somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

"আমরা বৈচিত্র্র্র্যময়, ওরা অভিন্ন" উপসর্গ

২৮ শে নভেম্বর, ২০০৬ রাত ১:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছোটবেলা চাইনীজ. জাপানীজ, কোরিয়ান বলতেই বুঝতাম বোঁচা নাকের, ছোট চোখের হলদে মানবদের। কিছুতেই বুঝতে পারতাম না, ওরা একে অন্যকে আলাদা করে চিনে কি করে? সবাই তো দেখতে একই রকম। তার চেয়ে আমরা বাঙালীরা কত বৈচিত্র্যময়, এক এক জনের চেহারায় কত তফাৎ, ওদের সবার চেহারা এত একরকম কেন? সিডনীতে আমার স্কুলে চাইনীজ, কোরিয়ান, জাপানিজ সবাইকে পেলাম এক সাথে। প্রথম প্রথম এমান্ডা আর মে এর চেহারায় পার্থক্য করতে পারতাম না। আর ওদের সবার ভাষা তো সেই একই চ্যাং চুং... এরকম একটা ধারণা নিয়ে থাকতাম। আস্তে আস্তে জাপানীজ মেয়ে এমান্ডা আর চাইনীজ মেয়ে মে এর নিজেদের ভাষার কথা শুনে শুনে বুঝে গেলাম জাপানীজ আর চাইনীজ ভাষায় আকাশ পাতাল তফাৎ। শুধু এমান্ডা আর মে কে আলাদা করে চিনতে শিখলাম না, জাপানীজ আর চাইনীজদের চেহারা মৌলিক পার্থক্যগুলোও চিনে গেলাম।

আমার ছোট বোনের গায়ের রং আমার চেয়ে একটু হালকা, একেবারেই অল্প। দুধ চায়ে দুই ফোঁটা দুধ মেশালে রঙের যতটুকু পার্থক্য হবে, ততটুকুই। এটা আগে বুঝি নি। কারণ বাংলাদেশে, ওকে সবাই 'উজ্জ্বল শ্যামলা' বলতো, আমাকে বলতো শ্যামলা। এবং এই হালকা রঙের পার্থক্য নিয়ে বিশাল ঘটনা হয়ে যেত। মজার ব্যপার হলো, এই গায়ের রঙের পার্থক্যটা সিডনীতে কেউ ধরতে পারে না। একেবারেই কেউ না। সবার ধারণা আমাদের দুই বোনের চেহারা একদম একরকম। এমনকি, এ পর্যন্ত অন্তত: পাঁচ জন মানুষ জিজ্ঞাসা করেছে আমরা জময কি না। অথচ আমরা জানি, আমার চোখ আমি পেয়েছি ফুপীর কাছ থেকে, ও বাবার থেকে, আমার ভ্রু মায়ের মত, ওর বাবার মতো, আমার ঠোঁট বাবার মতো, ওর ছোট খালার মতো। আমার মুখ লম্বাটে, ওর চারকোণা। ওত আলাদা! মানুষের দেখার চোখ নাই নাকি?

তবু, অবাঙালীরা আমাদের প্রথম দেখায় ভাবে, আমরা দেখতে 'একদম' এক রকম। আমার ভাইয়া, যার সাথে গুণে গুণে চোখ, নাক, ঠোঁট সব কিছুতেই আকাশ পাতাল তফাৎ পাই, সেই ভাইকে দেখেও নাকি আমার মতো লাগে। সমস্যাটা কোথায় বুঝলাম পরে। শুধু আমাদের তিন ভাই বোনের চেহারা একরকম বলে না ওরা, বরং সব বাঙালীদের চেহারাই একই ছাঁচে ফেলে দেয়। তখন বুঝলাম, চাইনীজ সিন্ড্রম হচ্ছে!

আসলে আমরা নিজেদের বরাবরই বৈচিত্র্যময় আর রঙিন ভাবি। যাকে 'নিজেদের' ভাবতে চাই না, তাদের সবাইকে 'এক' করে দেখি। নৃতত্ত্ববিদরা একে কি বলবেন জানি না। কিন্তু এই স্পষ্ট সাদা কালো দেখার প্রবনতা থেকেই আগে সামনা সামনি যুদ্ধ চলতো। 'আমার মানুষেরা' সব ভালো আর সব্বাই খারাপ।

