১১.
বসার ঘরে রানু নেই, রান্নাঘরেও না। কোথায় গেলো? বাথরুমে? তাহলে বিজুকে অপেক্ষা করতে হবে গোসলের জন্যে। মেয়ের ঘরের পাশে ছোটো বাথরুমটাতে যাওয়া যায়, কিন্তু গোসলে বিজুর ব্যবহার্য সবই শোয়ার ঘর-সংলগ্ন বাথরুমে। এই ফাঁকে ইমেল কিছু এসেছে কি না, দেখে নিলে মন্দ হয় না।
সতেরোশো বর্গফুটের এই অ্যাপার্টমেন্টে দুটো বেডরুম আর আধখানা স্টাডি, লিভিং রুম, কিচেন, ডাইনিং স্পেস, দুই বাথরুম। স্টাডিটা ঠিক আধখানাই, আট ফুট বাই দশ ফুট জায়গার তিন দিকে দেয়াল, দরজা-জানালার কোনো বালাই নেই। দেয়ালের দু’দিক জুড়ে শেলফ তৈরি করা।
একটা ডেস্কের ওপরে বিজুর কমপিউটার আর তার যন্ত্রানুষঙ্গগুলো পরপর সাজানো। টেবিলে হরেক চেহারা ও আকারের কাগজপত্র - স্তপাকার ও ছড়ানো। খোলা এবং না-খোলা কিছু কাগজমেল চোখে পড়ে বিজুর। কিছুকাল আগেও কাগজ ছাড়া আর কোনোভাবে যে চিঠি লেখা যায়, সে ধারণা মানুষের কল্পনায়ও ছিলো না। ইন্টারনেট আর ইমেলের আগে মানুষ অফিস-টফিসে দ্রুত কাজ করতো কী করে? ভাবা যায়!
সব ইমেল যে কাজের তা-ও নয়। সেদিন একটা বিজনেস জার্নাল পড়ছিলো বিজু। বিশাল কোম্পানির সি ই ও লিখেছে, আমার থেকে মাত্র দশ ফুট দূরে যে লোকটি বসে আছে তাকে আমি ইমেল করতে যাবো কোন দুঃখে? এ তো এক ভয়াবহ অপচয় - সময় এবং সম্পদের। অথচ হাজার হাজার মানুষ এই হাস্যকর কাণ্ডটি দিনের পর দিন করে যাচ্ছে। এর নাম প্রোডাক্টিভিটি, না আর কিছু?
বিজু অবশ্য জানে, দশ ফুট দূরে কেন, এক বিছানায় ঘুমানো দু’জন মানুষেরও কখনো কখনো ইমেল দরকার হতে পারে। বলার কথা যখন মুখ ফুটে বলতে বাধে, শর্টসার্কিটের ফলে যোগাযোগও অগম্য, সেই সময়ে চিঠির চেয়ে ভালো আর কী আছে?
একবার টিভিতে কোথায় যেন একটা রেস্টুরেন্টের কথা শুনেছিলো। খুবই অভিনব ধরনের রেস্টুরেন্ট - সেখানে আহার্য বা পানীয় কিছুই নেই, মেনুও নয়। শুধু চেয়ার-টেবিল পাতা আছে, প্লেট-ন্যাপকিনও দেওয়া হবে। সেখানে বসে বসে কথা বলো। শুধু কথা বলার রেস্টুরেন্টের ব্যাপারটা মন্দ নয়।
পৃথিবীতে কথা বলার সময় কমেই গেছে ক্রমাগত। এই শহরে এরকম একটা থাকলে খুব কাজে লাগতো বলে বিজুর ধারণা। কিন্তু রানু কি রাজি হতো যেতে?
কমপিউটার খুলে বিজু দেখলো ইনবক্সে অনেকগুলো ইমেল। বেশিরভাগই কাজ-সংশ্লিষ্ট, সাবজেক্ট লাইনে চোখ বুলিয়ে দেখে - ওগুলো কাল দেখলেও চলবে। গোটাতিনেক জাংক মেল। পিত্ত জ্বলে যায়। শালার বেনিয়ার দেশে সবাই শুধু কিছু একটা বেচতে চায়। তোমার দরকার আছে কি নেই, তাতে কী এসে গেলো? সবাই তোমাকে নাকি অবিশ্বাস্য কম দামে জিনিস দিতে চায়!
তারপরেও কথা আছে, এখন কিনে রাখো, পয়সা পরে দিও। এক্কেরে খাঁটি জিনিস, খাইয়া দাম দিয়েন, স্যার!
