৭.৪
রানু চেয়ারে গা এলিয়ে ডাইনিং টেবিলের ওপরে সিলিং-এ ঝোলানো আলোর ডুমটার দিকে তাকিয়ে থাকে। চশমার আড়ালে রানুর চোখ কি ভিজে ওঠে? নাকি দেখার ভুল!
‘ইফ ইউ ডোন্ট নো মি বাই নাউ, ইউ উইল নেভার নেভার নেভার নো মি... নো, ইউ ওন’ট।’
টেবিলের ওপর পড়ে থাকা রানুর হাতে চোখ পড়ে। শুধু হাত ধরাধরি করে পাশাপশি বসে থাকা - কতোদিন হয় না! ভালো করে তো দেখাও হয়নি অনেকদিন, আরো দশটা হাত পাশাপাশি রাখলে এখন হয়তো রানুর হাতটা আলাদা করে চিনতেও পারবে না বিজু।
কবে সে এক আশ্চর্য সময় ছিলো, এই হাতের একটুখানি স্পর্শের জন্যে আড়াল খোঁজা, নিঃশব্দে হাত ধরে কথা বলার চেয়েও বেশি কথা বলা - এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার ছিলো না। সময়ে চাওয়াগুলো পাল্টে যায়, ভালো লাগা, ভালোবাসাও নতুন মাত্রার সন্ধান করে।
সম্পর্ক কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে বললো রানু, বিজুও ভেবেছে কতোবার! তবু মনে হয়, এই অবস্থার ভেতরেও কি ভালোবাসা নেই? ভালোবাসা কোনো বদ্ধ জলাশয় নয়, সময়ে সেও পাল্টায়। নতুন পলি পড়ে, চর জেগে ওঠে কোথাও। উদ্দাম স্রোতে পাড় ভাঙে কোথাও, চোরাস্রোতের গভীরতার থৈ পাওয়া যায় না।
হয়তো পুরনো ভালোবাসাও আগের খোলস ছেড়ে নতুন চেহারা নিয়েছে এখন। তাই যদি হবে, পুরনো দিন ভেবে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলা কেন! এই বদলটা মানতে মন চায় না, তা-ই বা কেন!
বিজুর খাওয়ার ইচ্ছে চলে গেছে। গ্লাস তুলে অনেকটা পানি খায়, প্লেটে পড়ে থাকা অবশিষ্ট ভাতগুলোর ভেতরে আঙুল দিয়ে এলোমেলো নকশা কাটতে থাকে। কয়েক বছর আগে হলেও হয়তো সে রানুর নাম লিখতো।
বুয়েটে যখন রানু আস্তে আস্তে তার জীবনের ভেতরে ঢুকে পড়ছিলো, সেই সময় বিজু হাতের কাছে কাগজ-কলম পেলেই রানুর নাম লিখতো - একবার, দু’বার, শত শতবার। কোনো কারণ নেই, ভেবেচিন্তেও নয়। কী অদ্ভুত ঘোরলাগা এক সময় ছিলো! সেই অর্থহীন বোকামির মধ্যেও কতো রোমাঞ্চ!
মনে আছে, একবার রানুর জন্মদিনে বিজু নিজের হাতে একটা কার্ড বানিয়েছিলো। কার্ডের ব্যাকগ্রাউন্ড হলুদ রঙে আগাগোড়া ছোপানো, ঠিক মাঝখানে লাল মার্কার দিয়ে বড়ো বড়ো অক্ষরে লিখেছিলো, আজ তোমার দিন, শুভ হোক, মঙ্গল হোক। আর পুরো কার্ড জুড়ে বিভিন্ন রঙের কালিতে ছোটো ছোটো করে লিখলো, রানু রানু রানু রানু...। সেই কার্ড রানুকে কী মুগ্ধ, উচ্ছ্বসিত করেছিলো!
