somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

ঐশিকা বসু
নমস্কার পাঠক, সামহোয়্যারের এই ব্লগে ঐশিকা আপনাকে স্বাগত জানায়। জীবনের নানা হাসি-কান্না, দুঃখ-বেদনার ইতিহাসে লেগে থাকে কতই না কাহিনী। সেসব কিছু নিয়েই আমার এই ব্লগ। সত্য-কল্পনার মিশেলে কিছু গল্পের ব্লগ। যদি পাঠকের ভাল লাগে। নিজেকে সার্থক বলে মনে করব।

শেষ রাতের স্বপ্ন (প্রথম পর্ব)

১৬ ই আগস্ট, ২০২০ সকাল ১০:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ঘটনা – ১
রাত তখন ফুরিয়ে এসেছে। আর কিছুক্ষণ পরেই ভোরের আলো ফুটবে। সুজাতা তার ছ’বছরের ছেলে ধীমানকে নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। চাঁদের ম্লান আলো জানালার মধ্যে দিয়ে এসে তাদের গায়ের ওপর পড়ছে। যদিও সুজাতা ভেবেছিলো আজকে রাতে জেগে থাকবে, কিন্তু পারেনি। ঠিক কখন যেন ঘুমটা খুব গাঢ় হয়ে তার দুচোখে লেগে এসেছিলো, টের পায়নি। হঠাৎ একটা গোঙানির শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেলো। জেগেই সে অনুভব করলো খাটটা যেন কেউ নাড়াচ্ছে। ধড়মড় করে উঠে বসে দেখে তার পাশে শোয়া ধীমানের সারাটা শরীর থরথর করে কাঁপছে। কাঁপুনির সাথে সাথে অস্পষ্ট একটা গোঙানি। ছেলের এই সমস্যাটার সাথে সুজাতা পরিচিত আছে। ‘কি হয়েছে, বাবা, কি হয়েছে?’ বলতে বলতে প্রাণপণে সে তার ঘুমটা ভাঙিয়ে দিতে চেষ্টা করলো। আর ঠিক সেই সময়েই অস্পষ্ট গোঙানিটা স্পষ্ট হয়ে উচ্চারণ করে উঠলো, ‘রানা, রানা ঘোষ।’
ঘটনা – ২
পরেরদিন সকালে মলিনাদি বাসন মাজতে এসে এক খবর শোনালো। ‘জানো বৌদি, তোমাদের পাড়ায় একটা খুন হৈসে।’ মলিনা যেখানে বসে বাসন মাজছিলো, তার অদূরেই রান্নাঘর। সুজাতা সেখানে ধীমানের জন্য টিফিন বানাচ্ছিলো। সে জানে মলিনার সব খবরেই একটু জল মেশানো থাকে। তবু খুনের খবর বলে সে একটু সতর্ক হলো। জিগ্যেস করলো, ‘সে কি গো? কে খুন হয়েছে?’ মলিনা ভয়-ধরা গলায় চোখ পাকিয়ে বলে, ‘ঘোষাল বাড়ির লোকটা গো। রথীন ঘোষাল। কি ভয়ানক ব্যাপার!! নামটা শুনে চমকে ওঠে সুজাতা। কিন্তু তার মনের ভাব গোপন করে সে জানতে চাইলো, ‘কিভাবে খুন হয়েছে?’ মলিনা চটপট জবাব দেয়, ‘ঐ যেভাবে আগের জন হয়েছে। রাত্তির থেকে হঠাৎ বেপাত্তা। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পাওয়া গেলো না। আজ সকালে শ্মশানের কাছে দেহ পাওয়া গেছে। আধ-খাওয়া দেহ। মুণ্ডুটা আলাদা হয়ে গেছে। অনেক পুলিশ এসেছে গো।’ মলিনা আরো কি যেন বলছিলো, কিন্তু সুজাতার সেসব শোনার যেন আর এতটুকু ইচ্ছা নেই। সে তাড়াতাড়ি অন্য প্রসঙ্গ পেড়ে ওর কথা বন্ধ করার চেষ্টা করলো।


