
যেদিন সড়ক দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদের মৃত্যুর সংবাদ পাই, সেদিন, সে মুহূর্তে আমি ছিলাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, স্বাধীনতা স্তম্ভ ঘেঁষা জলাশয়ের পাশে। সংবাদটি ছিল শোকের, সংবাদটি ছিল শকেরও। আমরা প্রস্তুত ছিলাম না, এই সৃষ্টিশীল বাংলাদেশী চলচিত্র নির্মাতার এই অকাল প্রয়ানে।
আমার ছাত্র জীবনের একটা অংশ কেটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচিত্র সংসদ আন্দোলনের কর্মী হিসেবে। তারেক মাসুদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র , জড়িত ছিলেন ঢাকা ইউনিভার্সিটি ফিল্ম সোসাইটি নামক উক্ত অর্গানাইজেশনের সঙ্গে। উক্ত সংগঠনের সাথে জড়িত আমরা সবাই, স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের মানুষকে সুস্থ্যধারার চলচিত্রমুখী করার জন্যে তারেক মাসুদ এবং তার সহযোদ্ধারা যে সংগ্রামটি করেছেন, তার জন্যে তাঁকে গভীর সম্মানের চোখে দেখতাম। প্রোজেক্টর আর পর্দা কাঁধে তারেক মাসুদ, তানভীর মোকাম্মেল, শামিম আখতারের মত চলচিত্র সংসদ কর্মীরা ছুটে বেড়িয়েছেন একসময় গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে।
আমার ব্যক্তিগত সংগ্রামের জায়গা, আমার শৈশব থেকে, মূলত দুটি , যদি অ্যাকাডেমিক পড়াশোনাকে এক সাইডে চাপিয়ে রাখি। এক, বাংলা গান; দুই, বাংলা সাহিত্য।
আজকের এই পোস্ট, আমার একটি স্বপ্নকে ঘিরে। স্বপ্নের নাম ছিল - "আরশিনগরের খোঁজ"।
আমার বয়স যখন চার, আমার বাবা তখনি আমাকে হাতে ধরে রোকনুজ্জামান দাদাভাইয়ের তৈরি কিশলয় কচিকাঁচার আসরে সঙ্গীত বিভাগে ভর্তি করিয়ে দেন। ওখানে ছ' বছরের কোর্স সম্পন্ন করার পর প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কণ্ঠ সঙ্গীত শেখা বন্ধ থাকে। ক্লাস সেভেনে যখন পড়ি, তখন বাবা একটা গিভসন জাম্বো গিটার কিনে দেন। এইচএসসির রেজাল্টের পর নিজের জমানো টাকা, আর মায়ের অনুদানে কেনা হয় ইয়ামাহা ব্র্যান্ডের একটি কিবোর্ড। পিয়ানো বাজানোর তালিম নিই ওয়ারফেইজ ব্যান্ডের কিবোর্ডিস্ট শামস মনসুর গনি ভাই, এবং অ্যাডভান্স লেসন সমূহ নিই ওয়ারফেইজ ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন শুভানুধ্যায়ী রোমেল আলী ভাই'র কাছে। গিটারের প্রাথমিক তালিম নিই ওয়ারফেইজ ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ইব্রাহীম আহমেদ কমল ভাইয়ের কাছে।

ছবি - ছায়ানটে, বিলম্বিত একতালে রাগ ভীমপলশ্রি পরিবেশনকালে
এখনো আমি ছায়ানটের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত বিভাগের ছাত্র। আমার গুরু সঙ্গীতাচার্য রেজওয়ান আলী জগন্নাথ ইউনিভার্সিটির সঙ্গীত বিভাগের অধ্যক্ষ, ছায়ানটের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত বিভাগের প্রধান দুই শিক্ষকের একজন। তিনি উত্তরভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রাচীনতম ঘরানা - গোয়ালিয়র ঘরানার তালিম প্রাপ্ত।

