১০.
বিজু অফিস থেকে ফিরেছে, তখন সন্ধ্যা হয় হয়। রিকশা থেকে নামতে গিয়ে প্যান্টের বাঁ পকেটের কাছে ছিঁড়ে গেছে। খুব প্রিয় ছিলো প্যান্টটা, মাত্র মাসখানেক আগে রানু কিনে দিয়েছিলো এলিফ্যান্ট রোডের একটা দোকান থেকে।
রানু বিছানায় শুয়ে ছিলো, এই অসময়ে তার শুয়ে থাকা স্বাভাবিক নয়, একটু অবাক হয় বিজু। কাছে আসতে রানু পাশ ফিরে শোয়। খুব ক্লান্ত গলায় বলে, তুমি না বলেছিলে, সাবধানের মার নেই, নাকি মারের সাবধান নেই!
কেন, কী হয়েছে?
হবে আবার কী? যা হওয়ার তাই হয়েছে।
খুলে বলবে তো! শরীর খারাপ লাগছে?
হ্যাঁ, ব্যাপারটা শরীরের। ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। পজিটিভ।
বুঝতে একটু সময় লাগে বিজুর। কিন্তু এই নিয়ে রানুর মন খারাপ হবে কেন? পেটে বাচ্চা আসার ব্যাপারটা নিশ্চিত জানা হলে মেয়েরা খুশি হয় বলে এতোদিন জেনে এসেছে। রানুর প্রতিক্রিয়া কি সবসময় উল্টো হবে সবকিছুতে?
ঝুঁকে পড়ে রানুর কপালে ছোটো করে চুমু দেয়, মুখে হাসি ফুটিয়ে বিজু বলে, ভালো খবর তো। কতোদিন?
ডাক্তার বললো আট সপ্তাহ।
তুমি কিছু বলোনি তো আমাকে!
নিজেই টের পাইনি, শুধু একটু সন্দেহ হচ্ছিলো। আর তোমাকে বলার কী হলো?
বাঃ, তোমার সন্দেহের কথাটাও বলতে পারতে।
মনে আছে, আমরা ঠিক করেছিলাম অন্তত তিন বছর বাচ্চাকাচ্চা নেবো না!
বিজু বলে, মনে থাকবে না কেন! সাবধানই তো ছিলাম আমরা, কী করে যে হলো কে জানে! সে যাই হোক, তোমার খুশি হওয়া উচিত। ভালো খবর তো।
রানু শ্লেষের সঙ্গে বলে, তোমার জন্যে তো ভালোই, পৌরুষের প্রমাণ হয়ে গেলো।
বাচ্চা উত্পাদনে সক্ষম হলে পৌরুষের প্রমাণ হয়? বিজু জানতো না তো!
বলে, রানু, পুরুষমানুষের একার কৃতিত্বে বাচ্চা পৃথিবীতে আসে না। সেই কৃতিত্বের বেশিরভাগই মেয়েদের, সেটা তুমিও জানো।
রানু খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে। বিজু জিজ্ঞেস করে, কাউকে বলেছো?
না, ইচ্ছে করেনি। আর এক্ষুণি কাউকে জানাতেও চাই না, বিজু।
কী আশ্চর্য, কেন? এটা কি লুকিয়ে রাখা যাবে? লুকানোর দরকারই বা কী?
কিন্তু এখন নয়, প্লিজ।
বিজুর বিভ্রান্ত লাগে। রানুকে সে বুঝতে পারছে না কেন?
রানু একটু থেমে বলে, জানো, আমার খুব মন খারাপ লাগছে!
মন তোমার খারাপ হয়ে আছে দেখছি, কিন্তু কেন, সেটা ঠিক বুঝতে পারছি না, রানু।
আমার স্কলারশীপের কী হবে? আমেরিকা যাওয়ার?
এই ঘটনা যে রানুর আমেরিকা যাওয়ার ব্যাপারটাকে নড়বড়ে করে দিতে পারে, বিজুর মাথায় আসেনি। চট করে মনে হয়, এখন যদি রানুর সিদ্ধান্ত পাল্টানো যায়, অন্তত স্থগিত করা গেলেও, মন্দ হয় না।
বিজু বলে, সেটা পরে ভাবা যাবে। তোমার শরীরের চিন্তাটা সবার আগে করা দরকার।
সরাসরি আক্রমণে যায় রানু এবার। বিজুর চোখের দিকে তীব্র চোখে তাকিয়ে বলে, তুমি ইচ্ছে করেই এটা করলে। আমার সঙ্গে শত্রুতা।
অপ্রস্তুত না হয়ে বিজুর উপায় কী? বিন্দুবিসর্গও জানা নেই, এমন জিনিসের জন্যে দোষী সাব্যস্ত করা হলে আর কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে? বিনা দোষে অভিযুক্ত হওয়ার জন্যে ক্রোধ? ভালোবাসার ভুল ব্যাখ্যার জন্যে অভিমান? আক্রান্ত হয়ে পাল্টা আক্রমণের বাসনা?
এক এক করে সবগুলো অনুভূতিই এক মুহূর্ত করে খেলে যায় বিজুর ভেতরে। কোনোটাকেই স্থায়ী হতে দেয় না।
ধীর গলায় বলে, একটা কথা তোমার বিশ্বাস করতে হবে, রানু। আমি তোমার শত্রুপক্ষ নই।
রানু বলে, আমার ভালো তুমি চাও না। সেইজন্যে আমেরিকা যেতেও আপত্তি তোমার। আর কোনোকিছু দিয়ে আমাকে আটকাতে পারবে না বুঝে এখন পেটে বাচ্চা দিয়ে ধরে রাখতে চাও!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




