somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

উপন্যাস : পৌরুষ - কিস্তি ২৮

১৩ ই মে, ২০০৭ সকাল ১১:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১৪.১

নিজেদের একার সংসার শুরু হয়েছিলো আমেরিকা আসার পরে। ইস্কাটনের বাসায় যা ছিলো, তাকে দাম্পত্যের শুরু বলা যায়, সংসারের নয়। ওটা মায়ের সংসার। বাইরের সব কর্তৃত্ব বাবার। ওখানে একদিনের জন্যে বাজারও করতে হয়নি বিজুকে, রানুকেও এক কাপ চা বানিয়ে খেতে হয়নি কখনো।

ঢাকা এয়ারপোর্টে তাদের বিদায় দেওয়ার লোকের অভাব হয়নি। রানুর বাবা দু’জনকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, মনে রেখো, তোমরা কিন্তু যাচ্ছো ফিরে আসার জন্যে। জানি, যারা যায় তাদের অনেকেই আর ফেরে না। তোমরা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নেবে, কিন্তু একশোবার জিজ্ঞেস করলে আমি একশোবারই তোমাদের ফিরে আসতে বলবো।

নিউ ইয়র্কের জে এফ কে-তে ওদের রিসিভ করার জন্যে কেউ ছিলো না। কাগজপত্র সব ঠিকঠাক ছিলো, ইমিগ্রেশনে কোনো ঝামেলা হয়নি। ব্যাগেজ নিয়ে বাইরে বেরিয়ে চেনা কোনো মুখ দেখতে না পেয়ে ভারি অসহায় একটা অনিশ্চয়তার বোধ তৈরি হয়। এই অপরিচিত জায়গায় কোনো একটা চেনা মুখ না দেখলে তা হতেই পারে। কী করিলে কী হয় জাতীয় সংস্কারে বিজুর বিশ্বাস নেই, কিন্তু এই সময়টাকে চট করে খুব প্রতীকী বলে মনে হয়।

সম্পূর্ণ নতুন এক দেশে পৌঁছে যে সংবর্ধনার মুখোমুখি হতে হলো, তার ভেতরে কি কোনো সংকেত আছে? ‘এলেম নতুন দেশে / তলায় গেল ভগ্নতরী কুলে এলেম ভেসে।’ ভগ্নতরী তলিয়েছে ঠিকই, এখানে যে কেউ তোমার জন্যে অপেক্ষা করেও নেই! তোমাকে কেউ কি চায়! রানুর মুখের দিকে তাকায় বিজু, সেখানেও উদ্বেগ ছাড়া আর কিছু লেখা নেই।

রানুর দূর সম্পর্কের এক মামার এয়ারপোর্টে আসার কথা। ফ্লাইটের বৃত্তান্ত যথাসময়ে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিলো, অথচ এখন তার দেখা নেই। হয়তো কোথাও আটকে গেছে, এসে পড়বে ভেবে অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত জানায় রানু। ঘণ্টাখানেক পরেও কোনোকিছু বদলায় না, কোনো চেনা মুখ দেখা দিয়ে বলে না, স্যরি, আমার একটু দেরি হয়ে গেলো।

দেখেশুনে এয়ারপোর্টের কর্মী মনে হয় এরকম একজনকে জিজ্ঞেস করে বিজু জেনে নেয় ট্যাক্সি কোথায় পাওয়া যাবে। আর যাই হোক, এয়াপোর্টে তো আর থানা গাড়া যাবে না, কোথাও পৌঁছাতে হবে এবং সেজন্যে ট্যাক্সি ছাড়া গতি নেই এখন। বাস চলাচল দেখা যায়, কিন্তু কোন বাস কোথায় যায় কে জানে!

দু’জনে মালপত্র টেনে নিয়ে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে আসে। মানুষজন, গাড়িটাড়ি সব মিলিয়ে জায়গাটাকে ঢাকার গুলিস্তানের চেয়ে কম কিছু মনে হয় না বিজুর। শুধু রিকশা নেই, এই যা। সিগারেট খাওয়ার জন্যে অস্থির হয়ে আছে সেই কখন থেকে, কিন্তু এয়ারপোর্টের ভেতরে সর্বত্র নো স্মোকিং লেখা দেখেছে। এখানে বাইরে অনেকের হাতে সিগারেট দেখে সাহস করে ধরিয়ে ফেলে একটা। রানু তার ব্যাগ থেকে মামুজানের ঠিকানা লেখা কাগজটা খুঁজে বের করে।

ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে একটা বেঁটেমতো মোটাসোটা লোক ট্যাক্সির খবরদারি করছিলো। বিজু পায়ে পায়ে এগিয়ে তার কাছে ঠিকানা লেখা কাগজটা ধরিয়ে দিয়ে বলে, এই ঠিকানায় যেতে চাই আমরা।

সাদা চামড়ার লোকটা হাসি হাসি মুখ করে বলে, এ দেশে এই প্রথম?

বিজু হ্যাঁ বললে সে বলে, দেখলেই ঠিক বুঝতে পারি। হাতের ইশারায় একটা ট্যাক্সি দেখিয়ে ওদের উঠে পড়তে বলে সে। ঠিকানার কাগজ ফিরিয়ে দিয়ে বলে, ড্রাইভারকে দিলেই সে ঠিক জায়গামতো পৌঁছে দেবে।

ট্যাক্সির ভেতরে বসতেই, কী আশ্চর্য, ড্রাইভার পরিষ্কার বাংলা ভাষায় বলে, ঢাকাত্থিক্যা আইলেন?

