somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ আন্ডারগ্রাউন্ড ~ মাসরুর আরেফিন

৩০ শে জানুয়ারি, ২০২২ সকাল ১১:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



মাসরুর আরেফিন সাহেবের তৃতীয় এ উপন্যাস, আজ আমার পড়া শেষ হবে। অর্ধেকের বেশী ইতোমধ্যে পড়ে ফেলেছি। ভাবলাম, এটাই এ বই পড়বার অভিজ্ঞতা নিয়ে দুই কলম লেখার উপযুক্ত সময়। পুরো উপন্যাস শেষ হয়ে গেলে দেখা যায় সামারি লিখতে গিয়ে উপন্যাসের প্লট টুইস্টগুলো সব শেয়ার করে দিচ্ছি। ওটা আবার যে পাঠক আগে বইটা পড়ে নাই, তার জন্যে ক্ষতিকর।
.
ওনার প্রথম উপন্যাস 'অগাস্ট আবছায়া' র ন্যারেটিভ টেকনিক নিয়ে সমালোচনা শুনেছিলাম। প্রথম ১০০ পাতাই নাকি মাথা ধরিয়ে দেয়, এমন বিরক্তিকর ভঙ্গীতে লেখা। ঐ উপন্যাস সংগ্রহ করতে পারি নি তার দামের জন্যে (মুদ্রিত মূল্য ৮০০ টাকা)। ফলে পক্ষে বিপক্ষে মন্তব্য করা মুশকিল ছিল। কিন্তু অর্থ এবং প্রভাব খাটিয়ে তার উপন্যাসের পক্ষে "লেখক সমালোচক" দের একত্র করা নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে তার ব্যাপারে আমার বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি হয়েছিল একটা, সন্দেহ নেই।
.
যাহোক, আমি সাধারণত না পড়ে পূর্ব ধারনা থেকে, বা আন্দাজে মন্তব্য করি না কারো ব্যাপারে। কাজেই মাসরুর সাহেবের অন্তত একটা বই পড়া প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। তার তৃতীয় উপন্যাস আন্ডারগ্রাউন্ড, যেটা আগেই বললাম, এখন পড়ছি, এবং ওনার লেখনীর ব্যাপারে আমার মতামত ইতিবাচক।
.
খুব প্রস্তুতি নিয়ে ভদ্রলোক লিখছেন এতে কোন সন্দেহ নেই। ওনার লেখার ভেতরে অন্যান্য লেখকের লেখাপত্রের যে রেফারেন্স ঘনঘন আসে, তাতেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়। নিজের লেখার স্টাইলের ব্যাপারে ওনার কনফিডেন্স মারাত্মক। কেউ বুঝবে, না কি বোর হয়ে যাবে (অনেকেই হয়, অগাস্ট আবছায়ার ব্যাপারে যে সমালোচনা ছিল) - এ নিয়ে মনে হয় না তার কোন মাথাব্যাথা আছে। প্লট হিসেবে তিনি যে ক্ষেত্রটি বেছে নিয়েছেন তার 'আন্ডারগ্রাউন্ড' উপন্যাসে, তা বেশ ইউনিক। এক বাংলাদেশী রাশিয়ায় যায় - ২৬ বছর ধরে রাশিয়ায় নিখোঁজ তার বড় ভাইয়ের খোঁজে। রাশিয়ায় তার খুঁটি এক বাল্যবন্ধু, যে রাশিয়ার স্বনামধন্য ব্যবসায়ী এবং ধনকুবের, পুতিনের ৩৫ নং সার্কেলের লোক। রাশিয়ায় এসে পৌঁছানোর পর সেই বন্ধুর সঙ্গে বাংলাদেশী ভদ্রলোক রাশিয়ার "আন্ডারগ্রাউন্ড" এ ট্যুর দেয়, এবং ধারনা লাভ করে, কীভাবে আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে পৃথিবীর সমস্ত মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রন করে গুটিকয় ক্ষমতাসীন মানুষ।
.
আন্ডারগ্রাউন্ডের ট্যুরের অংশটুকু আমাকে বার বার হ্যারলড পিনটারের অ্যাবসার্ড ড্রামার (বার্থডে পার্টি, উদাহরণত) মনে করিয়ে দিচ্ছিল। লেখায় যৌনতা খুব প্রাসঙ্গিকভাবে আসে। সাম্প্রদায়িকতার ইস্যুও উপস্থিত যথাযথভাবে। ঘটনা ঘটছে রাশিয়ায়, ব্যকড্রপে বাংলাদেশ বরাবর উপস্থিত। রাশিয়ার সমাজতন্ত্রের পতন, এবং ধনতন্ত্র কীভাবে বৈশ্বিক ভাষায় পরিণত হোল, তা নিয়ে লেখকের খুব স্পষ্ট বোঝাপড়া লেখক উপন্যাসের চরিত্রগুলির মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন।
.
একটা অংশ উদ্ধৃত করা যাক -
.
" কামাল বলল , ইউ মাস্ট হ্যাভ অ্যান ওপেন মাইন্ড। সংকীর্ণ চিন্তা দিয়ে এই আন্ডারগ্রাউন্ড তুই বুঝতে পারবি না। গরিবের জন্যে হাহুতাশ থেকেও এই আন্ডারগ্রাউন্ড তুই বুঝতে পারবি না। তোকে বিগ পিকচারটা বুঝতে হবে। কেন ক্ষমতা সবার কাছে থাকা ভালো নয়, কেন সামান্য কিছু লোকের কাছেই তা থাকা ভালো, তোকে সেইটাও বুঝতে হবে। রাশিয়া এইসব এক্সপিরিমেন্ট করে ফেলেছে রে দোস্ত। কমিউনিজমের পতন এই জন্য হয় নাই যে, ঐ সিস্টেম অটোক্রেটিক, ইত্যাদি। ঐটা এইজন্যে হইছে যে, কমিউনিজম দিনমজুরকে শক্তিশালী করতে চাইছিল। সেইটা হয়না, সেইটা কোনদিন হয় না। দিনমজুর শুধু মিছিলে আর রাস্তায় ক্ষমতাশালী হয় রে, প্রেসিডেন্ট প্যালেসে দিনমজুর ক্যামনে ক্ষমতাশালী হবে? প্রেসিডেন্ট প্যালেসের বাথরুমে তো ওরা মুততেই পারবে না, ওইখানে গোসল করতে গেলে তো ওরা গরম পানিতে গা পুড়ায়েই ফেলবে। কারন, কারন, কারন ওরা সুইচগুলি কোথায় তা-ই তো জানে না...পৃথিবীতে ইভিল থাকবেই, খারাপ থাকবেই। কমিউনিজম সেইটা তাড়াইতে চাইছিল। কিন্তু তার বোঝার ভুল ছিল যে, খারাপ কোন ইটের টুকরা না যে, ওইটা আমি ছুড়ে ফেলে দিলাম।" (পৃষ্ঠাঃ ৬৯)
.
সমালোচনার তেমন কিছু পাই নি এখন পর্যন্ত, এটুকু ছাড়া যে, এই উপন্যাস অধিকাংশ বাংলাদেশীর জীবনেই প্রাসঙ্গিকতা বহন করে না। লেখক সমাজের যে অংশের মানুষের জীবনআখ্যান বর্ণনা করছেন, তা লেখকের ব্যক্তিজীবনের এলিট লাইফস্টাইল থেকে প্রাসঙ্গিক। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ আসলে জানতে চাইবে না যে দৈবক্রমে একজন বাঙালি কীভাবে রাশিয়ার প্রধানতম ধনকুবেরে পরিণত হয়ে রাশিয়ান আন্ডারগ্রাউন্ড ডিসিশনমেকিং এর পার্ট হয়ে গেলো। অথবা, হয়তো এ বিষয়ে আরও নিখুঁত ধারনা পাওয়ার জন্যে সে কোন রাশান লেখকের লেখা পড়তে চাইবে এ ব্যাপারে। এছাড়াও, লেখকের ভাষা বা ন্যারেটিভ স্টাইল আরোপিত মনে হয়। মনে হয় এক বা একাধিক পাশ্চাত্য লেখকের স্টাইল থেকে ধার করা। তা ঠিক অর্গানিক নয়, যেমনটা কিনা একজন কথা সাহিত্যিক দীর্ঘদিন নিজের বাংলা নিয়ে এক্সপিরিমেন্ট করে করে অবশেষে এসে একটা স্টাইলে থিতু হন।
.
লেখকের উপন্যাসে রুশ এবং জার্মান ভাষার অহরহ ব্যবহার এ উপন্যাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। রুশ রমণী ভ্যালেন্তিনার প্রতি প্রেমভাব, এবং যৌনতার দৃশ্যপটগুলি ফুটিয়ে তোলার ব্যাপারেও লেখক ছিলেন চূড়ান্ত যত্নশীল।
.
যত্ন নিয়ে, দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়ে বাংলা কথাসাহিত্যের চর্চায় আসার জন্যে মাসরুর আরেফিন সাহেবের প্রতি আমার শ্রদ্ধা। সেলে পাইলে তার প্রথম দুটো উপন্যাসও পরবর্তীতে কিনে পড়বো। কিনে পড়বো।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জানুয়ারি, ২০২২ সকাল ১১:০৬
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সিটিজেন ভিজিল্যান্টি থেকে কালেমার মিছিল: সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কতগুলো অশনি সংকেত - প্রথম পর্ব

