১২.১
বিজু খুলনা গিয়েছিলো কাল, ফিরেছে সন্ধ্যায়। বেড়াতে নয়, অফিসের কাজ নিয়ে যাওয়া। সুতরাং একাই। বাসায় ফিরে ওপরে নিজের ঘরে যাওয়ার আগে রান্নাঘরে উঁকি দেয়, রানু আছে কি না দেখে। নেই, মা ছিলো। বাবা খাওয়ার টেবিলে, সামনে চায়ের কাপ আর সকালের বাসি খবরের কাগজ। সকালে অফিসে যাওয়ার তাড়ায় বাবার কাগজ পড়া হয় না, পড়ে বিকেলে ফিরে এসে চা খেতে খেতে।
মা বলে, কী রে, এই এখন ফিরলি?
হ্যাঁ।
ঘরে গিয়ে দেখ তো, রানুর বোধহয় শরীর-টরীর খারাপ। সেই দুপুর থেকে শুয়ে আছে, ঘুমাচ্ছে। দুপুরে খেলোও না কিছু। বারকয়েক ডাকাডাকি করেছি, তাও এলো না। শুধু বলে, মাথা ধরে আছে। পরে খাবো, এখন খেতে ইচ্ছে করছে না।
সিঁড়ি ভেঙে ওপরে যায় বিজু। অন্ধকার ঘরে আবছামতো দেখা যায়, রানু ডানদিকে কাত হয়ে শোয়া। একটা পাতলা কম্বল কোমর পর্যন্ত টেনে দেওয়া। পা টিপে টিপে বিছানার পাশে দাঁড়ায় বিজু। নিশ্বাসের শব্দে বোঝা যায়, গাঢ় ঘুম ঘুমাচ্ছে রানু। গায়ে হাত দিয়ে দেখবে ভেবেও দেয় না, অযথা ঘুম ভাঙানোর দরকার নেই।
কাপড়চোপড় ছেড়ে একবারে গোসল সেরে নেয়। বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখে রানু একইভাবে ঘুমাচ্ছে। ওর ঘুম এতো গাঢ় নয়, বাথরুমে পানির শব্দে জেগে ওঠার কথা। বিজু সাবধানে কম্বলের তলায় ঢুকে পড়ে। এখন আর দ্বিধা না করে রানুর কপালে হাত রাখে। নাঃ, জ্বরটর নয়। তাহলে কী? শুধু মাথাব্যথায় এরকম কখনো হয়নি রানুর।
গর্ভাবস্থার কোনো বিশেষ সমস্যা কি না, ঠিক বুঝতে পারে না বিজু। মাকে বা অভিজ্ঞ অন্য কারো কাছে কিছু জিজ্ঞেস করারও উপায় নেই। রানু এখনো কাউকে জানাতে চায় না। তর্ক করার কিছু নেই, সময় হলে রানু নিজেই জানাবে বলেছে। এখানে বিজু শুধুই সহযোগী, মূল ভূমিকায় তো রানু। সুতরাং তার সিদ্ধান্তের জন্যে অপেক্ষা করা উচিত।
রানু ক্ষীণ গলায় বলে, কখন ফিরলে?
এই তো, একটু আগে। কী হয়েছে তোমার?
কিছু না, শরীর ভালো লাগছে না।
তোমার এমন গাঢ় ঘুম কখনো দেখিনি, তাই দুশ্চিন্তা হচ্ছিলো। মা বললো, সারাদিন তুমি কিছু খাওনি।
কিছু চিন্তা কোরো না। তুমি বরং যাও, খেয়ে নাও।
এখন তো মোটে সন্ধ্যা হলো, পরে তোমার সঙ্গে খাবো।
তাহলে অন্তত চা খেয়ে নাও। এই সময় তোমার চা খাওয়ার অভ্যাস।
তুমিও চলো।
মাথাটা এমন ভারী হয়ে আছে! আমি আরেকটু শুয়ে থাকি?
রানুর শরীর খারাপ তার শরীরের ভেতরের নতুন প্রাণীটির কারণে কি না, মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করতে সংকোচ হচ্ছিলো বিজুর। সেদিনের অভিযোগের পরে এই বিষয়ে কথা বলা আরো দুরূহ হয়ে গেছে। বিজু জানে, এই সময়ে মেয়েদের মানসিক চাপমুক্ত থাকা দরকার, যতোটা সম্ভব। কিন্তু আমেরিকার চাপ থেকে রানুকে বের করে আনার সাধ্য তার নেই, সে বুঝে গেছে।
বিজু বলে, তাহলে এখানেই দু'কাপ চা দিয়ে যেতে বলি? চা খেলে তোমারও একটু চাঙ্গা লাগতে পারে।
মৃদু অথচ দৃঢ় গলায় স্থির সিদ্ধান্ত জানায় রানু, আমি এখন চা খাবো না। ইচ্ছে করছে না।
বিজু কথা বাড়ায় না। সমস্যাটা কোথায় বোঝা যাচ্ছে না। আসলে শরীর খারাপ, নাকি বাসায় কারো সঙ্গে কিছু হয়েছে?
কয়েক মিনিট চুপচাপ শুয়ে থাকে সে রানুর পাশে। সদ্য বিবাহিতদের মধ্যে শরীরের যে তীব্র ও অবাধ আকর্ষণ থাকার কথা, এই কয়েক মাসে রানুর দিক থেকে তা হয়ে এসেছে নিয়ন্ত্রিত, অনেকটা অনিচ্ছাপ্রসূত অংশগ্রহণের মতো।
এরকম হওয়ার কথা ছিলো না, শুরুতে ব্যাপারটা ছিলো যেমন হওয়া স্বাভাবিক - উন্মোচন ও আবিষ্কারের উন্মাদনা যেন শেষ হওয়ার নয়। বিজুর ধারণা, এই অবস্থাটা পাল্টে দিয়েছে আমেরিকা। রাষ্ট্র হিসেবে অবশ্য নয়, আমেরিকা নামের ধুন তাদের দাম্পত্যের মধ্যে ঢুকে পড়েছে, তছনছ করে দিচ্ছে সব। রচিত হয়ে যাচ্ছে ব্যবধান।
বিজু অবশ্য এই ব্যাপারটাকে সাময়িক বলে মনে করে। একসময় ভালোবাসাই আবার সব ফিরিয়ে নিয়ে আসবে। 'লাভ উইল কংকার অল।'
উঠে পড়ে বিজু, নিচে নেমে আসে। রান্নাঘরে ঢুকে বলে, মা চা খাবো।
মা বলে, টেবিলে যা, দিচ্ছি। রানু কি এখনো ঘুমাচ্ছে? কী দেখলি, শরীর খারাপ?
এখন মাকে কী বলে বিজু! আগে ভাবা উচিত ছিলো এই প্রশ্নটার সামনে পড়তে হবে। তাহলে নিচে নামতো না সে এখন।
টেবিলে এখন বাবা নেই, নামাজ পড়তে পাড়ার মসজিদে গেছে মনে হয়। বাসি খবরের কাগজটা টেনে নিতে নিতে বলে, মনে হয়। খুব গভীর ঘুম, জাগাইনি। গায়ে হাত দিয়ে দেখলাম, জ্বরটর কিছু তো মনে হলো না।
মাথাব্যথার কথা বলছিলো। এরকম কখনো হয়নি, কিছু না হলেই ভালো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