কাবুলিওয়ালারা গল্পে-কাহিনীতে কুখ্যাত হয়ে আছে - আসল টাকায় তাদের আগ্রহ কম, সুদের টাকা ঠিকমতো পেলেই খুশি। এ দেশও সেরকমের কাবুলিওয়ালায় ভরা, তারাও আগে সুদের টাকা চায়, আসল পরে দেখা যাবে। এমন নয় যে, আসল দিতে হবে না। দিতে হবেই, কিন্তু এমন ভাবভঙ্গি করা হবে যেন তোমাকে বাকিতে জিনিস দিয়ে তারা নিজেদের ধন্য করছে।
কমপিউটার থেকে উঠে পড়ে বিজু, ফিরে আসে বসার ঘরে। এখনো রানুর দেখা নেই। আশ্চর্য তো! পায়ে পায়ে শোয়ার ঘরের দিকে এগিয়ে যায় সে, ঘর অন্ধকার। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দেখে, বাথরুমেও আলো জ্বলছে না। প্যাসেজের আলোয় দেখা যায়, রানু বিছানায় শোয়া।
ঘুমাতে যাওয়ার সময় সাধারণত রানু কাপড় পাল্টায়। বিছানার কাছে একটু এগিয়ে গিয়ে বিজু দেখে, আজ পাল্টায়নি। দুটো মানে হতে পারে। মন ভালো লাগছে না বলে বা আলসেমিতে ওভাবেই শুয়ে পড়েছে। এমনিতে রানু গায়ে চাদর বা কম্বল কিছু একটা না জড়িয়ে ঘুমাতে পারে না। কম্বলটা পায়ের কাছেই এখনো ভাঁজ করে রাখা। ধারণা হয়, একটু পরেই উঠে পড়বে।
কোনো নড়াচড়া নেই, রানু আসলেই ঘুমিয়ে গেছে কি না ঠিক বোঝা যায় না। বাথরুমে ঢুকে গোসল করতে গেলে কিছু শব্দ হবে এবং সেটা শোয়ার ঘরেও পৌঁছাবে নিশ্চিত। রানু যদি সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে গিয়ে থাকে, ঘুম ভেঙেও যেতে পারে। ওর ঘুম খুব পাতলা।
এখানেও প্রতিক্রিয়া দু’রকমের হতে পারে। যেহেতু বিজুর গোসলটা পূর্বনির্ধারিত, ঘুম ভেঙে গেলেও রানু বড়জোর পাশ ফিরে শোবে। কিন্তু আবার বলাও যায় না, আচমকা ঘুম ভেঙে গেলে রানুর মেজাজ বিগড়ে যেতেও পারে এবং বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসামাত্র বিজু একটা চোরাগোপ্তা হামলার শিকার হতে পারে। অতিশয় দক্ষ তীরন্দাজ। হামলাটা মৌখিক, কিন্তু ঠিক কী প্রসঙ্গ দিয়ে শুরুটা হবে অনুমান করা সম্ভব নয় বলে চোরাগোপ্তা কথাটা মনে আসে।
যা হওয়ার হবে ভেবে বাথরুমে ঢোকে বিজু। নিঃশব্দে, প্রায় চোরের মতো। কোনো শব্দ না করে দরজা বন্ধ করে, তারপর বাথরুমের আলো জ্বালে। আগে জ্বাললে আলোটা সরাসরি রানুর চোখ লাগতে পারে। তার প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, বিজু ভাবতেও চায় না।
গোসল করে সে অনেকক্ষণ ধরে। তারপর শেভ করে সামান্য ছেঁটেছুটে গোঁফের পরিচর্যা করে। রানু গোঁফ পছন্দ করে না। অনেক বলেকয়ে বিয়ের পরে রানু একবার তার গোঁফ উচ্ছেদ করাতে সক্ষম হয়েছিলো অল্প কিছুদিনের জন্যে, তখনও পরস্পরের পছন্দ-অপছন্দের মূল্য দেওয়ার রেওয়াজ ছিলো। এখনও মাঝেমধ্যে কথা ওঠে।
গোঁফের ব্যাপারে আলাদা কোনো মোহ নেই বিজুর। গোঁফের আমি গোঁফের তুমি সমিতিরও একজন সে নয়। কেউ কেউ ওটাকে পৌরুষের চিহ্ন হিসেবে গণ্য করে, বিজুর কাছে হাস্যকর মনে হয়। গোঁফ গজানোর বয়সে প্রথম থেকেই সে কামাতে শুরু করেছিলো। মা বোধহয় লক্ষ্য করছিলো, একদিন বলে ফেলে, মুসলমানের ছেলে গোঁফ কামাস কেন?
