো আমাদের গাইডকে বললাম, হোইয়ার ক্যান আই স্মোক?
গাইড মহিলা আমার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে ইনচন এয়ারপোর্টের দরজার পাশের 'ইউজ মি' লেখা অ্যালুমিনিয়ামের লম্বা বাক্স দেখিয়ে বলল 'দেইয়ার'। আমি সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে সেখানে গিয়ে দেখলাম আমার মতো আরও দু'একজন ধূমপায়ী ভোরের আলো না ফুটতেই হাজির হয়েছে অ্যালুমিনিয়ামের লম্বা বাক্সের পাশে। সিগারেট ঠোঁটে ঝুলিয়ে পুরনো অভ্যাস মতে পকেটে হাত ঢুকিয়ে দ্বিতীবারের মতো খেয়াল হল- লাইটারটা সঙ্গে নেই। বাংলাদেশ এয়ারপোর্টের নিরাপত্তা কর্মীরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আমার কাছ থেকে লাইটারটা রেখে দিয়েছিল। ব্যাংকক এয়ারপোর্টের স্মোকিং রুমে এক সাদা চামড়ার ভদ্রলোকের কাছ থেকে লাইটার চেয়ে নিয়ে সিগারেট ফুঁকেছিলাম। এবার আর দেরি না করে অচেনা এক কোরিয়ান ভদ্রলোককে বললাম, 'ক্যান আই হ্যাভ ইউর লাইটার?' ভদ্রলোক আমার ইংরেজি এক বিন্দুও যে বুঝল না তা তার চোখ মুখের অভিব্যক্তি দেখে বেশ বুঝা গেল। তবে ব্যতিক্রমী কাজে জড়িত মানুষদের কিছু 'ইউনিভার্সাল লেঙ্গুয়েজ' থাকে। আমার মুখে ঝুলে থাকা সিগারেট আর আঙ্গুলের নড়াচড়া দেখে যা বুঝার বুঝে নিল কোরিয়ান ধূমপায়ী ভদ্রলোক। হাসি হাসি মুখে এমনভাবে লাইটারটা এগিয়ে দিল, যেন সে আমাকে লাইটার দেয়ার জন্য ইনচন এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে আছে। আমি প্রায় ১০ ঘণ্টার বিরতির পর আবার একটা সিগারেট ধরালাম। কিন্তু ভাগ্য যেন আমার প্রতি একেবারে নির্দয়। দীর্ঘ বিরতির পর ধরানো সিগারেটটা যেমন আয়েশ করে টানার নিয়ম, তেমন আয়েশ করে টানা হলো না। আমাদের নিতে আসা অদূরে দাঁড়ানো বাসের ড্রাইভার হর্ন বাজিয়ে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে লাগল। অন্যের বিরক্তির কারণ হতে না চাওয়ায় আমি জোরে জোরে, দ্রুত এবং অগভীর কয়েকটা টান দিয়ে প্রায় দুই তৃতীয়াংশ সিগারেটটা বাক্সের বালুতে গুঁজে বাসের দিকে হাঁটতে থাকি। মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দেই : দাঁড়াও, জায়গামতো পৌঁছে নেই; তারপর আয়েশ করে এতক্ষণ তৃপ্তি সহকারে ফুঁকতে না পারা সিগারেটটা মনের মতো করে ফুঁকব।

কিন্তু ভাগ্যদেবী বাংলাদেশে ধূমপায়ীদের প্রতি যতটা প্রসন্ন, বিদেশে যেন ততটাই অপ্রসন্ন। কোরিয়ান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি আর সবার মতো আমাদেরও থাকার ব্যবস্থা করে ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন সেন্টারে। দেশ থেকেই জেনে গিয়েছিলাম ওই সেন্টারে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা পাঁচ তারকা হোটেলের মতো। পাঁচ তারকা হোটেল বিষয়ে আমার কোন ধারণা নেই। বাংলাদেশের শেরাটন আর সোনারগাঁও হোটেলের লবিতে দু'একবার হাঁটাহাঁটির অভিজ্ঞতা নিয়ে 'পাঁচ তারকা' বিষয়ে কোন ধারণা করাটা হাস্যকর ছাড়া আর কিছু নয়। অন্য সবার মতো আমিও ধর্ম রক্ষার বিষয়ে সদা চিন্তিত মাকে অভয় দিয়ে বলে এসেছি, থাকা খাওয়া নিয়ে চিন্তার কোন কারণ নেই; সবকিছু ফাইভ স্টার মানের। আমার মাও আর সবার মতো ধারণা ছাড়াই 'ফাইভ স্টার' শব্দ শুনে ভেবে নিয়েছে সবচেয়ে ভালো কিছু।

