somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

উপন্যাস : পৌরুষ - কিস্তি ২৬

১২ ই মে, ২০০৭ দুপুর ১২:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১২.২

রাতে খাওয়ার সময় মা গিয়ে ডাকাডাকি করে এলো, রানু উঠলো না। শুতে গিয়ে ঘরে ঢুকে বিজু টের পায়, রানু জেগে আছে। বলে, তুমি সারাদিন কিছু খেলে না, তোমার জন্যে খাবার এখানে দিতে বলবো?

নাঃ। রানু সংক্ষেপে জবাব দেয়।

বিজু বিছানায় এসে বসলে রানু জিজ্ঞেস করে, তুমি খেয়েছো?

হ্যাঁ।

সিগারেট খেলে না?

রানুর শরীরে ভ্রণসঞ্চারের খবর জানার পর থেকে তার আশেপাশে ধূমপান বন্ধ করে দিয়েছে বিজু। এ ঘরে একেবারেই খায় না। রানুও তা জানে। আজকাল খুব শোনা যায় সিগারেটের পরোক্ষ ধোঁয়ায় পেটের বাচ্চাদেরও ক্ষতি হতে পারে। সতর্ক হতেই হয়। নিজের বাচ্চা না? বিজু বিছানায় গা এলিয়ে দেয়।

মাথার নিচে বালিশটা ঠিক করে নিতে নিতে বলে, বাইরে খেয়ে এসেছি।

এখানেই খেতে পারতে।

রানুর কথায় কিসের সংকেত? বুঝতে না পেরে বলে, এ ঘরে আজকাল খাই না, তা তুমি জানো।

এখন থেকে আবার খেতে পারবে।

কী বলছো, বুঝতে পারছি না।

রানু খুব শান্ত গলায় বলে, যার জন্যে তোমার এতো সাবধান হওয়া, সে আর নেই।

চমকে ওঠে বিজু। বিছানায় উঠে বসেছে সে। বলে, কী হয়েছে, রানু? কী বলছো?

ওটাকে বিদায় করে এসেছি।

অকস্মাৎ ভূমিকম্পে বাড়িটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়লেও হয়তো এতোটা বিস্ময় বোধ হতো না। নিজের ইচ্ছায় রানু এটা করেছে, বিশ্বাস হয় না। পারলো কী করে? তেমন ইচ্ছের কোনো আভাসও ছিলো না। কেন এমন কাণ্ড করে বসলো রানু?

বিজুরও সেখানে কিছু অংশীদারিত্ব ছিলো, একবার তার সঙ্গে কথা বলারও দরকার মনে করলো না? বললে কী হতো? সে সম্মতি দিতো? নিশ্চয়ই নয় এবং রানু তা খুব ভালোই জানে। সুতরাং, পরামর্শ না করার একটা যুক্তি পাওয়া যায়।

কিন্তু এই আজগুবি, উদ্ভট ও অর্বাচীন সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা কী হয়? হয় না, কোনো ব্যাখ্যা হয় না। বিজু উদভ্রান্ত বোধ করে। এমন নয় যে ওই শিশুটির জন্যে তার কোনো রকমের অনুভূতি বা বোধ তৈরি হয়েছিলো। সে শুধুমাত্র একটা অশরীরী ধারণার মতো ছিলো, একটা অস্ফুট বোধ বা প্রাণের ধারণা, আস্তে আস্তে সম্পূর্ণ হয়ে ওঠার কথা তার। তাদের মিলিত ইচ্ছের প্রতিনিধি ছিলো সে।

ছিলো কি? তাহলে এখন আর নেই কেন? রানু কী করে পারলো তাকে নিজের শরীর থেকে এমন মমতাহীনের মতো বিচ্ছিন্ন ও বহিষ্কার করতে? আমাকে তুমি কেন বিয়ে করলে-র মতো এই প্রশ্নও কি অমিমাংসিত থেকে যাবে?

কেন করলে, রানু? নিজের গলার স্বরই বিজু যেন চিনতে পারে না।

অন্ধকার ঘরে কেউ কারো মুখ দেখতে পায় না। এই মুহূর্তে হয়তো চায়ও না।

রানু বলে, তুমি জানো আমি এখন বাচ্চা চাইনি।

তাই বলে তাকে মেরে ফেলতে হবে? বিজুর গলায় সামান্য ঝাঁঝ মেশানো।

বাচ্চা তোমার একার নয়, আমারও ছিলো, তাই না? বাধ্য হয়ে করতে হলো।

বিজুর চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে, কীসে তোমাকে বাধ্য হতে হলো, রানু? কী এমন হয়েছিলো? আমার ওপরে রাগ? ঘৃণা? অভিমান? বলে না, চুপ করে রানুর ব্যাখ্যা শোনার জন্যে অপেক্ষা করে।

আদালতে বিবাদীপক্ষের উকিলের মতো করে রানু বলে, বাধ্য হওয়ার কারণ আমার এবং তোমার ভবিষ্যত। বাচ্চা নিতে গেলে আমার এতো কষ্টে পাওয়া স্কলারশীপ ছেড়ে দিতে হয়। ভেবে দেখলাম, আমেরিকা যাওয়ার পরেও বাচ্চা হলে আমার পড়াশোনা করা আর হতো না। বাচ্চা আমরা পরেও নিতে পারবো, যখন চাইবো তখনই। আমেরিকার এই সুযোগ বার বার আসবে না, বিজু। জানি, তুমি আমাকে খুব নিষ্ঠুর ভাববে, স্বার্থপর ভাববে। কিন্তু এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারতো?

