somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রক্তফাঁদ

২০ শে নভেম্বর, ২০২৩ রাত ১০:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



এক.

“ক্রিং ক্রিং...”

“হ্যালো! কে বলছেন?”

“আমি গ্রীনভিলেজ হসপিটাল থেকে বলছি। আপনি কি এলেক্স আর্ডেন বলছেন?”

“হ্যাঁ, বলুন।”

“কংগ্রাচুলেশনস! আপনি বাবা হয়েছেন। ছেলে ও মা উভয়ই সুস্থ আছেন৷ আপনি চাইলে সকালেই আসতে পারেন।”

রাত তিনটা ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙলো এলেক্সের৷ বাবা হওয়ার সংবাদ পেয়ে সে এখন বেশ স্বতঃস্ফূর্ত৷ কয়েকদিন যাবত লন্ডনে ব্যবসায়িক ঝামেলায় বেশ বিষণ্ণ ছিল সে৷ শত চেষ্টার পরও স্ত্রীর লিসার কাছে এই অনন্দ বা বিপদের সময় উপস্থিত থাকতে পারেনি বলে অনেক দুঃখিত৷ যদিও তাকে ছাড়া সবকিছু ভালোভাবেই সম্পন্ন হয়েছে৷ হাসপাতালে এলেক্সের স্কুল জীবনের বান্ধবী থাকায় একটু বেশিই সুবিধা পেয়েছে লিসা৷ আর অন্যান্য কাজের জন্য তো রয়েছে একগাদা দেহরক্ষী৷

বলছিলাম ইংল্যান্ডের কর্ণওয়াল শহরের এক বিখ্যাত সিরিয়াল কিলার এলেক্সের কথা৷ সিরিয়াল কিলারদের ব্যাপারে 'কুখ্যাত' শব্দটা বহুল প্রচলিত হলেও এলেক্সের ব্যাপারে সম্ভবত এটা মানানসই নয়৷ কেননা, ইতিহাসের সব সিরিয়াল কিলাররা অসহায় নির্দোষ মানুষ হত্যা করে পৈশাচিক আনন্দে মেতে উঠে৷ এখানেই এলেক্স পুরো বিপরীত পথে হেঁটেছে৷ তার টার্গেটে এ পর্যন্ত যারা খুন হয়েছে তারা সবাই পুলিশের তালিকায় মোস্ট ওয়ান্টেড ব্যক্তিবর্গ। কিন্তু বিভিন্ন ক্ষমতাবলে পুলিশকে তারা পকেটে পুড়ে নিয়েছিল৷ কেউ শক্তপোক্তভাবে অগ্রসর হতে গেলে ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হয়ে মূল্যবান জীবন হারাতো৷ এসব নানা কারণেই কর্ণওয়াল শহর সবসময় অস্থিরচিত্ত থাকত৷ ফলতঃ এলেক্সও নিজের কোম্পানী দাঁড় করাতে হিমশিম খাচ্ছিল৷ সমুদ্রপথে সকল শিপের উপর উপর্যুপরি চাঁদার আক্রমণে তার অর্থনৈতিক অবস্থা পঙ্গুত্ব বরণ করে নিয়েছিল৷ যদিও তার বাবা লন্ডনে নিজের প্রতিষ্ঠানের হাল ধরতে বারবার তাকে চাপ দিয়ে আসছিল, কিন্তু এলেক্স নাছোড়বান্দা৷ নিজের প্রতিষ্ঠান একাই দাঁড় করাবে বলে মিনতি করেছে। তাই বাবার কথায় সাড়া না দিয়ে একাই পরিশ্রম করে চলছে৷

মোটা পুঁজি নিয়ে ব্যবসায় নামার কিছুদিন পরেই এলেক্স বুঝতে পারে কর্ণওয়ালে একা কোনো ব্যবসা দাঁড় করানো সম্ভব নয়৷ ব্যবসা করতে হলে কোনো মাফিয়াকে সাথে নিতে হবে৷ অথবা নিজেকে মাফিয়া হতে হবে৷ মানে একগাদা গুন্ডাপান্ডা নিয়ে ঘোরা, যা জনগণের চক্ষুশূল। এলেক্স জনগণকে কখনও বিরাগভাজন করতে চায় না৷ এজন্য ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে৷ হয়ে উঠেছে শতাব্দীর সেরা কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার৷ দেড় মাস অন্তর অন্তর ঠান্ডা মাথায় তেইশখানা খুন করে কর্ণওয়াল পরিষ্কার করে একচেটিয়া ব্যবসা শুরু করেছে৷ রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়ে গেছে তার৷ তবে এই শহরে তার কলাগাছ কাঁটার লোক নেই৷ প্রথম দু-চারটা খুনের পর জনগণের মাঝে আনন্দের পাশাপাশি আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল৷ সংখ্যা যখন দশ পেরিয়ে যায়; তখন মানুষের মনে এই বিশ্বাস জন্মে গেল যে, কথিত মাফিয়া কসাই আর যাইহোক নিরপরাধ মানুষের ক্ষতি করে না৷ এজন্য মানুষ আনমনে তাকে অতন্দ্র অভিভাবক হিসেবেই ধরে নিয়েছে৷ আর ডিটেকটিভ রবিনসন ছাড়া পুলিশও এখন এসব নিয়ে নাড়াচাড়া করা ছেড়ে দিয়েছে৷ কারণ, দিন শেষে একজন অভিভাবককে সন্ত্রাসী বানিয়ে নিজেদের বিপদে ফেলা বোকামী৷ শহরের বাকি দশটা চাপা পড়া কেসের মতো এলেক্সের সিরিয়াল কিলিংয়ে শিকার হওয়া ব্যক্তিদের কেসও পড়ে গেছে৷

