somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পুনঃপ্রকাশের অপেক্ষায় ডায়াস্পোরা, মেমোরি, আইডেন্টিটি, ওয়ার অ্যান্ড ট্রমা'র অনন্য মিশ্রণে নোবেল বিজেতা প্যাট্রিক মোদিয়ানো'র উপন্যাস 'মিসিং পারসন' - আমার অনুবাদে

০৫ ই অক্টোবর, ২০২০ রাত ৮:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



প্যাট্রিক মোদিয়ানো সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার জয় করেন ২০১৪ সালে। সে বছরেই আমি মোদিয়ানো'র আলোচিত উপন্যাস 'মিসিং পারসন' (১৯৭৮) ড্যানিয়েল ওয়েইসবোর্টের ইংরেজি অনুবাদ (১৯৮০) থেকে বাংলায় অনুবাদ করি, এবং পরের বছরের বইমেলায়তে অনুবাদকর্মটি মলাটবদ্ধ আকারে বাজারে আসে। এ বছর চমন প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী এনাম রেজা ভাইয়ের আগ্রহে অনুবাদকর্মটি তাঁর প্রকাশনা সংস্থা থেকে পুনঃপ্রকাশ হচ্ছে।

'মিসিং পারসন' - উপন্যাসে প্রবেশের পূর্বে সহায়ক তথ্য হিসেবে জেনে রাখা ভালো হবে যে প্যাট্রিক মোদিয়ানো'র জন্ম ১৯৪৫ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধত্তোর ফ্রান্সের প্যারিসে, এক ইহুদী পরিবারে। প্যাট্রিক মোদিয়ানোর বাবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, মোদিয়ানোর জন্মের বছর তিনেক আগে, হিটলারের নাজি বাহিনীর হাতে প্রাণ হারাতে হারাতে কোনক্রমে বেঁচে যান তাঁর এক বন্ধুর সহায়তায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত সাহিত্যকর্মের পরিমাণ নেহায়েত কম নয়, কিন্তু মোদিয়ানো'র রচিত এ উপন্যাসের বিশেষত্ব এই যে, এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাজি বাহিনীর নিস্রংসতার শিকার ইহুদীদের প্রতি বাহ্যিক সহানুভূতি থেকে সৃষ্ট কোন সাহিত্যকর্ম নয়। বরং উপন্যাসের রচয়িতা এমন একটি পরিবারের অংশ যারা সরাসরি সেই নিস্রংসতা চোখে দেখেছেন, এবং তাতে আক্রান্ত হয়েছেন। এই পার্থক্যটুকু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট অন্যান্য সাহিত্যিকের সাহিত্যকর্ম থেকে মোদিয়ানো'র উপন্যাস মিসিং পারসনকে পৃথক করে। ধার করা আবেগ, আর স্বতঃস্ফূর্ত জৈবিক অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক।

'মিসিং পারসন' উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র গায় রোল্যান্ড স্মৃতিবিভ্রাটে আক্রান্ত এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা। তাঁর জীবনে বিদ্যমান স্মৃতি বলতে স্রেফ একদশকের মতন সময়কাল ধরে কর্মরত থাকা একটি বেসরকারি গোয়েন্দাসংস্থার দিনগুলি। এর বাইরে তাঁর অতীত জীবন সম্পূর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্ন। তবে তিনি এটা জানেন, স্মৃতিসংক্রান্ত তাঁর এ সমস্যার সূত্রপাত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে। 'মিসিং পারসন' উপন্যাসের ঘটনার চাকা গড়াতে শুরু করে সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। তাঁর প্রারম্ভেই আমরা আবিষ্কার করি, যে বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থায় গায় কাজ করতেন তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই ফুসরতে বিদ্যমান সামান্য কিছু তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে গায় রোল্যান্ড শুরু করেন কুয়াশার চাদরে ঢাকা তাঁর অতীত জীবনের তত্ত্বতালাশ। গোয়েন্দা হিসেবে সফল একটি ক্যারিয়ারের প্রায় পরিসমাপ্তির মুখে এসে তিনি কি সমাধা করতে পারবেন তাঁর জীবনের সবচে ব্যক্তিগত ও গুরুত্বপূর্ণ কেইসটি? তিনি কি খুঁজে বের করতে পারবেন, তিনি কে? নাকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নিজের অতীত - বর্তমান - ভবিষ্যৎ হারানো আরও অসংখ্য হতভাগ্যের মত একজন 'মিসিং পারসন' হয়েই তাঁর জীবনের ইতি ঘটবে?