লাভ হয়নি, মা বলেছিলো বলেই সে তখন গোঁফ রাখেনি। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেওয়ার পর অনেকটা খেয়ালের বশে কিংবা আলসেমিতে শেভ করা বন্ধ রেখেছিলো। চুলও নেমে যাচ্ছিলো ঘাড় ঢেকে। মাস দুয়েকের মধ্যে বিজুর চেহারা দাঁড়িয়ে যায় যৌবন বয়সের রবীন্দ্রনাথের মতো। তখনো মায়ের আপত্তি, বিজু কানে তোলেনি।
বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষার আগে চুল ছেঁটে দাড়ি কামিয়ে ফেলেছিলো গোঁফ বাঁচিয়ে। এখন গোঁফের চাষ চালু রেখেছে প্রতিবাদের ঝাণ্ডার মতো। রানু পছন্দ করে না বলে ছেঁটে ফেলতে হবে, তার কোনো মানে নেই।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে বিজু, খুবই সতর্কতার সঙ্গে, কোনো শব্দ না করে, যেভাবে ঢুকেছিলো। ঘরের আবছা আলোয় দেখে, রানু একই ভঙ্গিতে কাত হয়ে শোয়া। সন্দেহ হয়, সত্যিকারের ঘুম? নাকি শুধুই চোখ মুদে পড়ে থাকা?
নাইট স্ট্যান্ডে রাখা ডিজিটাল অ্যালার্ম ঘড়িতে দশটা চল্লিশ। দূর থেকে দেখতে যায়, সকালের জন্যে অ্যালার্ম অন করা হয়নি। করলে নিচের দিকে একটা লাল ফুটকি জ্বলে থাকতো। রানু ভুলে গেছে, যদিও জানা নেই আবার সে উঠে পড়বে কি না।
ঘুমাতে যাওয়ার আগে মনে করে অ্যালার্ম দিতে হয়। এতো বছর ধরে ভোরে উঠছে প্রতিদিন, অথচ এখনো অভ্যস্ত হওয়া হলো না। হবেও না মনে হয়। অ্যালার্ম ছাড়া বিজুর ঘুম ভাঙে না।
বসার ঘরে এসে বিজু বেকুবের মতো, ভালো বাংলায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে, দাঁড়িয়ে থাকে খানিকক্ষণ।
একসময় রাতে ফুলটুস ঘুমিয়ে গেলে দু’কাপ চা নিয়ে দু’জনে পাশাপাশি বসে গল্পগাছা হতো। সারাদিনের কার্যবিবরণী, বিশেষ বিশেষ ঘটনা, একটা-দুটো চুটকি। পুরনো দিনের কোনো কোনো কথাও উঠে আসতো।
একটা শ্বাস চেপে বিজু ভাবে, সেসব দিন কবেই গত হয়েছে। সে রামও নেই, সে অযোধ্যাও নেই আর! তবে নিজে চা বানিয়ে নিতে কোনো অসুবিধে নেই। চুলা জ্বালিয়ে কেতলিতে পানি বসায় দু’কাপ আন্দাজে। যদি রানু উঠে আসে! পানি ফোটার পরে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে টি ব্যাগে এক কাপ বানিয়ে নেয়। দুধ-চিনির ঝামেলা নেই, শুধু লিকার।
একবার ভাবে, দুধ-চিনি মিশিয়ে আরেক কাপ বানিয়ে রানুকে ডাকলে কেমন হয়? খুব অবাক হবে নাকি সে? হয়তো হবে না, বিজু আগেও কখনো কখনো নিজে দু’জনের জন্যে চা বানিয়েছে। কিন্তু তখন সময় অন্যরকম ছিলো। তবু আজ ফিরে আসার পর থেকে বেশ অন্যরকম লাগছিলো রানুকে। কিছু ইঙ্গিতও কি ছিলো না? 'পরণে ঢাকাই শাড়ি...'!
বস্টন থেকে আনা আধখানা কাপ পেয়েও খুশি মনে হয়েছিলো। হাফ আ কাপ! বিজুর আচমকা মনে হয়, আধাআধি! সম্পূর্ণ আর নেই!
এখন চা বানিয়ে রানুকে ডেকে তোলার ইচ্ছে যেমন আছে, শংকাও ততোখানি। অসময়ে কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে দেওয়ার জন্যে যদি রেগে উঠে চেঁচামেচি শুরু করে দেয়? এই রাতদুপুরে তার কোনো দরকার নেই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