পৃথিবী বদলিয়েছে, আমরা 'সহাবস্থান' এর মত রঙিন শব্দ উদ্ভাবন করেছি। একে অন্যের কাছাকাছি আসায়, আদান প্রদান বাড়ায় সাদা কালো এখন আর স্পষ্ট সাদা কালো না। মাঝে অনেকগুলো রঙের শেইড ঢুকে গেছে। একটু ময়লাটে সাদা, ধূসর সাদা, হালকা ধূসর, গাঢ় ধূসর, খুব গাঢ় ধূসর... কত শেইড! তবু, এখনও স্বার্থপর উদ্দেশ্যে মানুষের প্রাচীন 'সাদা কালো' প্রবনতাকে ব্যবহার করে মানুষ। পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্র নেতারা। তাই বুশ বলতে পারো, 'য়ু আর ইদার উইথ আস অর য়ু আর উইথ দা টেররিস্টস'। এখানে মাঝামাঝি কোন পথ নেই। টেররিস্টদের অপছন্দ করে বুশকে অপছন্দ করার পথ নেই। ইসলামের মৌলিকত্ব ভালোবেসে সন্ত্রাসীদের অপছন্দ করার পথ নেই। মাঝের রাস্তা পুরোটাই 'নো ম্যানস ল্যান্ড'।

আমাদের জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে অবস্থা এক। যারা 'আমাদের' মানুষেরা না, তাদের স্টেরিওটাইপ করে আনন্দ পাই, তাতে স্বার্থসিদ্ধি হয় যে! চাইনীজ জাপানীজদের ছোট চোখ আর বোঁচা নাক দেখিয়ে যেমন আমরা ওদের এক করে ফেলতে ভালবাসি, তেমনি শুধু মাত্র কিছু বাহ্যিক মিলের জন্য আমরা 'আমাদের' সাথে সংঘর্ষশীল সব মতবাদকে এক ছাঁচে ঢেলে ফেলি। আর দেখুন, সেই তারাই ওপারে বসে আমাদের সবাইকে একই নৌকার ভাবছে।

ইদানিং খুব করে মনে হচ্ছে, পরিপক্কতার পথে খুব বড় একটা ধাপ হলো, নিজের এই সীমাবদ্ধতাটা চিনে নেয়া, এবং কাটানোর আন্তরিক চেষ্টা করা। তাতেই বিভিন্ন মানুষের নিজেস্ব স্বার্থে সৃষ্ট মাঝের 'নো ম্যানস' ল্যান্ডে চলাচল বাড়বে। কে জানে, হয়তো এটাই বেশির ভাগ মানুষের চলার পথ হবে এক দিন!
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৩৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

খাম্বা/খাল তারেক কে কিছু উপলব্ধি শেয়ার করছি

লিখেছেন অপলক , ১৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৪২

আজ আর মনের মাধুরী মিশিয়ে বকাঝকা করব না। আজ কিছু ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা শেয়ার করব।



খাল খনন বা ঢাকার বাসস্ট্যান্ড সরানোর চেয়ে কি কি গুরুত্বপূর্ন কাজ এই অর্থবছরে করা যেতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গানটি প্রিয় রাজীব নূর ও কবি স্বপ্নের শঙ্খচিলকে উৎসর্গ করছি

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:০৬

আমার খুব প্রিয় একটি কবিতার সাথে ব্লগার স্বপ্নের শঙ্খচিলের কবিতা মিলিয়ে গানটি বুনেছি।
শোনার আমন্ত্রণ রইলো।
============================

এই জল ভালো লাগে;
বৃষ্টির রূপালি জল কত দিন এসে
ধুয়েছে আমার দেহ- বুলায়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কদমের পাপড়ি

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ১৭ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৩


এ আষাঢ়ের চোখ কেমন জানি-
চৈত্রের হাওয়ায় কদম নয় যেনো
আগুন- আগুন- তবু ভেজে যাচ্ছে-
শান্তি চুক্তির গন্ধ বাতাস-বাতাসে;
আনন্দময় আষাঢ়ে কাম ভাবনায়
শুধু মাটির বুক গড়ে- গড়ে আসে
জলকাঁদার শ্রেষ্ঠ হাসি অথচ বসন্ত
কান্না... ...বাকিটুকু পড়ুন

অপারেশন ইকারুস: কুয়ালালামপুরের ছায়া সম্রাট

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৭ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৫



বালির নীল দিগন্ত
ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপের একটি নির্জন পাথুরে সৈকত। ভারত মহাসাগরের বিশাল নীল ঢেউ আছড়ে পড়ছিল তীরে। সমুদ্রের ঠিক ওপরের একটি আধুনিক কাঁচের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আহলে হাদিস বিরোধী পোষ্টে ব্লগে লাইক না থাকলেও গ্রুপে লাইক পাঁচ হাজার আটশত

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৭ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৪



হাদিস প্রেমিক হলো নাস্তিক ও আহলে হাদিস। উভয় দল হাদিস দিয়ে মুসলিমদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। আমি যেহেতু মুসলিমদের হেদায়াতের জন্য কাজ করি সেহেতু আমাকে আহলে হাদিস বিরোধী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×