আমাদের থাকার জায়গা মানে ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন সেন্টারের ডাইনিংয়ে গিয়ে দেখলাম এলাহি কারবার। বিশাল ডাইনিংজুড়ে নানা বর্ণের, নানা দেশের, নানা পেশার এবং অবশ্যই নানা পোশাকের মানুষ। কেউ এসেছে ইউরোপ থেকে কেউ আফ্রিকা থেকে, কেউবা ফিজি, নাউরুর মতো ছোট ছোট দ্বীপ দেশ থেকে। তবে এশিয়ানদের সংখ্যাই বেশি। বাংলাদেশ ছাড়াও বার্মা, ফিলিপিন, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, জর্দান, ইরাক ইত্যাদি নানা দেশের কয়েকটা দল আছে। চেহারায় মিল থাকায় কয়েকটা দেশের মানুষদের আলাদা করে চিনে নেয়াও কঠিন।
একসঙ্গে কয়েকটা কোর্স চলছে। আমরা যেদিন এলাম সেদিন চলে গেল তাজাকিস্তানের একটা দল। আবার দু'দিন পার হতেই দেখলাম ডোমেনিকান রিপাবলিকের একটা দল এলো। ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন সেন্টারে আসা-যাওয়া যেন নিত্য নৈমত্তিক বিষয়। কোন দেশ থেকে কেউ এসেছে জলবায়ুর পরিবর্তন নিয়ে জানতে, কেউ এসেছে উড়োজাহাজ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে, কেউ এসেছে কৃষির আধুনিক প্রযুক্তির বিষয়ে জ্ঞান নিতে। এত রকমারি ধর্ম আর সংস্কৃতির মানুষদের খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন নিয়ে বিচলিত না হয়ে পারা যায় না। সে জন্য সবাইকে বিশেষত মুসলমানদের আশ্বস্ত করতে ডাইনিংয়ে ঢোকার মুখে বড় বড় করে লেখা, 'অল আর হালাল ফুড'।
বাঙালি সন্দেহপ্রবণ জাতি; সন্দেহ নিয়ে তার দিবা-নিশি বসবাস। বিদেশীদের লেখা 'হালাল ফুড খুব' বেশি আশ্বস্ত হতে পারে না। বিশেষত দলবদ্ধ থাকা অবস্থায় নিজেদের মুসলমানিত্ব রক্ষায় আরও বেশি সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠে। পাছে ধর্মনাশের বিষয়টি দলের কেউ দেশে পৌঁছে দেয়, এ ভয়ে মাত্রাতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে সবাই বদ্ধ পরিকর থাকে। তাই ওই বড় বড় হরফের লেখা আমাদের কপালের ভাঁজ কিংবা সন্দেহ দূর করতে খুব পেরেছিল বললে ভুল হবে। বিশেষত শূকরের মাংস খেয়ে ধর্ম নষ্টের ভয়ে অনেকেই শাকসবজি খেয়ে জীবন ধারণ করতে বাধ্য হয়েছিল।

