আহমদ ছফার শেষ উপন্যাস 'অর্ধেক নারী, অর্ধেক ঈশ্বরী' (১৯৯৬) আজ পড়ে শেষ করলাম। হুমায়ূন আহমেদের ব্যাপারে এই অভিযোগ শুনেছি, নিজেও করেছি যে তার উপন্যাস পাঠকের খুব বেশী মেধার আলোড়ন, বা অখণ্ড মনোযোগ দাবী করে না। আহমদ ছফার এ উপন্যাসের ব্যাপারেও আমার অভিজ্ঞতা একই। দুলকি চালে দ্রুতগতিতে টেনে পড়ে ফেলা যায় এমন একটি বই এটি। আমার সে অভিজ্ঞতারই দু' চার ছত্র ভাবলাম লিখে শেয়ার করি। ব্যক্তিগত আক্রোশ যদি না থাকে, তবে সমস্ত সাহিত্য সমালোচনার একটি ভদ্রস্থ নিয়ম হচ্ছে, লেখকের কাজের ব্যাপারে কিছু ভালো কথা বলে ফের সমালোচনা আরম্ভ করা। ছফার এ উপন্যাসটির ব্যাপারে আমি সে কাজটি করি নি। আগে যা ভালো লাগে নি, তা বলে যা ভালো লেগেছে সেটার আলোচনা করেছি।
সাধারণত কোন শিল্পী - সাহিত্যিকের পক্ষে জানার কথা না যে তার জীবনের শেষ কাজ কি হবে। তবে 'অর্ধেক নারী, অর্ধেক ঈশ্বরী'র মতো একটি উপন্যাস ছফার জীবনের শেষ উপন্যাস, এটা ভাবতে আমার কষ্ট লাগে। আহমদ ছফার ষাটের দশকে লেখা প্রথম উপন্যাস 'সূর্য তুমি সাথী' ব্যতিরেকে তার বাকি সবগুলো উপন্যাস নিয়ে আমার যে সমালোচনা, তার এ উপন্যাসটি নিয়েও আমার একই সমালোচনা। ব্যক্তি ছফার উপন্যাসে অতিপ্রবল উপস্থিতি। বরং, আলোচ্য এ উপন্যাস তো ছফার প্রেমেরই সাতকাহন। ছফার কাছে যেকোন সাহিত্যকর্ম বোধয় কাব্যেরই নামান্তর ছিল। প্রেমের উপন্যাস লিখবার ইচ্ছেতে তিনি প্রচুর কাব্যিকতা করেছেন 'অর্ধেক নারী...' উপন্যাসটিতে। কিন্তু, আমার ব্যক্তিগত অভিমত, তেলেজলে মেশে নি, যেমনটা মেশান অরুন্ধতী, বা টনি মরিসন। কথা হল, আপনার বলবার জন্যে না অতি অসাধারণ একটি গল্প থাকতে হবে। তবেই ভাষার সৌকর্য বিশেষত্ব পায়। তত্ত্ব - তথ্য নেই, ভাষাই শুধু বড় পেলব মধুর, এমন লেখা আমার পছন্দ নয়।
.
ছফার উপন্যাসের প্রথম দুটি অধ্যায় দীর্ঘায়িত প্রেমপত্র, সোহিনী নাম্নী এক রমণীর প্রতি। তাকে কোন চরিত্র হিসেবে তৈরি করবার শ্রম ছফা কাঁধে নেন নি। সোহিনী থেকে যান ছফার দুই প্রেমিকার সঙ্গে কৃষ্ণের ব্রজানন্দ লাভ, এবং রাধার বিচ্ছেদ যাতনার একক স্রোতা হিসেবে। উপন্যাস যখন দুম করে শেষ হয়ে যায়, তখন পাঠক বুঝতে পারে - সোহিনী কেবল তৈরি করবার ছলেই তৈরি করা একটি চরিত্র।
.
তারপর, উপন্যাসের ছলে ছফা যেটি করেন, আমার তা একদমই পছন্দ হয় নি। দুরদানা এবং শামারোখ, ছফার আসনাইয়ের দুই পাত্রীকে ৭০এর দশকের ঢাকার ইতিহাস জানা ব্যক্তিমাত্রই চিহ্নিত করতে পারবেন। তারা যথাক্রম বিখ্যাত ভাস্কর শামিম শিকদার, এবং ঢাবির ইংরেজি বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষিকা সুরাইয়া খানম। তাদের সঙ্গে ছফা নিজের বন্ধুত্ব, এবং বন্ধুত্ব থেকে গড়িয়ে প্লেটোনিক, প্লেটোনিক থেকে গড়িয়ে শারীরিক প্রেমের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে ছফার প্রতি আমার শ্রদ্ধা কমেছে। বাড়ে নি। রিকশায় বৃষ্টিস্নাত অবস্থায় প্রেমিকার সঙ্গে শারীরিকভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়া, তার শরীরের কামোদ্দীপক বর্ণনা দেয়া - ছফার সঙ্গে যায় কি? এ অভিজ্ঞতা বাংলার প্রণয়ের সম্পর্কে জড়িত নারী - পুরুষের জীবনে খুব ইউনিক কোন কিছু? নিজের জীবনে সংঘটিত প্রেমের আনুপুঙ্খিক বর্ণনা দিয়ে যে লেখক তার জীবনের শেষ উপন্যাসটি লিখবেন, তার আদৌ উপন্যাস লিখবার কি প্রয়োজন ছিল? একটা ব্যাখ্যা ছফার উপন্যাস পড়তে পরতেই পাওয়া যায়। ছফা বারবার এ প্রসঙ্গটি তোলেন যে, এ দুই মহীয়সী নারীর সঙ্গে তার সম্পর্ককে ঢাকার তৎকালীন এলিট ক্লাসে থাকা অধ্যাপক, কবি সাহিত্যিক, ব্যবসায়ীরা ভালোভাবে নেই নি। কারন, তাদের সবারই আগ্রহ ছিল উক্ত রমণীদ্বয়ের ঘনিষ্ঠ হবার, এবং তারা পেলেন না, কিন্তু 'আচাভুয়া গ্রাম্য' ছফা পেয়ে গেলেন নানা গুণে গুণান্বিতা রমণীদের, এ নিয়েই ছিল তাদের বিস্তর ঈর্ষা, এবং ক্ষোভ। হয়তো সেই এলিট সম্প্রদায়কে অপ্রাপ্তির বেদনায় আরও কিছু জ্বলন বৃদ্ধির আকাঙ্খাও ছফার এতটা রসিয়ে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের প্রেমকাহিনীর ডালা খুলে বসার একটি কারন।
.
