somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নামের নামাবলি - পর্ব 2

১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ রাত ১:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

3.
সেলিব্রিটিদেরও এলেবেলে নাম থাকে। কিন্তু এই মানুষগুলি সেলিব্রিটি হয়ে উঠলে হেঁজিপেঁজি খুব সাধারণ নামেও অনন্যতার ছাপ পড়ে। যেমন রাজনীতির শেখ মুজিবুর রহমান বা তাজউদ্দিন আহমদ। টিভির আফজাল হোসেন বা আবুল হায়াত। ফুটবলের সালাউদ্দিন বা এনায়েত। ক্রিকেটের মোহাম্মদ আশরাফুল। চলচ্চিত্রের রাজ্জাক বা ফারুক। খ্যাতিমান লেখকের না হলে সৈয়দ শামসুল হক নামটি কিন্তু অন্য দশটা নামের মধ্যে দিব্যি একাকার হয়ে যায়। এই নামগুলোর মধ্যে কোনো আপাত-জৌলুস কিছু নেই। কিন্তু এঁদের কীর্তি বা অর্জন নামগুলোকে উজ্জ্বলতা দিয়েছে। একটি আ-কার সহযোগে শামসুর রহমান নিজেকে আলাদা করে ফেলেছেন শামসুর রাহমান হিসেবে।

অন্যদিকে কোনো কোনো নাম শুনলে মনে হবে এঁরা আলাদা কিছু না হয়ে পারেন না। যেমন, জহির রায়হান। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।

আবার শিল্প-সাহিত্যে সংশ্লিষ্ট মানুষেরা, বিশেষ করে কবি ও চলচ্চিত্রশিল্পীরা এ ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য, কলমনাম বা পর্দানাম ধারণ করে থাকেন নিজেদের সাধারণ থেকে আলাদা করে ফেলার জন্যে। পপি নামের মেয়েটি হয় ববিতা। বরিশালের আবুল হোসেন কবি হয়ে যায় আবুল হাসান নামে। কিশোরগঞ্জের হাবীবুর রহমান হয় আবিদ আজাদ। টাঙ্গাইলের নূরুল ইসলাম খান থেকে মাহবুব হাসান। নারায়ণগঞ্জের গোলাম মাওলা শাহজাদা হয় হাসান হাফিজ। যতোদূর জানি রফিক আজাদ, সেলিম আল দীন, শিহাব সরকারও কলমনাম।

অনেক বিচিত্র নামের মুখোমুখি কমবেশি আমরা সবাই হয়েছি। এককালে আমাদের দেশে শিশুমৃতু্যর হার ছিলো অত্যন্ত বেশি, পেছনে তাকালে জন্মেই মারা যাওয়া শিশুর গল্প প্রায় প্রত্যেক পরিবারেই একাধিক পাওয়া যাবে। এসব ক্ষেত্রে বাবা-মা সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুর জন্যে নির্বাচন করতো বিচিত্র নাম, অনেক ক্ষেত্রে অতি বাজে, এমনকী শ্লীলতার প্রচলিত ধারণার বিপরীত। সংস্কারবশে মনে করা হতো, যমের চোখ বা মনোযোগ এরকম নামধারীদের ওপর পড়বে না। ব্যাঙ্গা বা পচা এই ধরনের নামের খুব সাধারণ ও চালু নমুনা। অল্প কিছুদিন আগে সিলেটে পুলিশের হাতে অযথা হেনস্থা হওয়া আপাত-অশ্লীল নামধারী একজন খবরের কাগজে শিরোনাম হয়ে আসছিলেন বেশ কয়েকদিন ধরে।

এইসব নামের সবগুলো হয়তো বাবা-মায়ের দেওয়া নয়। পাড়া-প্রতিবেশী বা বন্ধুদের কল্যাণে অনেক নাম চালু হয়ে যায়, এমনকী এই আরোপিত নামের পেছনে আসল নামটি হারিয়েই যায়। স্কুলে হুমায়ূন কবির (ডাকনাম বাচ্চু) নামের আমাদের এক সহপাঠীর নাম হয়ে গেলো আটচলি্লশ। এর কোনো কার্যকারণ উদ্ধার করা যায়নি। ছাত্র হিসেবে মেধাবী ছিলো সে, তার রোল নম্বর দুই-তিনের মধ্যে থাকতো। তবু তার নাম কেন যে আটচলি্লশ কে জানে! তার আসল নাম একসময় প্রায় সবাই ভুলে গেলো। একই সময়ে খসরু পরিচিতি পায় বাতাস নামে। আরেক সহপাঠী (তার আসল নামটি মনে নেই) খ্যাতি পায় জালিম নামে। মলি্লককে সবাই জানতো পোত্যা নামে। বগুড়ায় মরিচকে পোত্যা বলা হয়। মরিচের মতো সরু ও লম্বাটে বলে তার ওই নামকরণ। আমাদের স্কুলের গেম টীচারকে সবাই চিনতো কোব্বাদ স্যার হিসেবে। কোব্বাদ নামের বিড়ি বাজারে তখন জনপ্রিয় ছিলো এবং সেই বিড়িতে আসক্তির কারণেই নাকি তিনি নামটি অর্জন করেছিলেন। আরেকজন শিক্ষক পরিচিত ছিলেন আদিব স্যার নামে। ষাটের দশকে ঊর্দূ ছবির বিখ্যাত ভিলেন আদিবের সঙ্গে তাঁর চেহারার খুব মিল ছিলো, এমন বলা শক্ত। তবু এইসব নামকরণ কোথা থেকে কীভাবে হয়, তার ঠিক আছে?