ওই হেস্টেলের প্রতিটি রুম শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত; সঙ্গে আছে অ্যাটাচ বাথ আর ৪২ ইঞ্চি এলসিডি টিভি। বাথরুমে সাবান আর শ্যাম্পু সাজানো ছিল আগে থেকেই; রুমে ঢুকতে না ঢুকতেই চিরুনি, টুথপেস্ট থেকে শুরু করে সুই সুতা পর্যন্ত দিয়ে গেলে প্রথম অনুধাবন করলাম 'ফাইভস্টার' কি? এত বিশাল আয়োজন, এত এত জিনিসের ছড়াছড়ির পরও রুমের দেয়ালে ঝুলানো 'স্মোকিং ইজ স্ট্রিক্টলি প্রোহেভিটেড' কথাটা আমাকে বিমর্ষ করে দিল। রুমের ভেতরে রক্ষিত নির্দেশনায় দেখলাম নিজ রুমে সবই করা যাবে, কেবল ধূমপান ছাড়া। আমরা বিছানায় শুয়ে, বালিশে হেলান দিয়ে, কাৎ হয়ে, চিৎ হয়ে সিগারেট খাওয়া মানুষ। চাদর কিংবা বালিশ সিগারেটের আগুনে পুড়ায়নি এমন সিগারেট খাওয়া বাঙালি দুর্লভ। আমি একরকম কষ্টই পেলাম বলা যায়। মনে মনে ভাবলাম কিছু জিনিস কম দিয়ে রুমে একটু ধূমপানের ব্যবস্থা রাখলে কি এমন ক্ষতি হতো?
বিদেশে গিয়ে বুঝলাম ধূমপানকে তারা নিষিদ্ধ না করে কষ্টকর করে তুলছে। রুমে সিগারেট নিষিদ্ধ হলেও ধূমপানের জন্য একটা ব্যবস্থা তারা রেখেছে। ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন সেন্টারের হোস্টেলের বাইরে ছাতা দেয়া কয়েকটা লম্বা টেবিল চেয়ার পাতা আছে। রোদ-ঝড়-বৃষ্টি, বাইরে যা-ই থাকুক না কেন- কেউ ধূমপান করতে চাইলে তাকে অবশ্যই সেই ছাতা দেয়া জায়গায় যেতে হবে। যদিও কোরিয়ানরা অক্টোবরকে বলে 'অউটাম' কিন্তু তাপমাত্রা বাংলাদেশের মাঘের শীতকেও হার মানায়। সঙ্গে আছে কথাবার্তা ছাড়া বড় বড় ফোঁটার বৃষ্টি। বিশেষত রাতে তীব্র শীতের মাঝে এবং প্রায়ই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে সিগারেট খাওয়াকে বড় ধরনের একটা শাস্তি বলে মনে হতো। সেই বৃষ্টিস্নাত শীতল রাতে ধূমপানের সময় মনে হতো আমি সিগারেট টানছি না, আমার দুষ্ট বালকের মতো মস্তিষ্কটাকে প্রবোধ দিচ্ছি মাত্র।

কোরিয়ায় অবস্থানের প্রথম দুই দিন ছিল সরকারি ছুটির দিন। সুতরাং হোস্টেলসংলগ্ন দোকান, যাকে বলে 'স্যুভেনির শপ' তাও বন্ধ। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রথম দুই দিন লাইটার কেনা হয়নি। স্মোকিং জোনে যেয়ে প্রত্যেকবার আমি ও আমার একমাত্র ধূমপায়ী সহকর্মী ইব্রাহিম লাইটারধারী কারও আগমন পর্যন্ত অপেক্ষা করে সিগারেট জ্বালাই। এতে কারও কোন আপত্তি চোখে পড়ে না; সবাই বেশ আন্তরিকতার সঙ্গেই লাইটার দেয়। লাইটার দেয়া নেয়া আর সিগারেট টানতে টানতে বন্ধুত্ব হয়ে যায় পাপুয়া নিউগিনি, সলোমন আইল্যান্ডে, নাউরু,পাকিস্তান, আফগানিস্তান. ভিয়েতনাম ইত্যাদি নানা দেশের মানুষের সঙ্গে। আমি যেমন জানতে চাই তাদের দেশ সম্পর্কে তারাও জানতে চায় বাংলাদেশকে। আমি আমার সীমিত ইংরেজি জ্ঞান দিয়ে 'বাংলাদেশ' বিষয়ে ধারণা দিতে চাই। সবার মধ্যে পছন্দ হোক বা না হোক ছোট্ট এ দেশটাকে নিয়ে আগ্রহ দেখি (কেউ কেউ হয়ত আগ্রহের অভিনয় করে)।
আগ্রহ দেখি না শুধু আরবদের। আরব মানে জর্দান আর ইরাকের দুটি দল। তারা নিজেদের মধ্যে আরবি ভাষায় কথা বলে। আমি খেয়াল করি, আমার পরিচয় পেলে বা গায়ের চামড়া দেখে তারা কেমন যেন উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। মনে হয় বাংলাদেশ নিয়ে তারা অনেক কিছু জানে, নতুন করে আর কিছু জানার নেই। ওদের উদাসীনতা আমাকে কষ্ট দেয়। আমি সিগারেট টানার সময় মাঝে মাঝে আমার পদ, পদবী, কর্ম বিষয়ে ধারণা দিয়ে তাদের কাছ থেকে শ্রমিক পরিচয়ের বাইরে খানিকটা সমীহ আদায়ের চেষ্টা করি কিন্তু কোথায় যেন একটা বাধা এসে আমাদের আটকে দেয়। আমার মনে হয় আমি যত যে-ই হই না কেন, তাদের চোখে আমার পরিচয় শ্রমিকের বাইরে আর কিছু নয়।