ছফা যে গ্রাম থেকে উঠে আসা মানুষ, এবং আজীবনই দরিদ্র ছিলেন, এ ব্যাপারটা তাকে সচেতনে, অবচেতনে তাড়িয়েছে। এ উপন্যাসেও তার প্রমাণ পাওয়া যায়। শামারোখ তাকে বারবার তার পোশাক পরিচ্ছদ নিয়ে খোঁচা দেয়। তার ইন্টারন্যাশনাল হলে থাকার জায়গা, খাবারের মান, পকেটের পয়সা এ সব নিয়েও তিনি বরাবর হীনমন্যতায় ভোগেন। ভার্সিটির প্রফেসরদের সঙ্গে রিসার্চারের পদমর্যাদার তফাৎ তার কাছে অসহ্য লাগে। জায়গায় জায়গায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক - শিক্ষিকাদের চারিত্রিক দুর্বলতা, লাম্পট্য প্রমাণ করবার চেষ্টা করেছেন। সত্যমিথ্যা ছফাই ভালো জানেন। কিন্তু উপন্যাসের আশ্রয় না নিয়ে যদি প্রবন্ধের আকারে এসমস্ত ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করবার সৎসাহস তিনি দেখাতেন, ভালো লাগতো। ছফার কাছ থেকে এতটুকু আশা করতেই পারি।
.
অবশ্য এও সত্য যে, ছফা যদি এই কথাগুলো না লিখতেন কথাগুলো আলোচনাতেও আসতো না কখনো। কবি আবুল হাসান, শামারোখ, বা সুরাইয়া খাতুনের পরবর্তী প্রেমিককে ছফা পয়সা ধার দিয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হতে সহায়তা করেছিলেন, পরে সেই টাকা দিয়ে আবুল হাসান বেশ্যাপল্লীতে গিয়ে মৌজ করা অবস্থায় ছফা তাকে পিটিয়েছেন - এ সমস্ত ঘটনা ছফা বর্ণনা করেন অকপটে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারকে উপস্থাপন করেন, একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে, দাম্ভিক মিথ্যেবাদী হিসেবে। আহমদ শরীফ স্যারকে উপস্থাপন করেন মিথ্যে রটনার সহযোগী হিসেবে। সুরাইয়া খানমকে ইংরেজি বিভাগে চাকরী পাইয়ে দেবার জন্যে তিনি প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত তদবির করান ঢাবির এক শিক্ষককে ধরে, সেই সুরাইয়া খানম যখন ডিপার্টমেন্টে টিকে থাকার জন্যে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারের সঙ্গে টিচার্স লাউঞ্জে বসে মধুমিশ্রিত কথা বলে ডাগর নয়নে চেয়ে থাকেন সিক স্যারের দিকে ছফার বুকে তা কাঁটার মতো বেঁধে। দুরদানার সূত্রে তার ভাই ইউনুস জোয়ারদার, বা সিরাজ শিকদারের ঘটনাও আসে।
.
কাঠামোগতভাবে এতটা দুর্বল, এতটা ব্যক্তিগত একটি উপন্যাস, যেখানে ছফা নিজেই ভুতের মতো উপস্থিত আদ্যোপান্ত - এটা আহমদ ছফার শেষ উপন্যাস, ভাবতেই খারাপ লাগে। গুরু আবদুর রাজ্জাক তাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন তলস্তয়ের ওয়ার অ্যান্ড পিস, আন্না কারেনিনার মতো হাজার পাতার উপন্যাস লিখতে, মাওলা ব্রাদার্স থেকে তার আটটি উপন্যাসে মিলিত উপন্যাস সমগ্রের সর্বমোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ৫৭২, এটাও কষ্টেরই একটা ব্যাপার।
.
ছফা যাদের বাসায় বা মনে পোস্টারের মতো সেঁটে আছেন, আমি সেই ভক্তদের একজন। কাজেই ছফার প্রতি আমার - আমাদের দাবী বেশী। ঔপন্যাসিক ছফা সেই দাবী পূরণ করতে পেরেছেন কদাচিৎ। তার প্রবন্ধই তার মননশীলতার সেরা প্রমাণ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