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৮


গত মাসে আমেরিকায় "সিটিজেন ভিজিল্যান্টি" নামে মুসলিম ও অভিবাসীবিদ্বেষী একটি সিনেমা মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটি প্রথমদিকে দর্শকদের মধ্যে তেমন জনপ্রিয় হয়নি। পরে যখন ইলন মাস্ক এক্স প্ল্যাটফর্মে তার ২৪ কোটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

'গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড' আন্দোলন কেন ব্যর্থ হলো

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:১৩



মাও সে তুং-এর গৃহীত "গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড" (১৯৫৮-১৯৬০) আন্দোলনটি মূলত অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা, চরম অব্যবস্থাপনা এবং ভুল কৃষি নীতির কারণে মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী লীগ ফিরতে পারে, তবে…

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:২০




১। ২০১২ থেকে সংঘটিত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১২ বছরের গু/ম, খু/ন, অ*পশাসন, গণতন্ত্র হ*ত্যা, নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বং*স, দুর্নী*তি, বাকস্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার হরণের মাত্রা এমন চরমই ছিল যে, শুধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

সিনেমা-গান-খেলাধুলা

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ২:১৭

আইন সমাজ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি নয়। আইন দৃশ্যমান, প্রতিরোধযোগ্য। সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো মানুষকে নিজেই নিজের আনন্দ নিষিদ্ধ করতে শেখানো। জীবন থেকে আনন্দের উচ্ছেদ ঘটানো। এই কাজটি বাংলাদেশে গত... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রতি বছর জুলাই আসলেই কি কাউয়া ক্যাচাল লাগতে হবে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:৫০


জুলাই মাসটা আবার ঘুরে ফিরে আসতেই দেশের রাজনৈতিক পাড়ায় পারদ চড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে যারা গত দুই বছর আগের আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলেছেন, তাদের কাছে এই জুলাইয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×