বাড়ির ছাদে পায়চারি করছিলো দেবরাজ। সঙ্গে তার বারো বছরের মেয়ে রত্না। অফিস থেকে ফিরে এই একটু সময় দেবরাজ তার পরিবারকে দিতে পারে। মৌমিতা নিচের ঘরে চা বানাচ্ছে। সে চা নিয়ে এলে দুজনে মিলে চা খাওয়া হবে। রত্নার জন্য বরাদ্দ যদিও হরলিক্স। তবে যতক্ষণ সে না আসে, ততক্ষণ বাপ বেটি দুজনে আকাশটাকে ভালো করে দেখছিলো। মেঘমুক্ত নির্মল আকাশ। অনেকগুলো তারা আকাশটাকে যেন রত্নখচিত করে তুলেছে। আঙুল তুলে একসারি তারার দিকে ইঙ্গিত করে দেবরাজ বলে, ‘ঐ দেখ, রতু, সপ্তর্ষিমণ্ডল।’ এই বলে রত্নাকে ভালো করে বুঝিয়ে বলে, ‘সাতটা তারা কেমন জিজ্ঞাসা চিহ্ন এঁকে দিয়েছে আকাশটার মধ্যে। আসলে গোটা মহাবিশ্বটাই তো একটা রহস্য। তাই অতো বড়ো একটা প্রশ্নচিহ্ন আঁকা আকাশটার গায়ে।’ রত্না বলে ওঠে, ‘বাবা, আমি কিন্তু বড়ো হয়ে মহাকাশ নিয়ে গবেষণা করবো। আর ঐ রহস্যের সমাধান করবো।’
দেবরাজ স্মিত হেসে বলে, ‘হ্যাঁ, মা। নিশ্চয়ই করবি।’
- আচ্ছা বাবা। এই পৃথিবীতেও কত রহস্য আছে, তাই না?
- আছে তো। অসংখ্য রহস্য আছে।
- তুমি সেসব সমাধান করতে পারবে বাবা?
- ধুর, পাগল। আমি আর ক’টা পারি রে মা। আমি যা পারবো না, তুই বড়ো হয়ে করবি।
- কিন্তু আমি তো মহাকাশ নিয়ে গবেষণা করবো।
- ও হ্যাঁ, তাও তো বটে।
এমনভাবে বাবা আর মেয়ের গল্প যখন জমে উঠেছে, তখন চায়ের কাপ আর হরলিক্সের গ্লাস হাতে নিয়ে হাজির হলো মৌমিতা। ‘কি রে, কি গল্প হচ্ছে? আমি একটু শুনি।’ রত্না বলে উঠলো, ‘বাবা বলছিলো, আমাকে রহস্য সমাধান করতে। কিন্তু আমি তো মহাকাশ…’ রত্নার কথা শেষ না হতেই মৌমিতা বলে উঠলো, ‘বুঝেছি বুঝেছি। হয়েছে। বাবা আছেন রহস্য সমাধান করতে। আর মেয়েকেও নাচাচ্ছেন।’
কিন্তু ছাদগল্পে এখানেই একটা ছেদ পড়লো। অসময়ে বেজে উঠলো দেবরাজের ফোন। স্ক্রিনে নাম ঝলকাচ্ছে জয়দীপ। ‘হ্যাঁ, হ্যালো। বল।’ বলতে বলতে দেবরাজ একটু দূরে চলে গেলো।
ওপার থেকে জয়দীপের গলার আওয়াজ। তবে তার গলায় বেশ স্পষ্ট একটা উদ্বেগ রয়েছে। কোনোরকম ভূমিকা ছাড়াই একটা চাপা উত্তেজনায় সে বলতে শুরু করলো, ‘শোন, একবার আমার বাড়িতে আসবার সময় হবে তোর?’ দেবরাজ একটু অপ্রস্তুত ভঙ্গীতে বলে, ‘বাড়িতে মানে? দেবকের বাড়িতে? এখন?’
- হ্যাঁ, দেবকের বাড়িতে। তবে এখন না হলেও চলবে। কিন্তু ভাই, কাল সকালেই আসা চাই কিন্তু। তোর হেল্প লাগবে আমার। খুব দরকার।
- কেন রে? বিপদ কিছু? সিরিয়াস?
- হ্যাঁ, ব্যাপারটা সিরিয়াস। আর আমার পরিবার এর সাথে জড়িয়ে পড়েছে। তোকে ভাই প্লিজ হেল্প করতে হবে।
দেবরাজ আগামীকাল খুব সকালে তার বাড়িতে চলে যাবে বলে কথা দিলো। তবে জয়দীপের কাছ থেকে ব্যাপারটা সম্বন্ধে আরেকটু বিশদে সে জানতে চাইছিলো। কিন্তু জয়দীপ তখন বিশেষ কিছু বলতে রাজী হলো না। সে অবিলম্বেই ফোনটা কেটে দিলো।
তবে কি তার আশৈশবের বন্ধু জয়দীপ সান্যাল খুব গুরুতর কিছু সমস্যার মধ্যে পড়েছে? জয়দীপকে সে খুব বুদ্ধিমান ছেলে বলেই চেনে। ছোটবেলায় ক্লাসে তো বরাবরই ফার্স্ট হয়ে এসেছে। উচ্চমাধ্যমিকে চারটে বিষয়ে লেটার মার্ক্স নিয়ে পাশ করে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেলো। এখন একটা নামজাদা বহুজাতিক সংস্থার সহকারী কনসালট্যান্ট হিসেবে কর্মরত। কাজের প্রয়োজনে তাকে এখন ভুবনেশ্বরে থাকতে হয়। পরিবার বলতে স্ত্রী আর এক ছেলে। বাবা মা দুজনেই বছর দুয়েক হলো গত হয়েছেন। দেবকের বাড়িতে তাই এখন ওর বৌ আর ছেলেই থাকে। ছেলের স্কুল, পড়াশুনার জন্য আর জয়দীপের ঘন ঘন বদলির কারণে সে পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারে না। তবে উঁচু পোস্টে উঠে গেলেও দেবরাজের সঙ্গে বন্ধুত্বে তার ছেদ পড়েনি বিশেষ। দুজনেই ফাঁক পেলে ফোন করে খবরাখবর নেয় দুজনার। দেখাসাক্ষাৎও চলে মাঝেমধ্যে। ইদানীং অবশ্য ওকে বিশেষ একটা ফোনটোন করাও হয়ে ওঠেনি দেবরাজের। কিন্তু এর মধ্যে হঠাৎ কি এমন হলো যে কাল সকালেই দেখা করার জন্য ওর এতো তাড়া?