বিজুর ঠিকই মনে হয়েছিলো, এ জায়গাটা সত্যি গুলিস্তানের মোড়। ভিনদেশের প্রথম ট্যাক্সিতে বাঙালি ড্রাইভার, তা বোধহয় শুধু নিউ ইয়র্কে সম্ভব।

বিজু জিজ্ঞেস করে, কেমন করে বুঝলেন আমরা ঢাকা থেকে আসছি?

আপনাগো দেইখ্যাই বুজছি। কতা কইতেও তো হোনলাম।

ঠিকানা খুঁজে বারোতলা পুরনো একটা দালানের সামনে গাড়ি থামায় ড্রাইভার। বলে দেয়, ভেতরে গিয়ে লিফটে সাততলায় উঠে অ্যাপার্টমেন্ট নাম্বারটা খুঁজে নিতে হবে। দরজার ওপরে লেখা থাকবে নাম্বার।

দরজা খুলে দেয় একজন মধ্যবয়স্ক লোক। লুঙ্গিপরা, খালি গা। ভেতরে ঢুকে রানু বলে, মামা আপনার না এয়ারপোর্টে যাওয়ার কথা?

এই তাহলে মামা! মামা বলে, আর বোলো না...

বলার দরকার ছিলো না। বিজু পুরনো এক বন্ধুর ফোন নাম্বার জোগাড় করে এনেছিলো, সে ডালাসে থাকে বছর তিনেক। ফোনে বিজুর সব বৃত্তান্ত শুনে বললো, চলে আয়। এখানে সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

দু’দিন পরে ডালাস। বন্ধুর সঙ্গে গিয়ে ইউনিভার্সিটিতে রানুর রেজিস্ট্রেশন, ক্যাম্পাসের ঠিক বাইরে এক বেডরুমের একটা অ্যাপার্টমেন্ট ঠিক করা, পুরনো ফার্নিচারের দোকান থেকে ঘরের জন্যে সামান্য কিছু ফার্নিচার, চাদর-বালিশ, বাসনকোসন কেনা হয়। ডালাসে আসার দিন সাতেকের মধ্যে শুরু হয়েছিলো তাদের সংসার।

মাকড়সার জাল বোনার মতো বোনা হতে থাকে দিনযাপন, সংসার। একেকটা প্রয়োজনের লেজ ধরে দু’ঘর বুনে দেখা যায় আরো দুটো দরকার উঁকি দিতে শুরু করেছে। এই তাহলে সংসার। দেশে থাকতে বোঝা যায়নি, অনেককিছু হাতের কাছে তৈরি ছিলো। এখানে একেবারে শূন্য থেকে শুরু বলে প্রতিটি আঁচড় টের পাওয়া যায়।

এ শহরে ট্রেন নেই, বাস যা আছে তা-ও না থাকার মতো। চলাফেরা সীমিত হয়ে ছিলো, বাসা ক্যাম্পাস ঘেঁষে হলেও রানুর পক্ষে হেঁটে ক্লাসে আসা-যাওয়া প্রায় অসম্ভব। বন্ধু নিজে অথবা তার বউ রানুকে ক্লাসে নামিয়ে দেয়, তুলে নিয়ে আসে। হাটবাজার করার দরকার হলেও ওদের বলতে হয় গাড়িতে নিয়ে যেতে। নাহলে সামান্য রুটি বা সিগারেট কিনতেও মাইলখানেক হাঁটো। পরান্মুখ হয়ে আর কতো থাকা যায়!
১৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গানটি বন্ধুত্বের, গানটি শান্তির প্রতি ভালোবাসায় সিক্ত

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৪ শে জুন, ২০২৬ ভোর ৪:০০

আমেরিকা ও ইরানের শান্তি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে এই গানটি বুনেছি, নিজের বেসুরো গলা 'ব্যবহার' করেই।
এবারে কি ভারত - বাংলাদেশ সীমান্তে শান্তির আলো দেখা দেবার কথা?



বন্ধু হে অনেক... ...বাকিটুকু পড়ুন

সে আমার দিকে তাকিয়েছিল || একটা রোমান্টিক গান

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৪ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৪

সে আমার দিকে তাকিয়েছিল
ওওও
বহুবার সে তাকিয়েছিল
আমি ভাবতে চেয়েছি
আমাকে তার ভালো লেগেছিল



সে দেখতে এতটা সুন্দরী
তার উপমা যেন সে নিজেই
মাঝে মাঝে অধরে তার ফুটছিল হাসি
মুগ্ধতায় আমি হারিয়েছিলাম খেই
তখন মিহিসুতোর মতো বৃষ্টিরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

“নির্বাচিত সরকার যখন সেনাবাহিনী মাঠে নামায়, গণতন্ত্র তখন নিজের সত্ত্বা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।”

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৪



“নির্বাচিত সরকার যখন সেনাবাহিনী মাঠে নামায়, গণতন্ত্র তখন নিজের সত্ত্বা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।”

এই বক্তব্যের মূল তাৎপর্য নিহিত রয়েছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক দর্শনে। গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো জনগণের... ...বাকিটুকু পড়ুন

=কিছু গোপন ব্যথা রেখে দিলাম অন্তরে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৩



আমার হয়ে থাকুক কিছু
মন কুঠুরির আড়াল হয়ে
দুঃখগুলো যাক না নিরব
একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।

বাড়ুক ব্যথা বুকের গহীন
কেউ না জানুক গোপন থাকুক
ব্যথার কাঁপন উঠুক না হয়;
হেলা বুকে কষ্ট আঁকুক।

যাক না এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মের অবমাননা রুখতে গিয়ে নিজের ধর্মকেই ছোট করছেন না তো?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৫


সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ধর্ম অবমাননার আবার একটা ঘটনা ঘটলো। ২৩ জুন ২০২৬। প্রিন্স রায় দীপ্ত নামের পঁচিশ বছরের একটা ছেলে নবীজিকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ তাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×