নাম সংক্ষিপ্ত বা বিকৃত করে ফেলার নমুনাও কমবেশি সবারই জানা। কঙ্বাজারের বাহারকে বলা হবে বাহাইজ্জা। কোটালীপাড়ার সারোয়ার হয়ে যাবে সরো। ঢাকার মিলন মিলইন্যা। কুমিল্লার মজিদ মইজ্জা। মার্কিন দেশে সংক্ষিপ্তকরণের কিছু নমুনা: উইলিয়াম = বিল/বিলি/উইলি। চার্লস = চাক/চার্লি। রিচার্ড = ডিক/রিক/রিচি। টমাস = টম/টমি। রবার্ট = বব/ববি। অ্যালবার্ট = অ্যাল। ভিক্টোরিয়া = ভিকি। সুজান = সুজি। রেবেকা = বেকি। এলিজাবেথ = লিজ/লিজা/লিজি। এডওয়ার্ড = এডি। মাইকেল = মাইক।

নামের সঙ্গে বিশেষণ বা কোনো একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বা গুণ যোগ করে দেওয়ার রেওয়াজও আছে। যেমন শূন্যে লাফিয়ে উঠে উড়ন্ত অবস্থায় অসম্ভব সব কান্ড ঘটানোর ক্ষমতার কারণে বাস্কেটবলের মাইকেল জর্ডানের নাম হয়েছিলো এয়ার জর্ডান। কিন্তু এই সবিশেষণ বা পরিচিতিসূচক নামকরণকে একটা আলাদা মাত্রায় নিয়ে গেছে আমাদের দেশের কথিত সন্ত্রাসীরা _ কালা জাহাঙ্গীর, সুইডেন আসলাম, পিচ্চি হান্নান, গালকাটা কামাল, মুরগি মিলন, কুত্তা জহির ইত্যাদি।

4.
আমার পুত্রের জন্যে বাংলা নাম নির্বাচন করায় আমার ধর্মপ্রাণ শ্বশুর কিঞ্চিৎ অসন্তুষ্ট হয়ে বলেছিলেন, একটা মুসলমান নাম রাখলে হতো না?

কী করে তাঁকে বলি, নামের হিন্দু-মুসলমান হয় না! ইসলাম ধর্ম প্রবর্তিত হওয়ার অনেক আগে থেকেই মোহাম্মদ, আবদুল্লাহ, আবু তালেব বা খোদেজা নামগুলি চালু ছিলো। এগুলোকে মুসলমান নাম বলা যাবে কোন যুক্তিতে? পাল্টা যুক্তি আসতে পারে, এগুলো অন্তত আরবি নাম তো বটে। ঠিক কথা। কিন্তু ইসলাম ধর্মে কোথায় বিধান দেওয়া আছে যে মুসলমানের নামকরণ আরবি হতেই হবে? নামকরণ ব্যাপারটি মানুষেরই আবিষ্কার, তার নিজের প্রয়োজনে। প্রয়োজনটি বহুবিধ হলেও মূল ধারণাটি নিশ্চয়ই ছিলো, একজনকে আরেকজনের থেকে আলাদা করে চিহ্নিত করা। সেটি শ্রুতিমধুর বা অর্থপূর্ণ কিছু হলেই চলে, ধমর্ীয় বিবেচনা কতোটা প্রাসঙ্গিক তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা যেতেই পারে।

আমার এক বন্ধু _ নাম আবু জাফর _ কয়েক বছর আগে সৌদি আরবে যায় চাকরি নিয়ে। এই ধরনের নামকে আমরা মুসলমান বা আরবি নাম বলে জানি। কিন্তু সৌদি আরবে পৌঁছে বিপত্তি হয়, কী আশ্চর্য, আরব দেশে তার এই আরবি নাম নিয়েই! তাকে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো, এটা কী করে তোমার নাম হয়? এই নামের অর্থ হচ্ছে জাফরের পিতা। তাহলে তোমার নামটি কোথায়?