ছবি - আমার গুরুজি, সঙ্গীতাচার্য রেজওয়ান আলী
২০০৯ সালে বাংলাদেশের আন্ডারগ্রাউন্ড মেটাল ব্যান্ড এম্বারসের সাথে আমার সংশ্লেষণ ঘটে। তাদের সাথে জ্যাম করা শুরু করি। এক বছর বাদে মেটালিয়ানস নামে আরএকটি ব্যান্ডের সাথে কাজ শুরু করি। যেহেতু তাঁরা মূলত মেগাডেথ, মেটালিকা, এবং আয়রন মেইডেনের মত থ্র্যাশ, বা হেভি মেটাল সং কাভার করতো , কীবোর্ডিস্ট হিসেবে আমার করনীয় খুব বেশীকিছু থাকতো না। যদিও আমি তখন টুকটাক চিলড্রেন অফ বডম, বা ড্রিম থিয়েটার ব্যান্ডের পিয়ানো বেইজড কিছু গান কাভার করা শুরু করেছি।
আমার ঝোঁক ছিল বরাবর নিজের গান করবার। নিজে গান লিখে সুর দিয়ে গাইবার। কিন্তু আমার আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড মেম্বারদের আগ্রহ ছিল আমাকে মূলত কীবোর্ডিস্ট হিসেবে ব্যান্ডে রাখার, ফলশ্রুতিতে তাদের সাথে আমার সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয় নি। আমি নিজে নিজে গান লেখা, এবং পারফর্ম করা শুরু করি। এই প্রক্রিয়া এখনো জারি আছে।
এই লেখার মূল বিষয়বস্তুতে প্রবেশ করা যাক।
২০১৬ সালে, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করবার পর, প্রথমত আমার হাতে মিউজিকের পিছে ইচ্ছেমত খরচ করবার জন্যে টাকা আসতে শুরু করে; দ্বিতীয়ত, মাস্টারির সুবাদে, মিউজিসিয়ান ছাত্রদের সাথে আমার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ঘটে।

ছবি - ইউনিভার্সিটি অফ এশিয়া প্যাসিফিকে, ক্লাসের ফাঁকে আমার ছাত্রছাত্রীদের সাথে
২০১৭ সালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগে ইংরেজির দায়িত্ব নেয়ার পর চারুকলার সংস্কৃতিমনা ছেলেমেয়েদের সাথে পরিচয় হয়। ওখানেই , আমার দুই ছাত্র আয়াজ ফাতমি পৃথু (গিটারে) আর রাগিব এখওয়ান (পারকাশনে) কে নিয়ে একসাথে জ্যাম করা শুরু করি। কয়েকটি সেশন একসাথে মিউজিক করার পর আমাদের একটি ব্যান্ড ফর্ম করা সময়ের দাবী বলেই মনে করি।
প্রথম সমস্যা সামনে আসে নামকরণের। এমন একটি নাম ব্যান্ডের দেয়া প্রয়োজন হয়, যেটা একসাথে বাঙ্গালিয়ানা, এবং বৈশ্বিক চেতনার ধারক হবে।
ফিরে যাওয়ার জন্যে লালনের কোন বিকল্প আমাদের মাথায় আসে নি। লালনের গানের সাথে মিলিয়ে দলের নাম রাখা হল - "দা আরশিনগর প্রোজেক্ট" , বাংলায় - "আরশিনগরের খোঁজ"।
এই নামকরণের শানে নুজুল সংক্ষেপে এই যে - একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতে মানুষে মানুষে এত ভিন্নমত, এত ভিন্নপথ, যার অধিকাংশই পরিপূর্ণভাবে দূর আর কোনদিনই সম্ভব নয়। আমরা গানে গানে এমন এক আরশিনগরের খোঁজে নামতাম, যেখানে মানুষ সকল ভেদাভেদ ভুলে, কিছুক্ষণের জন্যে হলেও, গানের সূত্রেই একতারে আবদ্ধ হবে, আমাদের সাথে গলা মিলিয়ে গাইবে, এবং আমাদের সেই মেহফিল পরিণত হবে লালনের সেই আরাদ্ধ আরশিনগরে, যার খোঁজে লালন বলেছেন -
"বাড়ির পাশে আরশিনগর
সেথা পরশি বসত করে
আমি একদিনও না দেখিলাম তারে ..."
কাজেই, আমাদের গানের দল আরশিনগর নয়, বরং এক আরশিনগরের অন্বেষণের প্রচেষ্টা, একটা প্রোজেক্ট, আরশিনগরের খোঁজ।
গানে গানে আত্মার মেলবন্ধন রচনার জন্যে দলের নামের সাথে শ্লোগান সংযুক্ত হল - "আরশিনগরের খোঁজঃ গানে আত্মার যোগ"।
দলের একটা লোগো প্রয়োজন হল। আমার পরামর্শ মতে, প্রাচীন রুম নগরের ঘূর্ণায়মান সূফী সাধকদের (হুয়ারলিং দারভিশ) আদলে বাংলার বাউল আঁকা হল, হাতে ধরিয়ে দেয়া হল একতারা।

ছবি - আমাদের ব্যান্ডের স্ট্রিট শো'র ব্যানার
পারফর্মেন্সের ক্ষেত্রে তারেক মাসুদের ফিলসফি আমাদের পথ প্রদর্শক হিসেবে আবির্ভূত হন। প্রাথমিকভাবে, আমরা আমাদের সমমনা মিউজিকের শ্রোতা বাড়ানোর জন্যে লক্ষ্য স্থির করি যত বেশী সম্ভব স্ট্রিট শো'র আয়োজন করা। সোজা ভাষায়, রাস্তায় গান গাওয়ার। আমাদের বেশীর ভাগ প্র্যাকটিস সেশনগুলো হত ঢাকা ইউনিভার্সিটির পথেঘাটে, ফুলার রোডে, ডাকসু ভবনের সামনে, কখনো চারুকলায়, অথবা সোহরাওয়ারদিতে, বা টিএসসিতে।

