somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বুকের ভেতর বটবৃক্ষ, পর্ব ২ঃ ঢাকা শহরের এই প্রাসাদোপম ভবনগুলো আমি চিনতাম না কেন?

০১ লা জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

স্ত্রীর ইন্টার্ন আইনজীবী হিসেবে ভাইভা ছিল সুপ্রিমকোর্টে এক আইনজীবীর অফিসে। শীতের বিকেল। ভাইভা কতক্ষন, জানি না। কনকনে শীতের কারণে কার্জন কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাকি অংশের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে স্মৃতি রোমন্থন করবো, এমন সাহস পাচ্ছিলাম না প্রাথমিকভাবে। তাছাড়া, বহিরাগত হিসেবে পাকড়ে ফেললে মানসম্মানের রফা। কাজেই, সাতপাচ ভেবে বৌকে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে রওনা দিলাম শিল্পকলা একাডেমির উদ্দেশ্যে। উদ্দেশ্য, শিল্পকলা আয়োজিত তরুণ শিল্পী বাইনিয়াল দেখা। ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে চিত্রকলা ভবনের চারতলা ঘুরে ঘুরে সব কাজ দেখে শেষ করা সম্ভব। টুয়েলভ অ্যাংরি ম্যান নাটক মঞ্চস্থ হবার কথা ছিল শিল্পকলার প্রধান নাট্যমঞ্চে, সন্ধ্যায়। ছবি দেখা শেষ করে ইচ্ছে ছিল সে নাটকের দু'টো টিকিট কেটে রাখা অগ্রিম। যাতে স্ত্রীর ভাইভা শেষ হলে দু'জনে মিলে নাটক দেখতে পারি। তারপর বাইরে কোথাও ডিনার। বছরের শেষ রাতটা এভাবেই উৎযাপনের ইচ্ছে ছিল।

শিল্পকলায় গেলে ইদানীং এমনিতেই মন খারাপ হয়ে যায়। পুরো শিল্পকলায় সেনাবাহিনী, তাদের সাঁজোয়া যান, জিপ, ট্রাকে গিজগিজ করছে। সুর আর অসুরের এমন মেলবন্ধন জীবনে সামনাসামনি কখনো দেখি নাই। সে যাই হোক, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই কোনক্রমে এঁকেবেঁকে ঢুকে পড়লাম শিল্পকলায়।

আর্টগ্যালারিতে গিয়ে প্রথম বিস্ময়ের পালা। এক্সিবিশন শেষ হয়ে গিয়েছে ডিসেম্বরের ২২ তারিখ। আপডেটেড না থাকায় মিস করে গিয়েছি। অবাক হলাম। বাংলাদেশের চিত্রকলার পরিসর থেকে আমার দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছে অনেক। ছাত্রজীবনে আসেপাশের একটা এক্সিবিশনও মিস করতাম না। ছবির প্রতি এই ভালোবাসা আর টানের জন্যেই হয়তো, চারুকলায় খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে পড়ানোর সুযোগও হয়েছিল বছর পাঁচেক। অথচ ইদানীং ছবি ও চিত্রকর, ভাস্কর্য ও ভাস্কর এদের সবার থেকেই কতো দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে জীবনের ডামাডোলে।

তারপর হেঁটে হেঁটে এগিয়ে চললাম নাট্যকলা ভবনের দিকে। শিল্পকলার সেগুনবাগিচার গেটের দিকে তাকিয়ে দেখি নিষ্প্রাণ নিস্পন্দ একটা অবস্থা। টিকিট কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে দেখি, সব খালি। কেউ নেই। গেটে থাকা দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, বেগম জিয়ার মৃত্যু উপলক্ষ্যে ঘোষিত জাতীয় শোক দিবসে সব নাটকের শো বন্ধ আছে। আজ কোন নাটক মঞ্চস্থ হবে না।

আমার দ্বিতীয়বার বিস্মিত হবার পালা।

ঘটনাগুলো ঘটবার ছিল। মাথা একটু খাটালে আগেই বুঝতাম, সরকারি প্রতিষ্ঠান সব বন্ধ থাকার কথা।

শিল্পকলার সরকারি কর্মচারীরা আগেভাগেই বের হয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম।

মৎস ভবনের মোড় পেরিয়ে এখন গন্তব্য আবারো সুপ্রিম কোর্ট।

হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়লো, হাতের ডান দিকে এক প্রাসাদোপম দালান। সরকারি কোন ভবনই হওয়ার কথা। নইলে এরকম প্রাইম লোকেশনে কোন প্রাইভেট প্রোপার্টি থাকার কথা না। গেটে পুলিশ টুলিশ দাঁড়ানো।

উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখলাম, দালানের শিরোনামে লেখা, বার কাউন্সিল অ্যাসোসিয়েশন।

তার ঠিক উল্টোপাশে ডিপার্টমেন্ট অফ আর্কিটেকচারের সুবিশাল দালান, তারপর পূর্তভবন, একটু পর, মোড়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এই দালানগুলো মোটামুটি আজ প্রথমবারের মতো আমার চোখে ধরা পড়লো।

অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায়, বিশেষ করে শেষ একটা বছর, এই সমস্ত রাস্তা আমি হেঁটেই পার হতাম। বাসা তখন ঢাবির কাছাকাছি ছিল। এই দালানগুলো আমার কখনো চোখে পড়ে নি।

