হুমায়ুন আহমেদের সবচে' বড় গুরুত্ব, আমার মতে, কোলকাতার বইবাজারে হামলা দেয়া। "পাঠক তৈরি" নয়, বা হিমু - মিসির আলী লেখা নয়।
বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদই মূল। কেউ আর স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পাশের দেশ দখল করার চেষ্টা করে না। পাশের দেশের বাজারে নিজের প্রোডাক্ট ঢুকিয়ে দিয়ে তাদের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে আনতে পারলেই হয়। কোনদিন স্বপ্ন, মিনা বাজার, বা আগোরায় গেলে খেয়াল করে দেখবেন, কোন দেশী পন্যে তাদের তাক সয়লাব। চীনা পন্য ভারত, বা অ্যামেরিকা তাদের বাজারে ঢুকতে না দিলে চীন তাদের ওপর উল্টো অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। টার্কি প্রেসিডেন্ট তাইয়েব এরদোয়ান ফ্রান্সের সঙ্গে সরাসরি লড়াইয়ে না নেমে আরব দেশগুলোকে অনুরোধ জানায় তাদের পণ্য বয়কট করবার। কোন একটা প্রোডাক্টের অভাব না থাকলেও আমাদের মাঝে কৃত্রিম অভাব তৈরি করা হয়। সমাধানের বদলে সমস্যা বিক্রি করা হয়। বৈশ্বিক পূঁজি, ও অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের এই মজার খেলগুলি আমি - আপনি ধরতে না পারলেও সমস্যা নাই। আমাদের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রসমূহ আমাদের হয়ে আমাদের উন্নতির জন্যে এ সমস্ত বিষয়ে প্রতিনিয়ত চিন্তা করেই যাচ্ছে।
যেখানে আমাদের দেশে প্রায় সবক্ষেত্রেই ভারতীয় পণ্যের আধিপত্য , একা হুমায়ুন আহমেদ তখন কোলকাতায় বাংলা ভাষাভাষী পাঠকসমাজে সুনীল - সমরেশ - শীর্ষেন্দুর বাজারের ফাঁক গলে খুব মসৃণভাবে ঢুকে পড়েছিলেন। হুমায়ুন আহমেদ মারা যাওয়ার পর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এক ওভার দা ফোন ইন্টারভিউতে শুনেছিলাম, সুনীল বলছিলেন - 'আমাদের উপন্যাস প্রতি পূজো সংখ্যায় দেশ পত্রিকায় বেরুতো কিনা তার ঠিক ছিল না, কিন্তু হুমায়ুনের উপন্যাস টানা পাঁচ পূজোতে দেশ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, এ আমার মনে আছে।' সুনীলের এ কথার তাৎপর্য বোঝা দরকার। হুমায়ুন কখনো আনন্দ পুরস্কার পান নি। কাজেই আনন্দবাজার গ্রুপের সবচে প্রেস্টিজিয়াস পত্রিকার পূজো সংখ্যায় পর পর বছরগুলিতে হুমায়ুনের উপন্যাস ছাপা হওয়ার কারন হুমায়ূন আহমেদের প্রতি তাদের ভক্তি বা অপত্য স্নেহ নয়। বরং কারনটা বিশুদ্ধ বাণিজ্যিক। হুমায়ূনের পাঠকপ্রিয়তা। হুমায়ূনের উপন্যাস মানে দেশ পত্রিকার পূজো সংখ্যার আরও কয়েকশো কপি অধিক বিক্রি।
