২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল জনরায় নিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার। তৃতীয়বারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন বেগম খালেদা জিয়া। কিন্তু ক্ষমতার এই পরিবর্তনের পরপরই নবগঠিত সরকারের সামনে এসে দাঁড়ায় এক বিশাল প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দেশের চরম অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। এর আগের পাঁচ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ জোট সরকার। দীর্ঘ ২১ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে তারা যে শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করেছিল, সেখানে দেশের বিভিন্ন স্থানে জয়নাল হাজারী, হাজী সেলিম, শামীম ওসমানদের মতো অজস্র প্রভাবশালী রাজনৈতিক সন্ত্রাসী গডফাদারের উদ্ভব ঘটে। তাদের ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল সাধারণ মানুষের জন্য এক ভয়ংকর জনপদে পরিণত হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও এই সন্ত্রাসী চক্র, তাদের রেখে যাওয়া নেটওয়ার্ক এবং পরবর্তীতে নতুন করে ক্ষমতাসীন দলের পরিচয়ে গড়ে ওঠা কতিপয় চাঁদাবাজ ও দখলদারের উৎপাত বন্ধ হয়নি। ফলে সারাদেশে এক চরম অস্থিরতা ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়।
নির্বাচনটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মানবাধিকার প্রতিবেদনে অবাধ ও সুষ্ঠু হিসেবে বর্ণিত হলেও, প্রতিবেদনে রাজনীতিতে ব্যাপক সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা, নির্বিচারে গ্রেপ্তার এবং বিচার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। অর্থাৎ, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তৃতীয় মেয়াদে পদার্পণ করেই বেগম খালেদা জিয়াকে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। ২০০২ সালের দিকে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয়। হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, অ্যাসিড নিক্ষেপ এবং অবৈধ অস্ত্রের অবাধ বিস্তার জনমনে চরম আতঙ্কের জন্মনেয় । তৎকালীন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় , শুধু রাজধানীতেই প্রতিদিন ৩০০ এর বেশি চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটত। মানবাধিকার সংগঠন " অধিকার " এর হিসাব অনুযায়ী, ২০০২ সালে সারাদেশে ৩ হাজার ৩২৩ টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। একই বছরে ১৮৭টি বোমা হামলায় ৭৬ জন নিহত এবং ৫০০ এর বেশি মানুষ আহত হন। এছাড়া অন্তত ১,০৪০ জন নারী বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হন। ২০০১ সালে হত্যার সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৪১২ জন । এই ভয়াবহ চিত্র স্পষ্ট করে যে, সে সময় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও নিরাপত্তা কতটা হুমকির মুখে পড়েছিল। সবচেয়ে আতংকের বিষয় ছিল ২০০২ সালে ঢাকায় বিএনপি সমর্থিত অন্তত চারজন ওয়ার্ড কমিশনারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এমন এক নৈরাজ্যকর ও সংকটাপন্ন প্রেক্ষাপটে ২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর মধ্যরাত (কার্যত ১৭ অক্টোবর) থেকে পুলিশ, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়ে শুরু হয় সামরিক অভিযান " অপারেশন ক্লিনহার্ট "। সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা, চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও সশস্ত্র অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা এবং জননিরাপত্তা পুনর্প্রতিষ্ঠা করা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি আন্তর্জাতিকও স্বীকার করেছিল যে, অপরাধ, হত্যা ও সহিংসতার ঊর্ধ্বগতির কারণেই সরকার এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিল। প্রায় ৪০ হাজার সামরিক সদস্যের অংশগ্রহণে টানা ৮৫ দিন ধরে এই সর্বাত্মক অভিযান পরিচালিত হয়, যেখানে ১০ হাজারের বেশি অপরাধী ও আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অভিযান চলাকালে ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সহ অন্যান রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহারকারী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযানের প্রাথমিক পর্যায়ে অপরাধে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদেরও গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরবর্তীতে বিরোধী দলের সাথে সম্পৃক্ত অপরাধী ও সন্ত্রাসী নেতাকর্মীরাও আইনের আওতায় আসেন। এই নিরপেক্ষ তথ্য প্রমাণ করে যে, তৎকালীন প্রেক্ষাপটে দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে মূলত অপরাধ দমনের উদ্দেশ্যেই এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়েছিল। দেশের সাধারণ মানুষও তাৎক্ষণিক ভাবে এই অভিযানকে স্বস্তি ও জননিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ হিসেবে সমর্থন জানিয়েছিল।