এই দালানগুলোর ভেতরে কখনো ঢুকতে ইচ্ছা করে নি। ভেতরে গিয়ে বসতে ইচ্ছা করে নি। ভেতরের মেকানিজমের অংশ হতে ইচ্ছা করে নি।

স্বাপ্নিক ছিলাম। মাথায় স্বপ্ন ছিল প্রচুর। গান লিখি, সুর দিই, গাই। বই বের হচ্ছে একের পর এক। বড় বড় লেখকদের দামী দামী বই ব্যাগের ভেতর। হাতেও কমসে কম একটা বই, যেটা তখন পড়ছি। ইউনিভার্সিটির শিক্ষকরা আলাদা চোখে দেখতেন। ভালবাসতেন। আমার সম্ভাবনার কথা শোনাতেন।

এগুলো আজ থেকে ১০ বছর আগের ঘটনা।

এখনো লিখি, এখনও পড়ি। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি। কিন্তু বুঝি, এই সমাজ, এই শহর, এই দেশে স্বপ্ন বেচাবিক্রির বাজার খারাপ। মাতাল রাজ্জাক যেমন বলেন, পিরিতের বাজার ভালো না।

ঐ সব সরকারি দালানে বসা লোকগুলো দেশ চালায়। তাদের কথায় অসংখ্য লোক ওঠে বসে। চাইলে তারা আসলেই ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারে মানুষের জীবনে। বদলে দিতে পারে মানুষের জীবন।

সে আমি আমার জায়গাথেকেও পারি। লিখে, শিক্ষকতা করে।

কিন্তু সমাজে মানুষের দেখার, জাজ করবার যে চোখ এবং চোখের ওপরের লেন্স, তাতে আমার মতো মানুষের কোন আলাদা সম্মানের জায়গা নেই।

একটা বয়সে এসে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, সম্মান, এগুলোও গুরুত্ব বহন করে।

যা হোক, স্ত্রীর সঙ্গে দেখা হলে সে বলে, ভাইভা ইতিবাচক ছিল। আমরা রিকশায় বেইলিরোড রওনা হই।

এই পরিচিত শহর, তার সড়ক, জন্মের পর থেকেই তো এর বুক চীরে ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছি।

পরিবর্তিত সময়ে, পরিবর্তিত পরিচিতিতে তাদের চেহারাও আস্তে আস্তে বদলে গেলো।

যেটা জানি, যে স্বপ্ন বুকে একটু একটু করে পেলেপুষে বড় করেছি, বাকি জীবন তাদের পূঁজি করেই এগুতে হবে।

অনেক করে পড়তে হবে।

এক পৃথিবী ভরে লিখতে হবে।

নতুন বছরের শুভেচ্ছা সবাইকে।

(লেখাটি লিখবার সময় ব্যাকগ্রাউন্ডে এই গানটা চলছিল - view this link )
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:০৩
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একা হতে দুহু. দুহু থেকে বহু : যুদ্ধ আর ধংসও সৃষ্টির চিরন্তন লীলা

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৪ ঠা মার্চ, ২০২৬ সকাল ৯:৫১


বিধাতার পরে দুহাত তুলে
জানাই শুকরিয়া কারণ
অসীম শূন্যতার ভেতরেও
তিনি শুনেছিলেন প্রতিধ্বনি
নিজ সত্তারই গভীর আহ্বান।

তাই তিনি সৃজিলেন দুহু
আলো আর অন্ধকার
দিন আর রজনী
আকাশ আর ধরণী
প্রেম আর প্রত্যাশা।
একটি হৃদয় থেকে আরেকটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি এখন ইরান নিয়ে ভাবছি না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৪ ঠা মার্চ, ২০২৬ সকাল ১১:১৮



সূরাঃ ৪৮ ফাতহ, ২৯ নং আয়াতের অনুবাদ-
২৯। মোহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল; তাঁর সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল; আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় তুমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

“সূয্যি মামা জাগার আগে উঠবো আমি জেগে” (দিনলিপি, ছবিব্লগ)

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ০৪ ঠা মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৫


রোদের মাঝে একাকী দাঁড়িয়ে....
ঢাকা
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বেলা ১২৩৩

"সূয্যি মামা জাগার আগে উঠবো আমি জেগে" -- নিজ শিশুর মুখে একথা শুনে মানব শিশুর মায়েরা সাধারণতঃ কপট রাগত স্বরে এমন প্রতিক্রিয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাশিয়াকে ড্রোন দিয়ে ইরান নিজে কি পেল ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা মার্চ, ২০২৬ রাত ৮:৩৫


ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে একটা প্রশ্ন ঘুরেফিরে এসেছে — রাশিয়াকে ড্রোন দিয়ে ইরান আসলে কী পেল? ইরানের Shahed-136 ড্রোন ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করেছে, সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি... ...বাকিটুকু পড়ুন

জল্লাদ খামেনি বাঙ্গুদের কাছে হিরো

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ০৪ ঠা মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:১২



বাঙ্গুদের কাছে খামেনি হিরো কারণ সে ইউএসের বিরুদ্ধে দাড়িয়েছিল। কিন্তু বাঙ্গুরা কখনোই জানবেনা এই খামেনির ইরান ২০০৬ সালে তাদের এয়ারস্পেস আমেরিকার জন্য খুলে দেয় যাতে সাদ্দামের বাহিনীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×