somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রেট কতো, রেট কতোদের জন্য নগরীতে রেডজোন দরকার

২৯ শে জুন, ২০১৭ বিকাল ৫:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
কামরুন নাহার রুমা


ছবিঃ কামরুন নাহার রুমা

২০১৩ বা ২০১৪ সালের এক সন্ধ্যা, মাগরিবের ওয়াক্ত। পরীবাগ ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে আসছি। এই ব্রিজটা একটু সুনসান সবসময়ই। আজান হচ্ছিল, তাই আঁচল টেনে ঘোমটা দিয়ে ধীরে এগুচ্ছিলাম। অন্য কোনো মানুষ ছিল না তখন ব্রিজের উপর একজন লুঙ্গি পরা পুরুষ ছাড়া। আমি দূর থেকেই খেয়াল করেছিলাম সে দাঁড়িয়ে ছিল, আর আমার দিকেই সে তাকিয়েছিল। আমার দিকে তাকিয়ে থাকাটা কোনো সমস্যা ছিল না। সমস্যাটা শুরু হলো আমি তাকে ক্রস করার পর।
হঠাৎ শুনতে পেলাম কেউ একজন পেছন থেকে বলছে, ‘রেট কত’? আমি প্রথমে বুঝি নাই, নিজের মতো হাঁটছি। কিন্তু শব্দটা পিছু ছাড়ছে না। ‘রেট কত’ শব্দটা বুঝতে আমার একটু সময় লাগলো এবং আমি তৎক্ষণাৎ থেমে গেলাম। থেমে পেছনে ফিরলাম। লোকটাও থেমে গেল। আমি এগুলাম। সেও এগুচ্ছে – বুঝতে পারছিলাম। ‘রেট কত’ ‘রেট কত’ থামছে না।
ব্রিজ শেষ করে রাস্তায় নামলাম। সেও নামলো। এইবার আমি ঘোমটার আঁচল কোমরে বেঁধে ঘুরে দাঁড়ালাম। লোকজন ছিল কিছু চারপাশে। তারা খেয়াল করছিল বলে মনে হয় না। আমি ডাকলাম, ‘আয় রেট বলি’ – এই কথা শোনার সাথে সাথে লোকটা উল্টো পথে হাঁটা ধরলো। পরীবাগ ওভার ব্রিজের পাশে তখন একটা বহুতল ভবনের নির্মাণ কাজ চলছিল, এবং সে ওই ভবনের ভেতরে ঢুকে যাবার পর আমি নিশ্চিত হলাম সে একজন নির্মাণ শ্রমিক। তার পুরো উপস্থাপনে আমার শুরু থেকে তাই মনে হয়েছিল। ফুটওভার ব্রিজের এই ঘটনাগুলো খুব কমন ঘটনা। অনেক সাধারণ মেয়েই এই জাতীয় পরিস্থিতির শিকার হয় রোজ।
২০১৭ এর নিত্যদিনের সকাল। সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজের দুই ভবনের মাঝের রাস্তা। রোজ সকালে শ’খানেক ব্যবহৃত কনডম মাড়িয়ে আমায় কর্মস্থলে যেতে হয় এই রাস্তা দিয়ে । গাড়ির চাকার সাথে আটকে যে কটার ভাগ্য হয় না পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়তে, তাদের সাথে দেখা হয়ে যায় অফিস ফিরতি পথে। এই অবস্থা ঢাকা শহরের অনেক রাস্তারই।
আমার সাজ পোশাক, চলায় অন্তত ‘রেট কত’ টাইপ কোনো ব্যাপার নাই, এটাতে আমি শতভাগ নিশ্চিত; রোজ যে সকল মেয়ে ফেস করে এই সিচুয়েশন, তাদেরও পোশাক বা চলাফেরায় ‘রেট কত’ টাইপ ব্যাপার নাই, সেই ব্যাপারেও আমি নিশ্চিত। সুনসান রাস্তায়, ফুটওভার ব্রিজে রাতের আঁধারে বা সন্ধ্যায় যেসব পুরুষ ‘রেট কত’ বলে মুখে ফেনা তোলে, তাদের অধিকাংশই নিম্ন মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত এবং খেটে খাওয়া মানুষ, যারা এই শহরেই থাকে অথবা কাজের জন্য পরিবার পরিজন ছেড়ে এই শহরে লম্বা সময়ের জন্য আছে – যেমন আমার পিছু নেয়া সেই নির্মাণ শ্রমিকটি। এইসব মানুষের কল গার্ল ডেকে বাসায় নিয়ে গিয়ে সেক্স করার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই। আর তাই তাদের ভরসা তাদেরই মতো খেটে খাওয়া আর একদল মানুষ, যাদেরকে আমরা বলি ভাসমান পতিতা।