তবে " কেন ক্লিনহার্ট "? প্রশ্নটির পাশাপাশি " কীভাবে ক্লিনহার্ট"? প্রশ্নটিও ইতিহাসে সমানভাবে গুরুত্ব লাভ করে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসাবে অভিযানের সময় হেফাজতে অন্তত ৫০ জনের মৃত্যু হয়। যদিও অ্যামনেস্টি তাদের ২০০৩ সালের প্রতিবেদনে অন্তত ৪০ জনের নির্যাতনের মুখে মৃত্যুর অভিযোগ আনে এবং সরকারি পরিসংখ্যানে ১২ জনের মৃত্যুকে " হার্ট ফেইলিউর " হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে এই অভিযানের আইনি সুরক্ষা দিতে দায়মুক্তি আইন (ইন্ডেমনিটি) পাস করা হয়, যা মানবাধিকার সংস্থা ও আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী বিতর্ক ও উদ্বেগের জন্ম দেয়। ফলে এটি স্পষ্ট হয় যে, রাষ্ট্রীয় চরম সংকটে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা যেমন বাস্তব ছিল, তেমনি সেই পদক্ষেপের কার্যপদ্ধতি, আইনি নীতি ও মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নটিকেও ইতিহাসে আলাদা করে পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে।
ইতিহাসের সেই প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের সামগ্রিক চিত্রের একটি গভীর নীতিনির্ধারণী ও কৌশলগত সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে দীর্ঘ সময় ধরে চলা আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী, সন্ত্রাসী ও দূর্নীতির কারনে ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক সংঘাত, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের মতো বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি হতে হয় ৫ আগস্ট পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও পরবর্তীতে ১২ ফেব্রুয়ারী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চেয়ারে বসা বিএনপিকে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর সাম্প্রতিক মূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণগুলোতে দেখা যায়, পরবর্তী সময়জুড়েও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বেশ স্পর্শকাতর ছিল। হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাই, খাসজমি ও স্থাপনা দখল এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নাগরিক জীবনে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এই সংকটের সুযোগে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের একশ্রেণির সুবিধাবাদী নেতাকর্মী এবং পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের কিছু সুবিধাভোগী চক্র যোগসাজশ করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে বলে বিভিন্ন তদন্ত ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই ধরনের অপকর্মের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থার দাবি উঠলেও বাস্তবায়নে নানা আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা দেখা যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের মনে পুনরায় গভীর উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে ৫২ বছরের পুরনো সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে শতাধিক মুখোশধারীর হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়, মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান, আদাবরের শ্যামলী হাউজিং এবং ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রোপার্টিজে সংগঠিত হামলা ও জমি দখলের চেষ্টা সহ সারাদেশে হত্যা, চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব সহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড জননিরাপত্তাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে রাড্ডা সেন্টারে লুটপাটের সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কার্যকর ভূমিকা না রাখার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রত্যাহার করতে হয়েছে। এসব ঘটনায় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও স্থানীয় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ইন্ধনের অভিযোগ অনুসন্ধানে উঠে আসছে। জমি দখল বা চাঁদাবাজির সঙ্গে যখন সংঘবদ্ধ সন্ত্রাস ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা যুক্ত হয়, তখন তা আর ব্যক্তিগত বিরোধ থাকে না তা রাষ্ট্রের সার্বিক সক্ষমতা ও অস্তিত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়। এ কারণেই বর্তমানে অপরাধ দমনে ২০০২ সালের মতো আবারও যৌথ বা বিশেষ অভিযানের যৌক্তিকতা নিয়ে নীতিগত আলোচনা শুরু হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা " অধিকার " এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে মব হামলায় অন্তত ৩৩ জন নিহত এবং রাজনৈতিক সহিংসতায় ৪১ জন নিহত ও প্রায় ৯৭০ জন আহত হয়েছেন।