কথায় আছে ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও বাড়া বানে৷ তদ্রূপ সিরিয়াল কিলার কখনও প্রচ্ছন্ন অভিভাবক হতে পারে না৷ দিন শেষে সকল সাইকোপ্যাথদের নিজস্ব লাভ থাকে৷ এলেক্সের ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি৷ বছর দুইয়ের মধ্যে নিজের প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়ে ইংল্যান্ডের সেরা ধনীদের কাতারে নাম লিখিয়েছে৷ বাবার দীর্ঘদিনের হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানও যেন ছেলের অঙ্গসংগঠনে রূপ নিয়েছে৷ একে একে মাফিয়াদের
নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন বনে গেছে সে৷ এটা অবশ্য ভুল মূল্যায়ন হবে৷ আদতে সে আন্ডারওয়ার্ল্ডই বিলুপ্ত করে দিয়েছে৷ নিজের প্রতিষ্ঠান শহর সব প্রজেক্ট সামলায়৷ বহিরাগত কেউ আসলে আর্ডেন গ্রুপের বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারে না৷ এলেক্সের স্বৈরাচারী মনোভাবের জন্য একা টিকে থাকতে পারে না৷ অনেকটা সিন্ডিকেটের মারপ্যাঁচে পড়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে যায়৷ ব্যাপারটা মানুষের কাছে সন্দেহজনক হতে পারে বলে এলেক্স ইদানীং ছোটখাটো প্রজেক্টের কাজগুলো অন্যান্য বহিরাগত কোম্পানী দ্বারা করিয়ে নেয়৷ এতে সাপও মরে লাঠিও ভাঙে না৷

সকাল আটটায় আড়মোড়া ভেঙে বাবার সাথে দেখা করে ছেলের সুসংবাদ দেয় এলেক্স। বাসায় সময় নষ্ট না করে সে তখনই কর্ণওয়ালের দিকে রওনা হয়ে যায়৷ শীতের সকালে কুয়াশাজড়ানো রোডে গাড়ী চলছে আপন গতিতে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে দুপুর বারোটার দিকে গিয়ে উঠবে এলেক্স৷ গতরাতে সে কথা বলে ফোন এরোপ্লেন মুড চালু করেছিল৷ সকালে সেটা বন্ধ করতে খেয়াল নেই৷ হাজার বার ফোন দিয়েও তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি৷ এতক্ষণে যা হবার তা হয়ে গেছে।

দুই.

বেলা সাড়ে বারোটায় এলেক্স মনের সুখে ড্রাইভ করে হাসপাতালে আসে৷ কিন্তু অন্যান্য দিনের মতো পরিবেশটা শান্ত দেখাচ্ছে না৷ হাসপাতালের মূল ফটকে বেশ কয়েকটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি দেখা যাচ্ছে৷ আশেপাশের মানুষজনের চেহারায় আতঙ্ক ফুটে উঠেছে৷ বিক্ষিপ্তভাবে হাসপাতালের কর্মচারীদের দৌঁড়াতে দেখেই বোঝা যাচ্ছে খারাপ কিছু ঘটেছে৷ এলেক্সের স্মৃতিপটে ফুটে উঠল পুরোনো দিনের কথা। কীভাবে মাফিয়ারা শহর জুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল৷ কোথাও শান্তি নেই৷ নিজ বাড়িতেও যেন নিরাপত্তার অভাব। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও ছিল তাদের সামনে অসহায়৷ সেই সময় নিজ গরজে একাই ধুয়েমুছে সকল মাফিয়া পরিষ্কার করেছিল এলেক্স৷ তবে কি সপ্তাহখানেক তার অনুপস্থিতি টের পেয়ে নতুন কোনো দল শহরে আস্তানা গেড়েছে?! এর থেকেও তার কাছে চিন্তার বিষয় হলো, প্রচ্ছন্ন অভিভাবক হিসেবে খ্যাত সিরিয়াল কিলার যে এলেক্স আর্ডেন সেটা কি কেউ জানত? আপাতত কোনো প্রশ্নের সঠিক উত্তর নেই তার কাছে৷ অগত্যা সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে আনমনে চলে গেল হাসপাতালে।

লিফটে চার তলায় উঠে শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে প্রচুর মানুষের ভীড় দেখতে পেল৷ কালক্ষেপণ না করে এলেক্স লিসাকে ফোন করবে বলে মোবাইলটা বের করে দেখতে পেল এরোপ্লেন মুড অন করা৷ নিজেই নিজেকে কিছুক্ষণ গালিগালাজ করে লিসাকে ফোন দিল৷ কয়েকবার রিং হবার পর তাকে না পেয়ে বাল্যকালের বান্ধবী শেলীকে ফোন করে সে৷ ফোন রিসিভ করেই শেলী বলল উঠল, “ এলেক্স?”

“হ্যাঁ, কী হয়েছে তোমাদের হাসপাতালে? এত পুলিশের ভীড়? আর লিসাকেও ফোনে পাচ্ছি না৷”

“থ্যাংক গড! তোমার কিছু হয়নি৷ আমরা খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম তোমাকে নিয়ে৷ অনেকক্ষণ যাবত ফোন করেও তোমাকে পাচ্ছি না। তুমি তিন তলায় ছত্রিশ নাম্বার রুমে চলে আসো৷ এখানে আমি লিসাকে সাথে নিয়ে আছি৷”

“আচ্ছা, আসছি।”

চার তলা থেকে নেমে তিনতলার মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করতেই এলেক্স দেখতে পেল ডিটেকটিভ রবিনসন লম্ফঝম্প করছে৷ তার সাথে এলেক্সের ঝামেলা শুরু হয়েছে যখন তার ঝুলিতে খুনের সংখ্যা সাত৷ একমাত্র ডিটেকটিভ রবিনসন কোনোরকম সাক্ষ্য প্রমাণ ছাড়া শুধুমাত্র সাধারণ সিসিটিভির ফুটেজের উপর ভিত্তি করে তাকে সিরিয়াল কিলার হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল। তার অভিযোগ অবশ্য এখনও আছে৷ কিন্তু এর মধ্যে দেশের এলেক্স প্রভাবশালী ব্যক্তি ও উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে৷ সে চাইলেও তার বিরুদ্ধে কিছু করতে পারছে না৷ কারণ, যেসব সিসি টিভির ফুটেজ তার বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হয়েছিল সেগুলোর যথোপযুক্ত উত্তর সে দিয়ে দিয়েছে৷ সেজন্য সন্দেহকে বাস্তবে পরিণত করতে পারেনি ডিটেকটিভ রবিনসন। তবে সে হাল ছাড়েনি৷

এলেক্সকে ঢুকতে দেখেই ডিটেকটিভ রবিনসন হিংস্র ব্যাঘ্রের ন্যায় তার কলার ধরে ফেলল৷ রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বলল সে, “তুই শালা আমার মেয়েকে হত্যা করেছিস৷ এই বাচ্চাগুলো কি দোষ করেছিল?!”