আমার কথা শেষ হলে তারা যখন আরবি ভাষায় নিজেদের মধ্যে কথা বলে তখন আমি বিব্রতবোধ করি। মনে হয় ওরা আমাকে নিয়ে কিংবা আমার দেশকে নিয়ে কিছু বলছে। ওদের কাছে আমি যেন শুধুই এক বাংলাদেশী। যে দেশের মানুষেরা অল্প কিছু টাকার জন্য তাদের দেশে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। বিনা-ভিসায় অথবা বিনা-অনুমতিতে চোরের মতো লুকিয়ে লুকিয়ে দিন গুজরান করে। আমার পদ-পদবীর চেয়ে তাদের কাছে আমার শ্রমিকের দেশের পরিচয়টা যেন মুখ্য। আবার মাঝে মাঝে ভাবি, হয়তো তারা ইংরেজিতে নিজেদের দুর্বলতার কারণে আমার সঙ্গে 'কমিউনিকেট' করতে পারে না। নিজেদের মধ্যে যখন আরবি ভাষায় কথা বলে, তখন হয়ত নিজেদের প্রয়োজনীয় কথাই বলে। কিন্তু আমি আমার মনের মধ্যে ধারণ করা মানসিকতার কারণে ভিন্ন ব্যাখ্যা করি। হাজার হোক তারা তো আমাদের 'মুজলিম ব্রাদার!'