বর্তমান সময়ের আইনশৃঙ্খলা সংকটের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ বানচাল করা, আসামী ছিনতাই করা কিংবা নিজস্ব বিচারে সাজা দেওয়ার সামাজিক প্রবণতা। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই দায়িত্ব পালনকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ৩১৭টি হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যা ২০০২ সালের পরিস্থিতির চেয়েও কিছুটা ভিন্ন ও জটিল মাত্রার বার্তা দেয়। ২০০২ ও বর্তমান সময়ের মূল কাঠামোগত মিল হলো উভয় সংকটেই রাষ্ট্রের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ ভাঙ্গা জননিরাপত্তা ও অপরাধ দমনে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনর্প্রতিষ্ঠা করা। তবে পার্থক্যটি কৌশলগত ও সামাজিক। ২০০২ সালে মূল চ্যালেঞ্জ ছিল সংঘবদ্ধ সশস্ত্র সন্ত্রাসী ও অবৈধ অস্ত্রের অবাধ ব্যবহার আর বর্তমান সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়াভিত্তিক গুজব, মারাত্মক রাজনৈতিক মেরুকরণ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার অভাব এবং দীর্ঘদিন পর পুলিশ বাহিনীকে পুনর্গঠন করার জটিলতা। যদিও বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনাকে প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও দুর্নীতি দমনকে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও মব-ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে " জিরো টলারেন্স " নীতি ঘোষণা করে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একমাত্র বৈধ ক্ষমতা রাষ্ট্রের, জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। অপারেশন ক্লিনহার্টের ইতিহাস থেকে আজকের রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো অপরাধ দমনে রাষ্ট্রকে যেমন কঠোর হতে হয় তেমনি সেই কঠোরতাকে কঠোরভাবে আইনের অধীনও রাখতে হয়। জবাবদিহিহীন রাষ্ট্রীয় শক্তি সাময়িক ভয় বা স্বস্তি তৈরি করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা আইনি ব্যবস্থার প্রতি জনগণের মৌলিক আস্থাকে ক্ষয় করে। আবার বিপরীতক্রমে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র যদি প্রয়োজনীয় আইনি বল প্রয়োগে ব্যর্থ হয়, তবে নাগরিকের মধ্যে রাষ্ট্র অকার্যকর এমন ধারণা তৈরি হয়, যা মানুষকে নিজস্ব বিচারপদ্ধতির দিকে ঠেলে দেয়। এই দুটি চরম পন্থাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য সমপরিমাণ বিপজ্জনক। ২০০২ সালে বেগম খালেদা জিয়া যে কঠোর ও সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তার পেছনে তৎকালীন সময়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম ও অভূতপূর্ব সংকট বিদ্যমান ছিল। সেই সময়কার নৈরাজ্যকে উপেক্ষা করে শুধু অভিযানের সমালোচনা করলে ইতিহাসের মূল সত্যটি বাদ পড়ে যায়। ঠিক তেমনি, অভিযানের পরবর্তী আইনি জবাবদিহির শিক্ষাগুলোকে ভুলে গেলেও ইতিহাস শিক্ষা প্রদানে ব্যর্থ হয়। কঠোর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সাংবিধানিক জবাবদিহি এই দুটি উপাদানই একটি পরিপক্ক গণতন্ত্রের সমান্তরাল ভিত্তি।
আজকের বাংলাদেশে মূল প্রশ্নটি ক্লিনহার্টের পুনরাবৃত্তি দরকার কি না এমন আবেগী ফ্রেমে বাঁধা উচিত নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত ২০০২ সালের মতো বড় সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্র কীভাবে আরও দ্রুত, কার্যকর এবং একই সাথে সম্পূর্ণ জবাবদিহিমূলক আইনি কৌশল অবলম্বন করবে। অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা যেমন জরুরি, তেমনি কোনো নিরপরাধ নাগরিক যেন হয়রানির শিকার না হন তা নিশ্চিত করাও আবশ্যক। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও মব সহিংসতা বন্ধের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে আইন ও সংবিধানের সীমানার মধ্যে পরিচালিত করতে হবে। ২০০২ সালের " অপারেশন ক্লিনহার্ট " স্রেফ অতীতের একটি সামরিক বা প্রশাসনিক অভিযান নয়, এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা ও নাগরিক সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়না। দুর্বল আইনশৃঙ্খলা রাষ্ট্রকে কঠোর হতে বাধ্য করে কিন্তু সেই কঠোরতা যদি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পায়, তবে তা ভবিষ্যতের জন্য নতুন প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করে। ২০০২ সাল ও আজকের বাংলাদেশের সামাজিক ও প্রযুক্তিগত বাস্তবতা ভিন্ন হলেও রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব অপরিবর্তিত নাগরিকের জীবন, সম্পত্তি ও স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং আইনের শাসন সমুন্নত রাখা। বেগম খালেদা জিয়ার সময় কালের সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের মূল বার্তাটি এখানেই নিহিত রাষ্ট্র যখন অকার্যকর হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে, দেশের জনগণই কঠোর পদক্ষেপ চায় কিন্তু রাষ্ট্র যখন শক্তি প্রয়োগ করে, তখন সেই শক্তির সীমা ও ন্যায়বিচার নিয়েও নাগরিক সমাজ সচেতন থাকে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য কেবল গ্রেপ্তারের সংখ্যায় পরিমাপ করা যায় না প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে এমন এক টেকসই ব্যবস্থার ওপর, যেখানে অপরাধী আইনকে ভয় করবে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রীয় সুরক্ষায় আশ্বস্ত হবে এবং রাষ্ট্র নিজেও সংবিধান ও আইনি সীমানাকে শ্রদ্ধা করবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



