somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন বিএনপির নিরঙ্কুশ জয় ও আগামীর অশনিসংকে

১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৮:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


দীর্ঘ দুই দশকের প্রতীক্ষা আর রাজপথের লড়াকু পথ পেরিয়ে অবশেষে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে ধানের শীষের বিজয় নিশান উড়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট লাভ করেছে। তবে ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচন এবং তার ফলাফল কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের গল্প নয় বরং এটি বাংলাদেশের আগামীর রাজনীতির এক জটিল ও মেরুকরণকৃত রসায়নের প্রতিফলন। ৫৯.৪৪ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে যে পরিসংখ্যান ও প্রবণতা সামনে এসেছে, তা যেমন বিএনপির জন্য স্বস্তির, তেমনি গভীর আত্মোপলব্ধি ও আতংকেরও দাবি রাখে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠনের পথে রয়েছে। কিন্তু বিজয়ের এই বিশালত্বের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্যরকম পরিসংখ্যান। অন্তত ৮০টি আসনে বিএনপির প্রার্থীদের জয়ের ব্যবধান ছিল অত্যন্ত নগণ্য কোথাও মাত্র কয়েকশ, কোথাও দুই-তিন হাজার ভোট। অন্যদিকে, সবাইকে চমকে দিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দীর্ঘ সময় নিবন্ধনহীন থাকা দলটি এবার একক ও জোটগতভাবে যে সাফল্য দেখিয়েছে, তা বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির গত ৫০ বছরের সমীকরণ ওলটপালট করে দিয়েছে। সংসদের এই নতুন অবয়ব বলে দিচ্ছে যে, সামনের দিনগুলোতে রাজপথের দীর্ঘদিনের মিত্রদের মধ্যেই এখন আইনি ও সংসদীয় লড়াইয়ের এক নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে। সবচেয়ে বড় বিস্ময় ও পলিটিক্যাল শক এসেছে ঢাকা মহানগর থেকে। রাজধানীর ১৫টি আসনের মধ্যে সাতটিতেই জামায়াত জয়ী হয়েছে, যা বিএনপির দুর্ভেদ্য দুর্গে বড় ধরনের ফাটল হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা-১২ ও ১৪ আসনে বিএনপির প্রভাবশালী বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে ভোট ভাগাভাগি হয়ে জামায়াত অনায়াসে জয় তুলে নিয়েছে। এছাড়া ঢাকা-৪, ৫ ও ১৬ আসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বিএনপির হার কর্মীদের মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করেছে। ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমানের বড় জয় এবং ঢাকা-১১ আসনে জোটগত প্রার্থীর বিজয় নির্দেশ করে যে, নগরের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ বিকল্প ধারার রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে।
বিভাগীয় পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, খুলনা বিভাগে বিএনপির ফল ছিল বিপর্যয়কর। এই বিভাগের ৩৬টি আসনের মধ্যে বিএনপি পেয়েছে মাত্র ১১টি আসন। সাতক্ষীরা ও কুষ্টিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলোতে বিএনপি একটি আসনও পায়নি। এর প্রধান কারণ হিসেবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা তৃণমূলের মতামত উপেক্ষা করে মনোনয়ন প্রদান এবং চরম অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে চিহ্নিত করছেন। ঝিনাইদহ ও যশোরের মতো ধানের শীষের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসনগুলোতে জামায়াত যেভাবে আধিপত্য বিস্তার করেছে, তা বিএনপির নীতি-নির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। এই অভাবনীয় ফলাফলের পেছনে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করেছেন। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, "এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দৃশ্যত অনুপস্থিত থাকায় একটি বিশাল শূন্যস্থান তৈরি হয়েছিল। সেই শূন্যস্থানে বিএনপির যে একক আধিপত্য থাকার কথা ছিল, তা সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে জামায়াতের দখলে চলে গেছে। তাদের মতে, আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থকরা যারা কোনোভাবেই জামায়াতকে ভোট দিতে রাজি ছিলেন না, তারা আত্মরক্ষার্থে বিএনপিকে বেছে নিয়েছেন। আবার হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ জামায়াত শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে এই ভয় থেকে তুলনামূলক উদার ও জাতীয়তাবাদী দল হিসেবে বিএনপিকে ভোট দিয়ে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বিএনপির নিজস্ব ভোটব্যাংক ও বিদ্রোহী প্রার্থীর বিভাজন এই সুবিধাগুলোকে ম্লান করে দিয়েছে। ভোটের মাঠের সমীকরণ বলছে, জামায়াতের নারীকর্মীরা যেভাবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার চালিয়েছেন, তার বিপরীতে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের উপস্থিতি ছিল প্রায় অদৃশ্য। জামায়াত একদিকে ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করেছে, অন্যদিকে বিগত দিনে বিএনপির শাসনের ত্রুটিগুলো তুলে ধরে নারী ভোটারদের প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রধান শক্তি "'জেন-জি " বা নতুন প্রজন্মের চিন্তাধারার সঙ্গে বিএনপির ভাষা ও কৌশল এখনো পুরোপুরি খাপ খেতে পারেনি। তরুণরা এখন কেবল স্লোগান নয়, বরং সুনির্দিষ্ট সংস্কার ও স্বচ্ছতা চায়, যা জামায়াত তাদের সোশ্যাল মিডিয়া ও সুশৃঙ্খল প্রচারণায় সুকৌশলে ফুটিয়ে তুলেছে। আরেকটি বড় ইস্যু ছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাথে জুড়ে দেওয়া জুলাই সনদ বা রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা নিয়ে ঐতিহাসিক গণভোট। এই গণভোটে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ ভোটার তাদের মত জানিয়েছেন। প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলেও, প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ মানুষ ‘না’ ভোট দিয়েছেন। এই সাড়ে ৩৪ শতাংশ ‘না’ ভোট নির্দেশ করে যে, সংস্কার প্রক্রিয়া বা বর্তমান ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিয়ে একটি শক্তিশালী ভিন্নমত দেশে বিদ্যমান রয়েছে। বিএনপির জন্য এটি এক বিশাল চ্যালেঞ্জ কারণ এই জনমতকে আস্থায় নিতে না পারলে সামনের সংস্কার কার্যক্রম বাধার মুখে পড়তে পারে। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের সামলাতে না পারা ছিল বিএনপির দ্বিতীয় বড় ব্যর্থতা। ৯০টির বেশি আসনে বিএনপির বিদ্রোহীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছেন। দলের নীতিনির্ধারকরা কেবল বহিষ্কারের খড়গ চালিয়েছেন, কিন্তু সাংগঠনিকভাবে সংকট সমাধানে ব্যর্থ হয়েছেন। এর ফলে ভোট ভাগাভাগি হয়েছে এবং জামায়াত বা অন্যান্য প্রার্থীরা ফায়দা লুটেছেন। সিরাজগঞ্জ-৪, গাজীপুর-৪ এবং নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের মতো হেভিওয়েট জায়গায় বিএনপির হার এই সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলারই চূড়ান্ত রূপ।