একজন পুরুষের শরীরে যখন যৌন ক্ষুধার উদ্রেক হয়, তখন সে সামনের নারীর বয়স, স্ট্যাটাস দেখে না, সে দেখে রেট। আর এই রেট কত, রেট কত, বলতে বলতেই সে তার রেটের একজন পেয়ে যায় রাতের আঁধারে। রেট মতো একজন পেয়ে গেলেও সেক্স করার জায়গা পাওয়া এবার কঠিন হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে তারা মানুষজন কম মাড়ায় যেসব রাস্তা, সেগুলোকেই বেছে নেয় যার মধ্যে সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজের দুই ভবনের মাঝের রাস্তাটা একটা।
শিবের গীত অনেক গাইলাম, এবার ধানটা ভানি। অবশ্য এইটুকু শিবের গীত দরকার ছিল, ধান ভানার পটভূমি হিসেবে। নারায়ণগঞ্জের টানবাজার যৌনপল্লীটি যখন তুলে দেয়া হয়, তখন এর উচ্ছেদ পরবর্তী অবস্থা নিয়ে কেউ খুব একটা ভেবেছেন বলে আমার মনে হয় না। যারা চোখকান খোলা রেখে রাস্তায় চলাফেরা করেন, তারা নিশ্চয় খেয়াল করে থাকবেন ঢাকা শহরের আনাচে-কানাচে তখন যৌনকর্মীতে ভরে গিয়েছিল।
আমি রাত ১০টায় অবজারভার পত্রিকা অফিস থেকে ফেরার পথে দেখতাম দৈনিক বাংলার মোড় থেকে শান্তিনগর পর্যন্ত যৌনকর্মীরা বাহারি পোশাক পরে সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছে খদ্দেরের জন্য; কেউ কেউ ওপেন দরদাম করছে। আমার কাছে দুই পক্ষের কাউকেই অপরাধী মনে হয়নি, আজও হয় না।
পতিতাবৃত্তি আদি পেশা, যদিও সামাজিক বা ধর্মীয় কারণে এই দেশে এই পেশাটাকে বৈধতা দেয়াটা কঠিন। কিন্তু তাই বলে যৌনকর্মীদের সংখ্যা কমেনি , কমেনি খদ্দেরের সংখ্যাও। পুলিশকে টু পাইস দিয়ে পুলিশের সহযোগিতাতেই চলে এই পেশা। সেটা সবারই জানা। আমি বলতে চাইছিলাম এই দেশে, এই শহরে যৌনপল্লী দরকার, একটা না, ছড়িয়ে ছিটিয়ে বেশ কটা দরকার আর এই যৌনপল্লীগুলোর মূল ক্রেতা হবে নিম্নবিত্ত এবং খেটে খাওয়া শ্রমিক, দিনমজুর বা রিকশাওয়ালারা।
এতে করে দুইটা কাজ হবে:
১। ইচ্ছা অনিচ্ছায় যারা এই পেশাতে চলে আসবে, তাদের কাজের একটা নির্ধারিত জায়গা হবে; জায়গার অভাবে এদিক- সেদিক যেতে হবে না খদ্দের নিয়ে;
২। রাস্তাঘাটে কানের কাছে কেউ এসে ‘রেট কত’ জানতে চাইবে না; কিছুটা হলেও প্রবণতাটা কমবে। আর এতে করে সাধারণ নারীরা রেহাই পাবে অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি থেকে।
আমাদের দেশে যৌনপল্লী নাই এমন তো নয়। যৌনক্ষুধা যেহেতু মানুষের আছে (এখানে পুরুষদের কথাই বলছি) এবং সেই ক্ষুধা মেটানোর জন্য মানুষও যেহেতু আছে, সেক্ষেত্রে যৌনপল্লীর সংখ্যা কিছু বাড়লে কী এমন ক্ষতি! সবারই কাজের জায়গা আছে; অনিচ্ছায় এই পেশায় আসা মেয়েগুলোরও না হয় কাজের জায়গা হোক। আর যারা এই মেয়েগুলোর কাছে যাবে, তাদেরও না হয় হয়রানি কমুক।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জুন, ২০১৭ বিকাল ৫:৫১
৭টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ২০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৩১



এবছর দেশে আমড়ার ফলন ভালো হয়েছে।
আমড়ায় আছে প্রচুর ফাইবার যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। এক কেজি আমড়া মাত্র ৫০ টাকা। এক কেজি আপেল ৩৫০ টাকা। মালটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×