পরেরদিন বেশ সকালেই দেবরাজ রওনা দিয়েছিলো জয়দীপের বাড়িতে। ওর বাড়িতে যেতে যেতে তার মনে হচ্ছিলো দেবক জায়গাটা ইদানীং খুব খারাপ হয়ে গেছে। মাস দুয়েকের মধ্যে সেখানে তিন-চারটে খুন হয়ে গেছে বলে খবরে বেরিয়েছে। যদিও পুলিশ এখনও একটা খুনেরও কিনারা করতে পারেনি। জয়দীপ যে কিভাবে ওর পরিবারকে এমন একটা জায়গায় ফেলে রেখে অতদূর পড়ে থাকে, তা ভাবলে সত্যিই অবাক হতে হয়।
দেবরাজ যখন জয়দীপের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছোলো, তখন সকাল সাড়ে ন’টা। বেশ ঝলমলে রোদ উঠেছে। হিমেল হাওয়া বইছে বেশ ভালোই। বাতাসে একটা ঠাণ্ডা আমেজ আছে। এমন পরিবেশে মনটা চনমনে হয়ে যায়। কিন্তু জয়দীপের বাড়িতে গিয়েই দেবরাজ টের পেলো সেখানে এখন বিরাজ করছে একটা থমথমে পরিবেশ।
সে আসতেই জয়দীপ ওকে নিয়ে গেলো বাড়ির ভিতরে। বৈঠকখানাটা বেশ বড়ো এবং সুসজ্জিত। ঘরের মাঝখানে একটা মাঝারি সাইজের কাঁচের টেবিল যার পায়াগুলো সেগুন কাঠের। তার চারিদিকে মেহগনি কাঠের ভারী চারখানা চেয়ার। তাতে বসার সুবিধার জন্য গদি আর বালিশও রয়েছে। এছাড়া তেতাল্লিশ ইঞ্চির একটা এল.ই.ডি টিভি আর একটা বড়োসড়ো অ্যাকোয়ারিয়ামও ঘরটার শোভা বাড়িয়েছে। দেবরাজ একটা চেয়ারে বসে বালিশটা কোলের ওপর রাখলো। পরিবারের সকলেই সেখানে ছিলো। জয়দীপের স্ত্রী সুজাতা খুব বন্ধুত্বসুলভ ভঙ্গীতে তাকে আপ্যায়ন করলো। ওদের একমাত্র ছেলে ধীমান তাকে প্রণাম করে, ‘কেমন আছো কাকু’ জিগ্যেস করলো। দেবরাজও ওকে ‘বেশ আছি, তুমি কেমন আছো সান্যালবাবু?’ বলে ইয়ার্কির ছলে সম্বোধন করলো। কিন্তু সবটাতেই রয়েছে একটা বিমর্ষভাব যেটা দেবরাজকে খুব স্পর্শ করে গেলো।
যাই হোক, বন্ধুর বাড়িতে এসে অনিচ্ছাসত্ত্বেও সামান্য মিষ্টিমুখ করতেই হলো দেবরাজকে। তারপর কিছুক্ষণ সুজাতার সঙ্গে, কিছুক্ষণ ধীমানের সঙ্গে সে সাধারণ কথাবার্তা সারলো। এমন সময় জয়দীপ কোনো একটা অছিলায় ধীমানকে ঘরের ভেতরে পাঠিয়ে দিয়ে দরজাটা ভালো বন্ধ করে দিলো। তারপর শুরু করলো তার বক্তব্য –
তুই হয়ত শুনে থাকবি, এই অঞ্চলে ইদানীং কয়েকটা খুন হয়ে গেছে। ব্যাপারটা আমার এতোই সিরিয়াস মনে হয়েছে যে সুজাতার কাছে গতমাসে এটা শোনার পর আমি ঠিকই করে ফেলেছিলাম যে ওদের ভুবনেশ্বরে নিয়ে যাবো। ওখানে সপরিবারে থাকবার ব্যবস্থাও করে ফেলেছিলাম। কিন্তু তারপরে সুজাতার মুখে শুনতে পেলাম একটা আশ্চর্য ঘটনা। ব্যাপারটা আমার প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। কিন্তু গত পরশুদিন আমি নিজে এটা দেখেছি। আর তারপর থেকে আমিও ব্যাপারটা নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। ঘটনাটা তুই সুজাতার কাছ থেকেই শুনবি, কারণ ও ব্যাপারটার সাথে বেশি পরিচিত। তার আগে আমি একটা ব্যাপার তোকে বলতে চাই।