বিজুর বলতে ইচ্ছে হয়, সবচেয়ে ভালো হতো বাচ্চাটাকে জন্মাতে দিলে! কী হবে বলে? অসহায়ের মতো বালিশে মাথা এলিয়ে দেয়, চিত হয়ে শুয়ে থাকে সে।

দেসারুতে সমুদ্রের ধারে বসে এক সন্ধ্যায় ছেলেমেয়ে, ভবিষ্যত এসব নিয়ে কথা হয়েছিলো। রানু প্রথম ছেলে চায়, বিজু মেয়ে। ঠিক হয়েছিলো, ছেলে হলে নাম হবে তাতাই, মেয়ে হলে টুপুর।

বিজুর মনে হয়, যে চলে গেলো, সে কে ছিলো? তাতাই? না টুপুর? জানা হলো না! হবে না কোনোদিন।

সেই রাতে বিজু কেঁদেছিলো। বোধবুদ্ধি হওয়ার পর এমন কান্না সে কাঁদেনি কোনোদিন। পূর্ণবয়স্ক পুরুষমানুষের কান্না আসে, যখন তা হয় অপ্রতিরোধ্য ও অনিবার্য। যখন সে নিজেকে অসহায়, নিরুপায় দেখে। পরাজিত দেখে।

বিজুর কান্না সংক্রমিত হয়েছিলো রানুর মধ্যেও। বিজুর প্রতিক্রিয়া ঠিক এরকম হবে, সে হয়তো আশা করেনি। হয়তো তার মনে হয়েছিলো, বড়োজোর রাগারাগি করবে, অভিমান করে থাকবে কয়েকদিন। তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে একসময়।

কিন্তু ছেলেমানুষের মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠবে বিজু, সেটা খুবই অপ্রত্যাশিত ছিলো রানুর কাছে। বিজুর প্রতিক্রিয়ায় সে নিজেকে হয়তো প্রথমবারের মতো অপরাধী বোধ করে। মনে হতে থাকে, ঠিক হয়নি, মোটেই ঠিক হয়নি। ততোক্ষণে বড়ো দেরি হয়ে গেছে, কিছু করার নেই আর।

নিদ্রাহীন একটি দুঃসহ রাতও একসময় ভোর হয়। অন্ধকার ঘরে বিছানায় শুয়ে-বসে অস্থিরতায় রাত কাটে। বিজু শুধু একবার বলেছিলো, তুমি কী করে পারলে, রানু? আর কোনো কথা কেউ বলেনি। বলার কিছু ছিলো না।

রানুর কাছেও প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিলো না!
১৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গানটি বন্ধুত্বের, গানটি শান্তির প্রতি ভালোবাসায় সিক্ত

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৪ শে জুন, ২০২৬ ভোর ৪:০০

আমেরিকা ও ইরানের শান্তি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে এই গানটি বুনেছি, নিজের বেসুরো গলা 'ব্যবহার' করেই।
এবারে কি ভারত - বাংলাদেশ সীমান্তে শান্তির আলো দেখা দেবার কথা?



বন্ধু হে অনেক... ...বাকিটুকু পড়ুন

সে আমার দিকে তাকিয়েছিল || একটা রোমান্টিক গান

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৪ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৪

সে আমার দিকে তাকিয়েছিল
ওওও
বহুবার সে তাকিয়েছিল
আমি ভাবতে চেয়েছি
আমাকে তার ভালো লেগেছিল



সে দেখতে এতটা সুন্দরী
তার উপমা যেন সে নিজেই
মাঝে মাঝে অধরে তার ফুটছিল হাসি
মুগ্ধতায় আমি হারিয়েছিলাম খেই
তখন মিহিসুতোর মতো বৃষ্টিরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

“নির্বাচিত সরকার যখন সেনাবাহিনী মাঠে নামায়, গণতন্ত্র তখন নিজের সত্ত্বা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।”

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৪



“নির্বাচিত সরকার যখন সেনাবাহিনী মাঠে নামায়, গণতন্ত্র তখন নিজের সত্ত্বা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।”

এই বক্তব্যের মূল তাৎপর্য নিহিত রয়েছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক দর্শনে। গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো জনগণের... ...বাকিটুকু পড়ুন

=কিছু গোপন ব্যথা রেখে দিলাম অন্তরে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৩



আমার হয়ে থাকুক কিছু
মন কুঠুরির আড়াল হয়ে
দুঃখগুলো যাক না নিরব
একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।

বাড়ুক ব্যথা বুকের গহীন
কেউ না জানুক গোপন থাকুক
ব্যথার কাঁপন উঠুক না হয়;
হেলা বুকে কষ্ট আঁকুক।

যাক না এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মের অবমাননা রুখতে গিয়ে নিজের ধর্মকেই ছোট করছেন না তো?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৫


সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ধর্ম অবমাননার আবার একটা ঘটনা ঘটলো। ২৩ জুন ২০২৬। প্রিন্স রায় দীপ্ত নামের পঁচিশ বছরের একটা ছেলে নবীজিকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ তাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×