ডিটেকটিভের এমন আচরণ এলেক্স ভ্যাবাচেকা খেয়ে বলল, “কি বাজে বকছ ডিটেকটিভ! আমি কেবলই এলাম এখানে৷ একজন পুলিশের লোক হিসেবে তোমার জানা দরকার শহরের শিল্পপতিরা কখন কোথায় যায়?!”

রবিনসন কিছু বলতে যাবে এই মুহুর্তে অন্যান্য সহকর্মীরা তাকে সরিয়ে নিয়ে একটি চেয়ারে বসাল। এলেক্স কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর শূন্যে প্রশ্ন করল, “কেউ কি বলবেন? এখানে আসলে কী হয়েছে?”
এলেক্সের প্রশ্ন শুনে একজন পুলিশ কর্মকর্তার এগিয়ে এসে বলল, “মি. আর্ডেন এখানে আপনার থাকাটা নিরাপদ নয়। আজ সকালে চুয়াত্তরটি শিশুর রক্তাক্ত লাশ পাওয়া গেছে৷ যাদের সবার বয়স সাত থেকে দশ দিনের মধ্যেই৷ অবস্থা খুবই গুরুতর৷”

শিশুর লাশ শুনেই এলেক্সের টনক নড়ে৷ না জানি তার ছেলের লাশও এগুলোর মধ্যে এসেছে৷ কালক্ষেপণ না করে এলেক্স দৌঁড়ে ডাক্তার শেলীর রুমে গিয়ে একটি বেডে ঘুমন্ত অবস্থায় প্রিয়তমা লিসাকে আবিষ্কার করল৷ পাশে শেলী বসে কপালে জলপট্টি দিয়ে দিচ্ছে৷ এলেক্স কে দেখে শেলী দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে বলে উঠল, “ওহ, তুমি এসেছ তাহলে? জানি না আমি তোমাকে কী বলে সান্ত্বনা জানাবো৷ তোমার আর ছেলের চিন্তায় লিসার যেন ইহধাম ত্যাগ করতে চলছে৷ সেই সকাল থেকেই লিসা তোমাকে ফোনে পাচ্ছে না৷ স্ত্রী মা হওয়ার পর স্বামীকে না পেলে কীভাবে নিজেকে ঠিক রাখবে! এরপরের কাহিনী তো জানোই৷”

“শেলী! আমি অত্যন্ত দুঃখিত। রাতে কখন ফোন এরোপ্লেন মুড চালু করেছিলাম মনে নেই৷ এখানে পৌঁছেই ফোন দেখি৷ আমি আসলে বুঝতে পারছি না আসলে হয়েছে টা কী? আর আমার ছেলে কোথায়?”

“কী বলছ! তুমি কিছু জানো না?”

“তেমন কিছু শোনার সময় পাইনি৷ শুনলাম কোনো বাচ্চাকাচ্চার লাশ নাকি পাওয়া গেছে...”

পুরোটা শেষ হওয়ার আগেই শেলী তার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বলল, “আমি জানি না, কীভাবে তোমাকে ব্যাপারটা বলব! সম্ভবত ইংল্যান্ডের ইতিহাসে এমনটা কখনও ঘটেনি। সকাল নয়টার দিকে ক্লীনার প্রতিদিনের মতো যখন নবজাতকদের ওয়ার্ডে যায়, তখন দরজার গ্লাসে লেগে থাকা রক্ত দেখে এই অঘটন টা আবিষ্কার করে৷ ওয়ার্ডের প্রত্যেকটা শিশুর বেডেই রক্ত৷ এবং গলায় কামড়ের দাগ৷ যদিও সবার গলাতে কামড়ের দাগ স্পষ্ট না। কারও কারও গলায় দুইটি ছিদ্র দেখা গেছে৷ দুঃখের বিষয় সেখানে তোমাদের সন্তানও ছিল।”

শেলীর কথাগুলো যেন এলেক্সের গায়ে বজ্রের মতো আঘাত হানল। পায়ের নিচের মাটি সরে গেছে৷ আকস্মিক আঘাতে কোনোমতে নিজেকে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে চেয়ারে বসল সে৷ নিজের সন্তানকে একটিবার দেখার আগেই যে বিদায় নিয়ে নেবে সেটা কখনও কল্পনাতে আসেনি তার৷ এখন একজন ঠান্ডা মাথার খুনি হিসেবে তাকে অনেক অংক কষতে হবে৷ মাথা গরম কিম্বা শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়লে তার চলবে না৷ কিন্তু এদিকে প্রিয়তমা লিসার অবস্থাও করুণ৷ প্রচণ্ড জ্বরে ত্রাহিত্রাহি অবস্থা৷ এমতাবস্থায় ঠিকমতো মাথা খাটানো তো দূরের কথা মাথা ঠিক রাখাই মুশকিল৷

শেলী আর এলেক্সের কথোপকথন শুনে লিসা নিদ্রা থেকে জাগ্রত হয়ে উঠে বসার ব্যর্থ চেষ্টা করল; কিন্তু শরীর সায় দিচ্ছে না৷ অগত্যা শুয়েই এলেক্স কে জিজ্ঞেস করল, “কখন আসলে হানি?”

“কেবলই পৌঁছালাম, সুইটহার্ট। আমি আসলে কি বলব বুঝতে পারছি না....”, কাঁদোকাঁদো হয়ে এলেক্স বলল।

চোখের অশ্রু ছেড়ে দিয়ে লিসা শুধু বলল, “আজকে তুমি পাশে থাকলে হয়তো এমনটা হত না। আমি জানি তুমি আমার ও আমাদের সন্তান থেকে দূরে আয়েশ করতে না৷ সারাক্ষণ পাশে থাকতে৷ সব আমারই দোষ...”