নাসিরউদ্দিন হোজ্জার গল্পে যেমন ছিলো, আধসের মাংস খেয়ে ফেলা বিড়ালকে দাঁড়িপাল্লায় তুলে ওজন করে দেখা গেলো তার ওজন আধসের। হোজ্জা বললেন, এই যদি বিড়াল হয়, তাহলে মাংস কোথায় গেলো? আর এটা মাংস হলে বিড়ালটা কোথায়?

অনেক প্রামাণ্য কাগজপত্র দাখিল করে আমার বন্ধুটি সৌদি আরবে তার নতুন কর্মক্ষেত্রে আবু জাফর হিসেবে নিজেকে বহাল করতে সক্ষম হয়! অর্থ না বোঝার অনর্থ আর কী।

আরেকটি ঘটনার কথা মনে পড়লো। ঢাকায় একবার আমাদের অফিসে একটা ফোন রিসিভ করেছি। ফোনের অন্য প্রান্তের ভদ্রলোক আমার এক সহকমর্ীকে চাইলেন। সহকর্মী অনুপস্থিত জানিয়ে বললাম, কিছু বলতে হবে কী না। ভদ্রলোক বললেন, মজুমদার ফোন করেছিলো জানালেই হবে।

ভদ্রলোককে পুরো নাম বলতে অনুরোধ করি, কারণ আমার সহকর্মীর সঙ্গে অন্তত তিনজন মজুমদারের নিয়মিত যোগাযোগ আছে বলে আমি জানি। ভদ্রলোক কিছুতেই পুরো নাম বলবেন না, আমিও নাছোড়বান্দা। শেষমেশ ভদ্রলোক সসংকোচে নামটি বললেন, বস্ত্রহরণ মজুমদার।
ভাবলাম, নাছোড়বান্দা দেখে ভদ্রলোক আমাকে বোকা বানানোর জন্যে বানিয়ে নামটি বলেছেন। পরে জেনেছি, ওটি তাঁর আসল নাম, সংকোচ সেই কারণেই। এমন নামও বাবা-মা রাখেন!
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ দুপুর ১২:৫৮
১৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিশুদের পর্যবেক্ষণ, শিশুদের ভালোবাসা

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৩


Two for joy!

আমার চার বছরের নাতনি আলিশবা আমাকে ব্রীদিং এক্সারসাইজ করতে দেখলে সে নিজেও শুরু করে। যতটা পারে, ততটা মনোযোগের সাথে অনুকরণ করতে চেষ্টা করে। আমি ওকে দেখলে কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনি ধার্মিক না মানুষ?

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:০৮



ধার্মিক হওয়া কোনো কাজের কথা নয়।
ধার্মিক হওয়া সহজ। বিজ্ঞানী হওয়া সহজ কথা নয়। পিএইচডি করা সহজ কথা নয়। সেই তুলনায় কোরআন মূখস্ত করা সহজ। জন্মগত ভাবে আমি বাপ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ISD মোবাইল, TNT ফোন।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:২৮

২০০১ সালে কম মানুষের হাতেই মোবাইল ছিলো। মোবাইল ছিলো বড়লোকী পরিচয়। সে সময় সকল মোবাইল থেকে ইন্টারনেশন্যাল ফোন ও টেলিফোন থেকে কল আসার সুবিধা ছিলো না। মুষ্টিমেয় সিমের বিদেশ থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

'মানুষ' হওয়া খুব সোজা, 'মুসলমান' হওয়া কঠিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:৩৪



একটু আগেই ভাবছিলাম, মানুষ হওয়াটা খুব সহজ। বাবা-মা জিংজিং করে আমাদের পৃথিবীতে এনেছেন, এতে আমাদের কৃতিত্ব কোথায়! কোন কৃতিত্ব নেই। আমরা অটো ভাবেই 'মানুষ' হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছি। দুইজন মানব-মানবীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

তোমাকে ভালোবাসি I love you

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ২৭ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৩:০২

তোমাকে ভালোবাসি বাতাসের মতো,
যেমন শিশুর কাছে বালি একটা খেলনা,
অথবা ঝড়ের মতো, যাকে কেউ বোঝে না।

I love you like the wind,
Playing like a child in the sands,
Or a storm that no... ...বাকিটুকু পড়ুন

×