১.২
ব্যাগেজ এলাকায় অদৃশ্য সুড়ঙ্গ থেকে এখন কনভেয়র বেল্টে চড়ে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে বিভিন্ন আকার ও চেহারার স্যুটকেস, নানা চেহারা ও স্বাস্থ্যের ব্যাগ, স্লিপিং ব্যাগ, কার্ডবোর্ডের বাক্স। গড়িয়ে নেমে যাচ্ছে ঘুরন্ত ক্যারুসেলে। যেখানে দাঁড়িয়ে আছো, থাকো - ক্যারুসেল তোমার ব্যাগেজটি সামনে এনে হাজির করলে টুপ করে তুলে নাও। কনভেয়র বেল্টে একটা চ্যাপ্টামতো লম্বা বাক্সও দেখা যায়, আকার দেখে ভেতরে কী আছে বোঝার উপায় নেই। সবই আসছে, শুধু বিজুর কালো রঙের ব্যাগটারই দেখা পাওয়া যাচ্ছে না।
ভেবে দেখলে ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত আর অবিশ্বাস্য। জীবনে অন্তত একবারও কি ওর ব্যাগেজ প্রথমদিকে আসতে পারে না? কনভেয়র বেল্টে কারো না কারো ব্যাগ বা স্যুটকেস তো প্রথমে আসবেই। সেই প্রথমটা কখনোই বিজুর নয়, এমনকী প্রথম দশ-পনেরোটার মধ্যেও তার ব্যাগেজের দেখা সে পায়নি এ জন্মে। এয়ারপোর্টে কাউকে হয়তো রিসিভ করতে এসেছে বিজু। তার যাত্রীটি অবধারিতভাবে একেবারে শেষের দিকে হেলেদুলে বেরিয়ে আসে - প্লেনের ভেতরে বসে এতোক্ষণ কী যে করে, কে জানে!
কাঁধে ঝোলানো হাতব্যাগটা অসহ্য লাগছিলো। ভারী তেমন নয়, তবু অযথা ঘাড়ে তুলে রাখারও কোনো মানে হয় না। ব্যাগটা বিজু পায়ের কাছে নামিয়ে রাখে। হাত দুটো বুকের ওপর আড়াআড়ি রেখে দাঁড়ায়। কনভেয়র বেল্টের ওপরে রাখা চোখে শিকারী মাছরাঙার একাগ্রতা। নৌকায় নানাবাড়ি যাওয়ার সময় দেখেছে, শূন্যে একই জায়গায় স্থির থেকে মাছরাঙা ক্রমাগত ডানা ঝাপটায়, তার অচঞ্চল চোখ নিচে পানির ভেতরে ভাসতে থাকা মাছের ওপর। অস্ত্র তার ঠোঁট, তাক করে আছে শিকারের দিকে।
কালো ব্যাগ শেষ পর্যন্ত দেখা দেয়। ব্যাগটা বিজু কনভেয়র বেল্ট থেকে তুলে নিতেই পাশে দাঁড়ানো আরেকজন যাত্রী হাসিমুখে বলে, সম্ভবত তোমার ভুল হয়েছে। এ ব্যাগটা আমার।
বটেই তো - এ রকমই হওয়ার কথা! হুবহু এক রকম দেখতে, তবু ব্যাগ ওর নয়! বিব্রত মুখে দুঃখিত বলে ব্যাগের দখল ছেড়ে দেয় বিজু। দুঃখিত সে হয়নি, বলার জন্যে বলা। দুঃখিত তার নিজের জন্যে হওয়া উচিত। যে কোনোকিছু ঠিক যেরকম ঘটা উচিত বলে মনে হয়, তার বেলায় কীভাবে যেন সব নিয়ম-কানুন পাল্টে যায়!
