5.
আমাদের দেশে কিছু কিছু মানুষের নাম দেখে তাঁদের গ্রামের বাড়ির খবর পাওয়া যায়। যেমন, শফি বিক্রমপুরী। কলিমুল্লাহ আক্কেলপুরী। চরমোনাইয়ের পীর বা আটরশির পীরের আসল নাম কেউ কি জানে? নামবৈচিত্র্যের আরো নমুনা: চাষী নজরুল ইসলাম, সুরুজ বাঙালি। এগুলোর কোনোটাই পারিবারিক পদবী নয়, বাবা-মা এরকম নাম দিয়েছিলেন বলে বিশ্বাস করা শক্ত। এগুলো আসলে ধারণ করা নাম।
খ্যাতিমান কিছু মানুষের পুরো নামের সঙ্গে ডাকনামটি এমনভাবে একাকার হয়ে গেছে যে দুটোকে আলাদা করার আর উপায় নেই। মেনন বাদ দিয়ে রাজনীতিক রাশেদ খানকে কেউ চিনতে পারবে? বা সেলিম-বিহীন মুজাহিদুল ইসলামকে? লেখক ইমদাদুল হক মিলনও এই দলের একজন। এঁদের অনুকরণে আজিজুর রহমান আজিজ বা শহীদুল ইসলাম শহীদ জাতীয় নামও লেখা হয়, যেখানে ডাকনামটি যোগ করা অনাবশ্যক মনে হতেই পারে।
অনেক সমাজেই একসময় পারিবারিক পেশাটিকে পদবী হিসেবে নেওয়ার চল ছিলো। কাজী, তালুকদার, জায়গীরদার, সরদার, গোল্ডস্মিথ, শু্যমেকার এই গোত্রে পড়ে। তখন প্রামাণিক, সাহা, ঘোষ, শীল বা চক্রবর্তী পদবী দেখে বোঝা যেতো কার কী পেশা। আজকাল আর এইসব পদবী অনেক ক্ষেত্রেই কোনো অর্থ বা ইঙ্গিত বহন করে না। আমার এক ভারতীয় সহকমর্ীর পদবী কিংখাবওয়ালা। পেশায় আই টি প্রফেশনাল।
অনেক নাম আছে, শুনে বোঝার উপায় নেই চরিত্রটি পুরুষ না মেয়ে। আমার নিজের ডাকনামটি এই গোত্রে পড়ে, মুকুল নামের একাধিক মেয়েকে আমি চিনি। মঞ্জু, নিতু, শিমুল, শাহিন, বকুল এইসব নামও চট করে মালিক বা মালকিনের লিঙ্গ-পরিচয় নির্দেশ করে না।
মার্কিন দেশেও এমন নাম পাওয়া যায়। ছেলেদের ক্রিস্টিয়ান বা মেয়েদের ক্রিস্টিনা নামের সংক্ষিপ্ত রূপ ক্রিস, কিন্তু ক্রিস জোনস নাম শুনলে কী উপায়ে বোঝা যাবে সে ছেলে না মেয়ে?
কর্মোপলক্ষে কিছুকাল সিঙ্গাপুরে বসবাস করতে হয়েছিলো। সেখানে শতকরা পঁচাত্তর ভাগ মানুষ চীনা বংশোদ্ভুত। প্রথম প্রথম কিছুকাল তাদের নামকরণের ধরণ-ধারণ বোঝার চেষ্টা করেছিলাম। লাভ কিছু হয়নি। কাজকর্মের সূত্রে পরিচিত এক স্থানীয় চীনা ছেলেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ওদের নাম দেখে ছেলে বা মেয়ে বোঝার কোনো সূত্র বা উপায় আছে কী না। সে জানালো, খাঁটি চীনা নাম হলে কোনো আশা নেই। তবে এইসব ঘোচানোর জন্যে আজকাল পারিবারিক পদবীটি ঠিক রেখে ইংরেজি ধাঁচের নাম রাখা হচ্ছে। যেমন দেখো, আমার নাম ক্যামেরন, আমার বোনের নাম রাখা হয়েছে জুলি।
6.