খাওয়ার টেবিল থেকে উঠে পড়ে বিজু। অভ্যাসমতো প্লেট হাতে তুলে নিয়ে ময়লা ফেলার পাত্রে এঁটো ভাতগুলো ঢেলে দেয়। অন্নকষ্টের দেশের মানুষ, প্রথম প্রথম খাবার ফেলতে গেলে বাধো বাধো ঠেকতো। এখানে ঘরে ঘরে, হোটেল-রেস্টুরেন্টে আর ফাস্ট ফুডের দোকানে যে কী পরিমাণ খাবার ফেলে দেওয়া হয়, না দেখলে বিজুর বিশ্বাসই হতো না। এখন আর কিছু মনে হয় না, সয়ে গেছে। প্রাচুর্যের হাত ধরে অপচয় আসে।
সিঙ্কে পানি ছেড়ে সাবান দিয়ে প্লেটটা ধুয়ে ফেলে বিজু। ফুলটুসের জন্মের বছরখানেক পরে বিজুর মা এসেছিলো নাতনিকে দেখতে। বিজুকে নিজের হাতে বাসনকোসন ধুতে দেখে মা খুব আশ্চর্য হয়ে বলেছিলো, পুরুষমানুষ এসব কাজ করে নাকি!
বিজু হাসতে হাসতে বলেছিলো, এখানে আর নূরুর মা বুয়াকে কোথায় পাবো, মা?
তাই বলে তোকে করতে হবে?
আমি একা না মা, এ দেশে সবাই করে। আর একটা-দুটো প্লেটের জন্যে ডিশওয়াশার চালানোর কোনো মানে হয় না। রানুর জন্যে রেখে দেবো, সেটা কি ঠিক? ও-ও তো আমার মতো বাইরে কাজ করে সারাদিন। ঘরে এসে বাচ্চা সামলায়, রান্নাটাও তো আমি করি না। এইটুকু না পারলে চলবে কী করে?
তুই আবার রান্না করবি কি?
বিজু বলে, একেবারে যে পারি না, তা নয়। শিখে নিয়েছি। এ এমন এক দেশ মা, এখানে ঘরের কাজ বাইরের কাজ সব ভাগাভাগি করে করতে হয়। আমি পুরুষমানুষ বলে যদি হাত গুটিয়ে বসে থাকি, রানুর অবস্থা কী হবে ভেবে দেখো তো!
মা তবু ঠিক মানতে পারেনি। পারার কথা নয়, সারাজীবনের অভিজ্ঞতা তাকে অন্যরকম শিখিয়েছে। বলেছিলো, এতো কষ্ট করে এখানে থাকার তাহলে দরকার কী তোদের? দেশে চলে এলেই পারিস।
বিজু এক পায়ে খাড়া। এ দেশে তার মন বসেনি কোনোদিন, আসতেও সে চায়নি। তাকে আসতে হয়েছিলো, মা জানে। এখন ফিরে যাওয়ার কথা বললেও সিদ্ধান্ত তার একার হবে না, ফুলটুসের জন্মের পর তার জীবনের অংশীদার আরো একজন বেড়ে গেছে। এসব মাকে বলার মানে হয় না।
বলে, তার চেয়ে তুমি চলে এসে আমাদের সঙ্গে থাকো। বাবা তো আর নেই, বড়ো ভাইও বাইরে।
তোর বাবা নেই, তার কবরটা তো আছে!
এই কথার জবাব হয় না। বাবার কবর এখানে তুলে আনা যাবে না। বিজু জানে, মায়ের এখন শুধু অপেক্ষা, বাবার কাছে কবে যেতে পারবে। মৃত্যু বাবাকে আলাদা করে সরিয়ে নিয়ে গেছে, কিন্তু মা খুব বেশিকাল আর আলাদা থাকতে চায় না।
মা কী বুঝেছিলো কে জানে। মানতে পারছিলো না, বেশ বোঝা যাচ্ছিলো। শেষমেষ বলেছিলো, আমি যে ক’দিন আছি, তোকে বাসন ধুতে হবে না। আমি করে নেবো।
তা মা করেছিলো। মাস দেড়েক ছিলো, তার বেশি তাকে রাখা যায়নি। যতোদিন ছিলো, বিজুকে রান্নাঘরে বা ধোয়াধুয়ির মধ্যে যেতে দেয়নি একেবারে।
প্লেট ধুয়ে পানি খেতে খেতে বিজু দেখে, রানু উঠে দাঁড়িয়েছে। মুখে বিষণ্ণতার মেঘ। ধীর পায়ে সোফায় গিয়ে বসে রানু।
টেবিলে খাবার দেওয়ার সময় টিভি বন্ধ করে উঠে এসেছিলো, রিমোট চেপে আবার অন করে দেয়।
‘দ্য কোল্ড রিমেইনস অব হোয়াট বিগ্যান উইথ আ প্যাশনেট স্টার্ট...।’

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