দেবরাজ হাল্কা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘কি ব্যাপার?’
জয়দীপ বলে, যে খুনগুলো হচ্ছে, প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই কিন্তু একই পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে। মাথাটা ধড় থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়েছে আর মাথার ঘিলু আর যকৃত একটা মৃতদেহেও পাওয়া যায়নি। এ থেকে কি বোঝা যাচ্ছে?
দেবরাজ বলে, ‘যে বা যারা খুনটা করছে তারা একই ব্যক্তি বা দল।’
জয়দীপ সম্মতির সুরে বলে, ‘এক্স্যাক্টলি। পুলিশেরও অনুমান এটাই। কাগজেও এমনটাই লিখেছে। আর একটা বিষয় হলো, খুনটা হয় প্রায় মধ্যরাতে। সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন। এমন সময়ে কোনো অজানা কারণবশত ভিক্টিম ঘুম থেকে উঠে পড়ে। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে তাকে আর পাওয়া যায় না। কোথাও পাওয়া যায় না। না ঘরে, না বাইরে। পাওয়া যায় পরের দিন সকালে। বাড়ি থেকে অনেক দূরে, সাধারণত জনবিরল এলাকায়। ধড় থেকে মুণ্ডু আলাদা। মাথার ঘিলু আর যকৃত মিসিং।
দেবরাজ বলে, ‘দেখ, যেহেতু এখন নরখাদক নামে কোন শ্রেণীর মানুষ আমাদের আশেপাশে রয়েছে বলে জানা নেই। তাই ধরে নেওয়া যেতে পারে এটা নরবলি দিতে চাওয়া কোনো পিশাচের কাজ, অথবা এমনটাও তো হতে পারে যে কোন বিকৃতমনস্ক আততায়ী এই কাজ করছে খুব সুচারু উপায়ে।
জয়দীপ মাথা নাড়ালো, ‘উহু। যদি তাই হতো, তবে ভিক্টিম নিজে থেকে কেন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাবে? যেসব বাড়িতে এই ধরনের খুন হয়েছে তাদের পরিবারের লোকেরা কিন্তু কাউকে তাদের বাড়িতে আসতে দেখেনি কিংবা বেরোতেও দেখেনি। এমনকি পুলিশের রিপোর্টেও কিন্তু বাড়িতে কারুর আসার বা সেখান থেকে বেরোনোর কোনো ইভিডেন্স নেই।
দেবরাজ এর কোনো প্রত্যুত্তর দিলো না। জয়দীপই তারপর বললো, ‘এরপরেও যদি তোর মনে হয় এটা কোন আততায়ীর কাজ, তবে সুজাতার কাছ থেকে শুনলে তোর সেটুকু বিশ্বাসও উবে যাবে।’
দেবরাজ চমকে ওঠে, ‘ব্যাপারটা কিরকম?’