তৃতীয় দিন স্যুভেনির শপ খুলে। আমি সঙ্গে নেয়া ডলারকে কোরিয়ান উনে রুপান্তর করি। প্রথমেই যাই স্যুভেনীর শপে। সেখানে সহকর্মী ইব্রাহিমের সঙ্গে দেখা হয়। তার হাতে দেখি খুব সাধারণ একটা লাইটার। আমাকে দেখেই ইব্রাহিম হাত টেনে স্যুভেনির শপের বাইরে নিয়ে আসে। যদিও ইব্রাহিম আমার সঙ্গে বাংলায় কথা বলে এবং আশপাশে অন্য কোন বাঙালি আমি দেখি না তথাপি ইব্রাহিম বাঙালির মজ্জাগত 'লুকোচুরি স্বভাব'টা আড়াল করতে পারে না। ফিসফিস করে আমাকে বলে,'স্যার, এরা ডাকাইত, একটা ১০ টাকার লাইটারের দাম রাখে দুই হাজার উন। মানে বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১৬০ টাকা। এক কেজি ব্রয়লার মুরগির চেয়ে বেশি দাম একটা লাইটারের। জিনিসও তেমন ভালো না। বাংলাদেশে এক প্যাকেট বেনসন কিনলে এমন একটা লাইটার ফ্রি দেয়।'
ইব্রাহিমের কথা আমি মনোযোগ দিয়ে শুনি। তারপর বলি, 'কিন্তু লাইটার তো একটা লাগবে; এভাবে মানুষের কাছে বারবার লাইটার চাওয়া কি ঠিক?' ইব্রাহিমের যেন যুক্তি ঠিক করা আছে। 'একটা লাইটার কিনছি ১৬০ টাকা দিয়া। আরেকটা কিন্না লাভ কি? আমরা তো স্যার, একসঙ্গে সিগারেট খাই। দুই জনের একটা লাইটার থাকলেই তো যথেষ্ট। আর আপনিতো এই লাইটার দেশে নিয়া যাইতে পারবেন না। এয়ারপোর্টে রাইখা দিব। সাত দিনের জন্য ১৬০ টাকা দামের একটা লাইটার কিন্না লাভ কি?'
ইব্রাহিমের যুক্তি আমার ভালো লাগে। একটা ১০ টাকা দামের লাইটারের জন্য বাংলাদেশী টাকায় ১৬০ টাকা খরচের কি মানে আছে? আমি ইব্রাহিমের সঙ্গে একমত পোষণ করি। লাইটার না কিনে স্যুভেনির শপ থেকে চলে আসি।
আমি ও আমার দলের একমাত্র ধূমপায়ী সহকর্মী ইব্রাহিম, অন্য ধূমপায়ীদের মতো দিনে পাঁচ-সাতবার স্মোকিং জোনে যাই। কোরিয়ায় সিগারেটের দাম বেশি হওয়ায় দেশ থেকে নিয়ে যাওয়া বেনসন অ্যান্ড হেইজেস টানি। সিগারেট টানতে টানতে বিদেশীদের 'বাংলাদেশ ইজ এ পুওর কান্ট্রি' এ ধারণাটি বদলাতে চেষ্টা করি। পাশের টেবিলে বসা আরবদের দেখি নিজেরা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে। মাঝে মাঝে কপাল কুচকে আমাদের মাল্টি ন্যাশনাল গ্রুপটাকে দেখে।
দেশে ফেরার দিন দুয়েক আগে দুপুরের খাবারের পর লাইটারধারী ইব্রাহিমকে খুঁজে পাই না। বিদেশে মোবাইল ফোনও নেই যে, মিসকল মেরে ইব্রাহিমকে লাইটারের কথা মনে করিয়ে দেব। অন্য সময় যেমন তেমন ভাত খাওয়ার পর সিগারেট না টানলে আমার অস্থির লাগে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বাধ্য হয়েই আমি স্মোকিং জোনের দিকে যাই। আমার দুর্ভাগ্য, পরিচিত কোন ধূমপায়ীকে পাই না। দুর্ভাগ্যবশত সে সময়ে স্মোকিং জোনে শুধু আরবদের পাই। জর্দান আর ইরাকের গ্রুপ দুটির সঙ্গে নতুন আসা আরও কিছু আরব দেশের লোক জমা হয়েছে। তারা আরবি ভাষায় গল্প করছে আর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে। বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকি পরিচিত কোন ধূমপায়ীর আগমনের আশায়। কিন্তু কেউ আসে না। এ সময়ে আরব যুবকদের 'রথম্যান' আর 'ক্যামাল' ব্র্যান্ডের সিগারেটের ধোঁয়া আমার ধূমপানের নেশাকে আরও তীব্র করে তুলে। অগত্যা বাধ্য হয়ে এক অচেনা আরব যুবককে বলি, 'ক্যান আই হেভ ইউর লাইটার'?
আড্ডারত যুবক তার চমৎকার লাইটারটা আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়। সিগারেট জ্বালাতে জ্বালাতে আমি কারুকার্যময় লাইটারটার দিকে এক পলক তাকাতে বাধ্য হই। লাইটারটা যেন এক নারী শরীরের ভাস্কর্য। ওপরে চাপ দিতেই একটা নারী মুখের অবয়ব ওঠে আসে। মনে হয় চুমু দিতে সে মুখটা বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও সেই নারী অবয়বের মুখ থেকে আগুন বের হয়ে আসে।
আমার জীবনে আমি এত সুন্দর লাইটার চোখে দেখিনি। তবে লাইটারের সৌন্দর্য আর আবেদন আমার ইন্দ্রীয়কে পুরোপুরি কব্জা করতে পারেনি। সিগারেটের মাথায় আগুন জ্বালাতে জ্বালাতে আমি আড় চোখে লক্ষ্য করি আড্ডায় খানিকটা বিরতি দিয়ে পাশের আরেক যুবক লাইটার ধার দেয়া যুবকের উদ্দেশে কিছু একটা বলছে। আরবি ভাষা না বুঝলেও 'বাংলাদেশ' শব্দটা আমি বুঝে ফেলি। আমার মধ্যে কেমন যেন একটা অস্বস্তিবোধ কাজ করতে শুরু করে।
সিগারেট জ্বালানো শেষ করেই আমি আবার সেই আরব যুবককে 'থ্যাংকস' বলে লাইটারটি ফিরিয়ে দিতে যাই। যুবকটি কি মনে করে যেন সেই লাইটারটা ফিরিয়ে নেয় না। খুব একটা দানবীর দানবীর ভাব নিয়ে হাত নেড়ে আমাকে বলে, 'টেইক ইট, টেইক ইট।'
উপহার নিতে আমার আপত্তি নেই; যদি তা উপহার হয়। কিন্তু অচেনা-অজানা এক আরব যুবকের 'টেইক ইট' এর মাঝে আমি উপহারের গন্ধ পাই না; পাই দানের গন্ধ। আমি হতে পারি 'শ্রমিক' দেশের মানুষ, কিন্তু কারও দয়ার পাত্র হতে চাই না।। লাইটারটা যতই চমৎকার হোক না কেন তা আমার আত্মসম্মানবোধের ওপর লোভের প্রলেপ দিতে পারে না। আরব যুবকের দেয়া লাইটার নিতে আমার ভেতরে একটা প্রবল আপত্তি টের পাই। আমি তার টেইক ইট-কে অগ্রাহ্য করে 'থ্যাংকস' বলে লাইটারটা তার দিকে বাড়িয়ে দেই। আড্ডারত আরব যুবকরা চমৎকার এবং দামি একটা লাইটার পেয়েও তা ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা দেখে ভাবে- আমি যে একটা সুযোগ পেয়েছি তা বুঝতে পারছি না।
আমি স্পষ্ট বুঝি, আরব যুবকেরা আশা করছিল চমৎকার লাইটারটা পেয়ে আমার চোখ মুখ আনন্দে ভরে উঠবে। একটা জীবন্ত দান খয়রাতের দৃশ্য দেখার প্রত্যাশায় উদগ্রিব যুবকেরা একটু হতাশ হয় যেন।। আমার হাব-ভাব দেখে পাশ থেকে আরেক যুবক আমাকে প্রলুব্ধ করতে বলে ওঠে, ' নাউ ইউ হ্যাভ এ লাইটার। টেইক ইট, টেইক ইট।'
তার কথায় আর হস্ত সঞ্চালন দেখে মনে হয়, সে বলতে চাইছে- এমন সুযোগ আর পাবে না, দেরি না করে এখনই লাইটারটা পকেটে পুরে নাও। যুবকের কথা আর ভাব দেখে আরব যুবকদের দলটা আরও হেসে ওঠে। আমি আর দেরি করি না। ক্ষোভে অপমানে আমার শরীর শক্ত হয়ে ওঠে। হাতের লাইটারটি আস্তে করে আরব যুবকদের টেবিলটার মাঝখানে রেখে দেই, তারপর শরীরটাকে সোজা করে দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে মিথ্যা কথা বলি, 'আই হ্যাভ এ বিউটিফুল লাইটার ইন মাই রুম, আনফরচ্যুনিটলি আই ফরগেট টু ব্রিং দ্যাট। ওয়ান ইজ ইনাফ; আই ডোন্ট নিড অ্যানি মোর।'
তারপর আর কাউকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে গটগট করে হেঁটে স্যুভেনির শপের দিকে রওনা দেই। ছয় হাজার উন দিয়ে আমি সবচেয়ে দামি এবং চমৎকার একটা লাইটার কিনি। রাতে খাবারের পর আমি আবার স্মোকিং জোনে যাই। আরব যুবকদের পাশের টেবিলটায় বসে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে লাইটারটা জ্বালাই আর নিভাই।
আমি দেখি আরব যুবকেরা আড় চোখে আমাকে দেখে। তাদের চোখে আমি সবসময়ের তাচ্ছিল্যের ভাবটা খুঁজে পাই না। বরং তাদের ভেতর একটা সমীহ কাজ করে বলে মনে হয়। তারা এমনভাবে হাসে, এমনভাবে ফিসফিস করে কথা বলে, যেন আমি কোন আরব আমির। আর তারা বিনাভিসায় আমার পাশের টেবিলে এসে বসা একদল শ্রমিক।

