১৩.
চায়ের কাপ আর সিগারেটের প্যাকেট হাতে বারান্দা ওরফে প্যাটিওতে যায় বিজু। চায়ে একটা চুমুক দিয়ে চেয়ারে বসে। সিগারেট ধরিয়ে মনে পড়ে, অনেকদিন মা-র কোনো খবর নেওয়া হয় না। একটা ফোন করা দরকার। সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে ঝুলিয়ে রেখে ভেতরে যায়। কর্ডলেস ফোন নিয়ে ফিরে আসে বারান্দায়। একবার ডায়াল করেই লাইন পাওয়া গেলো।
বারো বছর আগে যখন এসেছিলো, সেই সময় বাংলাদেশে ফোনে লাইন পেতে কখনো কখনো এক বেলা লেগে যেতো। আজকাল সহজে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে ডিজিটাল ফোনের যুগ শুরু হওয়ার পর আরো সহজ হয়ে গেছে।
মা, আমি বিজু। কেমন আছো তুমি?
আছি বাবা, এই বয়সে যেমন থাকা যায়। টুকিটাকি এটা-ওটা গোলমাল লেগেই আছে। তা থাক, তোদের খবর বল।
আমরা ভালো আছি।
আমার ফুলটুস বোনটা কোথায় রে?
ঘুমিয়ে গেছে।
ও হ্যাঁ, তোদের ওখানে তো রাত এখন। ক’টা বাজে এখন?
এগারোটার কাছাকাছি। তা তোমার টুকিটাকি গোলমালের কথা কি বলছিলে?
ওই হাতে-পায়ে আর কোমরে একটু ব্যথা হচ্ছে ক’দিন ধরে।
ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলে?
এই নিয়ে কেউ ডাক্তারের কাছে যায়? ডাক্তার কী করবে? একগাদা ওষুধ লিখে দেবে, এই তো।
বাংলাদেশের বয়স্ক মানুষদের প্রায় সবাই বিষম রকমের চিকিৎসাবিমুখ। কেন, বোঝা যায় না। বিজুর ধারণা, এই অসুস্থতা বয়ে বেড়ানোর প্রবণতাও এক ধরনের রোগ। এ রোগের চিকিৎসা জানা নেই। বাবাও এরকম ছিলো। রানুর বাবা-মাও তাই।
এ জীবনে দেশে যতো বয়স্ক মানুষ দেখেছে, এমন কারো কথা বিজু মনে করতে পারে না যে এক কথায় কখনো ডাক্তারের কাছে গেছে। অথচ এ দেশে যে কোনো বয়সী মানুষ সামান্য সর্দি হলেও ডাক্তারের কাছে দৌড়ায়, সুস্থ থাকা এদের কাছে অনেক বেশি জরুরি।
বিজু বলে, তবু তোমার দেখানো দরকার।
আচ্ছা সে দেখা যাবে। আমার রানু মা কেমন আছে? কোথায় সে?
ঘুমিয়ে পড়েছে, বোধহয় শরীরটা ভালো নেই।
বোধহয় আবার কী রে? তুই জানিস না?
অফিসের কাজে আমি বস্টনে গিয়েছিলাম তিনদিনের জন্যে। সন্ধ্যায় ফিরেছি। খাওয়া দাওয়ার পর দেখি হঠাৎ শুয়ে পড়েছে।
তুই কিছু বলিসনি তো?
রানুর সঙ্গে মনোমালিন্য বা মতান্তরের বিষয়ে বিজু মা-র কাছে কোনোদিন বলেনি। শুধু মা কেন, কাউকেই নয়। এসব তাদের দু’জনের শুধু, আর কারো সেখানে প্রবেশাধিকার নেই। কারো কিছু বলার থাকতে পারে না, করারও নয়।
বিজু হালকা গলায় বলে, বা রে, আমি আবার কী বলবো?
আমার রানু মা খুব লক্ষ্মী মেয়ে, তাকে একদম কষ্ট দিবি না। তোরা বিদেশে পড়ে আছিস, কাছাকাছি নিজের মানুষ তেমন কেউ নেই।
বিজু হাসতে হাসতে বলে, কী আশ্চর্য, ওর তো তবু কাছাকাছি একটা বোন আছে। আমার তা-ও নেই। তুমিও ওর দলে গেলে আমি যাই কোথায়?
মা বলে, মেয়েদের কষ্ট তোরা বুঝবি না!
তর্ক করে লাভ নেই। রানু কী মন্ত্রপড়া দিয়েছে কে জানে, তার ব্যাপারে একেবারে অন্ধ মা। বিজু অবশ্য ব্যাপারটা উপভোগ করে। ছেলের বউয়ের জন্যে শাশুড়ির এমন টান দেখা যায় না। মা-র স্বভাবই এরকম। বড়ো ভাইয়ের বউয়ের বেলায়ও তাই।
বিয়ের পর পর রানু একদিন বলেছিলো, শাশুড়ির সঙ্গে কোমর বেঁধে ঝগড়া করবো, আপনার ছেলের কাছে ইনিয়ে-বিনিয়ে নালিশ করবো, বাপের বাড়ি গিয়ে শাশুড়ির নামে এক বস্তা নিন্দামন্দ করে আসবো - আপনি তো মা সে সুযোগ দিচ্ছেন না!
মা হেসে ফেলেছিলো, কারণটা কী জানিস? আমার যে মেয়ে নেই, তোরা দু’জনই এখন আমার মেয়ে। নিজের মেয়ে থাকলে কীরকম হতো তা অবশ্য জানি না।
বিজুর মনে হয়েছিলো, ভেবে দেখার মতো বিষয় বটে। গবেষণা হতে পারে।
আরো মামুলি কিছু কথা বলার পরে ফোন রেখে দিয়ে চা শেষ করে বিজু। সিগারেট ধরায় আবার। রানু তাহলে সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে?
‘স্মোকড দ্য ডে’জ লাস্ট সিগারেট রিমেম্বারিং হোয়াট শী সেড...।’
শেষ কথা রানু কী বলেছিলো আজ সন্ধ্যায়? বলছিলো, কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের সম্পর্ক। ঠিকই তো, এ কোথায় এসে পড়লাম আমরা? এখানে এসে পৌঁছানো একদিনে হয়নি। ভুল বা দোষ খুঁজতে যাওয়া বৃথা। এক সময়ের নাব্য নদীতে এখন বিষণ্ণতার পলি। উদ্ধার কীসে? বিজুর মনে হয়, উদ্ধার হয়তো এখনো অসম্ভব নয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