ছবি - ছবির হাটে আমাদের স্ট্রিট শো
জ্যামিং এর শুরু হত গিটারে, স্প্যানিশ ফ্ল্যামেঙ্কোর মূর্ছনায়। একে একে গাইতাম লালনের গান, আমাদের ভারতীয় ক্লাসিকেল মিউজিকের ছোট ছোট ঠুমরী, বা গজল, সিস্টেম অফ এ ডন, রেডিওহেড, কোডালাইন, রিচারড মার্ক্স, ডেমিয়েন রাইস থেকে নিয়ে অর্ণব, মহিনের
ঘোড়াগুলি, অঞ্জন দত্ত, সুমন চাটুজ্জে, ফসিলস, আমাদের দেশজ লোকসঙ্গীত, ওয়ারফেইজ, আর্টসেলের গান।
সাথে আমার নিজের কম্পোজ করা প্রায় ত্রিশটির মত গান।

ছবি - চারুকলার গ্রাফিক ডিজাইনের নবীন বরনে আমাদের পারফর্মেন্স
একবছরের একটু কম সময় আমাদের ব্যান্ডের আয়ু থাকে। এর মধ্যে আমরা পারফর্ম করি চারুকলার নবীনবরনে, ইউনিভার্সিটি অফ এশিয়া প্যাসিফিকের নবীনবরনে, ব্রিটিশ কাউন্সিল আয়োজিত পৌষ উৎসবে, বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্রের চৈত্র সংক্রান্তি উৎসবে, রেডিও একাত্তরে, এবং একাধিক স্ট্রিট শোতে।


ছবি - ব্রিটিশ কাউন্সিলের পৌষ মেলায় আমাদের পারফর্মেন্স
পরবর্তীতে, আমার ছাত্রদের ব্যান্ডের প্রতি আগ্রহ ধরে রাখতে আমি অসক্ষম হই। ওদেরও জীবন - জীবিকার প্রয়োজনে আস্তে আস্তে ওদের আগ্রহ ব্যান্ডের দিক থেকে অন্যদিকে ধাবিত হতে থাকে। চারুকলার শিক্ষার্থীদের পকেটমানির একটা বড় সুযোগ থাকে বিবিধ জায়গায় "খ্যাপের কাজে", ইন্টেরিওর ডেকোরেশন বা ডিজাইনে। ওরা কমবেশী তাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আমিও খানিকটা অভিমান থেকেই ওদের ডেকে একত্র করার দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দিই।


ছবি - রেডিও '৭১ এ আমাদের পারফর্মেন্স
কিন্তু সঙ্গীত আজও আমার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমার মিশন খুব সিম্পল। মারা যাওয়ার আগে, আমাদের বাংলাদেশের মানুষদের জন্যে গুনগুন করে গাওয়ার জন্যে উল্লেখযোগ্য দু' - এক ডজন গান রেখে যাওয়া। আমার স্বপ্ন , একদিন আমি আমার ক্যাম্পাস, ঢাকা ইউনিভার্সিটি দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় শুনবো, আমার গান গিটার বাজিয়ে একটি তরুণ ছেলে তার প্রেমিকাকে শোনাচ্ছে, তার প্রেমিকা তন্ময় চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এভাবে আমি, না থেকেও, বাংলা ও বাঙালীর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়ে যাবো।

ছবি - ইউনিভার্সিটি অফ এশিয়া প্যাসিফিকের ইংরেজি বিভাগের র্যাগডেতে
ব্যান্ড নেই। এখন একাই পারফর্ম করি। আজ রাত দশটায় এই পেইজে পশ্চিমবঙ্গের এক বাচিক শিল্পীর, এবং বাংলাদেশের এক করোনা স্পেশালিষ্টের সাথে আয়োজিত একঘণ্টার এক লাইভ অনুষ্ঠানে আমি নিজের কিছু গান পরিবেশন করবো। সময় হলে শুনবেন , এই প্রত্যাশায়।
আমাদের কিছু লাইভ পারফর্মেন্সের ভিডিও নীচে সংযুক্ত করে দিলাম -
১। ফসিলস ব্যান্ডের ফিরে চলোঃ চারুকলা, গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের নবীন বরন
২। একই অনুষ্ঠানে, অর্ণবদা'র হারিয়ে গিয়েছি, এবং নিজের অরিজিন্যাল মিশেল ফুঁকো
৩। রাগ বাসান্ত মুখারির ছোট খেয়াল
৪।বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের চৈত্র সংক্রান্তি উৎসবে আমার ব্যান্ডের সাথে অতিথি শিল্পী আমার ছোটবোন, মৌমিতা হক সেঁজুতি
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মার্চ, ২০২১ রাত ১০:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