“হানি, এসব নিয়ে এখন দুশ্চিন্তা করো না৷ সব ঠিক হয়ে যাবে৷ তুমি ধৈর্য্য ধারণ কর৷ পুলিশ ঠিকই ধরে ফেলবে খুনীকে৷” মিছে আশ্বাস দিয়ে এলেক্স নিজের মুখটা দুই হাত দিয়ে চেপে ধরল৷
রাজ্যের চিন্তা তাকে পেয়ে বসেছে এখন৷ দশবার জন সুদক্ষ দেহরক্ষী দ্বারা সার্বক্ষণিক পাহারার ব্যবস্থা করার পরও এমন একটা অঘটন ঘটে যাবে সেটা কখনও ভাবেনি৷ নাকি বডিগার্ডদের কেউ আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাথে যুক্ত৷ সেই এমনটা করেছে৷ প্রশ্ন যৌক্তিক হলেও উত্তরটা ধোঁয়াশাপূর্ণ৷ একজনের উপর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে এতগুলো শিশু বাচ্চা হত্যা করার কোনো অর্থ হয় না৷ উপরন্তু দুধের শিশুদের গায়ে হাত তো ভালো মানুষ তুলতে পারে না৷ উচ্চ মার্গীয় সাইকোপ্যাথ না হলে এমন কাজ করা সম্ভব নয়৷ সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে এলেক্স লিসাকে জিজ্ঞেস করল, “নিরাপত্তার কোনো কমতি আমি রাখিনি৷ আমার ছেলে যে রাজপুত্রের মতো থাকবে এর ব্যবস্থাও করে গেছি৷ এক ডজন গার্ড সবসময় থাকার জন্য পয়সা খুইয়েছি৷ তারা এই দুর্ঘটনার সময় কোথায় ছিল বলতে পার?

লিসা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “ আসলে সব দোষ আমারই। ওরা সারারাত এখানেই ছিল৷ আমি সকালে ওদের ডেকে সবজায়গায় সুসংবাদ দিতে বলি যে, জুনিয়র আর্ডেন দুনিয়ায় চলে এসেছে। চার জনকে রেখে দিয়ে বাকিদের পাঠিয়ে দেই৷ এদের মধ্যে দুইজন আমার কেবিনের সামনে আর বাকিরা বাবুর ওয়ার্ডে চলে যায়। এরপরই কী থেকে কী হয়ে গেল...”

“শিশু ওয়ার্ডে কে ছিল?”

“স্মিথ এবং ক্যথি।”

এলেক্স জবাব পেয়ে বাইরে রুমের বাইরে এসেই ক্যথিকে তলব করল৷ খবর পেয়েই ঈগলের মতো উড়ে সশস্ত্র রূপে হাজির ক্যথি৷ তাকে দেখে এলেক্স উদ্দেশ্য করে বলতে লাগল, “তোমরা হলে মায়ের জাতি৷ সন্তান হারানোর কষ্ট কেমন হতে পারে সেটা আশাকরি বুঝতে পারছ৷ আমি তোমাকে পুলিশি জেরা করার প্রয়োজন বোধ করছি না৷ শুধু বল ঠিক কী হয়েছিল?” প্রশ্ন করতে করতে চুরুটে আগুন লাগাল এলেক্স।

“স্যার, আমরা সবসময় প্রস্তুত ছিলাম যেকোনো কিছুর জন্য। সকাল সাতটায় আমি পুরো ওয়ার্ড চেক করে দাঁড়িয়ে যাই গেইটের সামনে৷ কোনোরকম সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়েনি৷ এমনকি ঐ সময় কেউ আসেও নি৷ এরপর আটটার দিকে একজন নার্স ট্রলি ঠেলে ওয়ার্ডে ঢোকে কিছু কাগজপত্র নিয়ে৷ পৌনে একঘন্টা অবস্থান করার সে বের হয়৷ এর মধ্যে ক্লিনার চলে আসলে আমি তার সাথে ভেতরে গিয়ে.....”

ক্যথির কথা মুখ থেকে নিয়ে এলেক্স প্রশ্ন করে, “তুমি কি নার্সের চেহারা দেখেছিলে? কেমন ছিল বের করতে পারবে খুঁজে?”

“স্যার এটাই সমস্যা। নার্স মাস্ক পরা ছিল৷ চোখ ছাড়া কিছুই দেখতে পাইনি।আমি সাথে সাথে পুরো টিমকে জানিয়ে নার্সকে খুঁজতে ছড়িয়ে দেই৷ তবে এতটুকু দেখেছি যে, নেইম কার্ডে লিলি লিখা ছিল৷”

“গুড জব৷ আশাকরি নিরাশ করবে না।”

তিন.

হাসপাতাল কাণ্ডের দিন সাতেক পেরুনোর পরও খুনীর কোনো হদিস বের করতে পারেনি পুলিশ৷ এমন পৈশাচিক কর্মকাণ্ড ইতিপূর্বে কেউ দেখেনি৷ উপরন্তু আর্ডেন গ্রুপ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কেইসের সাথে জড়িত থাকায় পুলিশের নজর একেবারে ভুল দিকে চলে গিয়েছে৷ তারা অনেকটা ধরেই নিয়েছে শত্রুপক্ষের কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এলেক্সের ক্ষতি করতে গিয়ে এই অঘটন ঘটিয়েছে৷ এজন্য ব্যক্তিগত বডিগার্ডদের বেশ কয়েকবার জেরার সম্মুখীন হতে হয়েছে৷ তবে এলেক্স মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে, তার বডিগার্ডরা কখনওই এমন কাজ করবে না৷