ব্যাগেজ এলাকার ভিড় অনেকটা পাতলা হয়ে যাওয়ার পর নিজের ব্যাগের দখল পেয়ে বিজু এসকেলেটরে নিচে নেমে আসে। নিচের এ জায়গাটা সুড়ঙ্গের মতো - আধো অন্ধকার। দিনদুপুরেও বাতি জ্বলে। যে রাস্তাটা ঘুরে ঘুরে এয়ারপোর্টের সবগুলো টার্মিনাল ছুঁয়ে চলে গেছে, তার সমান্তরাল মাটির নিচে বানানো হ্রস্ব এই সুড়ঙ্গ-রাস্তাগুলো। সুড়ঙ্গগুলো খুব দীর্ঘ নয় বলে দু'দিক থেকে দিনের আলো খানিকটা আসে, নিউ ইয়র্কের আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেন স্টেশনের মতো পুরো রাতের চেহারা পায় না। ওপরের মূল রাস্তা থেকে আলাদা হয়ে সুড়ঙ্গে ঢুকে আরেকদিক দিয়ে বেরিয়ে আবার সদর রাস্তায় উঠে পড়ো।
নিচের সুড়ঙ্গ-রাস্তার পাশে বহির্গামী যাত্রীদের জন্যে চেক-ইন করার ব্যবস্থা, বিশেষ করে খুব ভারী লাগেজ থাকলে এখানে চেক-ইন করতে সুবিধা, টানাটানি করে ওপরে না গিয়ে গাড়ি থেকে নেমে কয়েক পা এগোলেই কাউন্টার। কাছে কাচে ঘেরা যাত্রীদের প্রবেশপথ, এসকেলেটরে ওপরে ডিপারচার লাউঞ্জে উঠে যাওয়ার ব্যবস্থা। এলিভেটরও আছে। রাস্তার ওপারে আন্ডারগ্রাউন্ড গাড়ি পার্কিং-এর জায়গা।
ডানে-বাঁয়ে তাকিয়ে বিভিন্ন জাতের সাইন দেখে বিজু বুঝে উঠতে পারে না, ঠিক কোথায় দাঁড়াতে হবে বাসের জন্যে। দুটো বাস দাঁড়িয়ে আছে সামান্য দূরত্বে, এগুলোর একটাও ওর নয়। এয়ারপোর্টের পশ্চিমে গাড়ি পার্কিং এলাকায় যাবে একটা, অন্যটা শাট্ল্ বাস - যাত্রীদের নিয়ে যাবে শহরের ভেতরে যাত্রীদের যার যার হোটেল বা বাড়ির ঠিকানায়। ওর বাসও ওখানেই আসবে ভেবে পায়ে পায়ে এগিয়ে যায়। ব্যাগ দুটো নামিয়ে রেখে ভাবে, সিগারেট ধরানো দরকার। সেই বস্টন এয়ারপোর্টে ঢোকার আগে শেষ সিগারেট খেয়েছে - পাঁচ ঘণ্টারও বেশি।
আজকাল কোনো ফ্লাইটেই সিগারেট খাওয়া যায় না। এমনকী কোথাও কোথাও এয়ারপোর্টের ভেতরেও নয়। কোনো কোনো এয়ারপোর্টের ভেতরে অবশ্য ধূমপানের জন্যে নির্দিষ্ট জায়গা করে দেওয়া আছে। আটলান্টায় দেখেছে, পাশাপাশি দুটো খাঁচার মতো ঘর, সেখানে বসে ধূমপান করা যায়। কোরিয়ার সিউল এয়ারপোর্টে দেখেছিলো আরো ভয়াবহ অবস্থা। কাচঘেরা দরজাবন্ধ ঘরে সিগারেট খেতে গিয়ে দম বন্ধ হয়ে আসার জোগাড়। ঢোকার আগে বাইরে থেকেই দেখা যাচ্ছিলো, ঘরটি ধোঁয়ায় ধূসর। বেরিয়ে আসার পর মনে হয়েছিলো, ওই ঘরে ঘণ্টা দুয়েক কাউকে আটকে রেখে দিলে সারাজীবনের মতো সিগারেট খাওয়ার ইচ্ছে উড়ে যাবে। বিজু নিজে অবশ্য ওই ঘরে দু'ঘণ্টা থাকবে না, সিগারেট ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছে কখনো হলে দেখা যাবে।
আজকাল প্রায় সারা পৃথিবীতে সিগারেটখোরদের বড়ো দুর্দিন, প্রায় জাতগোত্রহীন প্রাণী হিসেবে গণ্য করা হয় তাদের। এ দেশে পুলিশে ধরে পেটালে পুলিশের নামে মামলা ঠুকে দেওয়ার অধিকার আছে, অথচ সিগারেটের মতো জরুরি বিষয় নিয়ে যে এতো খবরদারি চলছে সেখানে অধিকারবোধের কথা কেউ যে মনেও রাখছে না! বিজু মাঝে মাঝে ভাবে, বাঙালির সংগ্রামী ঐতিহ্যের ধারায় একটা জঙ্গী আন্দোলন করে ফেলা যায় না? নিদেনপক্ষে একখানা হরতালের ডাকও তো দেওয়া যায়!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