ঠিক এই সময়ে ঘর থেকে ধীমান বেরিয়ে এলো। ‘বাবা, কার্টুনটা বন্ধ হয়ে গেলো, একটু দেখো না।’ এই বলে সে জয়দীপকে টানতে টানতে অন্য ঘরে নিয়ে গেলো। যদিও জয়দীপের যাওয়ার ইচ্ছা ছিলো না। কিন্তু উপায়ান্তর না দেখে সে দেবরাজকে বললো, ‘দেবু, তুই বাকীটা সুজাতার থেকে শোন। আমি আসছি। আমার আরো কিছু বলার আছে।’ কথাগুলো বলতে বলতে সে ছেলের হাত ধরে অন্য ঘরে ঢুকে দরজা দিয়ে দিলো।
বৈঠকখানার ঘর থেকে জয়দীপদের বাড়ির বাগানটাকে খুব সুন্দরভাবে দেখা যায়। সূর্যের উজ্জ্বল আলো বাগানটাকে ভরিয়ে তুলেছে। বাহারি রঙিন ফুলগুলো সুন্দরভাবে ফুটে আছে। এমন একটা পরিবেশে এরকম একটা বাজে ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করতেই ভালো লাগে না। দেবরাজ ভাবে, পাড়ায় খুন হচ্ছে তো আমি কী করবো?
এমন সময় সুজাতা বলে ওঠে, ‘আসলে আপনাকে হয়ত আমরা ডিস্টার্ব করছি। কিন্তু জানেন, সত্যিই বাধ্য না হলে আজ আমরা আপনাকে আসতে বলতাম না।’
দেবরাজ বললো, ‘বেশ তো। বলুন না।’
সুজাতা শুরু করে –
জানেন, গতমাসে ব্যাপারটা প্রথম লক্ষ্য করেছিলাম। আমার ছেলে আর আমি রাতে একইসাথে শুই। ভোর হওয়ার ঠিক আগে, কটা বাজে জানি না, হঠাৎ দেখি ওর সারাটা শরীর কাঁপছে। সে কি অসহ্য কাঁপুনি আর ছটফটানি। ওর ঐ ছটফটানিতে খাটটা এতোই কাঁপছিলো যে আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমি তো ভেবেছিলাম ও কোন বাজে স্বপ্ন দেখে ভয় পেয়েছে। মাঝেমধ্যেই তো ভূতের সিনেমা দেখে। তাই আমি চেষ্টা করলাম ওর ঘুম ভাঙিয়ে দিতে। কিন্তু ওর ঘুম সহজে ভাঙলো না। একটুবাদেই শুনতে পেলাম ও যেন অস্ফুট স্বরে কি একটা বলার চেষ্টা করছে। ভালোভাবে শোনবার চেষ্টা করলাম। ও একটা নাম বলছিলো। নামটা ছিলো রথীন ঘোষাল। ভদ্রলোক আমাদের পাড়াতেই থাকেন। আমি ভাবলাম বোধহয় ও রথীনদার কাছ থেকে কোন ভয়ের কথা শুনেছে, তাই ঐ নামটা বলছে।
যাই হোক, পরের দুদিন কিছু হলো না। কিন্তু তারও একদিন পরে ঘটলো একটা অদ্ভুত কাণ্ড। রথীনদা হঠাৎ বাড়ি থেকে নিখোঁজ। হঠাৎ রাত্তিরে সে কোনো এক অজানা কারণে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়, তারপর সে আর ফেরেনি। আমরা যারা ওকে চিনি, তারা তো খুব অবাক হয়ে গেছিলাম। রথীনদার মতো লোক হঠাৎ নিখোঁজ হলো কি ব্যাপার। কিন্তু তারপরেই শুনি একটা বাজে খবর। রথীনদার মৃত্যু হয়েছে। আর কি বীভৎস সেই মৃত্যু! আমাদের বাড়িতে যে কাজ করতে আসে সেই প্রথম খবরটা দিয়েছিলো।