পরিশেষে বলা যায়, বিএনপি ক্ষমতায় বসছে এটি সত্য, কিন্তু এবারের জয় কেবল একটি রাজনৈতিক দলের জয় নয় এটি ছিল একটি দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরশাসনের অবসানের পর রাষ্ট্র পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষার ফসল। জামায়াতের এই শক্তিশালী উত্থান এবং নগরে তাদের ক্রমবর্ধমান জনসমর্থন বিএনপির জন্য এক অশনিসংকেত। মির্জা আব্বাসের ভাষায় ‘ভয়ংকর ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা নজরুল ইসলাম খানের ভাষায় ‘ভোটমুখী করতে না পারা’ যাই বলা হোক না কেন, মূল সমস্যাটি যে কাঠামোগত এবং কৌশলগত, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক যদি কোনো কারণে ভবিষ্যতে সক্রিয় হয় কিংবা জামায়াত যদি তাদের এই গতি ধরে রাখতে পারে, তবে বিএনপির জন্য সামনের দিনের রাজনীতি হবে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। নতুন সরকারকে কেবল ক্ষমতার গদিতে বসলেই চলবে না, বরং তাদের ঘর গোছাতে হবে, নতুন প্রজন্মের ভাষা বুঝতে হবে এবং সবচেয়ে বড় কথা যোগ্যদের মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। আগামীর বাংলাদেশ হবে কর্মদক্ষতা ও স্বচ্ছতার বাংলাদেশ যেখানে কেবল " ধানের শীষের " পুরোনো আবেগ দিয়ে নতুন মাঠ ধরে রাখা হয়তো আর সম্ভব হবে না।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৮:২৯
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রাজাকারনামা-২ (অপরাধির জন্য আমাদের,মানবতা ! বিচিত্র এই দেশের মানুষ!!)

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৫৫



সনজীদা খাতুন তখন ইডেন কলেজে কর্মরত ছিলেন । ইডেনের মেয়েরা 'নটীর পূজা' নামে একটা নাটক করেছিলো। সেই নাটকে একেবারে শেষের দিকে একটা গান ছিলো। তিনি ছাত্রীদের সেই গানটা শিখিয়েছিলেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

সুস্থধারায় ফিরছে রাজনীতি; আম্লিগের ফেরার পথ আরো ধূসর হচ্ছে

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১০:১০


গত শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) এক সংবাদ সম্মেলনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, নির্বাচনের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে একে অপরের মধ্যে কোথাও কোথাও... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশে টেকসই পরিবর্তন আনতে এই 'প্ল্যান'-গুলো আমাদের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর লিস্টে আছে কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৪৮



আসসালামু আলাইকুম।
দেশে টেকসই পরিবর্তন আনতে নিচের বিষয়গুলোর উপর নজর দেওয়া জরুরী মনে করছি।

প্ল্যান - ১
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রত্যেকটিতে গবেষণার জন্যে ফান্ড দেওয়া দরকার। দেশ - বিদেশ থেকে ফান্ড... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছায়া মন্ত্রীসভা : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত !

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:০৮

ছায়া মন্ত্রীসভা : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত !



বাংলাদেশে নূতন ভাবে এই প্রসঙ্গটি আসতে শুরু করছে ।
আমাদের আইনে এই ব্যাপারে নির্দিষ্ট কিছু আছে কিনা জানা নেই । তবে বিরোধী দল সংসদে
তাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

পবিত্র হজ্জ্ব- ২০২৫ এর মায়াময় স্মৃতি….(৮)

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:১০

আমরা ০৯ জিলহজ্জ্ব/০৫ জুন রাত সাড়ে দশটার দিকে মুযদালিফায় পৌঁছলাম। বাস থেকে নেমেই অযু করে একসাথে দুই ইকামায় মাগরিব ও এশার নামায পড়ে নিলাম। নামাযে ইমামতি করেছিলেন আমাদের দলেরই একজন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×