বন্ধের দিন রবিবার সন্ধ্যায় এলেক্স একখানা ম্যাসেজ দিয়ে ডিটেকটিভ রবিনসন নিজের অফিসে আসতে বলে৷ এলেক্সের ছেলের খবর শুনে রবিনসনও শোক প্রকাশ করেছে৷ শোকের দিকে অবশ্য রবিনসনই এগিয়ে৷ দাম্পত্য জীবনের দশটি বছর পার করার পরই একটা ফুটফুটে মেয়ের মুখ দেখতে পেয়েছিল৷ কিন্তু বয়স তিন দিন না গড়াতেই হারাতে হয় তাকে৷ তার ভাগ্য ভালো যে মৃত্যুর আগে সন্তানের চেহারাটা দেখতে পেয়েছিল, যা এলেক্সের ভাগ্যে জুটেনি। তাই পুরোনো সন্দেহ আপাতত দূরে রেখে এলেক্সের ডাকে সাড়া দিয়ে তার অফিসে চলে গেল।

সুনশান নীরবতায় চারদিক ছেয়ে আছে৷ সিকিউরিটি গার্ড আর বডিগার্ড ছাড়া আর কোনো লোক নেই বিল্ডিংয়ে৷ ডিটেকটিভ রবিনসনকে দেখতে পেয়ে ক্যথি তাকে রিসিভ করে লিফটে নিয়ে গেল পনের তলায় এলেক্সের অফিসে৷ কুশলাদি বিনিময়ের পর এলেক্স বলল, “আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে তোমাদের পুলিশ ডিপার্টমেন্ট ভুল পথে হাঁটছে৷ আমার দাবীর পিছনে শক্তশালী যুক্তি আছে৷ তবে আমি সেগুলো দেওয়ার প্রয়োজন মনে করছি না৷ আমি তোমার কাছে আইনী সহযোগিতা চাই।”

রবিনসন গলা খাঁকারিয়ে বলল, “আমিও এব্যাপারে নিশ্চিত যে তুমি একজন সিরিয়াল কিলার৷ যদিও আমার কাছে প্রমাণ নেই৷ তবে এখন যেহেতু আমরা এক নৌকার মাঝি তাই সাহায্যের কথা আসলে না করতে পারি না৷ আচ্ছা, বলো কীভাবে তোমাকে সাহায্য করতে পারি?”

“এই ঘটনার তদন্ত আমি করব৷ তদন্ত চলাকালীন সকল আইনী প্রশ্ন তুমি সামাল দেবে৷ আর যখন খুনীকে পেয়ে যাব সেটা তোমার৷”

“তোমার পরিকল্পনাটা কী বলতো?”

“আমি কখনও এটা ফাঁস করব না৷ উপরন্তু আমি পুলিশদের বিশ্বাস করি না৷ এব্যাপারে প্রশ্ন না করলেই খুশি হবো৷ তবে এতটুকু বলতে পারি যে, আমি একটা ফাঁদ পাততে যাচ্ছি। তোমার কী মনে হয়? কে এর পেছনে থাকতে পারে?”

“আমার মাথায় আপাতত ভ্যাম্পায়ার ছাড়া কারও কথা আসছে না৷”

“যাচ্ছেতাই অবস্থা! আর কিছু পেলে না। এগুলো তো বাচ্চারা দেখে বিনোদন হিসেবে৷ আর তুমি কীনা বাস্তব জীবনে তদন্ত করত বসে গেছ। আচ্ছা, এমন কী হতে পারে গ্রিক দেবী লামিয়া দুনিয়ায় এসে শিশুদের রক্ত চোষা শুরু করেছে?”

“ওমা! দেখ কারবার৷ ভ্যাম্পায়ার বললে বাচ্চাদের কাহিনী৷ আর নিজে পুরো পৌরাণিক কাহিনী খুলে বসে আছে তার কোনো খবর নেই৷ সে যাইহোক, অতিপ্রাকৃত কাউকে খুঁজে বের করো না৷ এতে আইনের সমস্যা হয়৷ তোমার জেলে থেকে কয়েক যুগ লেগে যাবে এদের বিশ্বাস করাতে যে ওটা একটা ভূত ছিল৷ কিন্তু তোমার প্রথম পদক্ষেপ টা কি সেটা বলো৷”

“ওটা না হয় দুদিন পরেই দেখবে৷”

রাত নয়টায় পর্যন্ত কেইসের বিভিন্ন বিষয় আলোচনা করতে করতে চলে গেল। এরপর তাকে বিদায় করে ক্যথিকে বলল, “ শহরের সব মিডিয়াকে জানাও আমি সংবাদ সম্মেলন করে শিশু হাসপাতাল করার খবর দিতে যাচ্ছি৷ খবরটা খুব চাউর করে ছড়িয়ে দাও৷ আমার মন বলছে, পলাতকা নার্সই মূল ঘাতক৷ কিন্তু বেকুব পুলিশের দল সেদিকে এগুবে না৷ আশাকরি, শিশু হাসপাতালের খবর পেয়ে সংবাদ সম্মেলনে সে হাজির হবে। নয়তো দু'দিন পর চাকরি নিতে আসবে। তুমি নজর রাখবে যাতে শিকার ফাঁদে পা ফেলার সাথে সাথে ধরা পড়ে৷ ”

“ওকে, স্যার৷ আরেকটা কথা৷ আপনি গ্রীনভিলেজ হসপিটালের সকল কর্মচারীর ডিটেইলস চেয়েছিলেন৷ এইযে সবার ডিটেইলস।” একটি ফাইল বাড়িয়ে দিয়ে ক্যথি বলল৷

এলেক্স ফাইলটা নিয়ে মিনিট দশেক যাবত সবগুলা কর্মীর নাম ভালোভাবে দেখল৷ কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কোথাও লিলির নাম নেই৷ তাই সে শূন্যে প্রশ্ন করে বসল, “লিলির নাম দেখছি না যে?”

“এটা এখনকার তথ্য৷ লিলি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছে জানুয়ারীর পাঁচ তারিখে৷ মানে দুর্ঘটনার এক সপ্তাহ আগে৷ ফলতঃ তার ঐদিনের কোনো রেকর্ড নেই হসপিটালে৷ এর থেকেও বড় কথা হলো হাসপাতালে সংরক্ষিত তথ্য এবং অন্যান্য সহকর্মীদের ভাষ্যমতে লিলির বয়স ছিল পঞ্চান্ন। কিছুদিন আগে তার জন্মদিনও পালন করেছে সে৷ কিন্তু আমি যাকে দেখেছি সে একেবারে তাগড়া যুবতি৷ বড়জোর ত্রিশ বছর হবে৷”

“ওয়েল ডান লিলি; সরি, ক্যথি! আমরা সঠিক পথেই এগুচ্ছি। আশাকরি, খুব দ্রুতই খুনীর সাক্ষাৎ মিলবে৷ তুমি কি তার বাসায় খোঁজ নিয়েছিলে? আর পুলিশ কি এই পথে আছে?”