লেখকঃ মাসউদুল হক। মূল লেখাটি এখানে ফেসবুকের শেয়ারিং থেকে লেখাটি পড়ে ভালো লাগলো তাই ব্লগে তুলে দিলাম।
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

লিখেছেন নতুন নকিব, ১১ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০৩

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

মানুষের জীবন মূলত অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের সমষ্টি। প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি মোড়ে আমাদের কোনো না কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

লিখেছেন আঘাত প্রাপ্ত একজন, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

[সম্ভাবনার ক্রমানুসারে নয়ঃ]

আর্জেন্টিনা: আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তার ডিফেন্স আর ইনজুরি । ৩৮ বছরের তরুণ(!) সেন্টারব্যাক ওতামেন্দি আর কমপক্ষে এক হালি হাফ-ফিট ফুটবলার নিয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ শরৎ বন্দনা

লিখেছেন ইসিয়াক, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৯


শরৎ এলেই আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের ভেলা
দিনমণি আর মেঘমালার লুকোচুরি খেলা।

রুম ঝুমঝুম নূপুর পায়ে ছুটছে নদীর ঢেউ
ভাটিয়ালি গাইছে গান অচিন সুরে কেউ।

বিলে ঝিলে শাপলা পদ্ম... ...বাকিটুকু পড়ুন

×