বাঙালি মুসলমান পরিবারে নামকরণের যে বিশৃঙ্খলা, তা আর কোথাও কোনো গোষ্ঠী বা সমপ্রদায়ে আছে বলে আমার জানা নেই। শতকরা নব্বই বা তারও বেশিরভাগ পরিবারে বাবার সঙ্গে ছেলের নামের কোনো মিল পাওয়া যায় না। আবদুল কাদেরের পুত্র অনায়াসে আমিনুল হক হতে পারে। হুমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল এবং আহসান হাবীব _ জানা না থাকলে আমাদের দেশের এই তিন খ্যাতিমানের নাম পাশাপাশি বসিয়ে দিলে এঁদের সহোদর হিসেবে শনাক্ত করা অসম্ভব। অখচ অন্য দেশে শেখ মুজিবর রহমান ও জিয়াউর রহমানকে সহোদর বলে চালিয়ে দেওয়া সম্ভব।
নামকরণের এই অব্যবস্থাটি কীভাবে কবে শুরু হয়েছিলো তা নিয়ে গবেষণা কেউ করেছেন বলে শুনিনি। তবে হওয়া দরকার বলে মনে হয়। পরিবার ও পারিবারিক সম্পর্ক বিষয়ে বাঙালি ঐতিহাসিকভাবে পরিচিত পথে হাঁটতে অভ্যস্ত। কিন্তু ছেলেমেয়েদের নামকরণের ব্যাপারে সেই বাঙালি এমন অর্গলমুক্ত স্বাধীনতা নিতে গেলো কেন? এর পশ্চাতে সামাজিক, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় কারণ অবশ্যই আছে বলে ধারণা করা যেতে পারে। সেগুলোর বিচার-বিশ্লেষণও হওয়া দরকার। কথা উঠতে পারে, আমাদের জীবনে-সমাজে এতো এতো সমস্যা থাকতে নামধাম নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার কী, সময় কোথায়? ঠিক কথা। কিন্তু ক'টা জরুরি কাজকে আমরা জরুরি হিসেবে মানছি? অথবা সেসব বিষয়ে সামাজিক-রাষ্ট্রিক পর্যায়ে কিছু করে উঠতে পারছি? পারলে এই বঙ্গদেশে হেজাবের প্রচলন হতে পারতো না, ভুঁইফোঁড় কোনো ভাইয়ের উত্থান ঘটতে পারতো না, সন্ত্রাস-অন্যায়-অনাচার সামাজিক-রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সহায়তা পেতে পারতো না, অপরাধীরা সমাজের মাথায় উঠে বসে আমাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হতে পারতো না। এগুলোও ভেবে দেখার বিষয়। যদি সব সমস্যার সমাধান পাওয়া গেলে তবে আমাদের চিন্তাভাবনা বা আচার-আচরণের শৃঙ্খলার কথা ভাববো বলে আমরা ঠিক করি, সে মুহূর্তটি আমাদের জীবনে কখনোই আসবে না।
তার চেয়েও জরুরি একই পরিবারের সন্তানদের নামকরণের বেলায় কিছু শৃঙ্খলা ও সতর্কতা। বাধ্যবাধকতার কথা নয়, প্রশ্নটি অসঙ্গতিগুলো ঘুচিয়ে ফেলার। এখানে বিশাল কোনো সমষ্টিগত উদ্যোগের দরকার নেই, দরকার নেই রাষ্ট্রীয় বাজেটে ব্যয়-বরাদ্দের। কেবল চাই ব্যক্তিপর্যায়ে কিছু সচেতনতা ও উদ্যোগ।
সব বিচারেই গোগোল গাঙ্গুলি অথবা আবু হোসেন মুহম্মদ জুবায়ের ওরফে এ.এইচ.এম. জুবায়ের ওরফে আ.হ.ম. জুবায়ের ওরফে মুহম্মদ জুবায়ের মুকুল ওরফে মুহম্মদ জুবায়ের ওরফে আহ্ম্ জুবায়ের-এর অভিজ্ঞতা কিন্তু খুব সুখের নয়।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ দুপুর ১২:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