কোলকাতার একটা বইয়ের গ্রুপে ছিলাম। সদ্য লিভ নিয়েছি। ওখানে পশ্চিমবঙ্গের অনেকে সদিচ্ছায় হোক বা পাকনামো করেই হোক, বাংলাদেশী লেখক প্রকাশকদের নাম বিকৃত করে লিখতেন। মাওলা ব্রাদার্সকে মৌলা ব্রাদার্স, আহমদ ছফাকে এহমাদ ছফা, মাশরাফি বিন মুর্তজাকে মশাররফ মুরতাজা ইত্যাদি। আমি প্রশ্নও করেছিলাম একদিন, মূল বইয়ে যেহেতু এরকম বানানে নাম লেখা নেই, তবে এরকম উদ্ভট বানানে নাম লিখবার হেতু কি? প্রপার নাউনে বানান ঠিক - বেঠিক বলে কিছু নেই। যে যেভাবে লিখতে চান সেটাই ধর্তব্য। পোস্টদাত্রী উত্তর দেয়াকে বাহুল্য বিবেচনা করে চুপ থেকে গিয়েছিলেন। কিন্তু সে গ্রুপেও দিনে অন্তত একটা পোস্ট দেখতাম, পশ্চিম বঙ্গের কোন তরুণ বা তরুণীর, যে - হুমায়ুন আহমেদের হিমু সমগ্র /মিসির আলী সমগ্র কিনবো, কোন প্রকাশনীরটা ভাল হবে। বা, হুমায়ুনের অমুক বা তমুক বইয়ের পিডিএফ আছে কি না। অনুপম রয়কেও দেখেছি তার ফেসবুক পাতায় 'মিসির আলীর বই পড়ছি' পোস্ট দিয়ে এই বাংলার ফ্যান ফলোয়ারদের মনে আর একটু জায়গা করে নেয়ার চেষ্টায় রত।
তো এটাই। পূঁজির গোলকায়নের যুগে, যখন আমার বাড়িতে ভারতীয় সাবান, টুথপেস্ট, কাপড়, বিদ্যুৎ, টেকনোলজি, টিভি সিরিজ, সিনেমা, গান হুড়মুড়িয়ে প্লাবনের মতো ঢুকছে, হুমায়ুন আহমেদের শত শত বই তখন জায়গা করে নিয়েছে পশ্চিম বঙ্গের বাঙ্গালীদের বইয়ের তাকে। হুমায়ুন আহমেদ প্রকাশনা বাজারে নিজের বিশাল একটা মার্কেট দুই বাংলায় তৈরি করতে পেরেছিলেন, কোটি কোটি টাকা যেখানে বাণিজ্যের নামে আমাদের দেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে, হুমায়ুন আহমেদ তার লেখনীর মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা বিদেশ থেকে দেশে এনেছেন - এই জন্যে তাকে হাঁটু গেড়ে বসে এক কৌম বাংলাদেশী হিসেবে আমি সম্মান জানাই। আহমদ ছফা ব্যাপারটা কখনো এভাবে ভেবে দেখলেন না, এটা আমাকে খানিকটা বিস্মিতই করে।
যারা তার লেখায় বুদ্ধিবৃত্তিকতার ছোঁয়ার অভাব আছে বলে অভিযোগ তোলেন, বা বাংলাদেশী অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিক লেখকদের পাঠকহীনতার অভিযোগ তোলেন, তাদের বোঝা উচিৎ - হুমায়ুন ত্রিশ কোটি বাংলা ভাষাভাষী সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সুখদুঃখের গাঁথা লিখেছেন, তিনি তাদের ভালোবাসা পেয়েছেন। বুদ্ধিবৃত্তিক লেখকরা সাধারণ মানুষদের জন্যে লেখেন নি, তারা তাদের ভালোবাসা পান নি। তবে এই বলে আমি হুমায়ূন এবং বৌদ্ধিক / ইন্টেলেকচুয়াল ধারার লেখকদের তুল্যমূল্য বিচার করছি না, বা একটি শ্রেণীকে অপর শ্রেণীর ওপর প্রাধান্য দিচ্ছি না। আমি বলতে চাচ্ছি এই যে - শহিদুল জহিরের লেখা বাংলাদেশে জনপ্রিয় নয়, এ বলে আমি দুঃখ করতেই পারি, কিন্তু সাদাত হুসেইন যদি আগামীকাল কোলকাতার বইয়ের মার্কেটে একটা দখল আনতে পারেন, আমি তাকেও পছন্দ করব।
শেষ রসিকতাটা একটু কড়া ডোজের হয়ে গেলো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