“তার বাসায় খোঁজ নিয়ে জানতে পারি প্রায় দু' সপ্তাহ যাবৎ তার কোনো খবর নাই৷ নিকটাত্মীয় না থাকার কারণে কেউ তার নিখোঁজের খবর পুলিশকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি৷ আর পুলিশ লিলির খোঁজ করতে পারে বলে আগেই সব কাগজপত্র সরিয়ে ফেলেছি৷ খুঁজে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।”

এলেক্স মুখে বিজয়ীর হাসির রেখা ফুটিয়ে তোলে বাসায় ফিরল৷

চার.

পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী বিশাল সংবাদ সম্মেলন করে ঢাকঢোল পিটিয়ে একটি শিশু হাসপাতাল উদ্বোধন করল৷ একমাত্র ছেলেকে স্মরণীয় করে রাখতেই তার এমন উদ্যোগ। আর্ডেন গ্রুপ ব্যবসার পথে হাঁটলেও এক্ষেত্রে ভর্তুকি দিয়ে রোগী নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে৷ ভালো মাইনে আর স্বাধীনতা পাবার লোভে পেয়ে গেছে একদল নামীদামী ডাক্তার। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত বস্তু এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে৷

দুর্ঘটনার তিন মাস পর মার্চের এক সন্ধ্যায় এলেক্স ক্যথিকে উদ্দেশ্য করে বলল, “বুদ্ধি বোধহয় এখন সংজ্ঞ দিচ্ছে না৷ ভেবেছিলাম খুনী যেই হোক না কেন একবার হলেও সংবাদ সম্মেলনে আসবে৷ তা না হলে চাকরির জন্য আসবে। কিন্তু কোথাও কোনো খোঁজ নেই৷ ব্যাপারটা হতাশাজনক।”

“আমাদের মনে হয় খুনীর পথে হেঁটে চমৎকার কিছু করার দরকার। যাতে খুনীর দৃষ্টি কাড়ে৷”

“আমিও সেটাই ভাবসি। আচ্ছা, এখন সদ্যভূমিষ্ট নবজাতকের সংখ্যা কত? যাদের বয়স দশ দিনের মধ্যে। ”

“একশো তিনটি।”

“বেশ! তাহলে আজকেই কাজ সমাধা করা যাক।”, ধাতব নির্মিত দন্ত বিশেষের উপর হাত বুলাতে বুলাতে এলেক্স বলল৷

যেই কথা সেই কাজ৷ রাত দুইটার দিকে ইমার্জেন্সি এক্সিট দিয়ে নবজাতকের ওয়ার্ডে পৌঁছে গেল এলেক্স৷ হাতে রয়েছে লৌহ নির্মিত এক চোয়াল দন্ত বিশেষ। শিশু কেন খোদ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের গলায় বসিয়ে দিলেও মৃত্যুর দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে৷ এলেক্স ইচ্ছে করেই ইমার্জেন্সি এক্সিটে সিকিউরিটি বসায়নি৷ না দিয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা৷

রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথেই নিঃশব্দে ঢুকে পড়ল সে৷ মূল ফটকে সিকিউরিটি গার্ড ঝিমুচ্ছে৷ ওয়ার্ডে ঢুকেই সুনশান নিরবতায় ঘুমন্ত শিশুদের আবিষ্কার করল সে৷ চোখের পলকে পেছন দিয়ে গিয়ে কাল ঘুমে হারিয়ে যাওয়া কর্তব্যরত নার্সের মাথাটা মটকে দিল৷ সেখানেই তার ইহলৌকিক জীবনের সলিলসমাধি ঘটে। এরপর একে একে একশো তিনটি শিশুর গলায় লৌহ নির্মিত দন্ত বিশেষ বসিয়ে দিয়ে প্রাণবায়ু বের করার পৈশাচিক আনন্দে মেতে উঠে এলেক্স আর্ডেন। মুখ চেপে ধরায় টু শব্দটি বাইরে আসেনি। শিশুগুলোর মধ্যে ছিল বাল্যবন্ধু শেলীর তিনদিন বয়সী মেয়ে। সে শুধু নিরাপত্তার কথা ভেবেই নিজের হসপিটাল রেখে বন্ধুর কাছে এসেছিল। নিজ কর্ম সমাধা করে মূল ফটকে বসে থাকা দুইজন সিকিউরিটির মাথা মটকে দিয়ে সটানভাবে শুইয়ে দিল। এরপর আগত পথেই ফিরে গেল শতাব্দীর কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার এলেক্স আর্ডেন৷

পরদিন সকালে হসপিটালের সম্মুখে কয়েকশো সাংবাদিক। সাথে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজন। লন্ডন থেকে চলে এসেছে বিশেষ তদন্ত কমিটি৷ রাণী এলিজাবেথ এই দুর্ঘটনায় দেশ জুড়ে শোক ঘোষণা করেছে৷ ইংল্যান্ডের ইতিহাসে এমন ভয়াবহ ঘটনা আর দ্বিতীয়টি ঘটেনি৷ এলেক্স চমৎকার কিছু করতে চেয়েছিল৷ কিন্তু এতটা চমৎকৃত হয়ে যাবে সেটা ভাবেনি। সন্ধ্যায় একটা সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা দিয়ে সাংবাদিকদের একদিকে সরিয়ে দিল৷ ক্যথি ও তার টিমের দৃষ্টি শুধু মাস্ক পরা তাগড়া যুবতিদের প্রতি৷ এখন পর্যন্ত কাঙ্খিত ব্যক্তিকে পাওয়া যায়নি৷