প্রথমটায় আমি বিস্মিত হয়েছিলাম বটে। কিন্তু সেভাবে কিছু ভাবিনি। বিশেষত যেখানে এইভাবে ভয়ঙ্কর রকমের খুন হতে পারে, সেখানে আমাদের থাকাটা কতখানি নিরাপদ এই ভাবনাতেই আমি বেশি বিচলিত হয়ে পড়েছিলাম। আপনার বন্ধুকে আমি তখনই ফোন করি। তারপর আমরা দুজনেই ঠিক করি যে এখান থেকে চলে যাবো। কিন্তু এরপর একের পর এক সেই একই ঘটনা ঘটতে থাকে। রাত্তিরে ছেলের বাজে স্বপ্ন দেখে কাঁপুনি। তারপর একটা পরিচিত নাম উচ্চারণ। আর তার ঠিক তিনদিনের মধ্যে সেই ব্যক্তির মৃত্যু। এভাবে কম করেও ছ’টা খুন হয়েছে এই পাড়ায়। আর সবাই আমাদের খুব পরিচিত। এটা কি হচ্ছে দেবরাজদা? আমি তো এর কিছুই বুঝতে পারছি না।
সুজাতার গলায় একটা আকুতি টের পায় দেবরাজ। কিন্তু সে নিজেও এতো অবাক হয়ে গেছে এর কোনো উত্তরও সে দিতে পারে না। খানিকক্ষণ পর সে বলে, ‘আচ্ছা, যেসব বাড়িতে খুনগুলো হচ্ছে, তাদের প্রত্যেককেই তো আপনারা চেনেন বললেন, তাই তো?’
সুজাতা বলে, ‘হ্যাঁ চিনি।’
- তো তাদের বাড়িতে গিয়ে কখনো খোঁজ নিয়েছেন?
- প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রেই হয় আমি, নয় আপনার বন্ধু গিয়ে খোঁজ নিয়েছে। আর প্রত্যেকের কাছ থেকেই আমরা একই কথা শুনতে পাচ্ছি। প্রত্যেকটা খুনই একইধরনের।
তারপর কিছুক্ষণ থেমে সুজাতা আবার বলে, ‘আর একটা ব্যাপারে আমার ভয় হচ্ছে জানেন। আমার ছেলে যে ওদের নামগুলো আগে থেকে জানতে পারছে এ কথা এখনও কেউ জানে না। পুলিশ যদি কোনোরকমে এটা জানতে পারে, তবে, বলা যায় না, হয়তো আমাদেরকেই সন্দেহ করে বসবে। আমাদের কথা হয়তো তারা বিশ্বাসই করবে না। এই ভয়েতেই আমরা এটা বাইরের কাউকেই জানাতে পারছি না। আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না আমার ছেলে কিভাবে এর মধ্যে জড়িয়ে পড়লো?
সুজাতার কথা চলাকালীনই ঘরে এসে ঢুকলো জয়দীপ। দেবরাজ জয়দীপকে জিগ্যেস করে, ‘কি রে? ধীমান কি করছে?’ দেবরাজের উল্টোদিকের চেয়ারটায় বসতে বসতে জয়দীপ বলে, ‘ঐ কার্টুন দেখছে।’
- আচ্ছা ওকে কি এর মধ্যে খুব ভয়ের কিছু দেখানো হয়েছে?
- সেরকম তো আমরা কিছু দেখাইনি। আর বাইরে থেকে ও খুব ভয়ের কিছু দেখে থাকলে, নিশ্চয়ই ওর মাকে বলতো।
দেবরাজ মিনিট খানেক ধরে কনুইদুটোকে টেবিলের ওপর রেখে দুই হাতের তালুতে মুখটাকে ধরে খুব গভীরভাবে কিছু ভাবলো। তারপর বললো, ‘আচ্ছা, ধীমানকে তোরা এই স্বপ্নের ব্যাপারে প্রশ্ন করিসনি?’ উত্তরটা সুজাতাই দিলো, ‘ও বলেছে। কিন্তু সেভাবে ভালোভাবে কিছু বলতে পারে না। একটা ছকের কথা ও বলে। ছকটায় নাকি অনেকগুলো নাম লেখা। আমরা ব্যাপারটা ঠিক বুঝিনি।’ জয়দীপ বলে, ‘তুই নিজেই ওর কাছ থেকে জিগ্যেস করে নে না। সেটাই মনে হয় ভালো হবে।’ দেবরাজ বলে, ‘ঠিক বলেছিস, ওর সাথে একটু কথা বলে নিই।'