নোবেল বিজয়ের পূর্বে প্যাট্রিক মোদিয়ানো বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে তারকা ছিলেন না, যে অর্থে মিলান কুন্দেরা, সালমান রুশদি, বা হারুকি মুরাকামি নোবেল পুরস্কার না পেয়েও বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে তারকাখ্যাতিসম্পন্ন । নোবেল বিজয়ের পরেও প্যাট্রিক মোদিয়ানো বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে কোন সেলিব্রেটি সাহিত্যিকে পরিণত হন নি, যে অর্থে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, আলবেয়ার কাম্যু, বা গ্যাব্রিয়েল গারসিয়া মারকেজ নোবেল বিজয়ী সেলিব্রেটি সাহিত্যিক। সাধারণ পাঠক - যারা বই পড়তে ভালবাসেন তাঁদের মাঝে, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার অ্যাকাডেমিক অঙ্গনেও মোদিয়ানোকে নিয়ে অ্যাকাডেমিশিয়ান/ শিক্ষক - গবেষকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রতিক্রিয়া, তাঁর নোবেল বিজয়ের পরেও, পরিলক্ষিত হয় নি। ব্যাপারটা বেশ বিস্ময়করই, কারন তাঁর উপন্যাস 'মিসিং পারসন'কেই যদি বিচ্ছিন্নভাবে উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করি, দেখা যায় তা বিবিধ আঙ্গিক থেকে পাঠ ও বিবেচনা করা সম্ভব। উপন্যাসটিতে একটি ভয়াল যুদ্ধের করাল থাবায় স্মৃতিভ্রংশ, ও নিজের পরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া একজন মানুষের অতীত খুঁজে ফেরার মানবিক ও শ্বাসরুদ্ধকর একটি গল্প তো আছেই, সঙ্গে আছে নিজভূম, বন্ধুবান্ধব, ও আত্মপরিচয় থেকে বিচ্ছেদের তাড়নাজাত ডায়াস্পোরা সাহিত্যের স্বাদ; আছে যুদ্ধ এবং বিভীষিকা/ ওয়ার অ্যান্ড ট্রমার চাক্ষুষ প্রতিবেদন যার সাইকোঅ্যানালাইটিক পাঠ ও বিশ্লেষণ খুবই সম্ভবপর; এবং আছে আত্মপরিচয়শূন্যতা - নির্মাণ - বিনির্মাণের চক্রাকার আবর্তন। অর্থাৎ, উপন্যাসটি কয়েকটি লেয়ার বা স্তরে পাঠ করা সম্ভব যা স্রেফ আনন্দের জন্যে সাহিত্যপাঠ / প্লেজার রিডিং এর সুযোগ যেমন তৈরি করে দেয়, একই সঙ্গে সিরিয়াস পাঠক - গবেষকের হাতে তুলে দেয় সাহিত্যতত্ত্বের গভীরে ডুব দিয়ে বইটির উপজীব্য সময় - চরিত্রাবলী - দর্শনের নতুনতর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, ও অর্থ উন্মোচনের চাবিকাঠি।

মিসিং পারসন ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত হলে সে বছরেই ফরাসী সাহিত্যের সম্মানজনক পুরষ্কার প্রি গনক্যুরে ভূষিত হয়। এ উপন্যাস ও তাঁর লেখকের ব্যাপারে আগ্রহ জাগানিয়া আরও অনেক তথ্যের সংযোজন সম্ভব, তবে গুণী পাঠক এ অনুবাদ পাঠ শেষে আগ্রহান্বিত হয়ে নিজেই হয়তো তা খুঁজে নেবেন, এই আশায় অনুবাদক হিসেবে আমার কর্তব্য আপাতত সমাপ্ত মনে করছি।


রকমারিতে বইটির প্রি অর্ডার নেয়া হচ্ছে - আগ্রহীদের জন্যে প্রি অর্ডার লিঙ্ক

সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই মার্চ, ২০২১ রাত ৮:৩৬
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ক্লাস ফাকি দিয়ে তারা আড্ডা মারছে। এই দিকে পিতা মাতা হয়তো মনে করবে যে আমার মেয়ে ক্লাস করতে গিয়েছে।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:২৫



ক্লাস ফাকি দিয়ে তারা আড্ডা মারছে। এই দিকে পিতা মাতা হয়তো মনে করবে যে আমার মেয়ে ক্লাস করতে গিয়েছে। এই স্থানটি খুবই নিরিবিলি। দেশের আইন-শৃঙ্খলার অবস্থা খুবই খারাপ। এমন ফাকা... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

×