হল রুমে শ'খানেক দেশী-বিদেশী মিডিয়াকর্মী উপস্থিত৷ সবার মনেই রয়েছে হাজারও প্রশ্ন৷ অবশেষে হৈচৈয়ের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে প্রবেশ করল আর্ডেন গ্রুপের কর্ণধার এলেক্স আর্ডেন৷ মাইক্রোফোনে টোকা দিয়ে বলতে লাগল, “আজ আমি দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে বলতে চাই, ইংল্যান্ডবাসী ইতিপূর্বে এমন ভয়ানক কিছু দেখেনি৷ দুঃখজনক ব্যাপার হলো কে বা কারা এমন ঘটনা বারবার পুনরাবৃত্তি করছে সেটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনও ধরতে পারেনি৷ আমি সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ করব তারা যেন দেশের চৌকস টিম দিয়ে হলেও এদের ধরে ফেলেন৷ এখন হাজার হাজার প্রাণের আকুতি মিনতি এটাই। আপনাদের কোনো প্রশ্ন থাকলে করতে পারেন৷”

প্রশ্ন করার সুযোগ পেয়ে অন্যান্য সাংবাদিকদের সাথে পাতলা ব্লু কালারের জ্যাকেট গায়ে জড়ানো আনুমানিক ত্রিশ বছর বয়স্কা মাস্ক পরা একজন তরুণী হাত উত্তোলন করল৷ এলেক্স মোক্ষম সুযোগ মনে করে তাকে প্রশ্ন করতে বলে৷ তরুণী সুযোগ পেয়ে দাঁড়িয়ে উদীয়মান সাংবাদিকদের ধাচে জিজ্ঞেস করল, “কয়েক মাস আগে হসপিটাল কাণ্ডের পর আপনি নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে এই ব্যক্তিগত হাসপাতাল নির্মাণ করেন৷ মানুষকে আকর্ষিত করার জন্য আপনার মূল বক্তব্যে ছিল বিশেষ নিরাপত্তা প্রদানের কথা৷ কিন্তু বাস্তবে এর ব্যত্যয় দেখা যাচ্ছে৷ আবার খুনের মোটিভ এবার একটু ভিন্ন। গত তারিখে শুধু শিশু মারা পড়েছিল৷ এবার প্রাপ্তবয়স্কও আছে৷ তাহলে কি এটা নিজের সন্তান হত্যার প্রতিশোধ ছিল?”

এমন বেখাপ্পা প্রশ্নেই এলেক্সের সন্দেহ আরও প্রকট আকার ধারণ করে৷ তবে প্রথমে প্রতিশোধের ব্যাপারটা মাথায় ধরে না তার৷ অন্যদিকে ক্যথির ঈগলের দৃষ্টিতে শিকার এবার আটকে যায়৷ ওয়াকিটকি দিয়ে অন্যান্য সদস্যদের শিকারের কথা জানিয়ে দেয় সে। ইতিমধ্যে ক্যথি রেজিস্ট্রার তলব করে লিলি নামে কাউকে খুঁজে পায় না৷ তবে কাছাকাছি লামিয়া নামটি নজরে ধরা পড়ে৷ ব্লু কালার জ্যাকেট জড়ানো তরুণীটিই লামিয়া। কালক্ষেপণ না করে ক্যথি এলেক্সের কানে ফিসফিসে বলে, “শিকার ফাঁদে পা দিয়েছে৷ সমাপনী বক্তব্য দিন৷”

এলেক্স সমাজের মানুষকে পাশে চেয়ে আর কিছু গুণীজনের সমালোচনা করে দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ের অভিনয় করে সংবাদ সম্মেলন শেষ করল। সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের সঠিক জবাব না দেওয়ায় তারা বীতশ্রদ্ধ। কিন্তু তাদের কিছু করার নেই৷ দায়িত্বে গাফলতির দরুন আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলে সে বিদেয় হয়েছে৷ তাই ইচ্ছেমতো গালিও দিতে পারছে৷

স্টেজ থেকে নেমেই ব্র‍্যাণ্ড নিউ মার্সেডিজে চড়ে বসল এলেক্স৷ সাথে আছে ক্যথি৷ ড্রাইভারের সিটে স্মিথ বসে ফুল স্পীডে গাড়ি চালিয়ে দিল। এলেক্স নির্দেশ ছিল ক্যথি আর স্মিথ ছাড়া আর কেউ তাদের সাথে যাবে না৷ একটি সস্তা ট্যাক্সিক্যাবে উঠেছিল লামিয়া৷ প্রায় পাঁচ ঘণ্টার জার্ণি শেষে লন্ডনের পরিত্যক্ত একটা বাড়িতে এসে ট্যাক্সিক্যাবটি থামে। দূর থেকে এলেক্স বেশ ভালো করে পরখ করতে পারছিল। এবার লামিয়ার মুখে কোনো মাস্ক নেই৷ চেহারা দেখে মনে হচ্ছে স্বর্গের দেবী স্বয়ং নেমে এসেছে দুনিয়ায়। কালক্ষেপণ না করে এলেক্স চিরায়ত ধারা অনুসরণ করে একটি লোড করা Remington R51 মডেলের সেমি অটোমেটিক পিস্তল এবং দু'টি সাধারণ চাকু নিয়ে লামিয়ার পিছু নিল।

পরিত্যক্ত বাড়িটি তে এলেক্স দেখতে পেল লামিয়া ইংরেজি পোষাক ছেড়ে মধ্যযুগীয় আলখাল্লা মতো কিছু একটা পরে তার জন্য অপেক্ষমাণ। এত দ্রুত সময়ে যে কাপড় পরিবর্তন করা সম্ভব না এটা এলেক্সের ভালো করেই জানা৷ সেদিকে নজর দেওয়ার সময় এখন নেই। এলেক্সকে দেখা মাত্রই লামিয়া বলে উঠল, “এযে দেখছি মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি৷ আর্ডেন গ্রুপের কর্ণধার ছেলে হত্যার প্রতিশোধ নিতে চলে এসেছে৷ তবে তার বোধহয় জানা নেই দেব-দেবীরা অমর৷ তোর ছেলে তো আমার হাতে মরে স্বর্গে আছে৷ এবার তুই মরে নরকে যাবি৷”