(প্রথম পর্ব সমাপ্ত। গল্পের দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।)

সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই আগস্ট, ২০২০ দুপুর ১২:৪১
৪টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শুভ সকাল

লিখেছেন জুন, ২৯ শে নভেম্বর, ২০২০ সকাল ৯:৩৪


আমার ছোট বাগানের কসমসিয় শুভেচ্ছা।

আজ পেপার পড়তে গিয়ে নিউজটায় চোখ আটকে গেল। চীন বলেছে করোনা ভাইরাস এর উৎপত্তি ভারত আর বাংলাদেশে, তাদের উহানে নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ মায়াময় ভুবন

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৯ শে নভেম্বর, ২০২০ সকাল ১১:২৯

এ পৃথিবীটা বড় মায়াময়!
উদাসী মায়ায় বাঁধা মানুষ তন্ময়,
অভিনিবিষ্ট হয়ে তাকায় প্রকৃতির পানে,
মায়ার ইন্দ্রজাল দেখে ছড়ানো সবখানে।

বটবৃক্ষের ছায়ায়, প্রজাপতির ডানায়,
পাখির কাকলিতে, মেঘের আনাগোনায়,
সবখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাস্কর্য বা মূর্তি যাই বলা হোক, রাখা যাবে না।

লিখেছেন এ আর ১৫, ২৯ শে নভেম্বর, ২০২০ সকাল ১১:৫০


ভাস্কর্য বা মূর্তি যাই বলা হোক, রাখা যাবে না।

কেন?
কারন আল্লাহ মুসলমানদের জন্য মূর্তি পূজা নিষিদ্ধ করেছেন। ভাস্কর্য বানালে এক সময় এগুলা মূর্তি হয়ে বিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিমায় পরিনত হবে। মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

উহানের দোষ এখন বাংলাদেশ বা ভারতের ওপর চাপানোর চেষ্টা হচ্ছে

লিখেছেন শাহ আজিজ, ২৯ শে নভেম্বর, ২০২০ দুপুর ১২:১৯



আমরা বাংলাদেশীরা বাদুড়ের জিন থেকে আসিনি ভাই । না বাদুড় খাই, না খাই প্যাঙ্গোলিন বা বন রুই । আমাদের কোন জীবাণু গবেষণাগার নেই , নেই জীবাণু অস্ত্রের গোপন... ...বাকিটুকু পড়ুন

"দি সান", একটা বৃটিশ টেব্লয়েড, এদের কথায় নাচবেন না

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৯ শে নভেম্বর, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:৩৭



বাংলাদেশে টেব্লয়েড পত্রিকা আছে, নাকি বাংলাদেশের সব পত্রিকাই টেব্লয়েড? টেব্লয়েড পত্রিকাগুলো ইউরোপ, আমেরিকায় স্বীকৃত মিডিয়ার অংশ, এরা আজগুবি খবর টবর দেয়; কিংবা খবরকে আজগুবি চরিত্র দিয়ে প্রকাশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×