“আচ্ছা, তুই সে-ই লামিয়া যে নিজের বাচ্চার প্রতিশোধ হেরার উপর না নিতে পেরে বাচ্চাদের থেকে নিতে শুরু করেছিলি৷ ফলতঃ জিউসের ক্রোধের মুখে পতিত হয়ে চোখ বন্ধ করার ক্ষমতা হারিয়েছিস৷ আহারে, তোর মতো অসহায় আর কে আছে৷ না সন্তান পেলি না প্রেমিক। না নিতে পারলি প্রতিশোধ। বেচারা দূর্ভাগা দেবী।” এলেক্সের খোচা মারা কথার উদ্দেশ্য ছিল লামিয়াকে উত্তেজিত করা৷ প্রথম পদক্ষেপেই এলেক্স সফল৷ দেবী লামিয়া নিজেকে অসহায় হিসেবে আবিষ্কার করতে পেরে বেজায় অখুশি৷ তাই প্রথম আক্রমণটা তার থেকেই আসলো৷

শিশুসুলভ আক্রমণ দেখে এলেক্স একটি চাকু পেট বরাবর ঢুকিয়ে দিয়ে এফোঁড়ওফোঁড় করে ফেলল৷ কিন্তু এতে লামিয়ার কিছু হয়েছে বলে মনে হলো না৷ লামিয়া হাসতে হাসতে বলল, “এবার কে অসহায় বল তো বাছাধন?! আমার মৃত্যু নেই৷ আর তোর নরকের ঠিকানা এখনই লাগিয়ে দেব৷ ”

“স্বর্গ-নরক নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। আমি এত পূণ্যও করিনি যে স্বর্গে যাব৷ তবে তোদের মতো দেব-দেবীকে নরকে না পাঠিয়ে গেলে আফসোস লাগবে। জন্মের পর থেকেই তো তোদের বাপ ক্রোনাসের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে এসেছিস৷ আর মানুষের উপকারেই বা তোরা কি কাজে আসিস। প্রমিথিউসকে আগুনের অপরাধে কী শাস্তি নির্ধারণ করেছিলো তা বুঝি আমাদের জানা নেই?! তোর মতো কয়েকটা দেবদেবী হত্যা করলে সমগ্র ইংল্যান্ডের মানুষজন আমাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে৷”

প্রচন্ড বাকবিতন্ডা ও কিছু ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার পর এলেক্স অনুধাবন করতে পারে যে লামিয়াকে এসব অস্ত্র দিয়ে ঘায়েল করতে পারবে না৷ খালি হাত যদি কাজে দেয় তাহলে হবে নইলে এখন দুনিয়া থেকে বিদেয় হওয়ার সময় হয়ে গেছে৷ সব হিসেব কষা বন্ধ করে এক লাফ দিয়ে আক্রমণে উদ্যত দেবী লামিয়ার গায়ের উপর গিয়ে পড়ে৷ দেবী কিছু বুঝে উঠার আগেই এলেক্স গলার শাহ রগ বরাবর কামড় বসিয়ে একটান দিয়ে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে ফেলে৷ ফিনকি দিয়ে নীল রঙা পানীয় বের হওয়ার সাথে সাথেই দেবী লামিয়ার দেহটা ভস্মে পরিণত হয়ে উড়ে যায়৷

......

“ক্রিং ক্রিং...”

“হ্যালো! কে বলছেন?”
“Now I am presenting to you Mr. Alex Arden who is the famous vigilante guardian and the mafia killer as a god butcher. Ha ha ha.” ফোনের ওপাশ থেকে ডিটেকটিভ রবিনসন বলল৷

এলেক্স ফোনটা রেখে স্মিথকে ইশারা দিয়ে বলল, “পরবর্তী টার্গেটের জন্য রওনা হও।”

সমাপ্ত
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে নভেম্বর, ২০২৩ রাত ১০:০২
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কিছু কিছু ছবি

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ২৪ শে জুন, ২০২৪ সকাল ১১:৪৩











এত ব্যস্ততা সবার যে ছবি তুলতেও সময় নেই.........................





তার উপর কোরবানীর ঈদ..............................ব্যস্ততা চৌগুন বেশি............।






গরু, ছাগল আর রাসেল ভাইপার নিয়ে দেশের মানুষ ও ফেসবুক সরগরম............।






গরমের চরম অবস্থায়ও কিছু ছবি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভারতকে ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্ট দেয়ায় বাংলাদেশের লাভ না ক্ষতি?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ২৪ শে জুন, ২০২৪ দুপুর ১২:১৯



সম্প্রতি আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় এ বিষয়ে ট্রানজিট বিষয়ে নেতিবাচক পোস্ট দেখছি। তাই বিষয়টির বিশদ বিশ্লেষণ জরুরি। প্রথমেই আমাদেরকে Transit, Transhipment, Corridor সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে।

▶️ ট্রানজিটঃ

প্রথম দেশ, দ্বিতীয় দেশের #ভূখণ্ড... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোদাইকানাল শহর ভ্রমণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ২৪ শে জুন, ২০২৪ বিকাল ৩:৫৪


দুপুরের আগেই ডে লং কোদাই কানাল সাইটসিইয়িং ট্রিপটি শেষ হয়ে গেলে আমি আর হোটেলে ফেরত না গিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম কোদাই শহরটা পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখার। যেহেতু দুপুর প্রায় মধ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার পান্তা বিলাস

লিখেছেন অপু তানভীর, ২৪ শে জুন, ২০২৪ সন্ধ্যা ৬:২৫



আমি পহেলা বৈশাখে কোনো দিন শখ করে পান্তা ইলিশ খাইনি। ইলিশ খেয়েছি, তবে পান্তা দিয়ে নয়। তার মানে কিন্তু এটা না যে আমি পান্তা ভালোবাসি না। বরং উল্টো, পান্তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেখেছি যারে এঁকেছি তারে..... (আপডেটেড রিপোস্ট)

লিখেছেন শায়মা, ২৪ শে জুন, ২০২৪ রাত ১০:২৬
×